Skip to content
Facebook Twitter Google-plus Youtube Microphone
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Menu
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Swasthyer Britte Archive
Search
Generic filters
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Search
Generic filters

আমরা চলমান বিশ্ব যুদ্ধের মধ্যে রয়েছি

Oplus_131072
Dr. Gaurab Roy

Dr. Gaurab Roy

Public health specialist and Health administrator
My Other Posts
  • February 22, 2026
  • 7:31 am
  • No Comments

তাইওয়ান প্রণালী (Taiwan Strait): এই মুহূর্তে রণাঙ্গনের সবচাইতে উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চল দিয়ে শুরু করি। চিনের (People’s Republic of China বা PRC) পূর্ব উপকূলের ফুজিয়ান প্রদেশের তটরেখা থেকে মাত্র ১৮০ কিমি দূরে ঘড়ির কাঁটার পথে উত্তরে পূর্ব চিন সাগর (East China Sea), পূর্বে ফিলিপাইন সাগর (Philippine Sea) ও প্রশান্ত মহাসাগর (Pacific Ocean), দক্ষিণে দক্ষিণ চিন সাগর (South China Sea) এবং পশ্চিমে তাইওয়ান প্রণালী (Taiwan Straight) দিয়ে ঘেরা ফরমোজা বা তাইওয়ান দ্বীপ। এটিকে ঘিরে ১৬৮ টি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে Republic of China (ROC)। PRC এর আয়তন, জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব যেখানে ৯৫.৯৬ লক্ষ বর্গ কিমি (বিশ্বে তৃতীয়), ১৪০.৫ কোটি (বিশ্বে দ্বিতীয়) এবং ১৪৬ / প্রতি বর্গ কিমি (বিশ্বে ৮৩ তম), সেখানে ROC এর জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব মাত্র ৩৬.১৯ হাজার বর্গ কিমি ও ২.৩২ কোটি (বিশ্বে ৫৯ তম), কিন্তু জনঘনত্ব ৬৪৪ / প্রতি বর্গ কিমি (বিশ্বে ১৭ তম)।

১৯৬০ এর দশক থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পর তাইওয়ানের  অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আধুনিক শিল্পায়নের প্রবল উন্নতি। এটি এখন বিশ্বের অন্যতম ধনী ও এগিয়ে থাকা দেশ যার মহার্ঘ্য ইন্টিগ্রেডেড সার্কিট, মাইক্রো চিপ ইত্যাদি প্রযুক্তি বিশ্বের সর্বোত্তম। তাইওয়ানের মোট জিডিপি (পিপিপি) ১.৯৭ ট্রিলিয়ন ডলার (বিশ্বে ২০ তম), জনপ্রতি জিডিপি ৮৪.০৮ হাজার ডলার (বিশ্বে ১১ তম) এবং মানব উন্নয়ন সূচক (এইচ ডি আই) ০.৯৩৪ (২১ তম)। সেখানে চিন বৃহত্তম অর্থনীতি (৪১.০২ ট্রিলিয়ন ডলার) হলেও জনপ্রতি জিডিপি ২৯.১৯ হাজার ডলার (বিশ্বে ৭৪ তম) এবং এইচ ডি আই ০.৭৯৭ (৭৮ তম)। আবার আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র সম্ভার, যুদ্ধ করার ক্ষমতায় চিন অন্যতম বিশ্ব সেরা (দ্বিতীয় অথবা তৃতীয়) যার তুলনায় তাইওয়ান ক্ষুদ্র শক্তি হলেও তার রয়েছে আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি (বিশ্বের ২২ তম সামরিক শক্তি)।

বহু বছর ধরে চিনের পাখির চোখ তিব্বত এবং যুক্তরাজ্যের থেকে হংকং ও ম্যাকাও পুনর্দখলের পর তাইওয়ান কে দখল এবং মূল চিনা রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্তিকরণ। তাইওয়ানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হল প্রাচীন যুগে জনজাতিদের বাস, তারপর মূল ভূমি থেকে হান দের অভিবাসন। এরপর বারবার চিনা ও জাপানি সাম্রাজ্য গুলির দখলদারি। ১৬২৪ থেকে ‘৬২ ডাচ ঔপনিবেশিকদের দখলদারি। তারপর চিনা কিং সাম্রাজ্যের (Qing Dynasty) দখলদারি। ১৮৯৫ – ১৯৪৫ অবধি জাপানি সামরিক – সাম্রাজ্যের দখলদারি। ১৯১১ -’১২ তে কুয়োমিনটাং নেতা ডা. সান ইয়াত সেনের নেতৃত্বে চিন জিনহাই বিপ্লবের মাধ্যমে ২১৩২ বছরের রাজতন্ত্র থেকে  মুক্ত হয়ে চিনা প্রজাতন্ত্র (ROC) গড়ে তুললেও ১৯৪৫ এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণ অবধি তাইওয়ান জাপানের দখলে ছিল। ১৯২৭ থেকে ১৯৪৯ অবধি, ১৯৩১ এবং ১৯৩৭ – ‘ ৪৫ জাপ বিরোধী যুক্ত সংগ্রাম পর্ব ছাড়া‌ মাও সে তুং এর নেতৃত্বে চিনা কমিউনিস্ট দল  ও তাদের লাল ফৌজ বা People’s Liberation Army বা PLA এবং চিয়াং কাই সেকের নেতৃত্বে কুয়োমিনটাং দল ও তাদের সমর্থিত সামন্তপ্রভু যোদ্ধাদের (Feudal Warlords) দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর কুয়োমিনটাংরা পরাজিত হয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে তাইওয়ানে আশ্রয় নেন। মূল ভূখণ্ডতে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে ১৯৪৯ এ নয়াগণতান্ত্রিক  বিপ্লব সম্পূর্ণ হওয়ার পর সেটি PRC তে রূপান্তরিত হয়। সেই থেকে চিন ও তাইওয়ানের বৈরিতা। চিন ১৯৫৩ থেকে কৃষি, শিল্প প্রভৃতিতে যৌথায়নের পথ ধরে সমাজতন্ত্র গঠন শুরু করে, তাইওয়ান পুঁজিবাদী সংসদীয় গণতন্ত্রে আস্থা রাখে। ১৯৫৪, ‘৫৮, ‘৯৬ ও ২০২২ এ চিন তাইওয়ান কে ঘিরে ধরে দখল করার চেষ্টা করে। পুনরায় এখন তাইওয়ানকে ঘিরে সমরসজ্জা সাজিয়ে ভীতি প্রদর্শন করছে। তাইওয়ানকে চিন বিশ্বের বিভিন্ন মঞ্চ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। যারা তাইওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত চিনের চোখ রাঙানি তে সরে এসে মাত্র ১১ টি দেশে পৌঁছেছে। তবে ভারতের মত অনেকে ঘুর পথে যোগাযোগ রাখে।

পারমাণবিক শক্তিধর চিনের রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম প্রশিক্ষিত ও আধুনিক ২৫ লক্ষের বেশি সক্রিয় ও রিজার্ভ সেনা বাহিনী। ভারত, ভিয়েতনাম, রাশিয়া, মঙ্গোলিয়ার সঙ্গে সীমান্ত বিবাদ; জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইনস, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামের সঙ্গে বেশ কিছু দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিবাদ এবং দক্ষিণ চিন সাগরে আধিপত্য রাখতে চিন সেখানে স্থল বাহিনী, নৌবাহিনী, এয়ারফোর্স সহ বিপুল বাহিনী এবং আধুনিক যুদ্ধ সম্ভার মোতায়েন রেখেছে। শুধুমাত্র তাইওয়ান কে ঘিরেই রয়েছে প্রায় তিন লক্ষ নৌসেনা (People’s Liberation Army Navy বা PLAN)। প্রতিরক্ষায় চিনের রয়েছে পাঁচটি Theater Command। যার মধ্যে East TC (HQ: নানজিং) ও South TC (HQ: গুয়াংঝাও) যথাক্রমে এই অঞ্চলের দায়িত্বে। লিয়াওনিং, শ্যানডং ও ফুজিয়ান তিনটি বৃহৎ এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার কে ঘিরে ১০০ এর বেশি যুদ্ধজাহাজ পীত সাগর (Yellow Sea), পূর্ব চিন সাগর ও দক্ষিণ চিন সাগর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এরসঙ্গে রয়েছে আরও ৫০০ যুদ্ধ জাহাজ, নির্মাণ অবস্থায় চতুর্থ বিমানবাহী রণতরী ছাড়াও ৫৭০০০ গান বোট যেগুলিকে দিয়ে দক্ষিণ চিন সাগরে ৩০০ কিমি ব্যারিকেড গড়ে তোলা হয়েছিল। এছাড়াও চিনের রয়েছে অত্যাধুনিক Strategic Support Force (SSF)। এবার বিশ্বের সব সম্পদ দখলকারী, প্রধান সাম্রাজ্যবাদী এবং সর্ববৃহৎ সামরিক শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অঞ্চলের সমরসজ্জায় আসা যাক। US Department of Defense (HQ: Pentagon, Virginia) সারা পৃথিবীর দখলদারি বজায় রাখতে ছয়টি Geographical Combatant Commands (CCMD) গড়ে তুলেছে। এছাড়াও তার রয়েছে: US Special Operation Command, US Strategic Command, US Transportation Command, US Cyber Command, US Space Command ইত্যাদি। CCMD এর মধ্যে সর্ববৃহৎ US Indo Pacific Command (HQ: Aiea, Hawai) পৌনে চার লক্ষ সেনা ও অত্যাধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে এই অঞ্চলের ৩৬ টি দেশ, ১৪ টি time zones, প্রশান্ত মহাসাগরীয়, উত্তর পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আধিপত্য বজায় রাখার ও দখলদারির দায়িত্বে।

