দেবগুপ্তের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই অনিয়ন্ত্রিত মালবসেনা বনমধ্যে ছত্রভঙ্গ হইয়া গেল। কতিপয় সেনানী পুষ্যভূতি সৈন্যদলের সহিত সম্মুখসমরে প্রাণত্যাগ করিল, অন্যরা দুর্গম পার্বত্য পথে পলায়ন করিল। মালব সেনাপতি পুষ্যভূতির সর্বাধিনায়ক ভণ্ডীর হস্তে বন্দী হইলেন। কিন্তু পরম পরিতাপের বিষয় যে রাজ্যশ্রীর কোনও সন্ধান পাওয়া গেল না। তাঁহার শূন্য শিবিকা আবিষ্কৃত হইল, বাহকদিগের খোঁজও মিলিল, কিন্তু বহু অনুসন্ধানেও রাজ্যবর্ধন সেই অপরিচিত বনাঞ্চলে আপনার কনিষ্ঠা ভগিনীর কোনও চিহ্ন পাইলেন না।
দেবগুপ্ত নিধনের পরে তিন রাত্রি অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। বিন্ধ্যাচলের অরণ্যস্থিত জয়স্কন্ধাবারে আপন আসনে বসিয়া হতাশ, বিমর্ষচিত্ত রাজ্যবর্ধন সহোদরাকে স্মরণ করিতেছিলেন।
শৈশবে এই আদরণীয়া কনিষ্ঠাটিকে তিনি আপন স্কন্ধে উপবিষ্ট করাইয়া কত ক্রীড়া করিয়াছেন, নূতন ধনুর্বিদ্যা শিখিয়া ভগিনীর অনুরোধে কানন হইতে অপক্ক আম্র অথবা উচ্চ শাখাস্থিত স্বর্ণচম্পার পুষ্পরাজি নিমেষমধ্যে নির্ভুল শরক্ষেপে ভূপতিত করিয়া তাহার জন্য সংগ্রহ করিয়াছেন, সহোদরার বিবাহ উপলক্ষ্যে দাক্ষিণাত্যের মহার্ঘ্য রেশমবস্ত্র ও সুবর্ণ অলঙ্কারাদি কত আগ্রহে সার্থবাহ বণিকদিগের নিকট হইতে স্বহস্তে চয়ন করিয়া ক্রয় করিয়াছেন — ভাবিতে ভাবিতে তাঁহার চক্ষু সজল হইয়া উঠিল।
অদূরে যাম নির্দেশক ভেরী বাজিয়া উঠিল। রাজ্যবর্ধনের চিন্তাস্রোত ছিন্ন হইল। শিবিরের দ্বাররক্ষী আসিয়া সংবাদ দিল, এক জটাজূটধারী সাধু তাঁহার সাক্ষাৎপ্রার্থী। রাজ্যবর্ধন কৌতূহলী হইলেন।
রাজার নির্দেশ পাইয়া দ্বাররক্ষী সন্ন্যাসীকে লইয়া শিবিরমধ্যে প্রবেশ করিল। “রাজন, এই ব্যক্তির দাবি, সে দেবী রাজ্যশ্রীকে বনমধ্যে দেখিয়াছে।”
রাজ্যবর্ধন উৎসুক হইয়া সাধুর প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। দীনবেশী, শীর্ণ মনুষ্যটির দেহ এবং জটা ধূলিতে আচ্ছন্ন — নগ্নপদ হইতে স্থানে স্থানে রক্ত ঝরিতেছে। অনুমান করা যায় যে লোকটি দূরের পথিক, বহু পথ ভ্রমণ করিতে করিতে অরণ্যমধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে। এ তাঁহার ভগিনীর সন্ধান জানিলেও জানিতে পারে। বস্তুত, সাধুকে অবলোকন করিয়া রাজ্যবর্ধনের করুণা হইল। তিনি প্রশ্ন করিলেন — “আপনি কি ক্ষুধার্ত?”
