

একালের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে দেখা যাবে যে আধুনিক কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বাড়ির মহিলারা চাষবাসের কাজকে নিছক গ্রাসাচ্ছাদনের উপায় হিসেবে গণ্য না করে তাকে বাণিজ্যের ক্ষেত্র বলে মনে করছেন। ফলে উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আজ আধুনিক পরিকল্পনার ছোঁয়া। ভারতের কৃষি আজও জলবায়ুর খামখেয়ালিপনার ওপর নির্ভরশীল । বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন কৃষিতে ঝুঁকির মাত্রা আরও অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। এইসব বিষয়কে মাথায় রেখেই দেশের শিক্ষিত কৃষিবিদ মহিলাদের একাংশ এগিয়ে এসেছেন কৃষির উন্নয়নে তথা নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিতে। এঁদের হাত ধরেই শ্রম নির্ভর পারিবারিক কৃষি আজ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর বাজার কেন্দ্রিক কৃষির পথে হাঁটতে শুরু করেছে , যদিও এটা এখনও হাঁটি হাঁটি পা পা পর্যায়ে আছে। নতুন পথে পা মেলানো পাঁচজন ভারতীয় মহিলার কথা বলতেই আজ আমরা এখানে হাজির হয়েছি।
স্মরিকা চন্দ্রাকার – ছত্তিশগড়
রীতিমতো ঈর্ষণীয় পেশাগত শিক্ষার পুঁজি নিয়েই স্মরিকা চন্দ্রাকার পারিবারিক কৃষি ব্যবস্থার খোলনলচে পাল্টে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। স্মরিকা চন্দ্রাকার একজন MBA.
মহারাষ্ট্রের পুনেতে এক কর্পোরেট সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। ভালো বেতন, সামাজিক মর্যাদার মায়া ত্যাগ করে তিনি ফিরে এলেন ছত্তিশগড়ে তাঁর পিতৃপুরুষের কর্মভূমিতে। কৃষক পরিবারের মেয়ে। বাপ ঠাকুরদার কর্মকান্ড দেখে বড়ো হয়েছেন,তাই প্রথাগত কৃষির সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। স্মরিকা দেখলেন ধানের মতো অত্যন্ত আর্দ্র ফসলের চাষ আর তেমন লাভজনক নয়। জলবায়ুর পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা, সেচের জন্য জলের জোগানে টান – এই সব সমস্যার জন্য ধান চাষ করলে উদ্বেগের মধ্যে কাটাতে হবে। বাড়ির সকলেই ধানের পরিবর্তে লাভজনক সবজি চাষে বিনিয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করেছিলেন, আপত্তি জানিয়েছিলেন , কিন্তু এসবে দমানো যায়নি স্মরিকাকে। ম্যানেজমেন্টের পাঠ তাঁকে শিখিয়েছে – No risk,no gain – কিছুটা ঝুঁকি না নিলে ধনলাভ হবে না। ছত্তিশগড়ের মাটিতে বসে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি খুব সহজ মোটেই ছিলোনা। ধানকে সাময়িক বিরতি দিয়ে স্মরিকা বেছে নিলেন টম্যাটো, বেগুন,শশা এবং লাউয়ের মতো সব্জি ফসলকে যাদের উচ্চ বিক্রয়মূল্য রয়েছে। স্মরিকা চাকরিসূত্রে অর্জিত পুঁজির একটা বড়ো অংশ বিনিয়োগ করলেন drip irrigation, raised bed cultivation এবং staggered planting এর মতো হালফিলের কৃষি ব্যবস্থাপনায়। স্মরিকার যুক্তি – এইসব ফসল সারাবছরই কৃষকের আর্থিক সঙ্গতি বজায় রাখবে। লোকসানের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে। স্মরিকার কথায় –
কৃষি একটি লাভজনক ব্যবসা এবং কৃষিকে এমন দৃষ্টিকোণ থেকেই আজকে বিচার করতে হবে। অন্যান্য ব্যবসার মতো কৃষিজ পণ্যের যথাযথ বিপণন এবং উন্নত মানবিক সম্পদ হলো সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

এই সাফল্যের হাত ধরেই তাঁর এলাকার খেটে খাওয়া মানুষের জীবনে লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায় বেড়েছে তাদের আয়। চাষ করো, বাজার ধরো– শ্লোগানেই বাজিমাত করেছেন স্মরিকা চন্দ্রাকার। তাঁর এই অদম্য কর্মশক্তিকে কুর্ণিশ জানাই।
রোজা রেড্ডি – কর্ণাটক
বিশ্বনন্দিত IBM কোম্পানির ব্যাঙ্গালুরু শাখার কর্পোরেট কর্মচারী থেকে রোজা রেড্ডি এখন সোজা একজন প্রগতিশীল কৃষক। রোজার সিভি একদম এইরকম। ২০১৮ সাল। দিন কয়েকের ছুটিতে নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরেছে রোজা। সবাই বেজায় খুশি। কিন্তু আনন্দের সুরে হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে যখন তাঁর বাবা এবং দাদার কথোপকথন কানে আসে। সেই কথার সূত্র ধরে রোজা বুঝতে পারেন যে তাঁর বাবার অনেক দেনা হয়ে গেছে বাজারে, সেই দেনা শোধ করতে তিনি নিজেদের সব জমি জায়গা বিক্রি করে দিতে চাইছেন। আৎকে ওঠেন রোজা।
