হরিপদ বারুই ছাতনাতলা জেনেরাল হাসপাতালের জেনেরাল ডিউটি মেডিক্যাল অফিসার, যাকে সরকারিভাবে সংক্ষেপে এবং বেসরকারিভাবে কিছুটা ইয়ের সঙ্গে বলা হয় জিডিএমও। হাসপাতালের সদ্য ল্যাজ নাড়তে শেখা ক্ষুদে কুকুরটাও জানে গোটা হাসপাতালের এতগুলো মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ভীতু, নিরীহ যদি কেউ থাকে, সে হল এই হরিপদ ডাক্তারটা। একটু ভুক্ করলেই হল। সে এমারজেন্সিতে বসে অপ্রয়োজনীয় পেশেন্ট ভর্তি না করলে পার্টির চমকানি শোনে, বেকার পেশেন্ট ভর্তি করে বেড আটকানোর জন্য সব ডিপার্টমেন্টের স্পেশালিষ্টদের কাছে নিত্য গালি খায়। সপ্তাহে একদিন, শুক্রবার, অপারেশন থিয়েটারে তার ডিউটি পড়ে সেই কোনযুগে এক বছর সার্জারিতে হাউসস্টাফশিপ করার সুবাদে। সে স্পেশালিস্ট সার্জনদের অ্যাসিস্ট করে। অ্যাবসেস, হাইড্রোসিল, ফাইমোসিস, চামড়ার সিস্ট এইসব ছোটখাট কেসও করে দেয়। অপারেশন থিয়েটারে, মানে বাংলায় যাকে বলে ওটি, সেইখানেও বিনা কারণে সে সিস্টারদের ধমকধামক খায়। সবেতেই সে মুখ বুজে থাকে। প্রথমত, সে নিতান্ত ভিতু, প্রতিবাদের জিনটা তার ভ্রূণ তৈরী হওয়ার সময় বাদ হয়ে গেছে হয়ত। দ্বিতীয়ত, এই হাসপাতাল থেকে তেত্রিশ মিনিট হাঁটাপথে তার দাদুর বানানো শরিকি বাড়ি। ছাপান্নর চিরকুমার পিটপিটে পেটরোগা হরিপদ সেই বাড়ি থেকে তার মায়ের রান্না আলুসিদ্ধ -ভাত খেয়ে হাসপাতালে আসে, বাড়ি গিয়ে ছোট মাছের ঝোল দিয়ে আবার ভাত খায়। বদলিতে তার বড় ভয়, তাই হাসপাতালের এককোণে সে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। সে ডাক্তারদের কোনও পার্টির সদস্য হয়নি কোনওদিন, পাছে অন্য পার্টির কোপে পড়ে। প্রথম প্রথম সেই কারণেও গালি খেয়েছে, তারপরে মার্চ মাস অবধি গলায় মাফলার জড়িয়ে ঘোরা এই পাবলিকের উপরে হাল ছেড়ে দিয়েছে সব পক্ষের ডাক্তার নেতারা।
কিন্তু সেই বছর সে আর পারল না, যখন আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে একজন তরুণী ডাক্তারের মর্মান্তিক মৃত্যু হল। হরিপদ ভীরু হতে পারে, সে তো বিবেকহীন নয়। তার প্রায় অব্যবহৃত পড়ে থাকা ফেসবুক পেজে সে ‘আরজিকর-বিচার চাই’ লোগো পোস্টিয়ে দিল। কিছু তপ্ত লেখা, কিছু বক্র মিম সে শেয়ার করে ফেলল জীবনে এই প্রথমবারের মত ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ হয়ে। তারপর ডিউটি বদল-টদল করে ধর্মতলার অনশন মঞ্চে দু দফায় চব্বিশ ঘণ্টা করে অনশন-অবস্থানও করে এল।
কদিন পরেই, সব তুফান মিটে গিয়ে শরতের উৎসবের মরশুম শেষে শীতের মেলা শুরু হয়ে গেছে মাঠে মাঠে, হঠাৎ একদিন সে ফোন পেল এক সেভ না করা নম্বর থেকে।
“কিরে হরা, কেমন আছিস? প্রসূন বলছি। প্রসূন তরফদার। চিনতে পারছিস তো?”
