মেয়ের নাম ত্রুফেনা মুথোনি। পরিবেশবিদ। নিবাস আফ্রিকার কেনিয়া। এই মুহূর্তে সে খবরের আলোচনায়, একটি প্রতিবাদী আন্দোলনের সূত্রে। এক অনন্য প্রতিবাদের কারণে তাঁর ঠাঁই হয়েছে ‘ গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ‘ বইয়ের পাতায়। কী এমন করেছেন ত্রুফেনা যার জন্য এমন এক স্বীকৃতি?
ত্রুফেনা এই নিয়ে দ্বিতীয়বার, একটা দেশীয় প্রজাতির গাছকে দু হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে টানা তিন দিন বা বাহাত্তর ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দিয়েছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের ৮ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত সে এভাবেই গাছকে আঁকড়ে দাঁড়িয়েছিলেন টানা তিন দিন। তাঁর মুখে কোনো শ্লোগান ছিলোনা। করতে হবে, দিতে হবে, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও বলে কোনো স্বঘোষিত আস্ফালন ছিলো না, কেবলমাত্র গাছের প্রতি, পরিবেশের প্রতি সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিয়ে ছলছল চোখে নির্বাক হয়ে গাছকে নিজের বাহুপাশে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন করে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন ত্রুফেনা মুথোনি।তাঁর দাবি ছিল খুবই সাধারণ। যথেচ্ছভাবে গাছ কাটা চলবে না। নতুন করে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালনের সময় একেবারে স্থানীয় প্রজাতির গাছেদের প্রাধান্য দিতে হবে। পৃথিবীর বদলে যাওয়া জলবায়ুর কথা মাথায় রেখেই তাঁর এমন সিদ্ধান্ত। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের নিজেদের টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন তীব্র প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। পৃথিবীর বদলে যাওয়া বাতাবরণের কথা তাঁরা বুঝতে পারলেও তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। সেই সচেতনতার অভাব রয়েছে তাঁদের মধ্যে। ত্রুফেনা মুথোনি চেয়েছিলেন এঁদের মধ্যে সচেতনতার প্রসার ঘটাতে। আর সেই সূত্রেই বেছে নিয়েছিলেন গাছকে আঁকড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার ব্রত। আপনি আচরি ধর্ম শেখাও পরেরে – এই ছিল তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য।
গিনেস বুক কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের এমন অভিনব কায়দায় প্রতিবাদ জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ত্রুফেনা জানিয়েছেন – “আজকে যে সমস্যাকে আমরা সাদরে বরণ করে নিজেদের ঘরের আঙিনায় ডেকে এনেছি, তার সমাধান আমাদের পূর্বপুরুষদের জানা ছিল। আমরা উন্নত জীবনের হাতছানিতে শিকড়চ্যুত হয়ে নিজেদের বিপন্ন করে তুলেছি। ঐতিহ্যবাহী পরম্পরাগত জ্ঞানকে হেলায় বর্জন করে আজ আমরা এক আত্মঘাতী পথের শরিক হয়েছি। সেই হারিয়ে ফেলা পরম্পরাগত জীবনের প্রতি বর্তমান প্রজন্মকে আবার নতুন করে আকৃষ্ট করতেই আমার এই সামান্য প্রয়াস। গাছ তো আদিপ্রাণ। সেকথা বিস্মৃত হই কেমন করে ?”