US Navy, US Marine প্রভৃতির অধীনে এই অঞ্চলে তারা মোতায়েন রেখেছে USS Abraham Lincoln, USS George Washington, USS Tripoli তিনটি বৃহদাকার বিমানবাহী রণতরী এবং ৭০ টির মত ক্রজার, ডেস্ট্রয়ার, সাবমেরিন সহ USS Seventh Fleet। এছাড়াও রয়েছে আরও নানা ধরনের শতাধিক রণতরী। জাপানে ৬০ হাজার সেনা সম্বলিত আটটি ঘাঁটি, দক্ষিণ কোরিয়া তে ২৮,৫০০ সেনা সম্বলিত পাঁচটি ঘাঁটি সহ ফিলিপাইনস, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, গুয়াম, হাওয়াই সহ বিভিন্ন দেশে ও দ্বীপে সেনা ঘাঁটি। তাইওয়ানেও মার্কিন ঘাঁটি ছিল। ১৯৭৯ তে চিন – মার্কিন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটি তুলে নিলেও ঘুরপথে তাইওয়ানে র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে দিয়েছে। এছাড়াও এই অঞ্চলে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, উত্তর কোরিয়া সহ বেশ কয়েকটি সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী দেশ। দুই কোরিয়ার সীমান্তে রয়েছে মাইন ও মারণঘাতী অস্ত্রের পাহাড়। রাশিয়ার পূর্ব সীমানাও দূরে নয়। সুতরাং এখানে যুদ্ধ শুরু হলে কি ভয়ানক পরিস্থিতি হতে পারে ভাবতে পারেন? আবার এমনও হতে পারে ট্রাম্প – শি দুই অতি উচ্চাকাঙ্খী স্বৈরশাসক ব্যবসায়িক বোঝাপড়ায় অন্যান্য জায়গার পরিবর্তে তাইওয়ান কে ছেড়ে দিতে পারে চিনের দখলে।

বিশ্বযুদ্ধের সূচনা: জীবজগতের অন্যান্য প্রাণীরা তাদের জীবনধারণের খাদ্য ও খাদ্যের জন্য শিকার, লুকিয়ে থাকার জায়গা, নিদ্রা, রেচন, যৌনতা, সন্তান পালনের মধ্যে জীবনচক্র সীমাবদ্ধ রাখে। তিমি, হাতি, জলহস্তী, গণ্ডার, গরিলা, বাঘ, সিংহদের তুলনায় মানুষ শারীরিকভাবে নেহাতই ল্যাকপ্যাকে হলেও তার মগজাস্ত্র অনেক উন্নত। সেটিকে কাজে লাগিয়ে মানুষ আজ বিশ্বকে জয় করেছে, প্রতিদিন এগিয়ে চলেছে নতুনতর উত্তরণের পথে। আবার এই মগজই তাদের অনেককে সীমাহীন লোভ, লালসা, বিকৃতি ও ধ্বংসের দিকে নিয়ে চলেছে। প্রাচীন যুগে রাজতন্ত্র গড়ে ওঠার পর রাজায় রাজায় যুদ্ধ হত আঞ্চলিক দখলদারি ও কর্তৃত্বের জন্য। এভাবেই প্রাচীন যুগের শেষ পর্বে বর্তমান ইউরোপে শক্তিশালী গ্রিক (১২০০ – ১৪৬ খ্রিস্ট পূর্ব) ও তারপর রোমান সাম্রাজ্য (২৭ খ্রি.পূ. – চতুর্থ শতাব্দী) গড়ে ওঠে এবং তাঁরা ইউরোপ, এশিয়া মাইনর ও উত্তর আফ্রিকা দখলদারি করে কর্তৃত্ব চালায়। তারপর আসে খ্রিস্ট ধর্মীয় পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন (১৪৫৩ পর্যন্ত) ও ইসলাম ধর্মীয় অটোমান তুর্কি (১৯২২ পর্যন্ত) সাম্রাজ্য। প্রথমটিতে পাগান, ইহুদি; পরেরটিতে খ্রিস্টান, ইহুদি, আরমেনিয়দের উপর পীড়ন চলে। জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইহুদিরা হটে গেলেও আব্রাহামের সন্ততিদের থেকে উৎপন্ন অপর দুই ধর্ম খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে আটটি ধর্মযুদ্ধ (Crusade) চলে (১০৯৫ – ১২৯১) এবং শেষমেষ অমীমাংসিত থাকে।

৪১৫ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ার প্রখ্যাত পাগান ধর্মীয় গণিতজ্ঞা হাইপেশিয়া কে পুড়িয়ে হত্যার মধ্যে দিয়ে ভ্যাটিকান ও পোপের নেতৃত্বে ইউরোপে শুরু হয় রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রায় ৯০০ বছরের আতঙ্ক ও উৎপীড়নের অন্ধকার যুগ (Dark Age)। এরসঙ্গে একের পর এক মহামারী (Epidemic) মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়। এরই মধ্যে অসংখ্য জ্ঞানী বিজ্ঞানী এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। চার্চের ধর্মরক্ষা বাহিনী খবর পেলেই তাঁদের আক্রমণ করে তাঁদের গবেষণালব্ধ সব পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে দিত। গ্যালিলিও সহ অনেকের অন্ধকার কারাগারে জীবন শেষ হল; সার্ভেতাস, জিওনার্ডো ব্রুনোর মত জ্ঞান তপস্বীদের, যান হাস, থমাস মুঞ্জেদের মত মানবতাবাদী ধর্ম সংস্কারকদের হত্যা করা হল। কিন্তু এত করেও যুক্তিবাদী দর্শন, জীবন সাহিত্য, মানবিক চিত্রকলা, বৈজ্ঞানিক আবিস্কারগুলি প্রতিভাত হয়ে প্রথমে ইতালিতে তারপর সমগ্র ইউরোপে নবজন্ম হিসাবে (Reneissance) ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ছড়িয়ে পড়ল। এরপর প্রথমে ইংল্যান্ডে, তারপর জার্মানি ও অন্যত্র শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution) (১৭৬০ – ১৮৪০) সংগঠিত হয়ে ইউরোপ ও বিশ্বকে অনেকখানি এগিয়ে দেয়। ১৪৯২ এর মধ্যে স্পেন ও পর্তুগাল থেকে ইহুদি ও আরব মুরদের বিতাড়িত করে (Reconquista) একের পর এক সামুদ্রিক অভিযান চালানো হয় আরবদের নাগাল এড়িয়ে অত্যাশ্চর্য ঐশ্বর্যের দেশ ভারতে পৌঁছতে। কলম্বাস ১৪৯২ তে আমেরিকা পৌঁছলেও ১৪৯৮ তে ভাস্কো দা গামা ভারতের কোঝিকোডে পৌঁছতে পারেন।

