বিনীত কৈফিয়তঃ এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নই, এই বিষয় নিয়ে লিখতেও চাইনি। কিন্তু নোট বন্দী, কোভিড অতিমারি, দৈনদ্দিন জীবন যন্ত্রণা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আর্থিক বৈষম্য, দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি, কর্ম সংস্থানের সমস্যা ও অভাব, শিক্ষা স্বাস্থ্য ও পরিবহন সংকট, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, দীর্ঘ নির্বাচনের অত্যাচার প্রভৃতি একটার পর একটা সমস্যায় মানুষ যখন জেরবার পুনরায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির সচেতন চেষ্টা চলছে। অনেকক্ষেত্রেই সেটি চালাচ্ছেন তথাকথিত প্রগতিশীল ব্যাক্তিরা। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল। তাই বিষয়টি সকলে মিলে একটু বোঝার চেষ্টা করা।
টিকা ও টিকাকরণ ( Vaccine and Vaccination or Immunization): “A vaccine is a biological preparation that provides active acquired immunity to a particular infection or malignant disease.” (CDC).
“Vaccination is a simple, safe and effective way of protecting you against harmful diseases, before you come into contact with them. It uses your body’s natural defenses to build resistance to specific infections and makes your immune system stronger.
Vaccines train your immune system to create antibodies, just as it does when it’s exposed to a disease. However, because vaccines contain only killed or weakened forms of germs like viruses or bacteria, they do not cause the disease or put you at risk of its complications.” (WHO)
হয়তো আরও অনেক অতীত থেকে এই গ্রহের সবচাইতে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ রোগ নিরাময়ের অন্যান্য পদ্ধতির সাথে টিকাকরণ পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেছিল। তবে প্রমাণিত তথ্য হিসাবে প্রাচীন চিনা চিকিৎসা বিদ্যায় টিকাকরণের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন চিনা চিকিৎসকরা গুটি বসন্তের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে গুটি বসন্তের ফোস্কা দিয়ে দেহে প্রতিষেধক তৈরির (Variolation or Inoculation) ব্যাবস্থা করেছিলেন।
আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্রিটিশ চিকিৎসক গবেষক এডওয়ার্ড জেনার ১৭৯৬ সালে এক গোয়ালিনীর হাতের কাউ পক্সের গুটি থেকে জীবাণু নিয়ে আট বছরের এক বালকের দেহে গুটি বসন্তের সফল টিকাকরণ করে চিকিৎসা বিজ্ঞান কে অনেকটা এগিয়ে দেন। এরপর মহান চিকিৎসাবিজ্ঞানী লুই পাস্তুর (১৮২২ – ‘৯৫) অন্যান্য বহু আবিষ্কারের সাথে দুটি আবিষ্কার করে চিন্তার আভিমুখ কেই বদলে দিলেন। ১৮৬০ সালে পাস্তুর বাতাসের মধ্যে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি প্রমাণ করলেন, পরের বছরেই প্রবর্তন করলেন Germ Theory of Disease অর্থাৎ বিভিন্ন জীবাণুর কারণে বিভিন্ন রোগ হয়। ১৮৭৭ সালে রবার্ট কখ অ্যানথ্রাক্স রোগের জীবাণু আবিস্কার করলেন। ১৮৭৯ তে আবিষ্কার হল যৌন রোগের জন্যে দায়ী গোনোকক্কাস এর জীবাণু। এরপর খুব কম সময়ের মধ্যে আবিষ্কার হয়ে চলল একের পর এক রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু। তার সঙ্গেসঙ্গে রোগ গুলির ওষুধ। চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রবল গতিতে এগিয়ে চলল। কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হল।
যে রোগগুলির সরাসরি ওষুধ বের করা যাচ্ছিল না সেগুলির টিকা বেরোতে শুরু করল। এক্ষেত্রেও যে রোগের একমাত্র পরিণতি মৃত্যু সেই ভয়ানক জলাতঙ্ক রোগের টিকা ১৮৮৫ সালে আবিষ্কার করে টিকার জগতেও এডওয়ার্ড জেনারের সাথে পথিকৃৎ হয়ে রইলেন লুই পাস্তুর। এরপর বেরোতে শুরু করল অন্যান্য রোগের টিকা – প্লেগ (১৮৯৭), কলেরা ও টাইফয়েড (১৯১৭), ডিপথেরিয়া (১৯২০), টিটেনাস ও যক্ষ্মার বিসিজি (১৯২৭), পীতজ্বর (১৯৫১), হাম (১৯৬৩), হেপাটাইটিস বি (১৯৯১), জাপানি এনকেফেলাইটিস (১৯৯৩) … ।
