“জাড়ে কাঁপছে আমার গা। জাড়ে কেনে কাঁপিস বৌ, আগুন পুহা যা”– এরকম একটা গান ছিল। এই আগুন পুহা বা পোওয়ানো বোধহয় ঐ যারা শীতকে জাড় বলে তাদের জন্যই।
আমরা ছোট বেলায় মেদিনীপুরের গ্রামে আগুন পোয়াতাম। আমাদের বাড়ীর দক্ষিণ দিকে বেশ কটা কুল গাছ ছিল। শীতকালে ভোরে উঠে কুল কুড়াতে যেতাম। ওদিকেই ছিল একটা ঘন বাঁশের ঝাড়। শীতকালে বাঁশ বাগানের নিচে অনেক শুকনো পাতা পড়ে থাকত। আমরা কয়েকটা কঞ্চির ঝাঁটা বানিয়ে তাই দিয়ে বাঁশ পাতা জড়ো করতাম। তারপর সেই বাঁশ পাতায় আগুন দিয়ে, আগুন পোয়ানো হত।
আমাদের সেই কৈশোরের আগুন পোয়ানোর স্মৃতি অন্য আর সব স্মৃতির মতোই সুখের। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলেই বুঝি, ওটাও একটা দারিদ্রের লক্ষণ। আসলে আমাদের তখন যথেষ্ট শীতের পোশাক ছিল না। কথাটা মনে পড়ল, কদিন আগে শিয়ালদা দক্ষিণ শাখার ট্রেনে যাওয়ার সময়, দু’তিন জায়গায় আগুন পোয়াতে দেখে।
শীতকালে আমরা আগে বেশ কিছু আগুনে পোড়া রুগী পেতাম, বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজে। সবই ঐ আগুন পোয়নোর সময় পোশাকে আগুন লাগার ইতিহাস। আমাদের ছোটবেলার খেলার সঙ্গি তপন এভাবেই পুড়ে গেছল। তপনের বা হাতটা শরীরের সাথে আটকে গেছল। ওকে বছরের পর বছর ঐ অবস্থায় দেখেছি।
স্কুলের NCC শিক্ষক প্রণববাবুর কাছে প্রথম শুনেছিলাম ক্যাম্প ফায়ারের গল্প। ওটা যে আমাদের আগুন পোয়ানোর একটা মার্জিত রূপ তখন বুঝতাম না।
বাঁকুড়ায় গিয়ে শুনলাম ওখানকার গ্রামে আগুন পোয়ানোকে বলে, আগুন তাপানো। কলেজে পড়ার সময় দু একটা সিনেমায় দেখলাম, ঘরের ভিতর আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা। একে বলে ফায়ার প্লেস। শীতের দেশের প্রায় সব বাড়িতেই ফায়ার প্লেস থাকত। এখন রুম হিটার বা এয়ার কন্ডিশনারের ব্যাপক ব্যবহারে শীতের দেশেও বোধ হয় ফায়ার প্লেস উঠেই গেছে।
রুম হিটার বলতে মনে পড়ল, মায়ের শেষ কটা দিনের কথা। শেষের প্রায় দু মাস মা বিছানায় পড়ে ছিলেন। সে বছর ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝামাঝি খুব ঠাণ্ডা পড়েছিল। প্রথমে বড়দা মেদিনীপুর শহরে গিয়ে একটা মোটা কম্বল কিনে আনল। কম্বলে শীত কাটছে না বুঝে সেজদা রুম হিটার কিনতে বলল; তাও কেনা হল।
আমরা চল্লিশ বছর আগে মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় জেনেছিলাম, বহুদিন ধরে এক বিশেষ পদ্ধতিতে আগুন পোয়ানোর জন্য, কাশ্মীরের বয়স্ক লোকেদের নাভীর নিচে এক রকম ঘা হয়, পরে তার থেকে ক্যান্সার হয়ে যায়। ঐ আগুন পোয়ানোর ব্যবস্থাকে কাংরী বা খাংরী বলে। একটা মাটির পাত্রে কাঠ কয়লার আগুন রেখে, ঐ অঙ্গারের পাত্র ঢোলা আলখাল্লার নিচে নিয়ে পেটের কাছে রাখা হয়। আমি কোনদিন কাশ্মীর যাইনি, তাই ঐ খাংরী দেখা হয়নি।
গ্রামে আগুন পোয়ানোর একটা দৃশ্য এখনও চোখে ভাসছে। ঠান্ডা জলের ভয়ে আমরা যখন সবদিন স্নান করতে পারতাম না, তখনও সাত সকালে পুকুরে মাছ ধরতে জাল নামাতো জেলেরা। একেবারে খালি গায়ে একটা গামছা পরে কি করে মানুষগুলি জলে নামতো ভাবলে অবাক লাগে। সবদিন নয়, মাঝে মাঝে ওদের দেখতাম সামান্য আগুন জ্বেলে হাত গরম করছে।