এরপর ইউরোপের যান্ত্রিক শিল্পের এত অগ্রগতি হয় যে তার জন্য একদিকে প্রয়োজন হয়ে পড়ে ভিন দেশের সস্তা কাঁচামাল ও সস্তা শ্রম, অন্যদিকে নতুন নতুন বাজার ও উপনিবেশের। স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ডাচ, বেলজিয়ান, ড্যানিশ, ব্রিটিশ, ফরাসি অভিযাত্রী, সেনা ও ঔপনিবেশিকরা ছড়িয়ে পড়েন সারা বিশ্বে। এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপগুলিতে স্থানীয় জনজাতিদের হত্যা করে, সম্পদ লুঠ করে, উপনিবেশ তৈরি করে ফেলা হয় (Colonization)। এবার তাদের মধ্যে দখলদারি নিয়ে অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে যে ভয়ংকর যুদ্ধগুলির সূচনা এবং নবরূপে আজও চলছে বিশ্বময় সেই যুদ্ধ গুলিকেই আমরা এখানে বিশ্বযুদ্ধ (World Wars) বলছি। দুটি প্রতিপক্ষ জোট (Allies Vs. Central & Axis Power) গড়ে উঠে এবং বিশ্বের বিস্তৃত অংশে ছড়িয়ে পড়ে সেটি প্রথম (১৯১৪ -‘১৮) ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর (১৯৩৯ – ‘৪৫) আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পর ব্রিটিশের নেতৃত্বে মিত্র শক্তি (Allies), তারপর সাময়িক জার্মান – ইতালি – জাপানের কর্তৃত্বের পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো (NATO) দুনিয়ার কর্ণধার হয়ে যায়। তার উপর মার্কিন দেশে আবিশ্বের সেরা মানব ও মেধা সম্পদকে সমাবেশিত করে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ঘটিয়ে তারা শিল্প, অর্থনীতি, বাণিজ্য, সামরিক দিক দিয়ে অন্যদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। জুল ভার্ন ১৮৭২ সালে কল্পকাহিনী ‘Around The World in 80 Days’ লিখে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন, এখন প্রতিদিন International Space Station (ISS) এর ১৬ বার করে পৃথিবী কে প্রদক্ষিণ স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯১৭ তে সমাজ বিপ্লবের মাধ্যমে কমিউনিস্টরা রাশিয়ায় ক্ষমতায় এসে শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) গঠন করে বিশ্ব জুড়ে মার্কিনের প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠে এবং শুরু হয় মার্কিন – সোভিয়েত শীতল যুদ্ধের (Cold War) যুগ। সোভিয়েত রাষ্ট্রে উৎসাহিত হয়ে পূর্ব ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন শক্তিশালী হয়। বহু সমাজতান্ত্রিক দেশের অভ্যুদয় হয় যার মধ্যে চিন, ভিয়েতনাম, যুগোস্লাভিয়া, কিউবা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি র আভ্যন্তরীণ সংকটে ১৯৯১ এ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তারপর যুগোস্লাভিয়া ভেঙে পড়ে একের পর এক পাশ্চাত্য অভিমুখী জাতিরাষ্ট্র গড়ে ওঠে পূর্ব ইউরোপ, বলকান ও ককেশীয় এলাকা এবং মধ্য এশিয়ায়। ফলে এক মেরু বিশ্বে (Unipolar World) বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের কর্ণধার মার্কিনের সুবিধা হয়ে যায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, দখলদারি ও লুঠপাটের। যার সাম্প্রতিক উদাহরণ লাতিন আমেরিকার তেল, গ্যাস, সোনা, লোহা, বক্সাইট, কোলটান, নিকেল, কয়লা, হীরে খনিজ সমৃদ্ধ স্বাধীন দেশ ভেনেজুয়েলার প্রতিবাদী প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রী কে মধ্যরাতে  বিশেষ সামরিক অভিযান চালিয়ে শোবার ঘর থেকে ধরে এনে হাতকড়া পড়িয়ে সংবাদজগতের সামনে মারধোর ও মিথ্যা অভিযোগে কারাবন্দী করা। ইউক্রেন যুদ্ধে আটকে ও দুর্বল হয়ে পড়া রাশিয়া এবং স্বার্থপর ও ব্যবসাদার চিন এর বিরুদ্ধে কার্যত কিছুই বলে না, করে না। জনপ্রিয় ভোটে দ্বিতীয়বার জিতে আসা ফাটকা ব্যবসায়ী, যৌন অপরাধী, শ্বেতাঙ্গ জাতিবাদী, যুদ্ধাস্ত্র শিল্প লবির প্রতিনিধি, স্বৈরাচারী, আগ্রাসী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশের মধ্যে Immigration and Customs Enforcement (ICE)’ ‘গেস্টাপো’ বাহিনীকে নামিয়ে অভিবাসীদের অত্যাচার, প্রতিবাদীদের পীড়ন, একের পর এক দেশের উপর অযৌক্তিক বাণিজ্য শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া, ‘Brazil, Russia, India, China & South Africa (BRICS)’ জোট সহ যে কোন অন্য জোটকে ভেঙে ফেলা; কিউবা, গ্রিনল্যান্ড ও কানাডা দখল করার হুমকি; মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়াকে আনুগত্যের জন্য হুঙ্কার; ইরান সমীপে রণতরী নিয়ে গিয়ে ভয় দেখানো;  ভারতকে রাশিয়া ও ইরান থেকে সস্তায় তেল কেনা বন্ধ এবং মার্কিন নির্দেশমত একতরফা বাণিজ্য চুক্তি করতে বাধ্য করা – যা ইচ্ছা তাই করে চলেছেন।

তবে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধও সমানে চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপলিস প্রতিবাদের একটি বড় নাম, খোদ ট্রাম্পের শহর নিউ ইয়র্কে সাধারণ মানুষ ‘ডেমোক্রেটিক সোশালিস্ট’ তরুণ জোহরান মামদানিকে মেয়র নির্বাচিত করেছেন, ভেনেজুয়েলার মানুষ পথে নেমে তাঁদের প্রেসিডেন্ট কে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন, পশ্চিম ইউরোপ ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়েছে। চিন, ব্রাজিল, কানাডা, মেক্সিকো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ অনেকেই ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক মেনে নেয় নি।

চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ: ইউক্রেন ছিল নিজের তো বটেই সমগ্র ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের শস্যাগার। এছাড়াও সোভিয়েতের গুরুত্বপুর্ণ খনি ও শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। ইউরোপের সবচাইতে বেশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং কৃষ্ণ ও আজতভ সাগর সমীপে ১৮ টি সব ঋতুর সামুদ্রিক বন্দরের অধিকারী। তাই অতীতে গ্রিক, রোমান, বাইজান্টাইন, স্লোভাক, কিয়েভানরাস, পোল, কসাক, জার থেকে পরবর্তীতে বলশেভিক, নাৎসি সবার আগ্রাসন ইউক্রেনের উপর। ১৯৯১ তে স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর থেকে ইউক্রেন কে নিয়ে রাশিয়া ও মার্কিনের ‘টাগ অফ ওয়ার’। ২০০৪ ও ২০১৪ তে রুশপন্থী রা ক্ষমতায় এলেও ‘অরেঞ্জ রেভলিউশন‘ ও ‘ইউরোমাইডেন‘ আন্দোলনের মাধ্যমে ইউক্রেনের আবার পাশ্চাত্যমুখী হয়ে পড়া। এরপর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি পুরোদস্তুর মার্কিন শিবিরে যোগ দিয়ে ন্যাটো সদস্য হওয়ার আবেদন করায় রাশিয়া ২০২২ এ ইউক্রেন আক্রমণ করে ক্রমে পুর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনের ক্রাইমিয়া, দোনেস্ক, লুহান্সক, ঝাপরিঝঝিয়া ও খেরসন ওব্লাস্ট (Oblast) গুলির বৃহদংশ দখল করে নেয়। ইউক্রেনও মার্কিন ও ন্যাটোর সাহায্যে প্রত্যাঘাত চালায়। সেই থেকে এক ভয়ানক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ চলছে। এখনবধি দুপক্ষ মিলিয়ে আনুমানিক মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লক্ষ, উদ্বাস্তু হয়ে ইউরোপ সহ অন্যত্র গমন ৬০ লক্ষ, ইউক্রেনের মধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে আসতে হয়েছে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষকে (ইউক্রেনের জনসংখ্যা ছিল তিন কোটি ২৮ লক্ষ)। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, অর্থনৈতিক সংকট ও সেনা সংখ্যা হ্রাসের কারণে দুই পক্ষের যুদ্ধ চালানো শক্ত হয়ে পড়ায় ট্রাম্প ঢুকে পড়ে মধ্যস্থতার নামে নিজস্ব কর্মসূচি চরিতার্থ করতে চাইছেন। অন্যদিকে রাশিয়া অন্য দেশ থেকে সংগ্রহ করা ভাড়াটে সেনা এবং ভয়ঙ্কর সব রাসায়নিক অস্ত্র ইউক্রেনে ব্যবহার করছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্য (Middle East) ব্রিটিশের নজরে আসে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে মরূপ্রায় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ কালো মানিক পেট্রোলিয়াম আবিষ্কারের পর। সেই থেকে তারা এবং পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানকার তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে একেকটি দেশ ভেঙেছে, আবার তৈরি করেছে; একেকটি সরকার ফেলেছে, আবার বশংবদ কাউকে কুরসিতে বসিয়েছে; দেশগুলির মধ্যে গোলমাল লাগিয়ে একেকটি যুদ্ধ ঘটিয়েছে, আর সেই ফাঁকে তেল লুঠ করে নিয়ে গেছে (ইরাক, কুয়েত ইত্যাদি)। মধ্যপ্রাচ্যে এই মুহূর্তে প্রধান দ্বন্দ্ব গুলি: (১) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সমর্থিত ইহুদি ইজরায়েল বনাম মুসলিম দুনিয়া, মূলতঃ ইজরায়েল বনাম ইরান এবং ইরানের অনুগত হিজবুল্লা, হুথি, হামাস সশস্ত্র গোষ্ঠী গুলি; (২) মার্কিন সমর্থিত সুন্নি সৌদি আরব বনাম রাশিয়া ও চিন সমর্থিত শিয়া ইরান; (৩) সৌদি বনাম হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন এবং (৪) ইয়েমেন ও সুদানের সম্পদের কর্তৃত্ব নিয়ে সৌদি বনাম আমীর শাহী।