আধুনিক টিকা ও সার্বিক টিকাকরণ কর্মসূচিঃ আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে টিকাগুলিরও আধুনিকরণ ঘটে চলল। অনেক ধরনের টিকা তৈরি হলঃ (১) Live Attenuated Vaccines (খুবই কার্যকর, জীবন্ত ও রোগ জন্মাতে অক্ষম টিকা। যেমন, BCG, Measle, OPV), (২) Inactivated or Killed Vaccines, (৩) Toxoids, (৪) Protein Vaccines, (৫) Recombinant Protein Vaccines, (৬) Conjugated Vaccines, (৭) Combined Vaccines, (৮) Oral vaccines, (৯) Nasal Spray Vaccines প্রমুখ। Injectable টিকাগুলি আবার কোনটা পেশিতে (Intramascularly or IM), কোনটা চামড়ায় (Intradermaly or ID), আবার কোনটা চামড়ার নিচে (Subcutaneously) দেওয়ার নিদান হল।
বিভিন্ন দেশে রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যাপকভাবে টিকা ব্যাবহার শুরু হল। ১৯৭৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য (WHO) সংস্থা ২০০০ সালের মধ্যে ছয়টি প্রতিষেধন সম্পন্ন (Preventable) রোগকে (Tuberculosis, Diphtheria, Pertussis, Tetanus, Polio, Measles) নির্মূল করতে Expanded Programme on immunization (EPI) কর্মসূচি চালু করল। ভারতে এটি চালু হল ১৯৭৮ এ। ভারতে সরকারিভাবে তিনটি জায়গায় টিকা প্রস্তুত শুরু হলঃ (১) Central Research Institute (CRI), Kasauli, HP; (২) Pasteur Institute of India (PII), Coonoor, TN এবং (৩) BCG Vaccine Laboratory (BCGVL), Guindy, Chennai, TN। ইতিমধ্যে সার্থক টিকাকরণের ফলে ১৯৭৭ এ দুনিয়া থেকে ভয়াবহ গুটিবসন্ত রোগ (Small Pox) নির্মূল হল (Eradicated) যা বিংশ শতাব্দীতে ৩০ থেকে ৫০ কোটি মানুষের প্রাণহানী ঘটিয়েছিল।
১৯৯০ সালে UNICEF এই কর্মসূচির নামকরণ করলেন Universal Child Immunization Programme। তার আগেই ভারত ১৯৮৫ তে জাতীয় টিকাকরণ কর্মসূচির নাম দিয়েছিল Universal Immunization Programme (UIP)। ২০১৪ থেকে ভারতে ইন্দ্রধনুশ প্রকল্পে মোট ১২ রকম অসুখের টিকা সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলি থেকে বিনামুল্যে দেওয়া শুরু হল শিশু এবং গর্ভবতী মায়েদের। (১)Tuberculosis, (২)Diphtheria, (৩)Pertussis, (৪)Tetanus, (৫)Polio, (৬)Hepatitis B, (৭)Pneumonia, (৮)Meningitis, (৯)Measles, (১০) Rubella, (১১) Japanese Encephalitis এবং (১২) Rota Viral Diarrhoea।
যুদ্ধ ও অন্য ভাবনাঃ এতক্ষণ বলা হল জনহিতে চিকিৎসা বিজ্ঞান, এবার আমরা দেখতে পেলাম সম্পদ, ভূভাগ ও ক্ষমতা দখলের জন্য এবং যুদ্ধের সময় মানুষকে হত্যার জন্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যাবহার যা ইউক্রেনের রণাঙ্গন সহ সর্বত্র এখনও ঘটে চলেছে। ব্রিটিশরা উত্তর আমেরিকা দখল করার সময় জনজাতিদের হত্যা করতে ঝর্নার পানীয় জলে বিষ মেশাল, রাতের অন্ধকারে তাদের বসতিতে আগুন দিল আর পাদ্রিদের মাধ্যমে কম্বল বিতরণের সময় গুটি বসন্তের জীবাণু মাখিয়ে দিল। জাপানিরা চিন আক্রমণের সময় আকাশ পথে যথেচ্ছ প্লেগের জীবাণু ছড়াল। আর নাজি জার্মানি ইহুদিদের শেষ করার জন্যে গ্যাস চেম্বারে ঢোকাল। দুই বিশ্ব যুদ্ধে ক্লোরিন, ফসজিন, মাস্তারড গ্যাস, হাইড্রজেন সায়ানাইড প্রভৃতি ক্ষতিকর রাসায়নিক; অ্যানথ্রাক্স, গ্ল্যা্নডার, প্লেগের জীবাণু বিপক্ষ সেনাদের উপর বর্ষণ করা হল। এমনকি পারমাণবিক আক্রমণ চালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের একটি অংশকে ধূলিসাৎ করে দিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধন সম্পদ, ভূভাগ, মেধা সম্পদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, গবেষণা ও আবিষ্কার, জীবন যাপনের মান, সামরিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে খুব লাভবান হল এবং এগিয়ে গেল। স্তালিনিয় মডেলের সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়া সামরিক দিক দিয়ে সমানে সমানে পাল্লা দিলেও বিশাল শীতল দেশ এবং পশ্চাৎপর অর্থনীতির কারণে পেছিয়ে পড়তে লাগল। তথাপি তারা সকলের জন্যে বিনামুল্যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যাবস্থা করে বিশ্বের অনেক দেশগুলির কাছে মডেল হয়ে উঠল। টিকা থেকে ওষুধ সব কিছু রাষ্ট্রীয় অর্থে ও ব্যাবস্থায় উৎপন্ন হতে লাগল। এই মডেলের উপর দাঁড়িয়ে WHO এর ড্যানিশ ডিরেক্টর জেনারেল হ্যালফডেন মাহলারের নেতৃত্বে World Health Assembly ১৯৭৭ এ কাঝাকাস্তানের আলমাটিতে ২০০০ সালের মধ্যে ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্য (Health for All by 2000 AD)’ ঘোষণা করল যেখানে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হল Primary or Basic Health Care এর উপর, যার একটি অঙ্গ সার্বজনীন টিকাকরণ। ভারত সহ বেশিরভাগ দেশ ঘোষণায় স্বাক্ষর করল।
