WBJDF প্রেস বিবৃতি, ২৪/০২/২০২৫
৯ই আগস্ট থেকে অভয়ার সুবিচারের দাবিতে কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, তথা সমগ্র বিশ্ব জুড়ে যে আলোড়ন তৈরী হয়েছিল তা অভয়ার সুবিচারের দাবিতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও ভয়ের রাজনীতির বিরুদ্ধে তা আজও চলছে। কিন্তু এর মধ্যেও অভয়ার ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে যেভাবে সব হারানো মা বাবাকে হেনস্থা করা হচ্ছে তাতে আমরা অত্যন্ত ব্যথিত। আমরা অবিলম্বে রাজ্য প্রশাসনের সদর্থক পদক্ষেপে এই টালবাহানা থেকে অভয়ার বাবা মাকে অব্যহতি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
আজ ধনধান্য অডিটোরিয়াম এ ‘চিকিৎসার অপর নাম সেবা’ সভায় নানান বিষয়ে আলোচনা হলো। কিন্তু প্রত্যাশিত ভাবেই কথা হল না সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অধিকার এমনকি সেই অর্থে “সেবা” নিয়েও।
মেদিনীপুরের ঘটনায় সাসপেন্ডেড জুনিয়ার ডাক্তারদের বিরুদ্ধে প্রায় একমাস ধরে পুলিশি ও প্রশাসনিক হয়রানির পর আজকে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী তাদের সব শাস্তি মুকুব করলেন। আমরা প্রথমদিন থেকে এই দাবি করে এসেছি, যে এই শাস্তি অনৈতিক এবং অবৈধ। কিন্ত ন্যায্য পদক্ষেপ নিয়ে তাদের শাস্তি মুকুব করতে এত সময় লাগল কেন? নবান্নের প্রেসবিবৃতিতে যাদেরকে তিনি অবৈধ ভাবে হত্যাকারী বলে চিহ্নিত করলেন। তাঁদের অনৈতিক শাস্তি মুকুব করার সময়ে সেই হতভাগ্য মায়েদের করুন পরিণীতির কারণ ঠিক কী সেকথা উনি সবার সামনে আনলেননা কেন?
রোগী হয়রানি কমানো কী করে যেতে পারে; সেন্ট্রাল রেফার সিস্টেম নিয়ে কথা হলো না, দালাল চক্রের মোকাবিলা কীভাবে হবে তার কোন কথা হল না, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির নিম্নমানের ওষুধ/ চিকিৎসার সরঞ্জাম এর জন্য যে সমস্যা তা নিয়ে একটাও কথা হল না, সময়ে সময়ে ডাক্তার নিগ্রহ এবং তার পিছনের মূল কারণ অপ্রতুল স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিকাঠামো নিয়েও কোনও কথা হলোনা।
স্বাস্থ্যক্ষেত্রে শূন্যপদে নিয়োগ নিয়ে কোনো কথা হলো না, শিক্ষক চিকিৎসক, GDMO, SMO দের নিয়োগ, গ্রুপ ডি কর্মচারী – মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সহ অসংখ্য শূন্যপদে নিয়োগ নিয়ে সুস্পষ্ট কোনো কথা হল না!