ঘটনাবহুল ইরানঃ অতীতের পারস্য বর্তমান ইরান একটি বড় দেশ। ১৬.৪৮ হাজার বর্গ কিমি (বিশ্বের ১৭ তম), জনসংখ্যা ৯ কোটি ২৪ লক্ষ (১৭ তম), মোট জিডিপি ১.৮৮ ট্রিলিয়ন ডলার (২২ তম), জনপ্রতি জিডিপি ২১,৪৭৩ (৮৮ তম) ও এইচ ডি আই ০.৭৯৯ (৭৫ তম)। ইরান হল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও ধারাবাহিক সভ্যতার দেশ। একসময় এখানে জুরথ্রস্ট বা পার্সি ধর্ম প্রাধান্য লাভ করে। পরে ইসলামের বিজয়ের সময় সপ্তম শতাব্দী থেকে ইসলাম ব্যাপ্ত হয়। বিশ্বের ১০% খনিজ তেল ও ১৫% প্রাকৃতিক গ্যাস এখানে রয়েছে। তাই মার্কিন ও ব্রিটিশ রা এই দেশটি বাগে আনার চেষ্টা করে। তাদের সমর্থনে ১৯২৫ থেকে পহলবি শাহ্ জমানা শুরু হয়। ১৯৫১ তে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ মোসাদ্দেশ জনমুখী সংস্কার ও তেল খনি গুলির জাতীয়করণ করতে চাইলে মার্কিন ও ব্রিটিশ প্রভুরা গোলমাল পাকিয়ে সরকার ফেলে দেয় ও মোসাদ্দেশ কে কারাবন্দী করে। শাহ্ শাসনের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সেই সুযোগে কট্টর ইসলামি ধর্মগুরু আয়াতোল্লা খোমেনি র নেতৃত্বে ১৯৭৯ তে ইসলামি বিপ্লব সংগঠিত হয়ে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর মার্কিন প্ররোচনায় ইরাক ইরান আক্রমণ করে এবং আট বছর ইরাক – ইরান যুদ্ধ চলে (১৯৮০ – ‘৮৮)। এরপরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহুবার চেষ্টা করে ইরানকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য, কিন্তু তাদের নানারকম ষড়যন্ত্র, অভিযান ব্যর্থ হয় ইরানের শক্তিশালী সরকার ও তাদের বিশ্বস্ত ‘ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড করপ্স’ দের তৎপরতায়। অন্যদিকে ইসলামি শাসনের অত্যাচারের বিরুদ্ধেও সাধারণ মানুষ ও মহিলারা বারবার পথে নামেন। ইসলামি সরকার কুরদ, ইয়েজিদি, বালোচ, আরব, বাহাই, আজেরি জনজাতিদের দমন করে। তারাও প্রতিবাদ করেন। সবগুলি প্রতিবাদকেই ইরানের ইসলামি সরকার নির্মমভাবে  দমন করে।

১৯৯৯ এর নাগরিক বিদ্রোহ (সবুজ বিপ্লব), ২০২২ এ ঠিকমত হিজাব না পরার অভিযোগে  কুরদ তরুণী মাহসা আমিনিকে হত্যা নিয়ে বড় প্রতিবাদের পর মার্কিন ও পশ্চিমী দেশগুলির দীর্ঘ আর্থিক অবরোধ (Sanction), সাম্প্রতিক ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং খরার কারণে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয় সেটি জনজীবনের একাংশকে ক্ষিপ্ত করে। ডিসেম্বর’২৫ – জানুয়ারি’২৬ বড় ধরনের নাগরিক প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হলেও ইরানের আলি খামেইনি সরকার আগেরগুলির মত এটিকেও নৃশংসভাবে দমন করে। অন্ততপক্ষে ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ইরানের রয়েছে শক্তিশালী মিলিটারি, ইসলামি গার্ড  ও তাদের কাড বাহিনী এবং অত্যাধুনিক মিসাইল ও ড্রোনের ভাণ্ডার ছাড়াও প্রায় প্রস্তুত পারমাণবিক অস্ত্র। উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর ও তুর্কমেনিস্তান এর মধ্যে দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রয়েছে। ২০২৫ এ ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান আক্রমণ করে অনেক ক্ষয়ক্ষতি করলেও ইরানকে পুরোপুরি পর্যুদস্ত করতে পারে নি, বরং ছোট রাষ্ট্র হওয়ায় ইজরায়েল ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায় খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্কিন ও ইজরায়েলের মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান বাধা ইরান তাই সেটি দুর্বল ও কব্জা করা কিংবা ধংস করা তাদের বহুদিনের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে নতুন করে আক্রমণ শানানোর প্রস্তুতি চলছে। USS Abraham Lincoln, USS Gerald Ford বিমানবাহী রণতরী দুটি সহ বহু রণতরীকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারস্য ও লোহিত সাগরে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে ইরান আত্মরক্ষা ও প্রত্যাঘাতের প্রস্তুতি সহ ওমানের মত কিছু বন্ধু দেশের মাধ্যমে মার্কিনের সঙ্গে রণকৌশলগতভাবে বোঝাপড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

ছিন্নভিন্ন গাজাঃ বর্তমান প্যালেস্তাইন বা অতীতের লেভান্তে তে ইজরালাইট, ক্যানানাইট, ফিলিস্তিন, ফয়েন্সিয়ান প্রমুখ জনজাতি গোষ্ঠী বাস করতেন। পরে এদের অনেকে ইহুদি ধর্ম তারপরে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে ইসলামের বিজয়ের পর এবং আরবদের আগমনের পর ইহুদি ধর্মীয়রা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েন। সেখানেও তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধারাবাহিক নিপীড়নের শিকার হন। গত শতাব্দীতে হিটলারের নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে তাদের উপর বীভৎস অত্যাচার করে হত্যা করা হয় (Holocaust)। এরপর হিব্রু বাইবেলের ‘প্রতিশ্রুত পবিত্র দেশে (Promised Holy Land অথবা Eretz Yisrael) ফেরার স্বপ্ন এবং জিওনিস্ট (Zionist) আন্দোলনের স্বভুমির (Homeland) দাবি মিলে নতুন দেশ গড়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ইতিমধ্যে লেভান্তে থেকে খ্রিস্টানরাও অনেকে ইউরোপে চলে যান। ড্রুজ, মেরনাইট সহ অল্প কিছু খ্রিস্টান এবং সংখ্যালঘু ইহুদিরা এই অঞ্চলে বাস করতে থাকেন। আরবদের সংখ্যাধিক্য হয় এবং আরব জাতীয়তাবাদ (Arab Nationalism) গড়ে ওঠে।  অন্যদিকে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে বিজয়ী ব্রিটিশরা এই অঞ্চল দখল করে নেয় এবং তাদের অধীনে ভূমধ্যসাগর সমীপে প্যালেস্তাইন ম্যান্ডেট রাষ্ট্র তৈরি হয়। সুয়েজ খাল নিকটবর্তী হওয়ায় এই অঞ্চলের গুরুত্ব আরও বাড়ে। এবার ক্রমবর্ধমান জিওনিস্ট আন্দোলনকে সমর্থন করে ব্রিটিশরা  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এখানেই একটি অংশে ১৯৪৮ এ ইজরায়েল রাষ্ট্র গঠন করেন। তার আগে থেকেই এখানে আরব মুসলমান ও ইহুদি দের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেছিল। এবার আরব ও ইহুদিদের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ অবধি চলা সেই প্যালেস্টাইনের যুদ্ধে ইজরায়েল বিজয়ী হয় এবং এই এলাকা থেকে আরবদের হটিয়ে দিতে থাকে। আবার ইজরায়েল রাষ্ট্র তৈরি হতেই আশপাশের মিশর, ট্রান্স – জর্ডান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন – পার্শ্ববর্তী সমস্ত মুসলমান রাষ্ট্র তাকে আক্রমণ করে। রাষ্ট্রপুঞ্জের হস্তক্ষেপে ১৯৪৯ এ যুদ্ধ (১৯৪৮ – ’৪৯) বন্ধ হয়। এরপর ১৯৫৬ তে এবং সুয়েজ সংকট নিয়ে  ১৯৬৭ তে আবার ইজরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলির ছয়দিনের যুদ্ধ হয়। এবার ইজরায়েল মিশরের থেকে গাজা ও সিনাই, জর্ডনের থেকে জর্ডন নদীর ওয়েস্ট ব্যাংক এবং সিরিয়ার থেকে গোলান হাইটস দখল করে নেয়। পরে মিশরকে সিনাই ফেরত দেয়। ইহুদি ধর্মের পবিত্র ডোম অফ রক, টেম্পল মাউন্টেইন, ওয়েস্টার্ন ওয়াল; খৃষ্টানদের হোলি সেপালচার চার্চ ও মুসলমানদের পবিত্র আল আকসা মসজিদ সম্পন্ন জেরুজালেমের কর্তৃত্ব নেয়। তারপর ১৯৭৩ (ইয়ুম কিপ্পুর যুদ্ধ), ১৯৭৮, ১৯৮২ ও ২০০৬ এ আবার আরব – ইজরায়েল যুদ্ধ হয় এবং প্রতিবারই ইজরায়েল মার্কিন ও ব্রিটিশ সহযোগিতায় এবং নিজেদের সামরিক ও প্রযুক্তি দক্ষতায় বিজয়ী হয়ে পশ্চিম এশিয়ায় (West Asia) কর্তৃত্ব কায়েম করে। ১৯৯০ – ‘৯১ এর মার্কিন জোটের ইরাকের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রারম্ভে সাদ্দাম হোসেনের ইরাক ইজরায়েলের দিকে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তার আগে ইজরায়েল বোমা বর্ষণ করে ইরাক, সিরিয়া ও ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলি ধ্বংস করে দিয়েছিল। উচ্চ শিক্ষিত জনসমাজ ,অত্যাধুনিক অস্ত্র, প্রশিক্ষিত সেনা; ‘মোসাদ’, ‘শিন বেট’, ‘আমান’ প্রমুখ দক্ষ গোয়েন্দা বাহিনী; পারমানবিক অস্ত্র এবং মার্কিন সমর্থন নিয়ে ইজরায়েল মধ্য প্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার প্রধান ও আগ্রাসী সামরিক শক্তি হয়ে ওঠে।