ইতোপূর্বে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই ত্রুফেনা মুথোনি টানা দুই দিন অর্থাৎ ৪৮ ঘন্টা এভাবেই গাছকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। নাওয়া খাওয়ার জন্যও কিছু সময়ের বিরতি নেওয়ার কথা মাথায় আসেনি তাঁর। পাছে এভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার জন্য কোনো রকম শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয় সেজন্য চিকিৎসকরা মজুদ ছিলেন সেখানে, আর দল বেঁধে ভিড় জমিয়েছিলেন তাঁর একান্ত ভালোবাসার অনুগামীরা। ফেব্রুয়ারির সেই সময়সীমাকে আরও খানিকটা বাড়িয়ে নিতেই এবার তিন দিনের কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ। আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে তাঁর নয়া সবুজের অভিযানের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ ছিল ত্রুফেনার মধ্যে। তাই নতুন পথে নামার আহ্বান।তবে কি এসব রেকর্ড কথার জন্য নিছকই গিমিক ছিল? এমন প্রশ্নের সামনে পড়ে এতটুকুও না ঘাবড়ে ত্রুফেনা জানিয়েছেন – “আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমরা প্রকৃতির কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি , অথচ প্রকৃতি পরিবেশের কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই। গতবারের প্রচেষ্টায় কিছু মানুষের কাছে পরিবেশের জন্য আমার আবেদনকে পৌঁছে দেওয়া গেছে, তাঁরাই সেই ভালোবাসার টানে আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। আমার আক্ষেপ এবং দুশ্চিন্তা এই নিয়ে যে আমাদের দেশের পরিচিত বৃক্ষরাজি, যাদের সঙ্গে আমাদের আজীবনের সংযোগ, তাদের নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে। এক অদ্ভুত ঔদাসীন্য লক্ষ করি সবার মধ্যে । আর তাই হয়তো তাদের নির্দ্বিধায় সরিয়ে আনা হচ্ছে বিজাতীয় পরিবেশের উপযোগী গাছপালা। এই মাটির সঙ্গে যাদের কোনো যোগাযোগ নেই। আমার আন্দোলন, আমার প্রতিবাদ এই হঠকারী প্রয়াসের বিরুদ্ধে। প্রথমে আমি একাই আমার কন্ঠস্বরকে উঁচিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, আর আজ কতো মানুষ আমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আজ আমি গর্বিত । এই প্রতিবাদের সূত্রে আমি একটু একটু করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছি।”
এমন প্রতিবাদের পথে হেঁটে মুথোনি তাঁর দেশ কেনিয়ার কুড়ি জন প্রভাবশালী মহিলাদের তালিকায় নিজের নাম তুলে নিয়েছেন। এই মুহূর্তে কেনিয়ার পটভূমিতে প্রশাসন, স্বাস্থ্য, রাজনীতি এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করে চলেছেন যে সমস্ত মহিলারা তাঁদের তালিকায় নবতম সংযোজন হিসেবে ঠাঁই হয়েছে ত্রুফেনা মুথোনির নাম। কম বড়ো কৃতিত্বের বিষয় মোটেই নয় তাঁর এই সাফল্য।তাঁর এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে কেনিয়া জুড়ে আরও বহু সংখ্যক মানুষ পরিবেশকে রক্ষা করতে আন্দোলনে সামিল হয়েছেন। প্রাণপণ দৃঢ়তায় গাছকে আগলে ধরে প্রতিবাদ করছেন তাঁরা, গভীর আকুতি আর ভালোবাসা নিয়ে। দেশীয় প্রজাতির গাছপালাকে রক্ষা করতে হবে – এই তাঁদের একমাত্র দাবি। কোনো রেকর্ডবুকে নাম তোলার ইচ্ছে তাঁদের নেই। তাই ক্রমশই এক প্রত্যয়দীপ্ত আন্দোলনের রূপ নিয়েছে গাছ আঁকড়ে ধরার আন্দোলন। এই পদ্ধতি যে প্রতিবাদের এক সফল ও কার্যকর পদক্ষেপ তা গোটা দুনিয়াকে একদিন শিখিয়েছিলেন এই ভারতবর্ষের কিছু সরল সাদাসিধে আনপঢ় গ্রামীণ মহিলা ,বিখ্যাত চিপকো আন্দোলনের মাধ্যমে। এ যেন তারই পুনরাবৃত্তি সুদূর কেনিয়ার মাটিতে।