উত্তরে সাধু সবেগে মস্তক আন্দোলিত করিল। রাজ্যবর্ধন প্রহরীকে তাঁহাদের দুইজনের জন্যই নৈশাহার আনয়নের নির্দেশ দিলেন।
শ্রান্ত সাধু কহিল –“সর্বাগ্রে জলপান করিতে চাই — তৃষ্ণায় বক্ষ ফাটিয়া যাইতেছে।”
রাজ্যবর্ধন সবিস্ময়ে লক্ষ্য করিলেন অপরের তৃষ্ণা কখনও কখনও নিজমধ্যে সঞ্চারিত হয় — তিনি প্রহরীকে পথিক তথা আপনার জন্য পানীয় জল আনিতে আদেশ করিলেন।
একজন সৈন্য সুবর্ণস্থালীতে উভয়ের জন্য জলপাত্র লইয়া উপস্থিত হইল।
পথিক সাধু আচম্বিতে কহিল — “আমি দেবী রাজ্যশ্রীকে দেখিয়াছি। অদ্যই তাঁহার দর্শন পাইয়াছি। তিনি সুস্থ আছেন।”
রাজ্যবর্ধনের আবেগ আর বাধা মানিল না। তিনি আকুল স্বরে বলিয়া উঠিলেন –“কোন স্থানে তাহার দর্শন পাইয়াছিলেন, দয়া করিয়া শীঘ্র বিবৃত করুন। আমি এই মুহূর্তে সেই স্থলের উদ্দেশ্যে গমন করিব, আমার আর ত্বরা সহিতেছে না।”
সন্ন্যাসী ধীরস্বরে কহিল — “কাহারও সম্মুখে তাহা বলিব না, কেবল আপনাকেই বলিব।”
রাজ্যবর্ধনের চোখের ইঙ্গিতে জলপাত্র বহনকারী সৈন্য এবং দ্বাররক্ষী শিবিরের বাহিরে অন্তর্হিত হইল।
রাজা অধৈর্যভাবে কহিলেন — “এইবারে আপনার কথা ব্যক্ত করুন।”
সন্ন্যাসী মাথা নাড়িয়া শিবিরের পশ্চাদ্ভাগের আচ্ছাদনের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া কহিয়া উঠিল — “মহারাজ, এ অতীব গোপন কথা। আপনি ভিন্ন আর কাহারও কর্ণগোচর হইলে অনর্থ হইবে। কিন্তু আমার সন্দেহ হইতেছে শিবিরের পিছনের দ্বারপার্শ্বে কেহ দণ্ডায়মান থাকিয়া আমাদিগের কথোপকথন শ্রবণ করিবে মনস্থ করিয়াছে। কেহ শুনিয়া ফেলিলে কিন্তু সমূহ বিপদ”।
তাহাকে আশ্বস্ত করিতে রাজ্যবর্ধন আসনত্যাগ করিয়া পশ্চাতের দ্বারের দিকে অগ্রসর হইবামাত্র সন্ন্যাসী অসম্ভব ক্ষিপ্রতার সহিত আপন পরিধেয় বস্ত্রের একাংশের গ্রন্থি উন্মোচন করিয়া তৎস্থিত হরিদ্রাভ চূর্ণ রাজ্যবর্ধনের পানীয় জলে ত্বরিতে মিশাইয়া দিল। রাজ্যবর্ধন শিবিরের পশ্চাতের দ্বার উত্তমরূপে নিরীক্ষণ করিয়া সন্দেহভঞ্জনপূর্বক প্রত্যাবর্তন করিয়া দেখিলেন সন্ন্যাসী পূর্ববৎ ঋজুদেহে নিজ আসনে উপবিষ্ট রহিয়াছে।
রাজা কহিলেন — “আশা করি নিশ্চিন্ত হইয়াছেন। এখন আপনার সংবাদ দয়া করিয়া ব্যক্ত করুন — আমি অধিক ধৈর্য্য ধরিতে অক্ষম।”
সন্ন্যাসী তাহার জন্য আনীত জলপাত্র তুলিয়া লইয়া কহিল — “সেই বিবরণই দিব মহারাজ। আপনি জল পান করিতে করিতে শ্রবণ করুন।”
অধৈর্য্য রাজ্যবর্ধন তাঁহার জন্য নির্দিষ্ট পানপাত্রটি তুলিয়া নিমেষমধ্যে সমস্ত জল গলাধঃকরণ করিয়া ফেলিলেন। উত্তেজনাবশে লক্ষ্য করিলেন না, যে সন্ন্যাসী তাহার হস্তধৃত জলপাত্র হইতে একটি বিন্দু বারিও পান করে নাই। রাজা কহিতে চেষ্টা করিলেন – “এক্ষণে বর্ণনা করুন, আমার ভগিনীকে কোথায় দেখিয়াছেন?”