কথা হল কী নিয়ে? ঘোষণা করা হল, প্রত্যেকটি মেডিকেল কলেজ কে ফেস্টের (সাংস্কৃতিক কাজ) জন্য দু কোটি করে টাকা দেয়া হবে। কিসের জন্য এই টাকার প্রয়োজন? ঠিক কেন সরকারকে দু’কোটি টাকা সাংস্কৃতিক খাতে অনুদান দিতে হচ্ছে যখন তাদের পঠন পাঠন আর কর্মস্থলের সুরক্ষাই অনিশ্চিত! এটা কি কলেজে কলেজে দুর্নীতিবাজদের একত্রিত করে দলদাস তৈরির টোপ? নাকি যেই দুর্নীতি করতে গিয়ে কলেজের প্রিন্সিপাল আর হাউজস্টাফ জেলের ঘানি টানছে সেই দুর্নীতিকে লিগালাইজ করার প্রচেষ্টা। উদ্দেশ্য যাই থাকুক, যেখানে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার প্রশ্নে কোনরকম পরিবর্তনের সদিচ্ছা নেই। যেখানে রুগীদের এখনও স্যালাইন কিনে আনতে হচ্ছে সময়ে সময়ে, প্রয়োজনীয় টেস্ট করাতে, পরিষেবা পেতে রাজ্যের সমস্ত প্রান্ত থেকে ছুটে আসতে হচ্ছে কলকাতায়, এই পরিসরে এই দু’কোটি টাকা কাদের “সেবা”য় লাগবে তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কথা একটি বার ও বলা হল না। যদিও grievance cell এর মিটিংয়ে এই বিষয় বহু কলেজে উঠে এসেছে। তার সাথে সাথে সিনিয়র ও জুনিয়ার চিকিৎসক সহ পড়ুয়া ও মহিলা ডাক্তার প্রতিনিধি নিয়ে যে State task force গঠনের কথা ছিল যার কাজ ছিল প্রতি মাসে মিটিং করে রুগীদের ও ডাক্তারদের সমস্যা তুলে ধরা তা নিয়েও কোনও রকম কথা হলোনা। তাহলে দু’কোটি টাকা দিয়ে কলেজে কলেজে পেটোয়া বাহিনী তৈরীর সিদ্ধান্তই কি সরকারের তরফ থেকে কার্যকর করা হবে? এবং তারাই সাধারণ মানুষের সমস্যাকে ধামাচাপা দেওয়ার কাজ করবে তাই নিয়েও আমাদের মনে সন্দেহ রয়েছে।
ঘোষণা করা হল, ইন্টার্ন, জুনিয়র রেসিডেন্ট, সিনিয়র রেসিডেন্ট দের বেতন বৃদ্ধির কথা। মিটিংয়ের মূল আলোচ্য বিষয় থেকে উঠে এলো, যেন অভয়ার সাথে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনার প্রতিবাদে ডাক্তাররা পথে নামেন নি, নেমেছিলেন বেতন বৃদ্ধির জন্য! এবং তাদের মাইনে বাড়ানোটা এই মৃত্যুকে এবং তার সাথে জড়িয়ে থাকা প্রশাসনিক গাফিলতি ও দুর্নীতিকে আড়াল করে দেবে এমন ইঙ্গিতও আসলো বহু মহল থেকে।
এ বিষয়ে প্রথমেই বাস্তবটা জেনে নেওয়া প্রয়োজন। সরকারি পে স্কেলের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গে ডাক্তারদের (বিশেষত জুনিয়র রেসিডেন্ট দের) বেতন বিভিন্ন রাজ্যগুলির তালিকায় নীচের দিকেই ছিল। আর সিনিয়র রেসিডেন্টদের বেতন গত ৬ বছরে বারবার দাবি তোলা সত্ত্বেও বাড়ানো হয়নি। যদিও এই আন্দোলনে একটি বারের জন্যেও সেই দাবিকে সামনে আনা হয়নি। কারণ আমরা মনে করি জনগণের সঠিক চিকিৎসার জন্য আমাদের দরকার আরও সহকর্মী, আরও ডাক্তার, নার্স, গ্রুপ ডি কর্মচারী, টেকনিকাল স্টাফ। যখন রাজ্য জুড়ে কোনরকম নিয়োগ হয়নি, অন্যান্য বিভাগের সরকারি কর্মচারীদের প্রাপ্য মাইনে বৃদ্ধি হয়নি, ডাক্তারদের মাইনে এত বছর ধরে বাড়ানো হয়নি। ন্যায্য সাম্মানিক বৃদ্ধি বহুদিন আটকে রেখে, হঠাৎ ডাক্তারদের সভা ডেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে এখন এই আংশিক বৃদ্ধির কারণ ঠিক কী?
সরকার বাহাদুর যদি মনে করে থাকেন এই পাওনা টাকার কুমিরছানা দেখিয়ে ন্যায্য দাবির প্রশ্নকে তারা চুপ করাতে পারবেন, ভুলকে ভুল ও ঠিককে ঠিক বলার অধিকারকে কিনতে পারবেন। তাহলে তাদের জ্ঞাতার্থে আমরা জানিয়ে দিতে চাই প্রশ্ন আমরা করবো আর ভুল আর ঠিকের ফারাক আমরা সকলের সামনে তুলে আনবো।










