হূণ যোদ্ধাদিগকে পরাজিত করিয়া সিন্ধুনদের পশ্চিমতীরে সফলভাবে প্রেরণ করিবার পরে পুষ্যভূতি ও মৌখরীবাহিনী স্ব-স্ব রাজ্যে প্রত্যাগমন করিতেছিল। কামরূপরাজ ভাস্করবর্মা তাঁহার মিত্র রাজ্যবর্ধনের সঙ্গে একত্রে ফিরিলেও মৌখরীরাজ গ্রহবর্মা কান্যকুব্জে প্রত্যাবর্তনের জন্য অধিক ব্যাকুল হইয়াছিলেন। তরুণী পত্নী একাকিনী রহিয়াছেন, তাঁহার পিতা মৃত্যুশয্যায় — রাজ্যশ্রীর নিকটে যথাশীঘ্র পৌঁছাইবার ব্যগ্রতায় গ্রহবর্মার অশ্ব অন্যান্য সৈন্যদের অতিক্রম করিয়া দ্রুতগতিতে রাজধানী অভিমুখে ধাবমান হইল। প্রারম্ভে স্বল্প কয়েকজন অশ্বারোহী মৌখরীসেনা তাঁহার সঙ্গ লইয়াছিল। কিন্তু রাত্রির মধ্যযামে তাহারা অকস্মাৎ লক্ষ্য করিল যে সৈন্যের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাইতেছে। প্রাথমিকভাবে মৌখরী সৈন্যরা বিস্মিত হইলেও বিশেষ বিচলিত হয় নাই, কারণ নূতন সেনাদের মস্তকের শিরস্ত্রাণ ও অঙ্গের লৌহজালিক মৌখরী সৈন্যবর্গের অনুরূপ। ইহা ব্যতীত, তাহারা জানিত যে মিত্ররাজ্যের সীমানার মধ্য দিয়া ছুটিয়া চলিয়াছে — কিয়ৎকাল পরে নিজরাজ্যে প্রবেশ করিবে, বিপদের কোনও আশঙ্কা নাই। দীর্ঘ যুদ্ধযাত্রার অন্তে তাহাদের সতর্কতায় সম্ভবত কিছু শৈথিল্য আসিয়া থাকিবে।
শেষ রাত্রে চন্দ্রোদয় হইল। গ্রহবর্মার নিকটতম দেহরক্ষী অশ্বারোহীটি পার্শ্ববর্তী সেনানীর দিকে চাহিল। তাহার দৃষ্টি সেই দৃঢ়স্কন্ধ অপরিচিত অশ্বারোহীর বাহু সংলগ্ন সুবর্ণকবচের উপর ন্যস্ত হইল। সে আশ্চর্য হইয়া দেখিল, কবচে অঙ্কিত চিহ্ন মৌখরী রাজবংশের অভিজ্ঞান নহে। গ্রহবর্মার দেহরক্ষী সেনানীর অন্তর সংশয়সঙ্কুল হইয়া উঠিল।
কান্যকুব্জ নগরীর রাজ অবরোধের একটি সুসজ্জিত কক্ষে চন্দনকাষ্ঠ নির্মিত পালঙ্কে, মহার্ঘ্য রাজশয্যায় রাণী রাজ্যশ্রী একাকিনী শয়ন করিয়াছিলেন। রাত্রি গভীর হইয়াছে, তথাপি রাজ্যশ্রীর নয়নে নিদ্রা নাই, বক্ষে দুশ্চিন্তা এবং সুতীব্র অভিমানের অনল জ্বলিতেছে — দ্বিসপ্তাহ অতিক্রান্ত হইয়াছে, পঞ্চনদের তীরস্থ যুদ্ধক্ষেত্র হইতে মৌখরীরাজ গ্রহবর্মার সংবাদ বা লিপি লইয়া কোনও দূত আসে নাই।
সম্ভাব্য অসম্ভাব্য নানা চিন্তায় রাণী রাজ্যশ্রীর অন্তর বিভ্রান্ত। স্বামী যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁহার কুটুম্বদিগের অনুগমন করিবেন, ইহা স্বাভাবিক এবং স্বতঃসিদ্ধ, কারণ মৌখরী পুষ্যভূতির মিত্ররাজ্য।
কিন্তু দূতের মাধ্যমে নিয়মিত নিজ পত্নীকে আপনার কুশল সংবাদ প্রেরণও তো রাজার কর্তব্য!