রোজা তাঁদের বোঝালেন – জমিজমা বিক্রি না করে তোমরা অনেক অনেক বেশি সাশ্রয়ী জৈব কৃষির ওপর ভরসা রাখতে পারো। রাতারাতি সাফল্যের আশা করলে হবেনা। কেননা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে জৈব কৃষি ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে – মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে, আনুষাঙ্গিক খরচ অনেক কম হবে। ফসলের গুণমান এখনকার তুলনায় অনেক ভালো হবে, বাজারে এই জৈব উপায়ে উৎপন্ন ফসল ভালো দামে বিক্রি করা যাবে– এমনি সব মহামন্ত্র।
কবিতা মিশ্র – কর্ণাটক
উত্তরাধিকারসূত্রে একখণ্ড জমি পেয়েছিলেন কবিতা। অমন ঊষর, বন্ধ্যা জমিতে চেনা নিয়মে চাষাবাদ যে মোটেই সম্ভব নয় তা বেশ বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। তবুও ঐ জমিটা বিক্রি করে দেবার কথা কখনোই মনে ঠাঁই পায়নি। শত হলেও পিতৃপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত জমিকে এভাবে বিকিয়ে দিতে মন সায় দেয় নি কবিতার।
অনীতা নেগি – হিমাচল প্রদেশ
পাহাড়ি এলাকার কৃষি পরিবেশ সমতলের থেকে একদম আলাদা। হিমাচলের মেয়ে অনীতা এই সমস্ত সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে করেই বড়ো হয়েছেন, তবে তারপরেও সমস্যা থেকে মুক্তি মেলেনি। হিমাচলের কৃষি দফতরের আধিকারিকরাও এসব বিষয়ে ওয়াকিবহাল। তাঁদের উদ্যোগে আয়োজিত হলো এক কৃষি সচেতনতা শিবির, উদ্দেশ্য অপরিমিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কীভাবে সকলের শরীর স্বাস্থ্য ও ফসলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে সেই বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা।
সারাদিন মাঠে ময়দানে রীতিমতো জানপ্রাণ কবুল করে খাটাখাটনি করতে হয় তাঁকে। সার, কীটনাশকের সঙ্গে নিত্য যাপনের ফলে মারণ কীটনাশকের প্রভাব অনীতার শরীরে ফুটে উঠতে থাকে। চামড়ার সংক্রমণের পাশাপাশি নানারকম উপসর্গ দেখা দেয় অনীতার শরীরে। বাড়ির লোকজন রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে গররাজি থাকায়, সকলের অমতেই অনীতা সেই শিবিরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। এখানে এসে অনীতার চোখ খুলে গেল। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন রাসায়নিক পদার্থ বিমুক্ত জৈব কৃষির গুরুত্ব। অনীতা প্রমাণ করলেন জৈব কৃষির গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি। তাঁর পরিবারের সদস্যরা জৈব কৃষির মাহাত্ম্য বুঝতে পেরে অনীতার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাজস্থান মরুভূমির দেশ। বৃষ্টির অনিশ্চয়তা এই রাজ্যের কৃষির সম্ভাবনাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত করেছে। রাজস্থানের শেখাওয়াতী অঞ্চলে সন্তোষ খেদারের বসবাস। পারিবারিক জমির ভাগ বাটোয়ারার সূত্রে তাঁর নিজের ভাগে পড়েছে ১.২৫ একর জমি , যার থেকে মাসিক আয় কষ্টেসৃষ্টে মাত্র ২৫০০ টাকা। সন্তোষ দেবী একটা চলতি বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণিত করার জন্য মাঠে নামলেন। রাজস্থানের মাটিতে ফলের বাগিচা করা যাবে না। সন্তোষ এই বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণিত করার জন্য প্রবল উৎসাহে মাঠে নেমে পড়লেন। জমিতে লাগিয়েছেন বেদানা, পেয়ারা,লেবু এবং পেঁপের গাছ। সন্তোষের যত্নে সব গাছই আজ ফলের ভারে ন্যুব্জ।
দেশের সর্বক্ষেত্রেই পরিবর্তনের ঢেউ এসে সাবেকি ব্যবস্থাপনায় বদল আনছে। ভারতের কৃষি ব্যবস্থাও তার ব্যতিক্রম নয়। ভালো লাগছে যে এই পরিবর্তনের পেছনে দেশের মহিলারাও এক কার্যকর অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। ভারতীয় কৃষক সমাজের কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই। এতো বিপুল জনসংখ্যার জন্য খাদ্যের সংস্থান করা মোটেই সহজসাধ্য নয়। মূলতঃ তাঁদের কৃতিত্বের কারণেই দেশ আজ পৃথিবীর অন্যতম প্রধান খাদ্য রপ্তানিকারক রাষ্ট্র। এই মুহূর্তে দেশে জৈব কৃষির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। রাসায়নিক সার আর কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার কৃষি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এক প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই অবস্থায় জৈব কৃষি এক কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠছে। ভাবতে ভীষণ ভালো লাগছে যে আজকের স্মরিকা, রোজা, অনীতা, কবিতা কিংবা সন্তোষরা এই পরিবর্তনের মূল কাণ্ডারি হিসেবে সামনে সারিতে এসে দাঁড়িয়েছেন। আছেন আরও অনেকে। এঁরা সকলেই অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। এঁদের জানাই আন্তরিক অভিবাদন।।
ঋণ স্বীকার: দ্যা বেটার ইন্ডিয়া
জানুয়ারি ১০,২০২৬














