১.
মানে ব্যাপারখানা এরকম, আমার কাছে পেশেন্ট এসেছে, আমি ঘন্টায় ঘন্টায় তার ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে জনতাকে জিজ্ঞেস করছি, কেউ বলতে পারবেন কী হয়েছে? কী ওষুধপত্তর দেওয়া যায়? সার্জেন ওটি টেবল থেকে টিউমারের ছবি পোস্টিয়ে জিজ্ঞেস করছেন, এরপর কোথায় আর্টারি ফরসেপটা মারব একটু বলবেন কেউ? রিয়েল টাইম বেসিসেও নয়, বারো ঘন্টা পরে!
এখানেই শেষ নয়, এরপর আমি ক্যামেরার সামনে এসে সবাইকে তুমুল বকাবকি করছি, এর জন্য তো আপনারা দায়ী! আমার কিচ্ছু লুকোনোর নেই তো!
মানে, আমি একটা কাজের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছি পরীক্ষা দিয়ে, পড়াশুনো করে, ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে বছর দশেক। সেই কাজের জন্য টাকা পাই, ফেসবুকে সবাই আমায় “ওহফ তুই কী মারাত্মক ভালো” বলে। তারপরে আমি এখন কাজকম্ম শিকেয় তুলে সারাদিন অভিমানী ফুঁপিয়ে চলেছি, “কেউ আমায় বুঝিল না” মর্মে।
২.
কলকাতা পুলিশ, সে ব্লক-টক করুন ঠিক আছে। সে মহুয়া মৈত্রও করছেন! আপনারা একটু ক্যাটেগরিকেলি বলবেন, আপনাদের চোখের সামনে মবটা ঢুকল, ভেঙে তছনছ করে দিল আন্দোলন মঞ্চ, ইমার্জেন্সি, এগোলো ঘটনাস্থলের দিকে, রে*প- থ্রেট দিলো নার্স দিদিদের আর আপনারা রোগীর বেডের তলায়, বাথরুমে লুকোলেন, তারপর আধঘন্টা পরে বীরদর্পে বেরিয়ে এসে টিয়ারগ্যাস ফাটালেন, ভিনীত গোয়েল ক্যামেরার সামনে উত্তেজিত বক্তব্য রাখলেন “আমাদের কিচ্ছু লুকোনোর নেই, মিডিয়া এই বিশৃঙখলা সৃষ্টি করছেন”, সকালে আপনারা ফেসবুকে প্রথমে জানালেন মবটায় “পতাকা” ছিল, “সাত হাজার” লোক ছিল, তারপর নিজেরাই সেসব এডিট করে দিয়ে জনতার কাছে মিডিয়ার তোলা ছবি ছেড়ে বললেন অপরাধী ধরে দিতে…আপনার কী মনে হয় জনতার কপালে বড় বড় করে ‘চুয়িংগাম’ লেখা আছে?
মানে ভাবুন একবার, ‘কলকাতা পুলিশ’– জনতার মাইবাপ, সিস্টেমের অমিতাবচ্চন, ফেসবুকের “আপনিই পারেন” খেলার গোল্ড মেডালিস্ট– এভাবে একের পর এক পরীক্ষায় ডাহা ফেল করে এরপর দায় ট্রান্সফার করছেন ‘জনতা’র ওপর! চারটে ছবি যাতে কোনও একটি দলীয় পতাকা দেখা যাচ্ছে, ছেড়ে দিলেন– তৃণমূলের লোক এসে সমস্বরে আইডেন্টিফাই করে গেল– আপনি গ্রেফতার করে এরপর বলে দেবেন “ওই তো সবাই বলেছিল বলে ধরলুম”; “এই তো এরাই সবকিছু ভাঙচুর করল”; “এই দেখুন তবে আন্দোলন রাজনৈতিক, ভাঙচুর রাজনৈতিক, আপনারা এবং আপনাদের দাবী রাজনৈতিক”। এবার যান সবে নিজ নিজ কাজে।
৩.
এবং সঙ্গে সঙ্গে মমতা ব্যানার্জি এতে “রাম- বাম” স্ট্যাম্প মেরে নিজের এবং নিজের দায়টুকু ঝেড়ে ফেলে পুজোর ভাতা বিতরণের চেকে সই করতে চলে যাবেন!
সেই মমতা ব্যানার্জি যিনি আজ রাস্তায়। এরাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে ধর্নায় নেমেছেন যাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি চাপে থাকেন। এ ধর্না তে তিনি পাশে পাচ্ছেন আর জি কর সহ সমস্ত রাজ্যের তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রধান ডাকাবুকো নেত্রী মমতা ব্যানার্জিকে! ২০১১ থেকে আজ ২০২৪– “বিরোধীদের চক্রান্ত” তত্ত্বটি এবার ক্লাস নাইনের পদার্থবিদ্যার সিলেবাসে ঢুকিয়ে দিলেই তো ল্যাটা চুকে যায়!
