স্বাধীনতার আশি বছরে সরকারি স্কুলগুলোর ক্রমবর্ধমান সংকট নিয়ে আলোচনা অব্যাহত। সাম্প্রতিক সময়ে এই আলোচনা আরো গতি পেয়েছে সংসদে সরকার কর্তৃক প্রকাশিত দুটি তথ্যে।প্রথমটি হল ভারতে গত দশ বছরে প্রতিদিন গড়ে ২৫ টি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। দ্বিতীয়টি হল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবার আগেই ৭৩% শিক্ষার্থী শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে চলে যায়। এই তথ্যগুলির প্রতি বিন্দুমাত্র সন্দেহ প্রকাশ না করেও বলা যায় এতদসত্বেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ট ছাত্র ছাত্রী সরকারি স্কুলেই পড়ে। তাই দেশ গঠনের স্বার্থে সরকারি স্কুলকে জানা, তার ভালোমন্দকে উপলব্ধি করার দায় আমাদের সবার। সরকারি স্কুল নিয়ে তৈরি এক ওয়েব সিরিজ ‘আদর্শ বাল বিদ্যালয়’ নিশ্চিতভাবে আমাদেরকে সরকারি স্কুলের আজকের বাস্তবতার মুখোমুখি করে।
দিল্লির প্রান্তে এক কল্পিত এলাকা টিঙ্কি টোলিতে আদর্শ বাল বিদ্যালয় দেশের আর পাঁচটা সরকারি স্কুলের মত এক নেই রাজ্যের দেশ। ঘরের অভাব, শিক্ষকের অভাব, অকেজো ল্যাবরেটরি শুধু চা তৈরি আর দই বসানোর জন্য ব্যবহার হয়। মূলতঃ আর্থিক ও সামাজিক ভাবে প্রান্তিক পরিবার থেকে শিক্ষার্থীরা আজকের দিনে সরকারি স্কুলে পড়তে আসে। আজ যখন সরকারি স্কুলের হাল ফেরাতে রাস্তায় নামছে তরুন প্রজন্ম তখন দেখি আতঙ্কিত রাজস্থান সরকারের তড়িঘড়ি রিপোর্ট যাতে বলা হয়েছে সে রাজ্যে ৬১১ টি স্কুলের নিজস্ব কোন ভবন নেই, ২০৪৭ টি বিদ্যালয়ে শৌচাগার নেই এবং ১০৪৯ টি স্কুলে পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। খবরের কাগজে শিরোনাম হয় বিহারের ৭৫ টি স্কুলের মিড ডে মিলের তরকারিতে কৃমির সন্ধান পাওয়া গেছে। আদর্শ বাল বিদ্যালয়েশিক্ষার্থীরা কেউ আসে তাদের প্রিন্সিপালের সঙ্গে ক্রিকের খেলতে, কারোর লক্ষ্য বুধবার মিড ডে মিলে দেওয়া ক্ষীর, কোন অভিভাবক আবার চান তার মেয়ে যেন নারী সশক্তিকরণ প্রকল্পের পাঁচ হাজার টাকা যথাসময়ে পেয়ে যায়। স্কুলে নিয়মিত অনুপস্থিতি অভিভাবকদের চিন্তিত করে না, এমনকি তাদের অনেকের সন্তানেরা যে স্কুলে না গিয়ে বিড়ি ফ্যাক্টরিতে কাজ করে, তা নিয়েও তাদের কোন সমস্যা নেই। পড়াশোনার বদলে আজ সরকারি স্কুল হয়ে উঠেছে সরকারি পরিষেবা দেওয়ার কেন্দ্র।
আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান যতই শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলুক না কেন,আজও স্কুল শিক্ষার ভালোমন্দ অনেকটা নির্ভর করে চক হাতে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলোর জন্য। আদর্শ বাল বিদ্যালয়ের টিচার্স রুম এক আশ্চর্য জায়গা। কম মাইনে, নিজেদের জীবনের সমস্যায় জর্জরিত শিক্ষকরা এক রামধনু। এখানে আছেন এক হিন্দি শিক্ষক যার বাচন ভঙ্গী ও শব্দ চয়ন যেন হিন্দি ব্যকরণ বইয়ের কপি-পেস্ট। আছেন জীব বিজ্ঞানের শিক্ষিকা যিনি লজ্জার কারণে ক্লাসে বংশগতি ও জনন প্রক্রিয়া মুখে আঁচল ঢেকে পড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেন। এক বিপত্নীক তরুন কাউন্সিলর মনে প্রাণে চেষ্টা করেন শিক্ষার্থীদের বন্ধু হয়ে ওঠার কিন্তু নিজের মেয়ের মনকেই তিনি বুঝতে পারেন না। আর এই সব কিছুর কেন্দ্রে রয়েছেন প্রিন্সিপাল, যিনি ছোটখাটো আপোষ ও ধূর্তামির মধ্যে দিয়ে স্কুলকে বাঁচিয়ে রাখতে চান। এই স্কুলে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে যোগ দেয় তরুণী বিজ্ঞান শিক্ষিকা, যে কর্পোরাল শাস্তিতে বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে ভালোবাসা ও মানবিক মূল্যবোধে। এসবের বাইরে আছে রাজনীতির লোক, স্থানীয় বিধায়ক ও তার এজেন্ট। নির্বাচনী পাটিগণিতের নিয়ম মেনে স্কুলে তারা মৌরসীপাট্টা