নব্যসাহসী হরিপদ একটু টাল খেয়ে যায়। ক্লাসমেট প্রসূন স্বাস্থ্যদপ্তরে এখন বেশ মাথাভারী কর্তা একজন, গত রি-ইউনিয়নে নীল আলো লাগানো বড় একটা গাড়ি করে এসেছিল। সে হঠাৎ গ্রামের হাসপাতালের জিডিএমও কে ফোন লাগাচ্ছে! কুশল সংবাদে সময় অপব্যয় না করে ঠাণ্ডা গলায় সোজা টপিকে আসেন প্রসূন স্যর – “তুই ও তো দেখছি বিপ্লবী হয়ে গেলিরে হরা। একটু বুঝেশুনে প্রতিবাদ কর। আমাদের সরকারের ঘর থেকে মাইনে নিবি, আবার আমাদের এগেইনস্টেই বিপ্লব করবি, এ কি ঠিক কাজ, বল? শান্তিতে আছিস নিজের গাঁয়ে, ভালো লাগছে না? দেখ ভাই, পুরুলিয়া থেকে কোচবিহার যেতে হলে যেন বলিস না, আমি সাবধান করিনি। রাখলাম।”
সত্যি বলতে কি, ঈঙ্গিত বুঝে ফেসবুক থেকে লতাপাতা আর পাহাড়-সাগরের ছবি বাদে সব ডিলিট করে দিল হরিপদ। কিন্তু, মুশকিল হল, তার ঠাণ্ডা রক্ত তখন প্রতিবাদের গনগনে স্বাদ পেয়ে গিয়েছে। সে রাগ করতে শিখেছে। ভীরুতার মত সাহসও কখনও ছোঁয়াচে রোগ হয় কিনা, সে তার ডিএনএ তে সাহসের কোডিং না হয় নাই রইল। নূতন শেখা প্রতিবাদের নেশায় এইবারে সে এক অসম্ভব কাজ করে বসল। ওটিতে একজন দিদিমণি আছেন, মধুরা সিস্টার। তাঁর প্রতিটি কাজ যেমন ভুল এবং রোগীর পক্ষে বিপজ্জনক, তেমনি তাঁর দাপট। সাতেপাঁচে না থাকা হরিপদর অজানা কোনও কারণে তিনি সবার কাছেই অবধ্য। সহপাঠী প্রসূনের কাছ থেকে চমকানি খাওয়ার কদিন পরেই, এহেন মধুরা সিস্টারকে অটোক্লেভ করা জীবাণুমুক্ত ড্রাম থেকে সরাসরি হাত দিয়ে গ্লাভস বার করতে দেখে হরিপদ হঠাৎই ঝাঁঝিয়ে উঠল – “কি ব্যপার বলুন তো সিস্টার, এভাবে তো গোটা ড্রামের সব গ্লাভস্ আনস্টেরাইল হয়ে গেল। কোথা থেকে শিখেছেন এসব?”
গোটা থিয়েটার হতভম্ব হয়ে বোবা। মধুরা দিদিমণির ফ্যাটফেটে ফরসা মুখ টকটকে লাল। পা দাপিয়ে ওটি থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইনচার্জকে বললেন – “সিস্টার, আমার শরীর ভালো লাগছে না। কোয়ার্টার যাচ্ছি। হাফ সিএল নিয়ে নেব আজ।”
নীরবতা ভাঙল ওটি টেকনিশিয়ান শিবু -”স্যর, কি করলেন আপনি! মধুরাদি মিনিস্টার মদন মাখালের ক্যাচ। ওকে কেউ কিচ্ছু বলে না। সামান্য ডিউটি নিয়ে গোলমালে উনি সঙ্গীতা সিস্টারকে প্রেগন্যান্ট অবস্থায় ট্রান্সফার করিয়ে দিয়েছেন গোসাবাতে।”
হরিপদ নিজেও চুপ হয়ে আছে ঝোঁকের মাথায় একেবারে স্বভাববিরুদ্ধ কাজ করে ফেলে।
শিবুই কথা শেষ করল – “আপনি ভালোমানুষ, কি দরকার আপনার এসবে। ওনাকে কি আপনি পাল্টাতে পারবেন?”