তবে কি যুদ্ধে তিনি আহত হইয়াছেন? তাঁহার আঘাত যদি গুরুতর হয়? যদি তিনি নিহত হইয়া থাকেন? স্নেহবশত রাজ্যশ্রীর ভ্রাতাগণ হয়ত তাঁহাদের আদরিণী ভগিনীকে এই নিদারুণ দুঃসংবাদ পাঠাইতে দ্বিধা করিতেছেন! নিশ্চিতরূপে এই সর্বনাশই ঘটিয়াছে। গ্রহবর্মার এইরূপ দীর্ঘ নীরবতার অপর কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ রাজ্যশ্রীর মনে রেখাপাত করিল না — নীরব, অসহায় অশ্রুতে তাঁহার উপাধান সিক্ত হইয়া গেল!
অশান্ত অন্তরে, নির্ঘুম নয়নে রাজ্যশ্রীর জীবনের একটি অসহ রাত্রির অবসানে, বাতায়নপথে ধীরে ধীরে প্রভাতের আলোক ফুটিয়া উঠিল — প্রাসাদ প্রাঙ্গণের বৃক্ষগুলি বিভিন্ন পক্ষীর কাকলি কূজনে মুখরিত হইয়া উঠিল।
দাসী আসিয়া দীপাধারের দীপগুলি নির্বাপিত করিয়া কক্ষ সম্মার্জনে ব্যাপৃত হইল।
শারীরিক ও মানসিক ক্লেশে রাজ্যশ্রীর দেহ যেন ভাঙিয়া পড়িতেছিল, তথাপি তিনি গাত্রোত্থান করিলেন। বেশবাস কিঞ্চিৎ বিন্যস্ত করিয়া রাজান্তঃপুরের কঞ্চুকীকে দাসী দ্বারা আহ্বান করিলেন।
কঞ্চুকী শশব্যস্তে রাণীর সমীপে উপস্থিত হইলে রাজ্যশ্রী কহিলেন —
“কুমার আদিত্যবর্মাকে সংবাদ দাও যে আমি তাঁহার সাক্ষাৎপ্রার্থিনী।”
প্রসঙ্গত, গ্রহবর্মা যুদ্ধাবকাশে বা অন্যান্য কার্যোপলক্ষে কনৌজ ত্যাগ করিয়া অন্যত্র গমন করিলে তাঁহার অনুজ কুমার আদিত্যবর্মার স্কন্ধে রাজ্যশাসনের ভার অর্পিত হইত।
দীর্ঘকাল স্বামীর কোনও সংবাদ না পাইয়া রাজ্যশ্রী দেবরের সহিত আলোচনা করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন।
স্বামীচিন্তায় অন্যমনস্ক থাকার কারণেই সম্ভবত দূরাগত কোলাহলের শব্দ তাঁহার কর্ণে প্রবেশ করে নাই।
অকস্মাৎ দাসীদের আতঙ্কিত চিৎকার এবং বহুকণ্ঠের আর্তনাদ তাঁহাকে সচেতন করিল। তিনি আর্তনাদের কারণ অনুসন্ধানার্থ দ্বারের দিকে ফিরিলেন। কিন্তু অধিক অগ্রসর হইতে পারিলেন না।
দ্বারপ্রান্তে বিকটাকার ছায়া পড়িল। প্রতিহারিণীগণ সম্ভবত আতঙ্কে পলায়ন করিয়াছিল। রাজ্যশ্রী সভয়ে বিস্ফারিত চক্ষে অবলোকন করিলেন কেহ একটি দেহ কক্ষাভ্যন্তরে অবহেলাভরে নিক্ষেপ করিয়া দ্বার জুড়িয়া দণ্ডায়মান হইল।
দুইটি চক্ষে তীব্র অবিশ্বাস লইয়া রাজ্যশ্রী দেখিলেন, নিক্ষিপ্ত দেহটি তাঁহার স্বামীর। কেশ ও মুখমণ্ডল শোণিতে ভাসিয়া যাইতেছে, অঙ্গে লৌহজালিক নাই, ক্লেদাক্ত নগ্ন বক্ষস্থল তরবারির আঘাতে ছিন্নভিন্ন — বারেকমাত্র দৃষ্টিপাত করিলেই অনুমান করা যায়, মৌখরীরাজ গ্রহবর্মার দেহে আর প্রাণ নাই।
কে এই ভয়ানক দুষ্কৃতি করিয়াছে, রাজ্যশ্রী চাহিয়াও দেখিলেন না। কোন সে শমন কক্ষের দ্বার রুদ্ধ করিয়া তাঁহার দিকে শনৈঃ শনৈঃ অগ্রসর হইতেছে, রাণী তাহা সম্বন্ধেও সচেতন হইলেন না। তাঁহার সম্মুখে কেবল মৃত স্বামীর দলিত, লাঞ্ছিত মৃত মুখচ্ছবি দুঃস্বপ্নের তুল্য জাগিয়া রহিল — রাজ্যশ্রী একটি অস্ফুট আর্তনাদ করিয়া মূর্ছিত হইয়া ছিন্নলতার ন্যায় গ্রহবর্মার মৃতদেহের পদতলে লুটাইয়া পড়িলেন।