অন্যদিকে তখন থেকে পুঁজিবাদী ব্যাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স প্রভৃতি ধনী দেশগুলিতে প্রাইভেট কোম্পানিগুলির অন্যান্য শিল্পের মত ওষুধ শিল্পেও ব্যাপক বিনিয়োগ, গবেষণা, প্রতিযোগিতা এবং মুনাফা ও বাজারের সন্ধান। অনুকূল পরিবেশে ভাঙ্গাগড়ার মধ্যে দিয়ে ক্রমে ক্রমে এই ব্যাক্তি মালিকানার সংস্থাগুলি একেকটি বিশাল পুঁজির অত্যন্ত লাভজনক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠল, পাশাপাশি নিত্যনতুন আধুনিক ওষুধ, টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন করে বাজার মাত করে দিতে থাকল।
প্রায় পাঁচ দশকের মার্কিন – সোভিয়েত পারস্পরিক প্রতিযোগিতা এবং শীতল ও ছায়া যুদ্ধ চালানোর পর ১৯৯১ তে তার পূর্ব ইউরোপীয় ও এশিয় উপগ্রহ দেশগুলি সহ সম্পূর্ণ আভ্যন্তরীণ কারণে সোভিয়েত রাশিয়ার পতন হল। পতন হল সমাজতন্ত্রের অন্য মডেল বলকান দেশ যুগোস্লাভিয়ার। টুকরো টুকরো ছোট ছোট দেশগুলি পুঁজিবাদী পথে এবং মার্কিন জোটে সামিল হল। চীন, ভিয়েতনাম ও কিউবা কিছু পুঁজিবাদী, প্রশাসনিক ও দলীয় সংস্কার এবং কিছু ক্ষেত্রে কঠোর দমন পীড়নের মাধ্যমে টিকে গেল। এক বিশ্ব মেরুকরণের এই পর্বে মার্কিন ও পশ্চিম ইউরোপের বহুজাতিক ফার্মা দানবরা সারা বিশ্বের বাজার সহজেই দখল করে নিল এবং গরীব ও ছোট দেশগুলির তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হল। এদের মোড়ল IMF এর নির্দেশে সব দেশ বাধ্য হল চিকিৎসাকে সরকারকেন্দ্রিক থেকে ব্যাক্তিমালিকানা কেন্দ্রিক এবং বিনামুল্যের পরিবর্তে মূল্য নির্ভর করতে।
সারা বিশ্বের বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের বাজারগুলি ভরে উঠল দামি অপ্রয়োজনীয় শিশু খাদ্য, ওষুধ, টিকা, সরঞ্জামে এবং সেগুলির ব্যাপক প্রচার এবং সেই প্রচারে নামী তারকা ও চিকিৎসকদের সামিল করা হল। এরপর তাদের মত করে পরিবর্তন করা হল সমগ্র সারকারি স্বাস্থ্য ব্যাবস্থা, মেডিকেল শিক্ষাক্রম, মেডিকেল টেক্সট বই, চিকিৎসকদের মানসিকতা। স্বাস্থ্য পরিষেবা পরিণত চিকিৎসা বাণিজ্যে। গৃহ চিকিৎসকদের শেষ করে দেওয়া হল, দামি করপোরেট হাসপাতাল বা নার্সিং হোম, প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ, ক্যাপিটেশন ফি দিয়ে ভর্তি, গণ টোকাটুকি ও পাশ, চিকিৎসায়, ওষুধ লেখা ও পরীক্ষা নিরীক্ষায় পারসেনটেজ নেওয়া, সর্ব স্তরে দুর্নীতি ও অবৈধ পথে মুনাফা চালু হয়ে গেল সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলে। ড্রাগ কনট্রোল ইত্যাদি উঠেই গেল, বিপরীতে ওষুধের দাম ও চিকিৎসা খরচ আনকনট্রল্ড হয়ে গেল। ওই ১৯৯১ তেই কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও এবং অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংহের নেতৃত্বে ভারতের অর্থনীতির উদারীকরণ; IMF, World Bank দের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের দিকে যাত্রা এবং বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হওয়া। ওই পর্বেই ভারতীয় যে ওষুধ প্রস্তুত সংস্থাগুলি যারা দেশের জন্যে সস্তায় ওষুধ তৈরি করেও অন্যান্য গরীব দেশে পাঠাত তারা উঠে গেল অথবা বহুজাতিক দানবদের অনুসারী হয়ে গেল। অলাভজনক দেখিয়ে তিনটি টিকা উৎপাদনকারী সংস্থা সহ একের পর এক সরকারি বা সরকার পোষিত ওষুধ কারখানা গুলি বন্ধ করে দেওয়া হল। টিকা সহ অনেক ওষুধ কে নতুন করে আমদানি করা শুরু হল।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে মার্কিন এবং বহুজাতিক অর্থ ও কর্তৃত্ব নির্ভর WHO কে দর্শক হয়ে সব হজম করে যেতে হল। কোথায় ২০০০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য? আরও দূষণ, শোষণ, বৈষম্য, দারিদ্র, অপুষ্টি, মহামারি, যুদ্ধ, হিংসা, শরণার্থী, লিঙ্গ বৈষম্য, অমানবিক জীবন, চিকিৎসার অভাব, Anti Microbial Resistance। পুঁজিবাদের মুক্তকানন নিউ ইয়র্কে WHO ও সব দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে এসে সই করানো হল Millennium Development Goals (MDG)। সেখানে স্বাস্থ্য নিয়ে তেমন বাধ্যবাধকতা থাকল না। Goals 4, 5 6 এ শিশু স্বাস্থ্য, মাতৃ স্বাস্থ্য, ম্যালেরিয়া প্রভৃতির নিরাময়ের উল্লেখ থাকল। ২০১৫ র মধ্যেও বিষয় গুলির কোন সুরাহা না হওয়ায় আবার সবাইকে ডেকে Sustainable Development Goals (SDG) এ সই করানো হল এবং ২০৩০ এর দিকে তাকিয়ে সাধারণভাবে কিছু লক্ষ্যমাত্রা স্থির হল যেখানে Target 3 তে কেবল স্বাস্থ্য স্থান পেল।