কিন্তু তাঁহার কণ্ঠস্বর জড়াইয়া গেল, মুখমণ্ডল তীব্র বেদনায় বাঁকিয়া উঠিল, দৃষ্টি বিস্ফারিত হইল — তিনি স্বীয় আসনে টলিয়া পড়িলেন। সন্ন্যাসী দুই মুহূর্ত প্রতীক্ষা করিল, তাহার পরে রাজ্যবর্ধনের নিকটে গিয়া বক্ষোপরি হস্ত স্থাপন করিল — না, কোনও স্পন্দন নাই। তাহার মুখে একটি স্বস্তির হাস্য ফুটিয়া উঠিল।
অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে সে শিবিরের পশ্চাতের আচ্ছাদন সরাইয়া তমসাচ্ছন্ন নিবিড় বনমধ্যে মিলাইয়া গেল। যত শীঘ্র সম্ভব চম্পানগরীস্থিত গৌড়াধিপের জয়স্কন্ধাবারে পৌঁছাইয়া পুষ্যভূতিরাজ রাজ্যবর্ধনের ইহলীলা সংবরণের সংবাদ জানাইতে হইবে। গৌড়েশ্বর শ্রীমন্মহারাজ পরমভট্টারক শশাঙ্কদেব প্রতীক্ষা করিয়া আছেন।
অর্ধদণ্ড পরে যখন সৈন্য এবং দ্বাররক্ষী রাজা তথা অতিথির নৈশাহার লইয়া শিবিরে প্রবেশ করিল, তখন রাজা রাজ্যবর্ধনের বিষজর্জর নীলবর্ণ দেহ মৃত্যুর কাঠিন্যে শীতল হইয়া গিয়াছে।
কালের অশুভ করাঙ্ক চিহ্নিত রাক্ষসী বেলায়, সরস্বতী নদীতীরের মহাশ্মশানে সমুদয় স্থানীশ্বর নগরী যেন ভাঙিয়া পড়িয়াছে। পক্ষকাল পূর্বে যে স্থলে পিতা প্রভাকরবর্ধনের শেষ শয্যা প্রস্তুত হইয়াছিল, তাহারই পার্শ্বে রাজা রাজ্যবর্ধনের অনন্তযাত্রার প্রস্তুতি চলিতেছে। শোকোন্মত্ত জনতা বিক্ষুব্ধ তরঙ্গের ন্যায় নদীকূলে আছড়াইয়া পড়িতেছিল।
চিতাস্থল প্রস্তুত হইয়াছে। রাজপুরোহিত যজ্ঞাদির সূচনা করিয়াছেন। সেনাপতি, মহামন্ত্রী, রাজপণ্ডিত, অমাত্যবর্গসহ অন্যান্য রাজপুরুষেরা বিষণ্ণ, শোকসন্তপ্ত বদনে দাহকার্যের নানাবিধ বিষয় পরিচালনা করিতেছেন, মধ্যে মধ্যে হ্রস্বকণ্ঠে পরস্পরের সহিত গুরুতর আলোচনায় ব্যাপৃত হইতেছেন। চিতাস্থলের অনতিদূরে একটি নিষ্পত্র শাল্মলী বৃক্ষতলে শালপ্রাংশু কুমার হর্ষবর্ধন বাহুতে বাহু আবদ্ধ করিয়া দাঁড়াইয়া আছেন। তাঁহার মুখাবয়বে কোনওরূপ অধীরতার আভাস নাই, প্রশান্ত দৃষ্টিতে তিনি দূর দিগন্তের প্রান্তসীমায় একখণ্ড রক্তিম মেঘপুঞ্জের দিকে অপলক চাহিয়া রহিয়াছেন — তাঁহার ঝঞ্ঝাবিধ্বস্ত অন্তরের কথা কেবল অন্তর্যামী জানেন, কিংবা হয়ত তিনিও সম্যক জানেন না।
মাতা পূর্বেই গিয়াছেন, তাঁহার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া পিতাও বিদায় লইয়াছেন। এক্ষণে চিতাসমিধে সর্বজনপ্রিয় পরমভট্টারক জ্যেষ্ঠভ্রাতার শব সাজাইয়া দিতে হইবে — তাঁহাকে যথাযোগ্য মর্যাদার সহিত, অতীব যত্নে, বহু সমাদরে লোকান্তরের পথে নিষ্ক্রান্ত করাইতে হইবে, করজোড়ে জগৎসংহর্তা চন্দ্রশেখরের নিকট অগ্রজের যাত্রাসিদ্ধির জন্য প্রার্থনা জানাইতে হইবে — হর্ষবর্ধনের এখন শোকপ্রকাশেরও তিলেক অবসর নাই।