শমনরূপী মালবরাজ দেবগুপ্ত কক্ষে প্রবেশপূর্বক অচেতন রাজ্যশ্রীর নিকটে আসিয়া কিছুক্ষণ নির্নিমেষে তাঁহার দিকে চাহিয়া রহিলেন। তাহার পরে অস্ফুটে কহিলেন — “যশোমতী! প্রতিশোধের সময় এখনও পার হয় নাই।”
যে গূঢ়পুরুষ সংবাদ লইয়া আসিয়াছিল যে কান্যকুব্জ নগরী প্রায় অরক্ষিত পড়িয়া রহিয়াছে, গ্রহবর্মা হূণগণের সহিত যুদ্ধে কামরূপরাজ ও পুষ্যভূতিরাজের সহায়তা করিতে উত্তরাপথে যাত্রা করিয়াছে, তাহাকে পুরস্কৃত করিতে হইবে! দেবগুপ্ত নিঃশব্দে গ্রহবর্মার পশ্চাদ্ধাবন করিয়াছিলেন এবং হূণরাজা প্রবরসেনের পশ্চাদপরসরণের পরে কনৌজ প্রত্যাবর্তনরত গ্রহবর্মার শিথিল নিরাপত্তার সুযোগ গ্রহণ করিতে প্রাজ্ঞ নৃপতি বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ করেন নাই।
গ্রহবর্মাকে হত্যা করিবার অব্যবহিত পরে তাঁহার স্বল্পসংখ্যক মালবসেনা নির্বিবাদে কান্যকুব্জ অধিকার করিয়াছিল।
অতঃপর দেবগুপ্ত রাজ্যশ্রীর লুপ্তচেতন তনুদেহ বাহুমধ্যে তুলিয়া দ্রুত কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন।
বিজিত হইলেও ইহা শত্রুপুরী বটে। অকুস্থলে অধিককাল উপস্থিত থাকা বিচক্ষণ কার্য হইবে না, এমত অনুমান করিয়া আপন বিশ্বস্ত সেনাপতির হস্তে পরাভূত কান্যকুব্জের শাসনভার আপাতত অর্পণ করিয়া তিনি দ্রুত তাহার বন্দিনীকে লইয়া উজ্জয়িনীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করিতে মনস্থ করিলেন।
যশোমতীকে সংবাদ পাঠাইতে হইবে যে তাহার বিধবা কন্যা আজ মালবরাজ দেবগুপ্তের পণবন্দী — সেই দেবগুপ্ত, দুই যুগ পূর্বে অহঙ্কারী মালবদুহিতা যাহাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল। আত্মশ্লাঘায় মদগর্বী দেবগুপ্তের অন্তর পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল।
পিতৃহত্যার রুধিরে যে আপনার হস্ত রঞ্জিত করিয়াছে, দুর্নিয়তি কদাপি তাহার সঙ্গত্যাগ করে না।
নির্বোধ দেবগুপ্তের এ কথা অবিদিত ছিল, যে প্রতিশোধের সংবাদ গ্রহণ করিবার জন্য রাজ্ঞী যশোমতী আর ইহলোকে নাই। মূঢ় মানবের ইহাও অবগত ছিল না যে অতি শীঘ্রই যশোমতীর সহিত অনন্তলোকে তাঁহার সাক্ষাৎ ঘটিবে।
যশোমতীর শোচনীয় অকালমৃত্যুর পরে তিনটি দিবস অতিবাহিত হইয়াছে। রাণীর আত্মাহুতির রাত্রে প্রভাকরবর্ধনেরও জীবনাবসান হইয়াছে। তাঁহার প্রাণটুকু ওষ্ঠাগত হইয়াই ছিল, কনিষ্ঠ পুত্রের হস্তধৃত গঙ্গোদক পানের আকাঙ্ক্ষায় হর্ষের স্থানীশ্বরে প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষা করিতেছিল।