গাছকে আঁকড়ে ধরে নিজেদের বক্তব্যকে সকলের সামনে তুলে ধরার এমন প্রচেষ্টা কেনিয়ায় খুব নতুন এমনটা নয়। পল কাগো নামের এক ৪৩ বছর বয়সী মানুষ নানউকি শহরে ৯৬ ঘন্টা গাছ আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এই আশায় যে, আগামী ২০২৭ সালে কেনিয়ার সাধারণ নির্বাচন যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। এই ছিল তাঁর কৃচ্ছসাধনের উদ্দেশ্যে।
নিজের ভাইয়ের জটিল অপারেশনের জন্য আর্থিক সহায়তার আবেদন জানাতে নাইরোবি শহরের চোদ্দ বছরের এক কিশোর স্টিফেন গাছানিয়া গাছের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ৫০ ঘন্টা সময়। ভাবা যায়!প্রশ্ন হলো তাঁদের অমন প্রচেষ্টা রেকর্ডবুকে জায়গা পেল না কেন? আসলে উদ্দেশ্যগত ভাবে ত্রুফেনা মুথোনির প্রচেষ্টা অনেকটাই মহত্তর স্বতন্ত্র ভাবনা প্রসূত সন্দেহ নেই। তাঁর এই আন্দোলনের সূত্রে পরিবেশ নিয়ে নতুন করে এক জাগরণের সূচনা হয়েছে। স্বদেশী প্রজাতির গাছেদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য ত্রুফেনার দাবি আজ গণদাবীতে পরিণত হয়েছে। তাঁর এই আন্দোলনের ফলে কেনিয়ার যুব সমাজ এগিয়ে এসেছে। সরকারি বন বিভাগের সাহায্য নিয়ে দেশ জুড়ে দেশী গাছের চারা রোপণের কাজ করতে। ত্রুফেনা আজ কেনিয়ার বনবিভাগের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। আগামী ২০৩২ সালের মধ্যে সারা দেশে ১৫ বিলিয়ন গাছ রোপণ করার ঘোষিত কর্মসূচিকে সফল করতে কাজ চলছে জোরকদমে। গাছ আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকার এই রেকর্ড করা প্রচেষ্টা আজ এতো বড়ো এক প্রচেষ্টার প্রধান মুখ হয়ে উঠতে পেরেছে এটাই ত্রুফেনা মুথোনির সবথেকে বড়ো কৃতিত্ব। তাঁর দেখানো পথেই হাঁটছে আজকের কেনিয়া, সবুজ, সতেজ,সঘন কেনিয়া।
আমাদের অভিনন্দন রইলো ত্রুফেনা মুথোনির জন্য যিনি আন্দোলনের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন এই সময়ের অশান্ত এক পরিবেশের মধ্যে। এমন আন্দোলন আমরা করতে পারি না?
তথ্যসূত্র: Mongabay পত্রিকার প্রতিবেদন ও অন্যান্য সূত্র।
গত নভেম্বর থেকে কলকাতা হাইকোর্টে অভয়ার মামলা ৩৫ বারের ও বেশি তালিকাভুক্ত হলেও একবারও কার্যকর শুনানি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অসহ্য বিলম্ব ও দীর্ঘসূত্রিতার
কখনো আমার প্রপিতামহকে দেখলে প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাস জেনে নেবেন আর্যরা বহিরাগত ছিলেন কিনা মনুদেব তখনো বৌ পেটাতেন কিনা জেনে নেবেন কখনো আমার পিতামহকে দেখলে পরাধীন
আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।
অসামান্যা কন্যা!🙏
এদের কথা পড়লে নিজেদের খুব ছোট মনে হয়। এঁরা লড়াইয়ের নতুন পথ দেখাচ্ছেন গোটা দুনিয়ার জন্য। আমরা কি তা অনুসরণ করতে আগ্রহী হবো ?
ত্রুফেনা, এক প্রেরণার উৎস। বিরাট কঠিন কাজ কিছু হয়তো নয়, কিন্তু গভীর ভালোবাসা নিয়ে করা।
একদম ঠিক কথা। ভালোবাসা নিয়ে করা। এটাই খুব দুর্লভ হয়ে উঠেছে এযুগে।