অতিমারির পটভূমিঃ ইতিমধ্যে প্রযুক্তির আরও অগ্রগতির ফলে উপগ্রহ, ইন্টারনেট, ডিজিটাল ব্যাবস্থা, এ আই প্রভৃতিকে কাজে লাগিয়ে একচেটিয়া লগ্নি পুঁজির বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থা গুলি তার শোষণ ও মুনাফা বহুগুন বাড়িয়ে তুলেছে। তার দোসর হয়ে সাধারণ মানুষকে নিংড়ে নিচ্ছে দেশীয় পারিবারিক বৃহৎ পুঁজির শিল্পপতি, ব্যাবসায়ী এবং তাদের দালাল দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক, দালাল ও মাফিয়ারা। শ্রম সঙ্কোচনের সঙ্গে কাজের নিশ্চয়তা, পরিবেশ ইত্যাদি তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে। অতি মুনাফাকারী পুঁজিবাদ নিজের দেশেই ওয়াল স্ট্রিট ধ্বস সহ সংকটে পড়ে সামলে নিলেও ধারাবাহিক মন্দা থেকে বেরতে পারছেনা। অন্যদিকে প্রায় নিঃশব্দে বিপুল অর্থনৈতিক ও সামরিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়ে মার্কিনের প্রধান প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে চিন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দখলীকৃত বিশ্বের অন্দরে পরিকল্পিতভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে দিয়েছে চৈনিক আধিপত্যবাদ। হংকং ম্যাকাও কে সে ইতিমধ্যে আত্মস্থ করে ফেলে তাইওয়ান, মঙ্গোলিয়া, কিরঘিজিয়া, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভূটান, মাল দ্বীপ, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, সমগ্র চিন সাগরের দিকে হাত বাড়িয়েছে। প্রভাব বাড়িয়ে তুলেছে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়। তার সাথে সে তৈরি করেছে সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী উত্তর কোরিয়া, আন্তরমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভারে বলীয়ান স্বৈরাচারী নেতা মার্কিনকে প্রায়শই চ্যালেঞ্জ করে বসছে। যেমন ইরান ও তার মিলিশিয়ারা মধ্য প্রাচ্যে।
ভারত ও কোয়াড কে দিয়ে চিনকে, দক্ষিণ কোরিয়াকে দিয়ে উত্তর কে এবং ইসরায়েলকে দিয়ে ইরানকে সংযত রাখার মার্কিনের আপ্রাণ চেষ্টা। যেমন ন্যাটো ও ইউক্রেন কে দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা পুতিনের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত রুশ সামরিক শক্তিকে। এদিকে ভারতের ওষুধ শিল্পে পুরনো ও নতুন ব্যাক্তিমালিকানার সংস্থাগুলি বহুজাতিকের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে মূল্যবান, অপ্রয়োজনীয়, মিশ্র এবং ক্ষতিকর ওষুধ প্রস্তুত করে তার সাথে বিভিন্ন টিকা তৈরি করে শুধু ভারতের ১৪৪ কোটি মানুষের বিশাল লাভজনক বাজার শুধু নয় অন্যান্য দেশেও রপ্তানি করতে শুরু করে দিয়েছে। এখন ভারত শুধু যক্ষ্মা, প্রতিরোধী যক্ষ্মা, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, জাপানি এনফেলাইটিস, বিভিন্ন ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া প্রভৃতি সংক্রামক রোগের শুধু নয় ডায়বেটিস, হাইপারটেনশন, হার্ট ডিজিজ, মানসিক রোগ, দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা প্রভৃতিরও রাজধানী। এই পর্বে মাঝেমাঝেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন ধরনের বার্ড ফ্লু, সয়াইন ফ্লু, সার্স, মার্স, ইবলা, নিপা প্রভৃতি মহামারির কিছু রোগী হয়ত ভারতে এসে পড়েছে কিন্তু সেগুলি সেভাবে কোন বড় আকার নেয়নি এবং নিয়ন্ত্রণও করা গেছে।