 

ইতিমধ্যে প্যালেস্তাইন কে মুক্ত করতে Fatah, PFLP, DFLP, PPP, ALP, PLF, PAF, FIDA, PPSF বেশ কিছু বামপন্থী, ‘বাথ’পন্থী, আরব জাতীয়তাবাদী  সংগঠন তৈরি হয় যাদের অনেকে মিলে ১৯৬৪ তে  Palestine Liberation Organization (PLO) নামে বৃহৎ সংগঠন গড়ে তুলে  শিরোনামে আসে। তারা প্যালেস্টাইনের মধ্যে থেকে বা বাইরের অন্যান্য দেশে থেকে প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার আন্দোলন চালান। সশস্ত্র সংগ্রাম ও অন্তর্ঘাত প্রাধান্য পায়। ১৯৮৮ তে PLO প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু কিছুতেই ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে পেরে না উঠে মার্কিন মধ্যস্থতায় তারা ইয়েসের আরাফতের নেতৃত্বে ১৯৯৩ তে নরওয়ের অসলো তে ইজরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে। এরপর ইস্টার্ন জেরুজালেম, ওয়েস্ট ব্যাংক ও গাজা স্ট্রিপ নিয়ে ৬,০২০ বর্গ কিমি ও ৫০ লক্ষ জন সংখ্যার প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।

কিন্তু প্রতিনিয়ত সেখানে ইজরায়েলি বসতকারী (Settlers) ও আরবদের মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে, ইজরায়েল উক্ত এলাকাগুলিতে প্রচুর বাইরে থেকে আসা ইহুদীদের বসতি নির্মাণ করে। ইজরায়েলি পুলিশ ও মিলিটারি ফিলিস্তিনি দের উপর অত্যাচার চালায়। এর বিরুদ্ধে ফাতা সংগঠনের নেতৃত্বে ১৯৮৭ ও ২০০০ এ দুবার ইন্তিফিদা সশস্ত্র অভ্যুত্থান হয়। ২০২৩ এ হামাস সংগঠন গাজা থেকে ‘সুকোত’ ইহুদি উৎসবের দিন ইজরায়েল আক্রমণ করে এবং ১২০০ ইজরায়েলি কে হত্যা করে, বেশ কিছু মহিলা সহ ২৫১ জনকে পণবন্দী হিসাবে ধরে নিয়ে যায় ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে তাদের ঘাঁটিতে। এরপর ইজরায়েল গাজার উপর ভয়াবহ আক্রমণ চালিয়ে গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে, ৬০ হাজার প্যালেস্তানিয়ান কে হত্যা করে। গাজা জুড়ে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। মার্কিন ও ইজরায়েল মিলে গাজাবাসী উদ্বাস্তুদের দক্ষিণ দিকে সরিয়ে গাজার উত্তর অঞ্চল নিজেদের দখলে রাখতে চাইছে। সেখানে ট্রাম্প তার তৈরি ‘বোর্ড অফ পীস’ এর মাধ্যমে রিয়াল এস্টেট, রিসোর্ট ইত্যাদির ব্যবসা করার পরিকল্পনা করছেন।

সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনঃ ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সিরিয়া থেকে রাশিয়া ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার পর সিরিয়াকে মার্কিন ও ইজরায়েল বোমাবর্ষণে দুর্বল করে দিলে রাশিয়া ও ইরান সমর্থিত আসাদের দীর্ঘ অত্যাচারী স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাল মার্কিন সমর্থিত সুন্নী আল  – কায়দা জঙ্গি গোষ্ঠীর একটি শাখা আল – নুশরা যারা আবার কুখ্যাত ‘ইসলামি স্টেটে (IS)’ – র হয়ে কাজ করত। তারা ক্ষমতা দখল করে এবার শিয়া অলঊইট গণহত্যা ঘটাল, সংখ্যালঘু খ্রিস্টান, কুরদ প্রমুখ জনগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার শুরু করল। এতদিন লেবানন নিয়ন্ত্রণ করত ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ শক্তিশালী জঙ্গি গোষ্ঠী। উপর্যুপরি বোমা বর্ষণ করে ইজরায়েল হিজবুল্লাহকে অনেকটা দুর্বল করে দিল। গাজা যুদ্ধে হামাসের সঙ্গে হিজবুল্লাহ ও হুথি ইজরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইয়েমেন কার্যত চারটি ভাগ হয়ে গেছে। রাজধানী সানা ও লোহিত সাগর নিয়ন্ত্রণ করছে ইরানপন্থী হুথি। বাকিগুলি মার্কিন ও সৌদি সমর্থক জঙ্গি গোষ্ঠীরা। এদের নিজেদের মধ্যে যেমন যুদ্ধ চলছে, আবার মার্কিন, সৌদি ও ইজরায়েলি বিমান হানায় জনজীবন বিপর্যস্ত। অনাহার, মহামারীতে শিশু মৃত্যু ঘটে চলেছে।

ঝঞ্ঝাময় দক্ষিণ এশিয়াঃ চিন – ভারত সীমান্ত উত্তেজনা, ভারত – পাক যুদ্ধ, মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার গণ বিক্ষোভ, থাইল্যান্ড – কম্বোডিয়া সীমান্ত যুদ্ধ এবং অশান্ত রক্তাক্ত বাংলাদেশ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়াও ঝঞ্ঝাময়। ১৯১৪ তে ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের মধ্যে প্রকল্পিত  সীমান্ত রেখা ‘ম্যাকমোহন  লাইন’ চিনের পরবর্তী কমিউনিস্ট সরকার কখনই মানেনি। ১৯৬২ – র যুদ্ধে ভারতের পরাজয়ের পর চিন জম্বু ও কাশ্মীরের ‘আকসাই চিন’ এলাকা দখল করে এবং বাদবাকি সীমানার Line of Actual Control (LAC) নিজের মত নির্ধারণ করে নেয়। সেই থেকে বহমান সীমান্ত উত্তেজনা এবং বারবার চিনা সেনার লাদাখ, হিমাচল, উত্তরাখন্ড ও অরুণাচলে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ। কোথাও কোথাও তাদের সামরিক ও অসামরিক নির্মাণ। ১৯৬৭, ১৯৮৭ ও ২০১৩ তে চিন – ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ। ১৯৭৫ এ আশ্রিত রাজ্য সিকিমের ভারতভুক্তি  উত্তেজনা বৃদ্ধি করে। সিকিমে ভারত – চিন সীমান্তেও উত্তেজনা। ২০১৭ তে ডোকলামে ভারত – ভুটান – চিন ত্রিসংযোগে চিনা সেনার প্রবেশের পর ৭৩ দিন ধরে সংঘর্ষ চলে। এরপর চিনা সেনা নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারে ফিরে গেলেও পরে ভুটানের অংশে স্থায়ী সামরিক নির্মাণ করে। এর আগে চিন অকুপায়েড কাশ্মীরের উপর দিয়ে কারাকোরাম সড়ক নির্মাণ করে এবং পাকিস্তানের থেকে শাক্সগ্রাম অঞ্চল অধিগ্রহণ করে। আকসাই চিনের মধ্যে দিয়ে লাসা – উরুমকি জাতীয় সড়ক ২১৯ নির্মাণ করে। ২০২০ তে লাদাখের দেপ্সাং,   গালওয়ান উপত্যকা,  প্যাংগং হ্রদ এবং হট স্প্রিং অঞ্চলে চিনা বাহিনী ভারতের অংশে এগিয়ে এলে দুই বাহিনীর সংঘর্ষ হয় এবং বেশ কিছু সৈন্য হতাহত হয়। সেইসময় থেকে উক্ত ভারতীয় ভূখন্ডগুলির একাংশ চিন দখল করে নেয়। দক্ষিণে পাঠানকোটের চিকেন নেক বাদ দিয়ে সমগ্র জম্বু, কাশ্মীর এবং লাদাখের চারপাশ চিন ও পাকিস্তান দিয়ে ঘেরা। এই সমগ্র অঞ্চলটি দুনিয়ার সবচাইতে Militarized Zone এবং পরিবেশ ও জলবায়ুর দিক থেকে খুব বিপজ্জনক অবস্থায়। তার Belt and Road কর্মসূচির অধীনে চিন নেপাল, ভুটান ও মায়ানমারের মধ্যে দিয়েও ভারতীয় সীমান্ত অবধি সব ঋতুর সড়ক পথ নির্মাণ করেছে।

