আজ যে পাগলের কথা বলবো তিনি সত্যিই এক আজব পাগল। জন্মসূত্রে ভারতীয় নন, তবে তাঁর কাণ্ডকারখানা এই ভারতের মাটিকে ঘিরে। ইনি হলেন ক্যারন রন্সলে ( Caron Rawnsley) । আয়ারল্যান্ডের মানুষ তবে জন্ম ফরাসি দেশে।
একজন সাধারণ পর্যটকদের মতো এদেশে বেড়াতে এসেছিলেন ক্যারন। অন্যদের ক্ষেত্রে যা হয় – এলাম,ঘাম ছুটিয়ে এখানে ওখানে চষে বেড়ালাম, ক্যামেরা বাগিয়ে সবকিছুর ছবি তুলে, স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে দিনকয়েকের জন্য সময় কাটিয়ে আবার দেশে ফিরে গেলেন। আমাদের ক্যারন রন্সলে সাহেব হলেন একটু অন্য ধাতের মানুষ। রাজস্থানের যোধপুর শহরের নানান দর্শনীয় স্থানে ঘোরাঘুরি করে অনেক ভালো লাগায় স্মৃতি পাত্র ভরে উঠলো বটে, তবে তিনি বাঁধা পড়লেন রাজস্থানের ঐহিত্যবাহী Step Well বা ধাপ কুয়োর প্রেমে– বাওয়ারিস ( bawaris) এবং ঝালারাস্ (jhalaras )।

পৃথিবীতে এতো দেশ থাকতে ক্যারন রন্সলের মন এই ভারতবর্ষের মাটিতেই মজলো কেন? আসলে ক্যারন রন্সলের সঙ্গে ভারতের একটা অতীতের যোগাযোগ রয়েছে। ক্যারনের ঠাকুর্দা ভারতীয় রেলের চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দীর্ঘদিন এদেশে ছিলেন। মুম্বাই – বরোদা রেলওয়ে যোগাযোগ স্থাপন করার কাজে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভারতের সুপ্রাচীন কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ওপর ছিল তাঁর গভীর শ্রদ্ধা। অবসর গ্রহণের পর তিনি ইংল্যান্ড ফিরে গেলেন। ক্যারন এই মানুষটির সাহচর্যে এসে ভারতবর্ষ সম্পর্কে গভীরভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
ক্যারন রন্সলে উপমহাদেশের মাটিতে প্রথম পা রাখেন প্রতিবেশী পাকিস্তানে। সেখানে করাচিতে দু দশক সময় ধরে তিনি শ্রবণে দুর্বল ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার এবং পরিবেশ সংরক্ষণের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পড়ানোর কাজ করেছেন সিন্ধ অঞ্চলের সরকারি স্কুলেও। পাকিস্তান ছেড়ে তিনি ভারতে আসেন দুর্গ শহর জয়সলমীরের হাডা গ্রামে। কেজো লোক তো আর চুপচাপ বসে থাকতে পারেন না। তাই হাডাতেই গ্রাম গঠনের কাজে মজে গেলেন বেশ কিছুদিনের জন্য – গাছ লাগানো, সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন, শিশু শিক্ষার প্রসার এইসব আরকি! জয়সলমীরের পাট চুকিয়ে অন্য কোথাও যাবার ইচ্ছে ছিল ক্যারেনের। আকস্মিকভাবে যোধপুরে এসে তিনি আটকে গেলেন স্টেপ ওয়েলের টানে। কুয়োগুলোর অবস্থা তখন ভয়াবহ , লোকজন সেগুলোকে একদম ময়লা আবর্জনার আখড়ায় পরিণত করেছে । এদের আবার ব্যবহারোপযোগী করে তোলা যায় কীভাবে?
ক্যারন সাহেব ঠিক করলেন কেউই যদি তাঁর পাশে এসে না দাঁড়ায় তাহলে তিনি একা একাই এই কাজ করবেন। এমন সময় তাঁর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার ইচ্ছে নিয়ে এগিয়ে এলো মেহরানগড় মিউজিয়াম ট্রাস্ট। এই সংস্থার অন্যতম সদস্য এবং ইনট্যাক এর যোধপুরের আহ্বায়ক মহেন্দ্র সিং তানওয়ার তাঁদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। কুয়োর জমা জল তুলে ফেলার জন্য পাম্প বসানো হলো, এই ধরনের কাজে অভিজ্ঞ মানুষজন যোগ দিলেন ক্যারন রন্সলের সঙ্গে । সাহেবের কাজকর্ম দেখে আরো পাঁচজন উৎসাহিত হয়ে এগিয়ে আসবে,এক নতুন কর্মপ্রেরণার স্রোত বইবে কুয়োগুলোকে ঘিরে – এমনটাই আশা করেছিলেন তানওয়ার সাহেব।
যোধপুরের মানুষের কাছে ক্যারন রন্সলে এক আশ্চর্য অনুপ্রেরণা,এক নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা,এক ভারতপ্রেমী হৃদয়বান মানুষ, সর্বোপরি এক আশ্চর্য পাগলা সাহেব।
যোধপুরের মানুষের কাছে ক্যারন রন্সলে এক প্রেরণার নাম।
নবী বাওয়ারি, তাপী বাওয়ারি এখন অনেকটাই ফিরেপেয়েছে তাদের পুরনো চেহারা। তবে এখানেই থেমে থাকতে চায়না ক্যারন ও তাঁর দলবল। ক্যারন চান পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিনিধিদের মধ্যে এই অনুপম ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সত্যিকারের শ্রদ্ধাশীল ও আগ্রহী করে তুলতে যাতে জল বাঁচানোর এই ব্যবস্থা দেশের স্থায়ী আমানত হয়ে টিকে থাকতে পারে আরও বহু বহু বছর।
ঋণ স্বীকার: Better India
জুলাই ২৫. ২০২৬