কোভিড অতিমারিঃ ২০১৯ এর নভেম্বর থেকে খবর পাওয়া যাচ্ছিল চিনের ইউহানের পশু বাজার থেকে এক ধরনের মারাত্মক ইনফ্লুয়েঞ্জা ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র চিনে। প্রচুর মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এরপর চিন থেকে ইরান ও ইতালি, তারপর সারা পৃথিবী। কারণ কি সঠিকভাবে জানা গেলনা কারণ চিন কিছু জানালো না এবং আজ অবধি জানায়নি। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, অন্তরজাল, ব্যক্তির বক্তব্য থেকে যে সমস্ত খবর চুয়ে পরে আমাদের এখানে আসছিল তা নিয়ে বিবিধ জল্পনা ও গুজবের সৃষ্টি হল। একদল বললেন পশু বাজার থেকে নয় ইউহানের জীবাণু গবেষণাগার থেকে ছড়িয়েছে। সন্দেহবাদের প্রবক্তারা বললেন এটি মার্কিনের ষড়যন্ত্র, চিনকে দুর্বল করার জন্যে। সম্প্রতি আরেকটি হাইপোথেসিস প্রচার করা হচ্ছে যে মার্কিন – চিন মিলে ব্যাবসা করার জন্যে এটি করিয়েছে। মার্কিন, চিন ও কর্পোরেট অর্থে ও নির্দেশে চলা WHO নিঃস্পৃহ রইল। কারণ যাই হোক এবং সেটি জানানো উচিৎ হলেও চিন বা মার্কিন কেউ জানালেন না। কিন্তু আন্তর্জাতিক পুঁজির চাপে চিনের সাথে বিমান ও জাহাজ পরিবহন বন্ধ না করায় জানুয়ারি’ ২৪ থেকে ভারতে SARS CoV2 বা COVID 19 এর সংক্রমণ শুরু হল। মার্চ থেকে শুরু হল লক ডাউন, কনটেইনমেন্ট ইত্যাদি। তারপর থেকে যে কি সাঙ্ঘাতিক সব ঘটনা ঘটে চলল আপনাদের জানা। অগুন্তি মৃত্যু, বহু পরিবার ধ্বংস হওয়া, বহু শিশুর অনাথ হওয়া, রোগীদের ভর্তি করতে না পারা, ঠিকমত চিকিৎসা না হওয়া, অক্সিজেনের অমিল, প্রিয়জনের মৃতদেহ দেখতে না পাওয়া, ঠিকমত সৎকার করতে না পারা …। এরপর কাজকর্ম, উৎপাদন, রুজি রোজগার বন্ধ, বহু সংস্থার ঝাপ বন্ধ, পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজের জায়গা থেকে অমানবিকভাবে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া, বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য … । কেরল ও ওড়িশা সরকার বাদে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলির নিস্ক্রিয়তা এবং ব্যর্থতা। কোভিডের তিনটি তরঙ্গে ২০২০ – ২১ এ বিশ্বে ও আমাদের দেশে যথাক্রমে ১৮.২৮ ও ০৩.০৮ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং যথাক্রমে ২.৯৩ কোটি ও ০৪.০৭ লক্ষ মানুষ মারা গেছেন বলা হয়েছে। WHO মনে করে ভারতের ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য এর ১০ গুণ। যেখানে সবচাইতে বেশি মানুষ আক্রান্ত চিন তো কোন তথ্যই দেয়নি।
SARS CoV2 বা COVID 19 এর তখনও কোন ওষুধ ছিলনা, আজও তাই। প্রথম তরঙ্গের অভিঘাতে যখন বিশ্ব জুড়ে দিশেহারা অবস্থা তখন কেউ কেউ বললেন Hydroxyquinolone কাজ দিচ্ছে। তখন সেটির প্রয়োগ শুরু হলেও পরে দেখা গেল এর কোন ভূমিকা নেই। ট্রাম্প প্রশাসন তো ভারতকে হুমকি দিয়ে প্রচুর পরিমাণে Hydroxyquinolone নিয়ে গেছিল। কোথাও কোথাও Remdesivir ভালো কাজ দিচ্ছে শোনার পর ব্যাপকভাবে তার প্রয়োগ শুরু হল। এই দামী Anti-viral টির তখন রীতিমত কালোবাজারি শুরু হল। পরে দেখা গেল এর কোন ভূমিকা নেই বরং কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। পরেরদিকে Molnupiravir এর ব্যাবহার শুরু হয়। লক্ষণ দেখে চিকিৎসা (Symptomatic Treatment) এবং সহযোগী চিকিৎসা (Supportive Treatment) তো চলছিল ই।
সেইসময় সবাই অতিমারি থেকে বাঁচার পথ খুঁজছিলেন। চিকিৎসকরাও আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন এই ভাইরাস টি সম্পর্কে জানতে, এর আক্রমণ থেকে মানুষকে বাঁচানোর পথ খুঁজতে এবং আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা পদ্ধতি খুঁজে বের করে প্রাণ বাঁচাতে। নতুন কোন অজানা রোগ কে মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমেই এগোতে হয়। অতিমারি চলে যাওয়ার বা নিয়ন্ত্রণ হওয়ার অনেক পরে স্বাভাবিক অবস্থায় কারো হয়তো মনে হয় যে সেই সময় ওইগুলো কেন প্রয়োগ করা হয়েছিল? যেরকম একটা সময় অবধি গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভাবস্থার বমি আটকানোর জন্য Thalidomide খুব কার্যকর ছিল। পরে জানা গেল এর ব্যাবহারের ফলে ভ্রূণের বিকৃতি ঘটছে। সঙ্গেসঙ্গে সেটির ব্যাবহার বন্ধ করা হল। কোভিডের ক্ষেত্রে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট ছিল প্রধান উপসর্গ। নিঃশব্দে দ্রুত রক্তের অক্সিজেনের ঘনত্ব কমে যাচ্ছিল। তাই সেইসময় Pulse Oxymeter ব্যাবহারের সংখ্যা বেড়ে যায়।