দেশভাগ – দাঙ্গা নিয়ে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বৈরিতা শুরু থেকেই যা ‘ভূস্বর্গ’ কাশ্মীরের কর্তৃত্ব নিয়ে চূড়ান্ত রূপ নেয়। ফলে দুদেশের সীমান্ত নিয়ে উত্তেজনা, পারস্পরিক সন্ত্রাসবাদ ও অন্তর্ঘাত নিয়ে অভিযোগ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে শত্রুতা নিত্যদিনের বিষয়। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৪৭ – ‘৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৮৪ – ২০০৩ (সিয়াচেন হিমবাহের যুদ্ধ), ১৯৯৯ (কার্গিল যুদ্ধ) ও ২০২৫ – ছয়টি যুদ্ধ হয়। প্রথম পাঁচটি পাকিস্তান ও শেষের টি ভারত শুরু করে। প্রথম পাঁচটিতে ভারত বিজয়ী হয়, শেষের টিতে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে উভয়পক্ষ জয় দাবি করে। এছাড়াও বিরুদ্ধ শক্তির সক্রিয়তায় এবং ভারতীয় কূটনৈতিক, গোয়েন্দা ও সামরিক ব্যর্থতায় নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মাল দ্বীপ, আফগানিস্তানে চিনের প্রভাব বেড়ে যায়, চিনের নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তানের গদর বন্দরের  প্রতিস্পরধী ইরানের চাবাহার বন্দর থেকে ভারত সরে আসে এবং চিন মায়ানমারের কোকো দ্বীপ, শ্রীলঙ্কার হাম্বারতোতা, পূর্ব আফ্রিকার জিবুতি এবং পাকিস্তানের গদরে গড়ে তোলা নৌঘাঁটি দিয়ে ভারতকে দক্ষিণ সমুদ্রেও ঘিরে ফেলে। এর প্রতিরোধে ভারত দক্ষিণ নিকোবরে ঘন অরণ্য নিধন করে নতুন সামরিক ঘাঁটি বানাতে চলেছে। ভারত মহাসাগরের এই অঞ্চলে দিয়েগো গারসিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি ছিল, বর্তমানে মার্কিন বাহিনী পাকিস্তানের  সারগোদা বিমান ও অন্যান্য সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করছে এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও সেন্ট মারটিন দ্বীপে ঘাঁটি নির্মাণ করতে চাইছে।

২০২২ এ শ্রীলঙ্কায় গণবিদ্রোহ, ২০২৪ এ বাংলাদেশে ‘ছাত্র জনতা’ বিদ্রোহ এবং ২০২৫ এ নেপালে জেন জি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়ে সরকার পরিবর্তিত হয়। শ্রীলঙ্কায় ট্রটস্কিপন্থী  ‘জনতা বিমুক্তি পেরামুলা (JVP)’ ১৯৭১ এবং ১৯৮৭ – ‘৮৯ তে দুটি সশস্ত্র অভ্যুত্থান সংঘটিত করে অসফল হওয়ার পর ২০২৪ এ ‘ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (NPP)’ মোরচার মাধ্যমে নির্বাচনে জয়লাভ করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে। ঔপনিবেশিক – উত্তর অমীমাংসিত সীমান্ত বিবাদ এবং ঐতিহ্যশালী প্রেহা বিহার শৈব মন্দিরের দখল নিয়ে বারবার দুই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশী থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার (খমের) মধ্যে যুদ্ধ লেগে যাচ্ছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মায়ানমারে আং সান সুকি র নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (NLD)’ – র নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে চিনপন্থী সামরিক শাসকরা ক্ষমতা দখল করার পর ২০২১ থেকে ব্যাপক গণপ্রতিবাদ রুপান্তরিত গৃহযুদ্ধ চলছে। তাতে চিন (মায়ানমারের একটি প্রদেশ), কাচিন, আরাকান, কারেন, বামার, দানু প্রমুখ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি যোগ দিয়েছে। আবার বাংলাদেশ সংলগ্ন রাখাইন প্রদেশে বৌদ্ধ বার্মিজ দের সঙ্গে ২০১৬ থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংঘর্ষ চলছে। বহু শরণার্থী বাংলাদেশ ও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। সম্প্রতি মার্কিন ও ব্রিটিশ প্ররোচনায় মাল দ্বীপ মরিশাসের থেকে চাগোস দ্বীপ দখল করে নেয়। আবার মার্কিন ডিপ স্টেট নেপালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলনকে সামনে নিয়ে আসে।

 হিংসা কবলিত বাংলাদেশ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা ভারতীয় উপনিবেশের শাসন ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার আগে মুসলিম লীগ, জাতীয় কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা র সাহায্যে মৌলবাদী সমাজবিরোধী ও অপরাধীদের দিয়ে সারা দেশে সম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে দেয় এবং বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ করে দেশভাগ করে দেয়। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। ভারত ও পাকিস্তানের পাঞ্জাবে হিন্দু – মুসলমান  এবং শিখ – মুসলমানদের বিনিময় হলেও  সামান্য সংখ্যা বাদ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানরা থেকে যান এবং পাকিস্তানের অন্তর্গত পূর্ব বাংলায় হিন্দুদের বড় অংশ মূলতঃ দলিত সম্প্রদায়ের নমঃশূদ্র, রাজবংশী, মালো, ঋষি প্রমুখ জাতি; সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, গারো প্রমুখ জনজাতি থেকে যায়। পাকিস্তানের মৌলবাদী ইসলামি নেতাদের প্ররোচনায় মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলাম, রাজাকার, আল – বদর, আল – শামস সংগঠনগুলি  তাঁদের উপর অকথ্য অত্যাচার শুরু করে। পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুভাষী পাঞ্জাবী শাসকরা পূর্ববাংলা কে ও সেখানকার বাসিন্দাদের ছোট করে দেখতে, বাংলা ভাষাকে অবমাননা করতে থাকেন। ১৯৫২ – ‘ ৫৬ শক্তিশালী ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। এরসঙ্গে সরকারের সঙ্গী উর্দুভাষী বিহারী, জামাত, রাজাকারদের সঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদীদেরও সংঘর্ষ চলতে থাকে। ১৯৫২ ও ১৯৭০ এর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোট পেলেও পাকিস্তানি শাসকরা তার মান্যতা দেননা। ১৯৬৬ – ‘৬৯ পূর্ব পাকিস্তানের মার্শাল ল জারির বিরুদ্ধে ও স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে  আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে। নেতৃত্ব কে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ মুক্তি যুদ্ধ (Liberation War) শুরু হয়। পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত বুদ্ধিজীবী সহ ৩০ লাখ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা এবং চার লক্ষ নারীকে পাক সেনা – রাজাকার রা গণধর্ষণ করে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারতের সাহায্যে বাংলাদেশের জন্ম হয়।