১০০ বছর আগে লেখা জলধর সেন মহাশয় -এর হিমালয় ভ্রমণ কাহিনী শুনছিলাম। সেখানে উনি লিখেছেন, বদ্রিকাশ্রম -এ পৌঁছানোর পরে কয়েকটি মাত্র ঘর দেখতে পেয়েছিলেন, সেগুলির প্রায় কোনটারই জানালা দরজা ছিল না। উনি বলেছেন যে, আগে যে সমস্ত সাধু-সন্ন্যাসীর দল ওখানে গিয়েছেন তারাই আগুন পোহানোর জন্য ওইসব জানলা দরজার কাঠ ব্যবহার করেছেন। ১০০ বছর আগে বদ্রিকাশ্রম-এ কি দুর্দশা ছিল, এটা দেখে বোঝা যায়। আমাদের সাধারণ ধারণা যে, যে সমস্ত সাধু-সন্ন্যাসী হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ের গুহায় থাকেন তারা যোগ বলে ঠান্ডাকে সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করেন। আসলে সেরকম ক্ষমতা অর্জন করা সকলের পক্ষে সম্ভব হয় না। প্রায় সব সাধুই আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ, তাদেরও ঠান্ডা লাগে তাদেরও আগুন পোহানোর দরকার হয়।
বান্ধবগড়ে বেড়াতে গিয়ে আমরা একটা জঙ্গল রেসর্ট -এ ছিলাম। সন্ধ্যেবেলা জঙ্গল থেকে সাফারি করে ফিরে আমরা ঘরের ভেতরে থেকে গেছিলাম।সেদিন বেশ ঠান্ডাও ছিল। রাত্রে খাবার খেতে আমাদের বেরোতে হয়েছিল, তখন রিসর্টের কর্মচারীরা আমাদের জানালেন যে, ভেতরের মাঠে আগুন জ্বলছে, সেখানে যেতে পারি। ওখানে গিয়ে দেখলাম একটা বড় কুন্ড মত জায়গায় অনেকক্ষণ ধরেই আগুন জ্বলেছে। কাঠের আগুন তখনও বেশ তাপ ছড়াচ্ছে। আমরা ছাড়াও বেশ কয়েকজন লোক ওই আগুনের পাশে চেয়ার নিয়ে বসে আগুন পোহালাম।
এই কথার থেকে আমার একটা জিনিস মনে হচ্ছে আগুন পোহানো শুধু গরিবের বেঁচে থাকার পন্থাই নয়, এই আগুন পোয়ানোকে অনেক পয়সাওয়ালা লোকেরাও বেশ উপভোগ করেন। আসলে এখন গরিবের বলে আর কোনো জিনিস নেই। চুনো মাছ, ঢেঁকিছাটা চাল, এসব যেগুলোকে আমরা গরিবের খাদ্য ভাবতাম, অনেক পয়সাওয়ালা লোক ওই সব জিনিস এখন বেশি দাম দিয়ে কিনছে। তাই আমার যে ধারণা ছিল গরিব লোকেরাই এখন আগুন পোহায়, তা ঠিক নয়।
বছর দুই আগে আমি একবার বাঁকুড়ার রাধানগর গ্রামে গেছিলাম ওখানে ভ্রাতৃপ্রতিম শিক্ষক, সৌম্য স্যারের সাথে গ্রামের রাস্তায় সকালবেলা ঘুরছিলাম। দেখলাম একটা জায়গায় কয়েকজন লোক রাস্তাঘাট ঝাট দেওয়া নোংরা কাগজপত্র ও প্লাস্টিকের টুকরা জ্বেলে আগুন পোহাচ্ছে। আমারও সেই আগুন পোহানোর কথা মনে পড়ল; আমি ওদের সাথে বসে একটু আগুন পোয়ালাম। আমার সেই আগুন পোহানোর ছবি সৌম্য স্যার তুলেছিলেন। সেই ছবি দেখে আমার স্ত্রী খুব বিরক্ত হলেন। ওর মতে প্লাস্টিক পোড়ানো আগুনের সামনে যাওয়াটা ঠিক না। কথাটা ঠিকই প্লাস্টিক পোড়ালে তার থেকে অনেক বিপজ্জনক কেমিক্যাল বেরোয়। ওই প্লাস্টিকের ধোঁয়া নাকে ঢুকলে এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে। কিন্তু আমি মাঝে মাঝেই পার্কসারকাস স্টেশনে নেমে বস্তির ভেতর দিয়ে যখন হাসপাতালে যাই, দেখতে পাই লোকগুলি নানান রকমের প্লাস্টিক, রবারের টুকরো, জুতো তৈরীর সরঞ্জামের টুকরো পুড়িয়ে রান্না করছে। ওদের কিন্তু ওইসব বিপজ্জনক জিনিস পোড়ানোর বিপদ সম্বন্ধে ভাবলে চলে না।
আগুন পোহানো, গরিবের চুনো মাছ, ঢেঁকিছাঁটা চা্ল, মুড়ি, পুকুরপাড়ের শাক, এসব অনেক কিছুর মতই পয়সাওলা লোকদের হাতেই চলে যাচ্ছে।