নতুন উপলব্ধি, নতুন আবিষ্কারঃ কোভিডের প্রথম তরঙ্গের একটি পর্যায়ের পর রোগীদের imaging করে দেখা গেল ফুসফুস খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। Opacity এবং Ground glass appearance, বিশেষ করে Lower Lobes। Alveoli গুলির Consolidation হয়ে গেছে এবং ফুসফুসের Fibrosis হয়ে যাচ্ছে। Clinically Pneumonia অথবা Acute Respiratory Disease Syndrome (ARDS) এর উপসর্গ ও লক্ষণ। তাই মনে করা হচ্ছিল Corona Virus ফুসফুসের সবচাইতে বেশি ক্ষতি করে। ইতালিতে প্রথম কোভিডে মৃতদের দেহ ময়নাতদন্ত শুরু হল এবং এরপর থেকে অনেক বিষয় জানা – বোঝা গেল। জানা গেল সরাসরি কোভিডের জীবাণু দেহের অঙ্গগুলির ক্ষতি করেনা। কোভিডের জীবাণু দেহে প্রবেশ করলে হেমারেজিক ডেঙ্গুর মত কিছু রোগের ক্ষেত্রে যেটা হয় সেই দেহের প্রতিরোধ ব্যাবস্থার অতি সক্রিয়তা (Persistent Immuno-activation) দেখা যায় এবং এর ফলে দেহের মধ্যে সাইটোকাইনের অতিরিক্ত উৎপাদন (Amplification of Cytokines production)হয়ে সেগুলি জীবাণু আক্রান্ত অঙ্গগুলির দিকে ঝড়ের মত ধেয়ে যায় (Cytokine Storm)। এই সাইটোকাইনের মধ্যে Interleukin 6 (IL6) ইত্যাদি থাকে যা অঙ্গ গুলির সমুহ ক্ষতি করে (Multiorgan Failure) এবং রোগীর মৃত্যু হয়। Dexamethasone জাতীয় প্রচলিত Corticosteroid দিয়ে Immuno-supression ঘটিয়ে কোভিডের চিকিৎসা শুরু হল।
টিকা আবিষ্কারঃ Corona Virus আদতে একটি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস আর এই ভাইরাসগুলি প্রতিনিয়ত নিজেদের এত পরিবর্তন ঘটায় (Mutation) যে প্রচলিত ওষুধগুলিতে কাজ দেয় না এবং কোভিডের টিকার ক্ষেত্রেও একটি প্রজাতিতে (Strain) কার্যকর টিকা অন্য প্রজাতির ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নতুন প্রজাতির ক্ষেত্রে, অনেকসময় ঠিকমত কাজ করতে পারেনা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। দ্রুতগতিতে বেরতে লাগল একের পর এক টিকা। কারণ ততদিনে ইউরোপ এবং আমেরিকা মহাদেশে কোভিড তাণ্ডব চালাতে শুরু করেছে। খোদ মার্কিন মুলুকে এবং যুক্তরাজ্যে প্রচুর মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। সেইসময় Jenner’s institute of Oxford University & Vaccitech এর টিকা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক Sarah Gilbert, Adrian Hill, Andrew Pollard, Teresa Lambe, Sandy Douglus & Catherine Green গবেষণা করে Viral Vector Vaccine – Modified Chimpanzee Adenovirus chAdOx1 Vaccine বের করলেন। Oxford Sciences Innovation, Google Ventures & Sequoia Capital গবেষণায় অর্থ দিয়েছিল এবং Oxford University JI, Oxford Vaccine Group & Pomezia Clinical Trials এর ব্যাবস্থা করেছিল। Clinical Trial III এর পর কোভিডের alpha and delta varieties এর উপর কার্যকর ঘোষণা করে British – Swedish Pharmaceuticals AstraZeneca, Vaxzevria নামে জানুয়ারি ২০২১ এ বাজারে নিয়ে এল। তখন কিছু ক্ষেত্রে ছোটখাটো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে এক লক্ষ মানুষের মধ্যে একজনের Blood Clot এর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। এরপর European Medicine Agency (EMA) এবং WHO এটিকে মান্যতা দিল, ব্রিটিশ ও ফরাসি প্রধানমন্ত্রীদ্বয় সাংবাদ মাধ্যমের সামনে টিকাটি নিলেন এবং WHO বিশ্বের সর্বত্র কোভিড প্রতিরোধে এটি গ্রহণের জন্যে অনুমোদন দিল।
এরপর Moderna, Pfizer – BioNtech, Jhonson & Jhonson, NOVAVAX প্রমুখ মার্কিন ও ইউরোপের ওষুধ ও টিকা প্রস্তুত সংস্থাগুলি; চিনের Fosun Pharma, Beijing Institute of Biological Products Co. Ltd. (BIBP) ও Sinopham’s Beijing Institute of Biological Products; রাশিয়ার Gamaleya National Centre of Epidemiology & Microbiology, Moscova প্রমুখেরা Whole – virion inactivated vaccine, Non – replicating viral vector vaccine, LNP – encapsulated mRNA vaccine, Viral vector vaccine, Recombinant nano particle spike protein formulated vaccine, Protein sub-unit vaccine সহ বিভিন্ন ধরনের কোভিড ভ্যাকসিন বের করতে শুরু করলেন। এদের অনেকেই WHO এর অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন দেশে বিক্রি ও রপ্তানি করতে শুরু করল।