উপর্যুপরি দুইটি মৃত্যুর অভিঘাতে সমস্ত নগরী যেন মুহ্যমান হইয়া পড়িয়াছিল। গৃহে গৃহে অরন্ধন, রাজপথের স্থানে স্থানে শোকাবিষ্ট প্রজাদের সমাবেশ, সরস্বতী নদীতীরে গৃহস্থ নারীদের নীরব সমাগম — সকল রাজ্যবাসী এই অভূতপূর্ব সঙ্কটের সন্ধিক্ষণে বিমূঢ় হইয়া গিয়াছিল — জনজীবন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিতে পারে নাই।
দীপান্বিতার গৃহেও এই কয়দিন উনানে অগ্নিসংযোগ ঘটে নাই। যদ্যপি রাজা এবং রাজ্যশাসন সম্পর্কে সে ইতিপূর্বে উদাসীন ছিল, রাজপরিবারে উপর্যুপরি দুইটি শোচনীয় মৃত্যুর অভিঘাত তাহাকে বিষাদগ্রস্ত করিয়া তুলিয়াছিল। বস্তুত, সে এই কয়দিন যাবত গৃহের বাহিরে পদার্পণ করে নাই। প্রভাকরবর্ধন এবং তাঁহার মহিষীর মৃত্যুপরবর্তী কয়েক দিবস বিক্ষিপ্ত, বিভ্রান্তচিত্তে দ্বারপ্রান্তে উপবেশনপূর্বক প্রহর গণিয়াই কাটাইয়া দিয়াছিল। কারণ, এই দেশব্যাপী শোকসন্তাপের আবহে, অপর একটি অভাবনীয় সংবাদের আঘাতে দীপান্বিতা এবং সমস্ত পল্লীবাসীবৃন্দ বিস্ময়ে হতবাক হইয়া গিয়াছিল — তাহাদের সুসংহত চিন্তাশক্তি অল্প সময়ের জন্য সম্পূর্ণ লোপ পাইয়াছিল।
সংবাদ এই, যে রাজ্য তথা রাজপরিবারের অভূতপূর্ব ভাগ্যবিপর্যয়ের কালে সেনানী চন্দ্রবর্মার সহিত শ্রেষ্ঠীকন্যা শকুন্তলার বিবাহ অনুষ্ঠিত হইতেছে। শ্রেষ্ঠী ক্ষেমদত্ত কন্যার অটল সংকল্পের সম্মুখে আপনার পরাভব স্বীকার করিয়া লইয়াছেন এবং রাজা রাজ্যবর্ধনের সহিত শকুন্তলার বাগদান অস্বীকার করিয়া সেনানী চন্দ্রবর্মার সহিত তাহার বিবাহের যথাবিধ আয়োজনে প্রবৃত্ত হইয়াছেন।
তাঁহার অপর্যাপ্ত অর্থ রহিয়াছে, উপরন্তু নীতিজ্ঞানও প্রখর নহে, সুতরাং —
দীপান্বিতা দুঃখিত হয় নাই। কিন্তু তাহার বাল্যসখার এবম্বিধ অসঙ্কোচ অসংযমী আচরণের কথা শ্রবণ করিয়া মর্মপীড়ায় কাতর হইয়াছিল। ইহার সহিত সে বাল্যকালে ক্রীড়া করিয়াছে, পিতার নিকট একত্রে পাঠাভ্যাস করিয়াছে, স্বহস্তে রন্ধন করিয়া খাওয়াইয়াছে, আগ্রহভরে স্বরচিত কাব্য শুনাইয়াছে, কত নিভৃত অপরাহ্নে দূর অরণ্যে তাহার সহিত দুষ্প্রাপ্য ভেষজের সন্ধানে গিয়াছে — সেই চন্দ্রবর্মা এই? শকুন্তলার রূপে উন্মাদ হইয়া চন্দ্রবর্মার তাহাকে বিবাহ করিবার সিদ্ধান্তে দীপান্বিতা কৌতুক বোধ করিয়াছিল, বেদনাহত হয় নাই। তদপেক্ষা বিধেয় এক অযাচিত সম্পর্কের বন্ধন হইতে শৃঙ্খলমুক্তির আনন্দ লাভ করিয়াছিল।
কিন্তু সমস্ত রাজ্য যখন ব্যথাতুর হৃদয়ে তাহাদের পূর্বতন রাজা-রাণীকে স্মরণ করিতেছে, তাহার মধ্যে বিবাহের বিসদৃশ আড়ম্বর করিতে ইহারা অপ্রতিভ হইতেছে না? এই প্রণয়মত্ত যুগলের কি কিঞ্চিৎ বিলম্বও সহিতেছে না? এইরূপ অচিন্ত্যনীয় শোকাকুল পরিবেশে আত্মসুখের উল্লাসে মাতিয়া উঠিতে ইহাদের বিন্দুমাত্র বাধিতেছে না? ইহারা কি সাধারণ লোকলজ্জাও সরস্বতীর নীরে বিসর্জন দিয়া আসিয়াছে?