পাকিস্তানিরা দেশটিকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছিল। মুজিবর রহমান যত বড় লড়াকু বিরোধী নেতা ছিলেন তত বড় প্রশাসক ছিলেন না। ফলে দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও মহামারী বাংলাদেশকে গ্রাস করল। তার সঙ্গে বাড়ল দুর্নীতি, কালোবাজারি। বামপন্থী জাসদ দল বিদ্রোহ ঘটানোর চেষ্টা করল। অবশেষে মুজিবর ১৯৭৫ এর জানুয়ারিতে ‘বাকশাল’ একদলীয় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করলেন। কয়েকমাস বাদে ১৫ আগষ্ট তাঁর গৃহে সপরিবার কিছু মিলিটারি অফিসারের গুলিতে নিহত হলেন। সঙ্গেসঙ্গে রুশ – ভারত প্রভাব কাটিয়ে মার্কিন – পাক বাংলাদেশের কর্তৃত্ব নিল। তারপর থেকে বিগত ৫০ বছর কয়েকটি সেনা অভ্যুত্থান ও তদারকি সরকার বাদে দীর্ঘ জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনার শাসনকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজকে ইসলামি খলিফাতন্ত্র গড়ে তোলার কাজ যার একটি প্রধান উপাদান সংখ্যালঘু হিন্দু ও অন্যান্যদের উপর অবিরত অত্যাচার করে হয় ভারতে তাড়ানো নয়তো ইসলামে ধর্মান্তরিত করা। এই প্রকল্পে সৌদি, কাতার, সংযুক্ত আরব আমির শাহী প্রমুখের বিপুল অর্থ এবং তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমর্থন পাওয়া যায়। আবার কোন বাম বা বিরোধী কর্মকাণ্ড আটকাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্য প্রাচ্য, আফ্রিকা, আফগানিস্তান, পাকিস্তান সহ দেশে দেশে ইসলামি মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেওয়ার মত বাংলাদেশেও মৌলবাদী ইসলামি রাজনীতি ও সন্ত্রাসবাদকে মদত দেয়।ভারত বিরোধিতা ও ভারতকে দুর্বল করার লক্ষ্যে চিনের প্রচ্ছন্ন সাহায্যও থাকে। আবার তিনদিক ঘেরা তুলনামূলক বৃহৎশক্তি ভারতের প্রতি ভীতি এবং নির্ভরতার কারণে একাংশের মধ্যে ভারত বিরোধিতার জন্ম হয়। শান্তিনিকেতনে কিছুদিন পড়াশুনা করা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ বিষয়ে সংবেদনশীল ছিলেন এবং শাসক দল ও সরকারে প্রণব মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিতেন। আদানির একচেটিয়া বিদ্যুৎ ব্যবসা এবং অন্যান্য  অবাঙালি ব্যবসায়ীদের পিঁয়াজ সহ লাভজনক ব্যবসাগুলি চালু রাখা ছাড়া বর্তমান গুজরাতি নেতৃত্বাধীন  বিজেপি এবং মারাঠা নেতৃত্বাধীন আর এস এসের বাংলাদেশ নিয়ে কোন আগ্রহ নেই। এরসঙ্গে বর্তমান ভারতীয় শাসকদের বিচক্ষণতার অভাব, সংকীর্ণ মনোভাব, উগ্র হিন্দুত্ববাদী আচরণ এবং গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা বাংলাদেশ সহ প্রতিবেশী বলয়ে ভারত বিরোধিতা বৃদ্ধি করে।

এতদসত্ত্বেও দীর্ঘ শাসনে হাসিনা সরকার দেশের মধ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পেরেছিলেন এবং পরিকাঠামো সহ অর্থনীতি ইত্যাদির অগ্রগতি ঘটিয়েছিলেন। তাঁর ভারত বান্ধব নীতি এবং মার্কিন ও চিনের কাছে মাথা না নোয়ানোয় মার্কিন ডিপ স্টেট তাঁর বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে। চিন, পাকিস্তান ও ইসলামি দেশগুলির মদত পায়। হাসিনাকে ঘিরে এক বিদূষক অভিজাততন্ত্রের লুটপাট, হাসিনা সরকারের স্বৈরাচারী আচরণ জনঅসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। তাকে কাজে লাগিয়ে সেনা বাহিনীর সাহায্যে ‘ছাত্র জনতা‘ হাসিনাকে ভারতে বিতাড়িত করে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করে ১৯২৪ এর আগষ্ট  (জুলাই বিপ্লব)। সঙ্গে ছিল নিষিদ্ধ জামাত সহ হেফাজতে ইসলাম, বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসা সহ মৌলবাদী ইসলামি গোষ্ঠীগুলি। সক্রিয় ছিল সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলিও। চিত্রনাট্য মেনে মার্কিন দেশ থেকে মহম্মদ ইউনূস এসে উপদেষ্টা হয়ে নতুন সরকারের মাথায় বসে ব্যাপক নৈরাজ্য সৃষ্টি, সংখ্যালঘু ও বিরোধী নিধন এবং ইসলামি বাংলাদেশের তালিবানিকরণের পথ নেন। চিন এবং পাকিস্তান সহ ইসলামি দেশগুলির সঙ্গে সখ্যতা বাড়ে, ভারত বিরোধিতা চরমে ওঠে। হিন্দু সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আওয়ামী লীগ সহ বিরোধী দল, শিল্পী, সাংবাদিক প্রমুখদের উপর অত্যাচার চরমে ওঠে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়। ইউনুস পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বারবার পেছিয়ে দিয়ে এই নৈরাজ্যের শাসন চালিয়ে যান। অবশেষে জনমত ও বিরোধীদের প্রবল চাপে নির্বাচন ঘোষণা করতে বাধ্য হন। নতুন পরিস্থিতিতে সরাসরি শাসন ক্ষমতা পরিচালনার জন্য জামাত, ছাত্রনেতাদের দল ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এন সি পি)’ এবং সহযোগী মৌলবাদী ও প্রবল ভারত বিরোধী দলগুলি  জোট বাধে। অন্যদিকে ক্ষমতার অপর দাবিদার প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি (বি এন পি) র চাপে তাদের সঙ্গে ইউনুসের  রফার সূত্রে তারেক রহমান দেশে ফেরেন। বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়েই গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অশান্তি ও হিংসার মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন  এবং ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে গণভোট  অনুষ্ঠিত হয়।

তুলনামূলক কম ভোট দান (৬০%) ও অনেক জায়গায় কারচুপি সত্ত্বেও হাসিনার সময়ে শেষ তিনটি ‘রাতের নির্বাচন’ যেখানে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারেননি এবার তাঁরা ভোট দিতে পারেন। যাবতীয় সরকারি ও বিদেশী সাহায্য সত্ত্বেও জামাত জোট ক্ষমতা দখল করতে পারে না। বি এন পি বিপুল ভোটে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে (মোট আসনঃ ৩০০, ভোট হয়েছে ২৯৯ আসনে, আসন ঘোষণাঃ ২৯৬, বি এন পি র জয়ঃ ২০৯ আসন) । বি এন পি র একটি শক্তিশালী জনভিত্তি ছিলই, তার উপর আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মহিলা এবং হিন্দু রা কম বিপজ্জনক মনে করে তাদের ভোট দেয়। বিশ্বব্যাঙ্ক প্রবর্তিত Unconditional Cash Transfer পরিবার পিছু মাসিক ২,৫০০ টাকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পটিও ভোটারদের প্রভাব ফেলে। যেমন জামাতের ‘বেহেস্তের টিকিট’ নামক খয়রাতি বিলি। জামাত জোট বিজয়ী না হলেও ৭৬ টি আসন নিয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে (২০০২ এর নির্বাচনে বি এন পি র জোট হিসাবে জামাত পেয়েছিল ১৮ টি আসন)। ইউনুস নির্বাচনের ঠিক আগে চুপিসাড়ে মার্কিন প্রভুদের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে আসেন এবং এখন রাষ্ট্রপতি হিসাবে ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে যেতে সচেষ্ট। নির্বাচন পর্বে এবং জয়ী হওয়ার পরেও বি এন পি নেতৃত্ব এখন অবধি দায়িত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন এবং সংযম দেখিয়েছেন। বিক্ষিপ্ত কিছু হিংসার ঘটনা ঘটেছে। তারেক রহমান আইনের শাসন, সকলকে সঙ্গে নিয়ে চলা, অর্থনৈতিক উন্নতি ও দেশ গঠনের কথা বলেছেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পথ এবং বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে ভারত, চিন ও পাকিস্তানের মধ্যে ভারসাম্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন। দীর্ঘদিন প্রবল কষ্টের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এখন অপেক্ষা নৈরাজ্যের অবসান হয়ে গণতন্ত্র ফেরে কিনা সেটি প্রত্যক্ষ করার।