২০২১ এর যে জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যে Vaxzevria ভ্যাকসিন বেরিয়েছিল সেই জানুয়ারিতেই ভারতের পুনরওয়ালা শিল্প গোষ্ঠী AstraZeneca – র কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে ভারত সরকারের DGCI এবং ICMR এর অনুমতি ও অনুমোদন নিয়ে Serum Institute of India, Pune, Maharashtra – র কারখানায় COVISHIELD টিকা প্রস্তুত শুরু করে। সাধারণভাবে বিশ্বে টিকাদানের হার ৮১ % ও ভারতে ৭৯ % হলেও বিশাল জনসংখ্যার ভারতে এই সংখ্যাটি অনেক। Serum Institute of India এর বেশিরভাগটি সরবরাহ করেও এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বহু দেশে ভ্যাকসিন সরবরাহ করে। কোভিড অতিমারিতে প্রত্যেককে চার থেকে ছয় সপ্তাহ বাদে দুটি করে ডোজ পরবর্তীতে আরেকটি বুস্টার ডোজ নিতে বলা হয়। জানুয়ারি ২০২১ থেকে মার্চ ২০২৩ অবধি ভারতে ২২০ কোটি ডোজ Covishield Injection দেওয়া হয়েছিল।
এরপর ভারতে আসে Bharat Biotech International Ltd., Hyderabad, Telengana এবং ICMR নির্মিত COVAXIN inactivated viral vaccine (BBV152)। ভারতের প্রধানমন্ত্রী সংবাদ জগতের সামনে এটি গ্রহণ করেন। Panacea Biotech, Baddi, HP রাশিয়ার Gamaleya National Centre of Epidemiology & Microbiology, Moscova থেকে লাইসেন্স নিয়ে SPUTNIC V Adenovirus vector vaccine এবং Biological E Limited, Hyderabad, Telengana, Texas Children’s Hospital Center for Vaccine এর লাইসেন্স নিয়ে CORBEVAX protein subunit vaccine তৈরি করতে থাকে।
টিকা নিয়ে বিস্বংবাদঃ টিকা নিয়ে প্রথম থেকেই নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের একাংশের অন্যমত ছিল এবং তারা তা ব্যক্তও করেছেন। আবার বাকিদের অনেকেই এবং বেশিরভাগ সরকার মনে করেছিলেন কোভিড অতিমারির হাত থেকে বাঁচতে টিকা প্রধান হাতিয়ার। ভারতে প্রায় ১০০ কোটি মানুষের টিকাকরণ হয়। প্রায় সব টিকার ক্ষেত্রেই কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সাধারণভাবে সব ওষুধ ও টিকার ক্ষেত্রে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে যা আবার অনেক ক্ষেত্রে গোষ্ঠী, লিঙ্গ, বয়স, স্বাস্থ্য, অন্যান্য শারিরিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার টিকাকরণের সময়ে ও পরে টিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন কিছু শারীরিক সমস্যা ঘটতে পারে (Adverse Event Following Immunization or AEFI)। এইসব নিয়ে অনেক কাজ রয়েছে। তবে ১৯১৮ – ’২০ – র ইনফ্লুয়েঞ্জা অতিমারির (Influenza Pandemic or Spanish Flu), যাতে বিশ্বের প্রায় ১০ কোটি এবং ভারতের প্রায় এক কোটি মানুষ মারা গেছিল, পর এতবড় অতিমারি আর হয়নি। ২০১৯ – ’২১ এর এই কোভিড অতিমারির সঠিক কারণ এখন অবধি যেমন আমাদের জানা নেই সেরকম এই অতিমারি প্রাকৃতিক নিয়মেই চলে গেল, না টিকা ও অন্যান্য পদ্ধতি দিয়ে থামানো গেল, নাকি উভয় মিলিয়ে; আর মিশ্র যদি হয় কোনটার কত অনুপাত পূর্ণাঙ্গ তথ্য আমাদের কাছে নেই। এর প্রধান কারণ যে দেশে সবচাইতে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল সেই চিন আজ অবধি খুব সামান্য তথ্যই দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য এবং ভারত সহ অনেক দেশ তথ্য গোপন করেছে। চিন, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়ার টিকাকরণের সম্পর্কে আমাদের জানা নেই।
প্রথম ব্যাবহ্রত AstroZeneca র টিকা নিয়ে যেমন অনেক দেশ সফল টিকাকরণ করেছে, অনেক দেশ আবার ভিন্ন মত পোষণ করেছে। ক্লিনিকাল ট্রায়ালে একজনের ব্লাড ক্লট পাওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটির ব্যাবহার বন্ধ রাখে। বন্ধ রাখে কানাডা, সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, লাতভিয়া, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ। নরওয়ের স্বাস্থ্য দফতর এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে একসময় বলেছিলঃ “The risk of dying after vaccination with AstraZeneca vaccine would be higher than the risk from dying for the disease.” আবার EMA এবং WHO এই টিকাকে মান্যতা দেন। WHO তার ওয়েবসাইট এ এখনও লিখে রেখেছেঃ “Like with any vaccine, some people will experience mild to moderate side effects after being vaccinated against COVID – 19. This is a normal sign that the body is developing protection. Side effects of COVID – 19 vaccines include fever, tiredness, headache, muscle ache, chills, diarrhea and pain or redness at the injection site.