ভূতপূর্ব সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর প্রয়াণের এক সপ্তাহ পরে প্রবরসেন বাহিনীকে পর্যুদস্ত করিয়া রাজ্যবর্ধন রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করিলেন।
পথিমধ্যে দূতমুখে মাতা ও পিতার মৃত্যুর দুঃসংবাদ তাঁহার গোচর হইয়াছিল।
অন্ধকার হৃদয়ে, শূন্যমনে স্থানীশ্বরে ফিরিয়া তিনি প্রথমেই ভ্রাতার সহিত সাক্ষাতের অভিলাষী হইলেন।
প্রভাকরবর্ধন যে ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠটিতে অন্তিম নিশ্বাস ত্যাগ করিয়াছিলেন, সেই কক্ষে মলিন দীপালোকে দুই রোদনোন্মুখ ভ্রাতার সাক্ষাৎ হইল। জ্যেষ্ঠভ্রাতার দর্শন পাওয়া মাত্র হর্ষবর্ধন ছুটিয়া গিয়া তাঁহাকে সবলে আলিঙ্গন করিলেন। বীর রাজ্যবর্ধন, দিগ্বিজয়ী রাজ্যবর্ধন দীর্ঘদেহ হর্ষের স্কন্ধে আপনার মস্তক রক্ষিত করিয়া ফুকারিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। মাতার আত্মাহুতির সংবাদে আত্মগ্লানিতে তাঁহার অন্তর পরিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল — নিজ অবাঞ্ছিত অসংযমকে তিনি কিছুটা হইলেও দায়ী করিয়াছিলেন। এক্ষণে অনুজের স্নেহস্পর্শে তাঁহার অপরাধী হৃদয় যেন শতধা হইয়া ফাটিয়া পড়িবার উপক্রম হইল।
সেনাপতি ভণ্ডী এবং রাজবয়স্য ভূষণবর্মা এই শোকোচ্ছ্বাসের সাক্ষী রহিলেন।
অতঃপর দুই ভ্রাতার মধ্যে নিম্নোক্ত কথোপকথন হইল।
রাজ্যবর্ধন কহিলেন — “হর্ষ, আমি রাজত্ব চাহি না। স্থানীশ্বর নগরী এবং সমগ্র পুষ্যভূতি সাম্রাজ্যের দায়িত্ব তোমাকে গ্রহণ করিতে হইবে।
আমি বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা লইয়া সংসার ত্যাগ করিয়া সন্ন্যাস গ্রহণ করিব স্থির করিয়াছি।”
হর্ষবর্ধন স্নিগ্ধস্বরে উত্তর দিলেন — “রাজন, ইহা আপনার ক্ষণিক উত্তেজনার কথা। মাতাপিতার প্রয়াণে বিভ্রান্ত, শোকগ্রস্ত হইয়া তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া উচিত হইবে না। আপনি রণক্লান্ত — আপনার পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রয়োজন। তাহার পরে ক্ষণকাল সুস্থিতচিত্তে চিন্তা করিয়াও যদি আপনি পূর্বসিদ্ধান্তে অটল থাকেন, অবশ্যই প্রব্রজ্যা লইবেন। কিন্তু এখন এই প্রসঙ্গ স্থগিত থাকাই বাঞ্ছনীয়।”
সহসা অন্য কিছু স্মরণ করিয়া রাজ্যবর্ধন চকিত হইয়া বলিলেন —
“হাঁ, সন্ন্যাসগ্রহণের পথে আরও একটি দুস্তর বাধা রহিয়াছে বটে” — মুখমণ্ডলে প্রবল বিতৃষ্ণা ফুটাইয়া রাজা বীতশ্রদ্ধকণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন —
“এক রমণীকে বাগদানের পাপ করিয়াছিলাম। সংসার ত্যজিবার পূর্বে তাহাকে সেই শৃঙ্খল হইতে মুক্তি দিয়া নিজেও মুক্তি লইবার জন্য ব্যগ্র হইয়াছি। ভূষণ, সেই কন্যার পিতা শ্রেষ্ঠী ক্ষেমদত্তকে সংবাদ প্রেরণ করো।”