ন্যূনাধিক তিন দণ্ড পরে বাতাস স্তব্ধ হইল, অগণিত মনুষ্যের শোক কোলাহল সহসা নীরব হইল, পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ থামিয়া গেল। ললাটে ভ্রাতার হস্তধৃত অগ্নিশলাকার স্পর্শ লইয়া, পুষ্যভূতিরাজ রাজ্যবর্ধন সগৌরবে মহাপ্রস্থানের পথে গমন করিলেন — চিতা মহাসমারোহে বহ্নিমান হইয়া উঠিল।
সেই সুগভীর বিষাদমণ্ডিত সন্ধ্যায়, দাম্পত্য সুখশয্যায় স্বামী চন্দ্রবর্মার প্রেমময় আলিঙ্গনে আপনার অপ্সরানিন্দিত বরতনু সঁপিয়া সুরসুন্দরী শকুন্তলা চিন্তা করিতেছিল — ‘ভাগ্যক্রমে বিদ্রোহিণী হইয়াছিলাম, নচেৎ স্থানীশ্বরের দুর্ভাগ্যের সহিত অদ্য আমার নিয়তিও জড়াইয়া যাইত — মনস্তাপের আর সীমা থাকিত না। এক্ষণে চিরকালের জন্য আপদ বিদায় হইয়াছে।’
দীপান্বিতা অন্যান্য বনিতাদিগের সহিত নদীতীরস্থ জনসমাগমে উপস্থিত হয় নাই। সে সরস্বতীর বক্ষে একটি ক্ষুদ্র নৌকাতে বসিয়া চিতাস্থলের অদূরে থাকিয়া রাজ্যবর্ধনের শেষকৃত্য প্রত্যক্ষ করিতেছিল। নৌকার কর্ণধার তাহার পরিচিত — বহু অনুনয়ের পরে সে দীপান্বিতাকে নদীবক্ষে লইয়া আসিতে সম্মত হইয়াছিল।
অবশেষে নৌকাচালকের ধৈর্য ফুরাইল, সে তরীর হাল ফিরাইবার উপক্রম করিল। সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিতেছে, সকলকেই গৃহে ফিরিতে হইবে — দীপান্বিতা আর মাঝিকে বাধা দিতে পারিল না। অকুস্থল হইতে সরিয়া আসিবার মুহূর্তে তাহার দৃষ্টি সহসা কুমার হর্ষবর্ধনের মুখের উপর নিবদ্ধ হইল।
ঘনায়মান অন্ধকার এবং ঘাট হইতে নৌকার ক্রমবর্ধমান দূরত্ব সত্বেও চিতার আলোকে দীপান্বিতা সেই মুখ স্পষ্ট দেখিতে পাইল।
সে অভিভূত হইয়া দেখিল, আয়ত চক্ষু, খড়্গনাসা, দৃঢ়বদ্ধ ওষ্ঠাধর সংবলিত এক প্রিয়দর্শন তরুণ যেন অগ্নিসম্ভূত হইয়া তাহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহার কোমল মুখমণ্ডলে ত্রিলোকেশ্বর সমগ্র পুষ্যভূতি সাম্রাজ্যের মঙ্গলের স্বাক্ষর আঁকিয়া দিয়াছেন — এই তরুণের হস্ত ধরিয়া মৃতপ্রায়, হতাশ্বাস জাতির পুনরুত্থান ঘটিবে, দুর্ভাগ্যের অপদেবতা অপসৃত হইবেন, স্থানীশ্বরের মাহাত্ম্য পুনরায় সুপ্রতিষ্ঠিত হইবে।
পরম নির্ভরতার, নিশ্চিন্ততার আবেশে দীপান্বিতার সজল চক্ষুদ্বয় মুদিয়া আসিল।
সে নৌকার উপরে গলবস্ত্র হইয়া বসিয়া যুক্তকরে নক্ষত্রখচিত অন্ধকার নভঃস্থলে দৃষ্টি পাতিয়া ইষ্টের নিকট প্রার্থনা করিল — “প্রভু, উহাকে জীবিত রাখিও।
ধর্মহপ্যসৌ বিজয়তে জগদেকদীপঃ।”
জগতের একমাত্র দীপ ধর্মও জয়যুক্ত হউক।
(ক্রমশ)