জমাতে চায়। এক বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে কুশলী হাতে আঁকা বিদ্যালয়ের ছবিগুলো সেই মানুষদের কাছে ভীষণ চেনা যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারি স্কুলের সঙ্গে যুক্ত। আমরা শুধু যদি পশ্চিমবঙ্গের দিকে নজর ফেরাই তাহলে দেখব সব জমানাতেই সরকারি স্কুল- কলেজের ম্যানেজিং কমিটির মাথায় বসানো হয়েছে শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন রাজনীতির মাতব্বরদের। কোথাও তাদের পরিচয় জনপ্রতিনিধি, কোথাও নির্ভেজাল শিক্ষানুরাগী। দলতন্ত্র ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসাব নিকেশ সরকারি স্কুলের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলে দিচ্ছে।
আদর্শ বিদ্যালয়ের থোড়-বড়ি-খাড়া চিত্রনাট্যে বদল আসে যখন স্কুল দপ্তর থেকে এক ইনসেন্টিভ প্রকল্প আসে যেখানে মাধ্যমিকে সেরা দশটি স্কুলের প্রধানশিক্ষককে কেমব্রিজে সস্ত্রীক প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানোর কথা বলা হয়। শুরু হয় আদর্শ বাল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অসম লড়াই। সেই লড়াইয়ে পদে পদে বাঁধা আসে, প্রলোভন আসে তথাকথিত ‘কমা’ শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা না দিতে দিয়ে রেজাল্ট ভালো দেখানোর। সবাই জানেন বহু সফল স্কুল তাদের পারফরম্যান্স ভালো দেখানোর জন্য অহরহ এই পদ্ধতি অবলম্বন করে। নিরুৎসাহী অভিভাবক, নিস্পৃহ ও হতাশ শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভালো রেজাল্ট করার চেষ্টাকে দেখানো হয় সিরিও কমেডি স্টাইলে। তার মধ্যে অনেক গুরুগম্ভীর কথা লুকিয়ে থাকে। এ দেশে শিক্ষার অধিকার আইন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেল তুলে দিয়েছে। তাই নবম শ্রেনিতে উঠে শিক্ষার্থী চতুর্থ শ্রেণির গণিত বা তৃতীয় শ্রেণির ইংরেজি পারছে না– এ দৃশ্য সব রাজ্যেই দেখা যায়। শুধু পুঁথিগত পাঠ কেন ছাত্রদের আকর্ষণ করতে পারে না তা আদর্শ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে দৃশ্যমান হয়।
যথা সময়ে মাধ্যমিকের ফল প্রকাশিত হয়। আদর্শ বিদ্যালয় লক্ষ্য মাত্রা পূরণ করতে না পারলেও ফলাফলে আশাতীত উন্নতি হয়। সবচেয়ে বড়ো ম্যাজিকটা হয় মনোজগতে। শিক্ষার্থীরা জীবনের প্রতি আশা খুঁজে পায়,ফেল করা শিক্ষার্থীও কোমর বাঁধে সামনের বছরের জন্য। পরিবর্তন ছুঁয়ে যায় শিক্ষকদেরও। বেতবাগীশ হিন্দি শিক্ষক উপলব্ধি করেন শারীরিক শাস্তির সীমাবদ্ধতা, লাজুক শিক্ষিকা জনন পড়ানোর জন্য গানের আশ্রয় নেন, কাউন্সিলর শিক্ষক শিক্ষা নেন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। আর এই লড়াইয়ের সাহস এতটাই ছোঁয়াচে যে শেষ অঙ্কে প্রিন্সিপাল স্যারের যোগ্য নেতৃত্বে শিক্ষকরা রাজনৈতিক নেতাদের দাদাগিরি রুখে দেয়। এই পরিণতি বিশ্বাসযোগ্য। স্কুলের পরিকাঠামো যদি উন্নত করা যায়,প্রত্যেক বিষয়ের শিক্ষকের ব্যবস্থা যদি থাকে, শিক্ষার্থীদের আর্থ- সামাজিক অবস্থানকে উন্নত করতে যদি সরকার আগ্রহী হয় তবে ছবিটা পাল্টাতে পারে। বছর পাঁচেক আগে দিল্লির সরকারি স্কুলগুলো এই কথাগুলোর সার্থকতা প্রমাণ করেছিল। এই ওয়েব সিরিজের সবচেয়ে বড়ো গুণ হল কোন গুরুগম্ভীর ভাষণে আখ্যানকে ভারাক্রান্ত করেনি, অযথা রোমান্টিসাইজ করার চেষ্টা বা ইচ্ছে পূরণের গল্পও নেই। আছে শ্রেনিকক্ষকে জানার চেষ্টা, সমস্যাকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা। এই চেষ্টাটা আজ আমাদের সব্বার করা দরকার। সরকারি স্কুল রাষ্ট্রের সম্পদ, আমরা সবাই এর অংশীদার তাই ভঙ্গুর স্কুলগুলোর হাল ফেরানোর ডাক স্বাগত।
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আনন্দবাজার পত্রিকায় উত্তর সম্পাদকীয় হিসেবে প্রকাশিত।