অপ্রতিভ হর্ষবর্ধন লজ্জিত অধোবদন হইলেন। সেনাপতি ভণ্ডীও অন্ধকার মুখে নীরব রহিলেন।
অবশেষে ভূষণবর্মা মৃদুস্বরে রাজাকে জানাইলেন — “সেই বন্ধনমুক্তি আপনা হইতেই ঘটিয়া গিয়াছে। শ্রেষ্ঠীকন্যা এই বাগদানে স্বীয় অসম্মতি জ্ঞাপন করিয়া রাজ-অভিজ্ঞান প্রত্যর্পণ করিয়াছে। অদ্য সেনানী চন্দ্রবর্মার সহিত তাহার বিবাহ।”
উপস্থিত সকলকে চমকিত করিয়া রাজ্যবর্ধন অট্টহাস্য করিয়া উঠিলেন —
“নারী! এই বরবর্ণিনীর মোহে অন্ধ হইয়া আমি মাতার মনোবেদনার কারণ হইয়াছিলাম। ধিক আমাকে! শেষ মুহূর্তে আমার ক্ষমাপ্রার্থনা পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করেন নাই। কোনওভাবেই কি মৎকৃত এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত সম্ভব?”
প্রবল মর্মবেদনার অবসাদে তাঁহার কণ্ঠস্বর ভঙ্গুর, নয়ন জলভারাক্রান্ত হইল।
হর্ষবর্ধন পূর্বাপেক্ষা কোমলস্বরে অগ্রজকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন —
“মনুষ্যমাত্র ভ্রান্তির শিকার হয় মহারাজ। আপনি কোনও অন্যায় কার্য করেন নাই। আপনার চয়ন মাতার মনোবেদনার কারণ হইয়াছিল সত্য। কিন্তু মাতা তাহার জন্য দেহত্যাগ করেন নাই — পিতার বিচ্ছেদবেদনা অসহ হইবে, এমত অনুমান করিয়া স্বেচ্ছায় সতী হইয়াছেন। অনন্তলোকে পৌঁছিয়া আমাদিগের কল্যাণময়ী জননী অন্তর্যামিনী হইয়াছেন, এ আমি নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করি। আপনি নিরন্তর মাতার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করুন, তিনি অবশ্য আপনাকে ক্ষমা করিবেন।
আত্মগ্লানি শুভ, তাহা অন্তরের গরল উন্মোচনপূর্বক ক্ষতস্থানে নিরাময়ের প্রলেপ দেয় — আপনার সমস্ত ক্ষোভ কাটিয়া যাইবে ভ্রাতা, আপনি ব্যাকুল হইবেন না।”
অতঃপর সেনাপতি ভণ্ডীও নিশ্চুপ থাকিতে পারিলেন না। তিনিও রাজাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাইলেন — “আপনি বিশ্রাম করুন রাজা। পুষ্যভূতি রাজত্বের প্রজাদের প্রতিও আপনার বহু কর্তব্য রহিয়াছে — ব্যক্তিগত দুঃখশোকের প্রবাহে তাহা ভাসাইয়া দেওয়া সমীচীন হইবে না।”
রাজ্যবর্ধন তথাপি অনিশ্চিতভাবে মস্তক আন্দোলন করিতেছেন দেখিয়া কুমার হর্ষ পুনরায় স্নেহক্ষরিত কণ্ঠে কহিলেন — “আমাদিগের ভগিনী রাজ্যশ্রীর কথাও স্মরণ করুন রাজন। তাহাকে পিতামাতার মহাপ্রয়াণের সংবাদ প্রেরণ করা হইয়াছে। সে আসিয়া উপস্থিত হইলে, তাহার সহিত আলোচনার পরে আপনি প্রব্রজ্যা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত লইবেন, ইহা আমার একান্ত অনুরোধ” —
হর্ষবর্ধনের কথা সমাপ্ত হইবার পূর্বেই বিস্ফারিত নয়নে এক প্রতীহার তাঁহাদের মন্ত্রণামধ্যে প্রবেশ করিল।
ভণ্ডী অত্যন্ত অসন্তুষ্ট কণ্ঠে কহিলেন — “ইহা কেমন আচরণ, পিঙ্গল? তুমি রাজন্যবর্গের আলোচনার মধ্যে অনাহূত প্রবেশ করিবার স্পর্ধা করিলে কোন দুঃসাহসে?”
