ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের ইমার্জেন্সি বিভাগে সেদিন ইন্টার্ন হিসেবে ডিউটিতে ছিলাম। ডাক শুনে উঠে গিয়ে দেখলাম সাদা জামা আর সাদা টাইট প্যান্ট পড়া একটি মেয়ে ট্রলিতে শুয়ে। রক্তে মাখামাখি। গোটা শরীরটা তালগোল পাকিয়ে গেছে। প্রাণের কোনো লক্ষণ নেই।
সিএনএমসি এর জুনিয়র ডাক্তারদের ফি বছর শীতের সময় একটা করে উপহার জুটত। মরশুমের সার্কাস পার্টি পার্ক সার্কাস ময়দানে তাঁবু ফেললেই তাদের পক্ষ থেকে সার্কাস দেখার ফ্রি পাস। বিনিময়ে কিছুই না, ওই সার্কাসের লোকজন অসুস্থ হয়ে ইমার্জেন্সিতে আসলে একটু মনোযোগ, একটু যত্ন সহকারে তাদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
সেদিনের সেই মেয়েটির সঙ্গে যারা এসেছিলেন তাদের কথায় জানতে পারলাম একজন সার্কাসের রিং মাস্টার। তারই মেয়ে। ১৮ বছর বয়েস। দক্ষিণ ভারতীয়। কেরালার মুসলিম সম্প্রদায়। মেয়েটি ট্রাপিজ এর খেলা দেখতো। ওপর থেকে সোজা এরিনার মাটিতে পতন ও মৃত্যু।
বোকার মত বাবা কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ট্রাপিজ এর খেলার সময়ে তো নিচে একটা জাল পাতা থাকে। সেফটি নেট। তাতে আটকানো গেল না কেন। বাবার উত্তর ছিল, নেট পাতা ছিল কিন্তু যথেষ্ট বড় ছিল না আকারে। তারপরে হিসেবের ভুলচুক। দুয়ে মিলিয়ে এই দুর্ঘটনা। রিং মাস্টার বাবা বারবার আফসোস করছিলেন, ইস নেট টা যদি একটু বড় থাকতো ডাক্তার সাব, আমার মেয়েটাকে মরতে হতো না।
বহুদিন আগের ঘটনা। প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। শীতকাল আসলে মনে পড়ে। সঙ্গে মনে পড়ে আরেকটা খবর।
“কলকাতা, ৯ **** : নির্মীয়মাণ বহুতল থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হল এক কর্মরত শ্রমিকের। জানা গেছে, শেক্সপিয়র থানা এলাকার ওই বহুতলে অনেকেই কাজ করছিলেন। তাঁদের মধ্যে নির্মল মুর্মু, অর্নিবাণ সর্দার ও বরুণ সর্দার ছাদ থেকে পড়ে যান। JCB দিয়ে মাটি সরিয়ে তাঁদের উদ্ধার করা হয়। NRS হাসপাতালে নিয়ে গেলে নির্মল মুর্মু (৩০) মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। তাঁদের এন্টালির একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে, মৃত্যুর জেরে অসন্তোষের সৃষ্টি হয় শ্রমিকদের মধ্যে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত কাজ করবেন না বলে জানিয়ে দেন তাঁরা। যদিও ঘটনার তদন্তে নেমে নির্মাণ সংস্থার ম্যানেজারকে তলব করেছে পুলিশ। মালিকের তরফে মৃত শ্রমিকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে”
এই ধরণের খবর নতুন কিছু নয়। এইরকম ভাবে পড়ে গিয়ে কত ঠিকা শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, আহত পঙ্গু হয়ে গেছেন কতজন। তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনও উন্নতি হয়েছে বলে জানা নেই। মৃত বা আহতদের পরিবার কি ভাবে বেঁচে থাকে তাও জানা নেই। তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা জাল বলতে প্রায় কিছুই নেই।
সেদিন সেই রিং মাস্টার বাবা তার মেয়ের মৃতদেহ না নিয়েই চলে গিয়েছিলেন। পোস্ট মর্টেম ইত্যাদি ঝামেলা সামলানোর জন্য ম্যানেজার এসে বাবা কে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। নেক্সট শো এর টাইম হয়ে গেছে। রিং মাস্টার এর খেলা দেখানো বন্ধ রাখা যাবে না। শো মাস্ট গো অন। চোখের জল চেপে রেখে অগত্যা। এটা মেরা নাম জোকার এর গল্প নয়। সত্যি ঘটনা।
সব ভুলে গেছি। খালি সেই বাবার সেই কথাটা কানে বাজে, “ইস নেটটা যদি একটু বড় হত”
এখন আমরা আবার একটা সাধারণ নির্বাচনের সামনে। অনেক ইস্যু আসবে সামনে। আসছে ও। হিন্দু বাঁচাও, মুসলিম বাঁচাও ইত্যাদি কত কি। আমার খালি একটাই অনুরোধ সব দলের নেতাদের কাছে। ওই ট্রাপিজ এর মেয়েটিকে বাঁচাতে পারিনি সেদিন। নির্মাণ শ্রমিক নির্মল মুর্মুকেও বাঁচাতে পারে নি এন আর এস এ আমার সতীর্থ। আসুন না, আপনারা একটু চেষ্টা করেই দেখুন না ওই সেফটি নেটটা কে যদি একটু বড় করা যায়। একটু খানি বড়। আসুন সবাই মিলে হিন্দু নয়, মুসলিম নয়, মানুষকে আগে বাঁচাই।










অসাধারন 🙏🙏🙏
সার্কাসের মতোন বিস্ময়,! এখন আর নেই, এখন মানুষ বিস্মিত হতেও ভুলে গেছে।লেখাটা বড়ো বেদনার। কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো,শেষে এখন কার রাজনৈতিক স্খলনের সঙ্গে অহেতুক এক অনুরোধ মেলানোর আপ্তবাক্যের মরণ। ভালো লেখা এবং অবশ্যই ভালো লেখা।🙏😔❤️💕
এখন কার অমানুষ রাজনৈতিক খেউর মিডিয়া সর্বস্ব স্বজনেরা এমন অনুরোধ বুঝবে না।