এবার ঘটনাস্থল বারুইপুর। শনিবার বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিল ১২ বছরের এক কিশোরী। রবিবার সকালে বাড়ির কাছের পুকুর থেকে উদ্ধার হয় তার নিথর দেহ। পরিবারের অভিযোগ, ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে তাকে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। ক্ষোভে ফেটে পড়েন সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেই ক্ষোভের মধ্যেই আমরা প্রত্যক্ষ করলাম আরও এক ভয়ংকর বাস্তব যা আবারও প্রমাণ করে আইনের উপর থেকে মানুষের আস্থা ক্রমশ ভেঙে পড়ছে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রথমে অভিযুক্তদের আটক করলেও ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকা কিছু মানুষ তাদের বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা চালায়। মানুষের প্রবল গণপ্রতিবাদের মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিন্তু এরপর যা ঘটে, তা কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। বিক্ষোভ চলাকালীন এক যুবককে গণপ্রহারে হত্যা করা হয়। সন্দেহ, গুজব এবং ক্ষোভ এই তিনের মিশ্রণে তৈরি হয় আর এক মৃত্যু।
এই ঘটনার সঙ্গে অভয়ার ঘটনার এক অদ্ভুত মিল রয়েছে।
দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠেছে অভিযুক্তদের আড়াল করার চেষ্টা কেন? কেন প্রতিবারই ক্ষমতা, প্রভাব ও রাজনৈতিক রঙ বিচারপ্রক্রিয়ার উপরে ছায়া ফেলতে চায়? যদি অভয়ার ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হতো, তাহলে হয়তো আজ বারুইপুরের মানুষ নিজেদের হাতে আইন তুলে নিতে বাধ্য হতেন না।
আমরা বারবার বলেছি, অপরাধীর কোনো জাত নেই, কোনো ধর্ম নেই, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। অপরাধীর একটাই পরিচয়-সে অপরাধী। এবং তাকে আইনের কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করানোই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যখন সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা দেখা যায়, তখন সমাজে জন্ম নেয় অবিশ্বাস, প্রতিশোধস্পৃহা ও অরাজকতা। তার ফল আমরা আজ চোখের সামনে দেখছি।
একদিকে এক নাবালিকার সম্ভাবনাময় জীবন নির্মমভাবে শেষ হয়ে গেল। অন্যদিকে গণপ্রহারে আরও এক প্রাণ হারাল। এই দুই মৃত্যুই আমাদের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও শিশুদের উপর নৃশংসতা যেমন বরদাস্ত করা যায় না, তেমনই গণপ্রহার বা জনতার বিচারের সংস্কৃতিকেও কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে সমাজ ধীরে ধীরে প্রতিহিংসার অন্ধকারে ডুবে যাবে।
West Bengal Junior Doctors Front-এর পক্ষ থেকে আমাদের দাবি:
• বারুইপুরের কিশোরী হত্যাকাণ্ডের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে।
• সমস্ত অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
• রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে রেহাই দেওয়া চলবে না।
• গণপ্রহারের ঘটনাতেও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
• নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের নির্দিষ্ট ও কার্যকর রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে।
আমাদের আন্দোলনের দাবি ছিল এই বাংলার অভিধান থেকে “ধর্ষণ”, “নারী নির্যাতন”, “শিশু নিপীড়ন” শব্দগুলো মুছে যাক। আজও আমরা সেই দাবিতে অনড়। কারণ ন্যায়বিচার শুধুমাত্র আদালতের রায় নয় ন্যায়বিচার হলো মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা। আর সেই আস্থা আজ গভীর সংকটে।