পিঙ্গল ভগ্নস্বরে উত্তর করিল — “মৌখরীরাজ্য হইতে দূত পুষ্যমিত্র মর্মান্তিক সমাচার লইয়া আসিয়াছে সেনাপতি! সে মহারাজের সাক্ষাৎপ্রার্থী!”
রাজ্যবর্ধনের অন্তর কম্পিত হইল — পুনরায় দুঃসংবাদ! মন্মথনাথ মহাদেব কি তাঁহার পরীক্ষা লইতেছেন?
পিঙ্গলের বক্তব্য শেষ না হইতেই কান্যকুব্জের দূত পুষ্যমিত্র কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিল।
তাহার ধূলিধূসরিত নগ্নপদ, মলিন ছিন্ন বস্ত্র আর জটাজূটতুল্য কেশ দেখিয়া উপস্থিত সকলের আশঙ্কা প্রবল হইয়া উঠিল।
“মৌখরীরাজ গ্রহবর্মা নিহত হইয়াছেন। দেবী রাজ্যশ্রী অপহৃতা — কান্যকুব্জে অবাধ লুণ্ঠন চলিতেছে। পরিস্থিতি অবর্ণনীয়, মহারাজ।” — এইমাত্র উচ্চারণ করিয়া পুষ্যমিত্র রাজ্যবর্ধনের পদতলে কর্তিত বৃক্ষশাখার তুল্য পতিত হইল।
সংবাদের নৃশংসতায় রাজ্যবর্ধন স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। গ্রহবর্মা নিহত? তাঁহার প্রিয় ভগিনী, কান্যকুব্জের মহারাণী রাজ্যশ্রী অপহৃতা? কে? কে সেই দুরাচারী পিশাচ, যে এমন কুকর্ম সংঘটিত করিল?
সংজ্ঞালুপ্তির পূর্বে পুষ্যমিত্র যেন তাঁহার অনুচ্চারিত প্রশ্নের উত্তরেই কহিল — “দেবগুপ্ত। মালবরাজ দেবগুপ্ত, মহারাজ।”
ক্ষণিক পূর্বের সন্ন্যাস গ্রহণের সিদ্ধান্তের কথা রাজার স্মরণে রহিল না। ষড়রিপু বিজয়ের কথাও তিনি সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হইলেন। রাজ্য, প্রয়াত মাতা-পিতার শোক, আত্মগ্লানি সমস্ত কিছু অতিক্রম করিয়া ভগিনীর নিষ্পাপ, সুকোমল মুখশ্রী তাঁহার মানসপটে জাগরূক হইয়া উঠিল। ক্লেদাক্ত কীটতুল্য দেবগুপ্ত তাঁহার মাতার অবমাননা করিয়াছিল। এক্ষণে সেই পাপিষ্ঠ, নষ্টমতি, ঘৃণ্য পুরুষ তাঁহার আদরিণী কিশোরী সহোদরার স্বামীকে হত্যা করিয়া তাহাকে আপন বন্দিনী করিয়াছে?
সমগ্র পৃথিবী রাজা রাজ্যবর্ধনের চক্ষে রক্তাভ হইয়া উঠিল।
(ক্রমশ)