Not everyone will experience side effects. Most side effects go away within a few days on their own. You can manage any side effects with rest, plenty of non-alcoholic liquids and taking medication to manage pain and fever, if needed.
More serious or long – lasting side effects of COVID – 19 vaccines are possible but extremely rare. National health authorities monitor vaccines to detect and respond to rare adverse events. At the regional and global level, WHO also supports countries in monitoring vaccine safety.”(WHO Coronavirus disease (COVID 19): Vaccines and Safety, 5 December 2023)
যুক্তরাজ্যে যে বড় সংখ্যক মানুষকে যে Vaxzevria vaccine দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে ২৪২ জনের Thrombosis with thrombocytopenia syndrome (TTS) ধরা পড়েছে। এমনিতে যুক্তরাজ্যে ১০ লক্ষ জন সংখ্যায় ০৫ – ১৬ জনের TTS পাওয়া যায়। ২০২১ এর শেষের দিক থেকে ওমিক্রন প্রজাতি জনিত কোভিড মহামারিগুলি ছিল দুর্বল। তারপর প্রকৃতি ও সমাজে করোনা ভাইরাসের নানা প্রজাতি থেকে গেলেও সেগুলি মহামারির রুপ নিতে পারেনি। সম্প্রতি AstraZeneca বাণিজ্যিক কারণ দেখিয়ে Vaxzevria vaccine তুলে নিয়েছে। অন্যদিকে Moderna ও Pfizer এর ভ্যাকসিনে ১০ লক্ষ জনসংখায় ০.২১ টি TTS হওয়ার সম্ভবনা।
ভারতের চিকিৎসকদের একটি সংগঠন ‘Awaken India Movement’ Covishield এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নিয়ে সরব হয়েছেন। একটি তথ্যে জানা গেছে ভারতে Covishield উপভোক্তাদের ৩৬ জনের TTS পাওয়া গেছে। SII অনেক আগেই Covishied উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের একটি সূত্রে জানা গেছে ভারতে Covishield উপভোক্তাদের মধ্যে TTS হওয়ার সম্ভবনা ০.০০০৪%। বেনারস হিন্দু ইউনিভারসিটির একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে Covaxin এর ক্ষেত্রে Menstrual abnormalities, Gullein – Barre Syndrome এর মত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। TTS এর অনুপাত ০০০.৭%।
উপসংহারের পরিবর্তেঃ আমরা প্রথমেই আলোচনা করেছি বর্তমান পরিস্থিতিতে বহুজাতিক ওষুধ সংস্থা গুলি মানবসেবার জন্যে নয় মুনাফার জন্যে ওষুধ ও টিকা প্রস্তুত করে। তারা প্রয়োজনে ওষুধ ও টিকা বিক্রির জন্যে অসুখ তৈরি করে। তারা কোভিড অতিমারি কে কাজে লাগিয়ে তাদের টিকা ও ওষুধ বিক্রি বাড়িয়েছে। অতিমারির জরুরি পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তারা টিকার ক্লিনিকাল ট্রায়াল সংক্ষিপ্ত করেছে। ক্লিনিকাল ট্রায়ালের চতুর্থ পর্ব প্রায় করেনি। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে রোগ ব্যাধি, ওষুধ টিকা নিয়ে পরিক্ষা নিরিক্ষা গবেষণা উৎপাদন যেটুকু হচ্ছে তারাই করছে। ফলে অনেকক্ষেত্রেই বিভিন্ন কারণে সরকার গুলিকে এবং বিপদে পড়া সাধারণ মানুষকে নিরুপায় হয়ে তাদের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। সুতরাং শুধু সমালোচনা করে বা প্রশ্ন তুলে কোন লাভ নেই যতক্ষণ না উপযুক্ত বিকল্প এবং উত্তর গুলি হাজির করা যাচ্ছে।
১২.০৫.২০২৪