দুদিন পরে, বয়সে দশ বছরের জুনিয়র হাসপাতাল সুপারও ডেকে একই কথা বললেন হরিপদকে – “আপনাকে সবাই ঠাণ্ডা মাথার ভালোমানুষ বলেই জানে। দেখবেন দাদা আর যেন এসব না হয়। মাখাল স্যরের পিএ কে আমি দায়িত্ব নিয়ে বলেছি কিন্তু আপনার হয়ে। বোঝেনই ত সব।”
বুঝে হরেকৃষ্ণ চুপ করে রইল, কিন্তু চুয়ান্ন বছর বয়সে নূতন করে শেখা রাগটা তার গেল না। অপারেশন থিয়েটারে ডাঃ বারুই আর মধুরা সিস্টারের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেল। এসবই দু হাজার পঁচিশের গোড়ার কথা।
কাট টু জুলাই ২০২৬। কিসব দুর্নীতির অভিযোগে ভোটে হেরে যাওয়া মদন মাখাল এখন জেলে। তদন্ত হচ্ছে। আদালতে আসা যাওয়ার পথে ডিম, টম্যাটো দিয়ে আদর করে দিচ্ছে পাবলিক তাকে। এরই মধ্যে, এক শুক্রবার, হরিপদ একদিন দেখল মধুরা সিস্টার আবার একটা মারাত্মক গণ্ডগোল করছেন। আর তো মদন মাখালের ছাতা নেই। অতএব ভয়মুক্ত হরিপদ আবার বকে দিল মধুরাকে – “সিস্টার, এরকম ভাবে করলে পেশেন্টের ইনফেকশন হয়ে যাবে। আপনাকে তো আর বলে পারা যায়না।”
আজ আর মধুরা দিদিমণি রাগলেন না, ওটি ছেড়ে বেরিয়েও গেলেন না। শুধু বললেন – “হুম।”
হরেকৃষ্ণ বুঝল ওষুধে কাজ হয়েছে। দেড় বছর আগে অপমানের ক্ষতে একটু প্রলেপ পড়ল। এবার থেকে সে সবার সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। নির্ভয়ে।
শনি, রবি পার করে সোমবার দুপুরেই ফোনটা পেল ডাঃ হরিপদ বারুই। নম্বরটা এখন সেভড্ হয়ে গেছে – ডাঃ প্রসূন তরফদার।
“এই মরা, তোর কি হয়েছে বলত হরা? তুই তোদের ওটিতে মধুরা সিস্টার বলে কে একজন আছে তার সাথে ঝামেলা করেছিস! জানিস ও নূতন মন্ত্রী রমলা নাগের ক্যাচ? রমলাদি নিজে আমাকে ফোন করেছিলেন একটু আগে। দেখ বারুই, চেয়ারে বসে এসব ফালতু লফড়া কিন্তু আমরা বরদাস্ত করব না। অনেক খেটে আমরা এই চেঞ্জটা এনেছি। অনেক কাজ আছে আমাদের। রমলাদিকে বলেটলে এবারের মত তোর বদলিটা ঠেকিয়েছি। তবে তোকে আর ওটি ডিউটি করতে হবে না। আর কি সার্জারি করবি! অনেক তো করলি। শুধু ইমার্জেন্সি করবি আর একদিন রেকর্ড সেকশনে ডিউটি করবি। আমি তোদের সুপারকে বলে দিয়েছি। এটা লাস্ট ওয়ারনিং ধরে নে”। ফোনটা রেখে দিলেন ডাঃ তরফদার।
রবিবার নাইট করে আজ ডে অফ। খেতে বসেছিল হরিপদ। মায়ের বেড়ে দেওয়া ভাতে কলমি শাকটা টেনে নিয়ে মাখতে লাগল।