কেউ রাজনীতি করবেন না। কারণ এ রাজ্যে একমাত্র রাজনীতি করবেন মমতা ব্যানার্জি ও তাঁর দল। তিনি ক্যামেরার সামনে ডাক্তারদের রিক্যুয়েস্ট করবেন “আপনারা দয়া করে কাজে ফিরুন” আবার তিনিই একইসঙ্গে “১৬-১৯ তারিখ দলীয় কর্মসূচী” ঘোষণা করবেন। স্বাধীনতার রাত্রে এ দেশের সবচেয়ে বড় স্বতঃস্ফূর্ত গণ জাগরণের মুহূর্তে তার রাজ্যেই, তারই পুলিশের সামনে দিয়ে, ক্যামেরার সামনে দিয়ে গুন্ডা ঢুকে ধূলিস্যাৎ করে দিয়ে যাবে একটি সরকারি হাসপাতাল যা লাইভ দেখবে গোটা দেশ! কখনও তার বাহানা আসবে, “পুলিশ শান্তিপ্রিয় থাকতে চেয়েছিল”, আবার কখনও আসবে “এ আই জেনারেটেড ভিডিও” এবং এরপরেও নাকি ডাক্তার- নার্সরা নিজেদের সুরক্ষার কথা, জীবনের কথা না ভেবেই কাজে ফিরে আসবেন!
৪.
আরজিকর কান্ডে আমরা সব্বাই কতখানি “জাস্টিস” পাবো সেটা পরের কথা! কিন্তু এ দেশের একটি অঙ্গরাজ্যে, সরকার- পুলিশ মিলে আপনারা গত কয়েকদিন যে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা নিলেন, তাতে সাধারণ মানুষের চোখের সামনে গণতন্ত্র এবং জাস্টিসের ধারণাটাই জাস্ট চুরমার করে দিলেন আপনারা। নিজে হাতে তৈরি করলেন অ্যানার্কির ডোমিনো এফেক্ট। মানুষকে বলে দিলেন এ রাজ্যে ঘরে- বাইরে- কর্মক্ষেত্রে আপনি সামান্যতমও নিরাপদ নন শুধু তাই নয়, আপনার কিছু হয়ে গেলে তার বিচার পাওয়ারও কোনও প্রশ্ন নেই!
মাননীয়া মমতা ব্যানার্জি, আজ “খেলা হবে” দিবসে আপনি মিছিলের ডাক দিয়েছেন। কিন্তু এটি একটি ভয়ঙ্কর খেলা খেলছেন আপনারা। রাজনীতি- বিরুদ্ধ রাজনীতি এক জিনিস। গোটা সিস্টেমের ওপর থেকে সব্বার ভরসা উঠে যাওয়া আরেক। তখন মানুষ পাশের মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখে, অ্যানোনিমাস ভয়েস মেল মুহূর্তে ছড়িয়ে যায় দেশের এক থেকে অন্যপ্রান্তে, সাত থেকে সাতাশি রাস্তায় নেমে আসেন কারণ প্রতি শ্বাসবায়ুতে অবিশ্বাস মিশে নিজের ঘরের ভেতরেই দমবন্ধ হয়ে আসে সবার।
অন্য কেউ নয়, এতদিনে সরকার এবং পুলিশই দেখিয়ে দিয়েছেন আরজিকরে আমার বোনের নৃশংস ধর্ষ*ণ- খু*ন একটি রাজনৈতিক ঘটনা। এটি কোনও একজন বিকৃতকাম বিকৃতমনষ্ক মানুষ দিয়ে ঘটে যাওয়া বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়; এটি গোটা সিস্টেমের তৎপরতায় ঘটানো একটি ভয়াবহ ক্রাইম। তার এভিডেন্স সেমিনার রুমে যতখানি পড়ে, তার চেয়েও বেশি পড়ে আছে সরকার এবং পুলিশের কার্যপ্রণালীতে, আমাদের সবার চোখের সামনে। আমরা অপেক্ষা করছি সেটুকুরই উন্মোচনের।
অনেক বছর আগে কোনও এক ‘আগুনপাখি’ উদাত্ত গলায় গেয়ে গিয়েছিলেন “ভেঙে গেলে জোড়া যায় মন্দির মসজিদ/ ভাঙা কাচ, ভাঙা মন যায় না”। মাননীয়া, বহুদিন চুপ করে যাওয়া সেই মানুষকে আপনি চেনেন। তার কাছ থেকে, তার গানের কাছ থেকে আমাদেরও কিছুই পাওয়ার নেই আর।
তারই গানের লাইন এবার ব্যানারে- ফ্লেক্সে পড়ে থাকবে তছনছ হয়ে যাওয়া ইমার্জেন্সির সামনে আর ভেতরে স্ট্রেচারে নিথর শুয়ে থাকবে একটা গোটা জনপদের বিশ্বাস– এই বাস্তবতার আগে বন্ধ হোক এই ভয়ঙ্কর “খেলা”।
সত্যিকারের বিচার পাক আমার বোন, আমাদের তিলোত্তমা।