গণহত্যায় জর্জরিত দরিদ্র আফ্রিকাঃ আফ্রিকার সংঘর্ষ ও হিংসার মূল কারণগুলি হল (১) বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীর নেতাদের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা, সীমাহীন হিংসা এবং বিরল খনিজ সহ অঢেল প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি সাম্রাজ্যবাদী দেশ এবং চিনের মত আধিপত্যবাদী দেশের মদত। উদাহরণঃ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো (DPR) তে M23 সশস্ত্র আন্দোলন; সুদানে SAF বনাম RSF যুদ্ধ।  (২) আরব মুলুকের তেলের টাকায় এবং প্যান ইসলামি (দুনিয়া হবে ইসলামের অধীন) কর্মসূচি পালনে ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির হিংসাত্মক ধর্মযুদ্ধ। সোমালিয়া; ইথিওপিয়া; মোজাম্বিক; সাউথ সুদান; সাহেল অঞ্চলের মালি, বারকিনা ফাসো, নাইজার; নাইজেরিয়া; উগান্ডা; ডি আর সি  প্রভৃতি দেশে ADF, Boka Haram, Al Quada, Islamic State, Al Shahaab, Ansar Al – Sunna প্রভৃতি সন্ত্রাসবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির তাণ্ডব ও গণহত্যা’ এবং (৩) জাতিগত দ্বন্দ্ব ও গণহত্যাঃ রোয়ান্ডা তে হুটু – টুটসি সংঘর্ষ; সমগ্র উত্তর আফ্রিকা দখলের পর পূর্ব, পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় আরব ইসলামি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি কর্তৃক স্থানীয় জনজাতিগুলিকে আক্রমণ ও কর্তৃত্ব স্থাপনের চেষ্টা।

বাধ্য লাতিন আমেরিকা ও ক্যরিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জঃ ভেনেজুয়েলাকে ‘সবক’ শিখিয়ে অর্থনৈতিক অবরোধে দীর্ণ কিউবাকে হুমকি দিয়ে, প্রয়োজনে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে; এজেন্ট প্রভকেটর দের মাধ্যমে গোলমাল পাকিয়ে অথবা ডিপ স্টেটের ষড়যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকার ফেলে দিয়ে লাতিন আমেরিকার প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর দেশগুলিকে কদলী প্রজাতন্ত্র (Banana Republic) বানিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের অপরিসীম শোষণ করে চলেছে।

অনিশ্চিত ইউরোপ এবং কানাডাঃ একদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলা ও ইউরোপ জুড়ে যুদ্ধের পরিবেশ অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালী বিপজ্জনক আচরণ -উত্তর মেরু অঞ্চলে ডেনমার্কের স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড এবং উত্তর আমেরিকার কানাডা দখল করার হুমকি, ন্যাটো সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে বিদায় ও বিদায়ের এবং অর্থ সাহায্য বন্ধের বার্তা ও বরাদ্দ ছাঁটকাট, পুতিন ও শি এর সঙ্গে নানারকম গোপন ব্যবসায়িক বোঝাপড়া, বিপুল বাণিজ্য শুল্ক চাপানো, অন্য দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়গুলিতে শিষ্টাচারহীন হস্তক্ষেপ প্রভৃতি ঘটনা ইউরোপীয় দেশগুলি এবং  কানাডাকে বেশ চিন্তা ও চাপে রেখেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ ও বাল্টিক সাগরে রুশ তৎপরতা বৃদ্ধির পর স্ক্যান্দিনেভিয়ান শান্তিপ্রিয় দেশগুলিও নিরপেক্ষ অবস্থান ছেড়ে ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষণা, নোবেল পুরস্কার না পাওয়ার জন্য নরওয়ে কে তিরস্কার, পুতিনের সঙ্গে বারবার বৈঠক তাদের সারা বিশ্বের দেশগুলির মত অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে। রুশ জুজু ছিলই, এর সঙ্গে যোগ হল ট্রাম্পের মার্কিন জুজু। সারা ইউরোপ জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবার যুদ্ধ প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে।

প্রবল আর্থিক মন্দা, মারণঘাতী কোভিড অতিমারী, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর বিশ্বযুদ্ধের কালো মেঘ সারা বিশ্বকে সন্ত্রস্ত রেখেছে। সামরিক দিক থেকে প্রায় সমকক্ষ বা প্রবল শক্তিধর রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে বোঝাপড়া করে তাদের কিছু অভীপ্সিত জায়গা ছেড়ে ট্রাম্পের নেতৃত্বে অতি আগ্রাসী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সারা বিশ্বকে সামরিক শক্তি এবং ডলারের জোর খাটিয়ে দখল, নিয়ন্ত্রণ এবং কর্তৃত্ব করতে চাইছে। 

উপসংহারের পরিবর্তেঃ আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে মহান মানবতাবাদী দার্শনিক গৌতম বুদ্ধ এনেছিলেন অনিত্যবাদ তত্ত্ব অর্থাৎ কোনকিছুই চিরস্থায়ী নয়, সময়ের সঙ্গে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। উনবিংশ শতাব্দীতে আরেক জ্ঞানতাপস কার্ল মার্ক্স হেগেলের চরিত্রের দিক দিয়ে ভাববাদ ও ফয়েরবাখের বিশুদ্ধ বস্তুবাদকে পরিবর্তিত করে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, যেটি বাস্তব জগতের দ্বান্দ্বিক গতির সচেতন প্রতিবিম্বন, তুলে ধরেন। এই প্রসঙ্গে আরও অনেকের গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। এই দর্শন গুলি আমাদের শিক্ষা দেয় পরিস্থিতি সবসময়েই পরিবর্তনশীল। সেই নিরিখে আমাদের সামগ্রিক বিষয়গুলি উপলব্ধি করতে হবে এবং চারপাশের নেতিবাচক দিকগুলি বর্জন করে ইতিবাচক দিকগুলি গ্রহণ করে, ইতিবাচক পরিবর্তনের সংগ্রামের মধ্যে নিয়োজিত রাখতে হবে।

বাংলা ভাষা আন্দোলন এবং যাবতীয় জনমুখী গণ আন্দোলনের অমর শহীদদের আশীর্বাদ আমাদের পাথেয় হোক !

‘ডক্টরস’ ডায়লগ’, ‘স্বাস্থ্যের বৃত্তে’, ‘প্রণতি প্রকাশন’ এবং উপস্থিত সকলকে অনেক ধন্যবাদ।

একুশে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

PrevPrevious“মোদের গর্ব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা”
Nextসে ভাষার বিরোধীNext
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

দিল্লীর যন্তর মন্তরে অল ইন্ডিয়া স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সভাপতি সুভাষ লাম্বার বক্তব্য

March 14, 2026 No Comments

জেনে নেবেন

March 14, 2026 No Comments

কখনো আমার প্রপিতামহকে দেখলে প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাস জেনে নেবেন আর্যরা বহিরাগত ছিলেন কিনা মনুদেব তখনো বৌ পেটাতেন কিনা জেনে নেবেন কখনো আমার পিতামহকে দেখলে পরাধীন

“রাস্তায় মানুষের ভিড় কমলে শ্বাপদের চলাফেরা বাড়ে!”

March 14, 2026 No Comments

১০ মার্চ, ২০২৬ তুফায়েল রেজা চৌধুরী, মালদার কুখ্যাত তৃণ নেতার ততোধিক কুখ্যাত ছেলে। আন্ডার গ্রাজুয়েট মালদা মেডিকেল কলেজ থেকে, সেখানকার থ্রেট কালচারের কিং পিন। কলেজের

দিল্লীর যন্তর মন্তরে হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য অভয়া মঞ্চের অন্যতম কনভেনর মণীষা আদকের

March 13, 2026 No Comments

SIR Vanish!!

March 13, 2026 No Comments

“ধরনা মঞ্চ” আজ সন্ধের পর উঠে গেল, বঙ্গজীবনে এর তুল্য দুঃসংবাদ, সাম্প্রতিককালে, খুব একটা আসেনি। রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের ভাষণ নিয়ে বেশী কিছু বলার থাকে না, তাই

সাম্প্রতিক পোস্ট

দিল্লীর যন্তর মন্তরে অল ইন্ডিয়া স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সভাপতি সুভাষ লাম্বার বক্তব্য

Abhaya Mancha March 14, 2026

জেনে নেবেন

Aritra De March 14, 2026

“রাস্তায় মানুষের ভিড় কমলে শ্বাপদের চলাফেরা বাড়ে!”

West Bengal Junior Doctors Front March 14, 2026

দিল্লীর যন্তর মন্তরে হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য অভয়া মঞ্চের অন্যতম কনভেনর মণীষা আদকের

Abhaya Mancha March 13, 2026

SIR Vanish!!

Dr. Bishan Basu March 13, 2026

An Initiative of Swasthyer Britto society

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

Contact Us

Editorial Committee:
Dr. Punyabrata Gun
Dr. Jayanta Das
Dr. Chinmay Nath
Dr. Indranil Saha
Dr. Aindril Bhowmik
Executive Editor: Piyali Dey Biswas

Address: 

Shramajibi Swasthya Udyog
HA 44, Salt Lake, Sector-3, Kolkata-700097

Leave an audio message

নীচে Justori র মাধ্যমে আমাদের সদস্য হন  – নিজে বলুন আপনার প্রশ্ন, মতামত – সরাসরি উত্তর পান ডাক্তারের কাছ থেকে

Total Visitor

613135
Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on linkedin

Copyright © 2019 by Doctors’ Dialogue

wpDiscuz

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

[wppb-register]