মাত্র ২৬ বছর বয়সে তাঁর সঙ্গীত শিল্পী বোন জঙ্কি বড়ঠাকুরের দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যুর (২০০২) পর সম্প্রতি উত্তর-পূর্ব ভারতের জনতার পরমপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী এবং কাছের ও মনের মানুষ জুবিন গর্গ (জুবিন দা নামেই সর্বত্র সমাদৃত) (১৯৭২ – ২০২৫)-এর অকালমৃত্যু ঘটল সিঙ্গাপুরে ‘উত্তর – পূর্ব ভারত উৎসব’-এ আমন্ত্রিত হয়ে গিয়ে সমুদ্রে স্কুবা ডাইভিং করার সময় ডুবে গিয়ে।
তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা এখনও রয়েছে। আয়োজকদের গাফিলতি ও জুবিনকে ভুল পথে চালিত করার যেমন অভিযোগ এসেছে, আবার জুবিনের বেপরোয়া জীবনযাপনকেও কেউ কেউ দায়ী করেছেন। অনেকে মনে করেন এটি অসমীয়া সঙ্গীত ও শিল্প জগতে তাঁর একচ্ছত্র প্রভাব ও বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে ষড়যন্ত্র করে হত্যা। বিরোধীদের একাংশ মনে করেন এন আর সি, সি এ এ সহ বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে হিমালয়ের মত অটল থাকায় এই অসম ও উত্তর – পূর্ব ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও জনজীবনে প্রভাবশালী জুবিনকে সরিয়ে দেওয়া হল। কেউ কেউ তাঁর শেষ সাক্ষাৎকারে তাঁকে ঘিরে থাকা এক চক্রের তাঁকে যন্ত্রের মত ব্যবহার করার উল্লেখ করে তাদের দিকে আঙুল তুলেছেন।
অসমের একদা কংগ্রেসের বর্তমানে বিজেপির কেন্দ্র নেতৃত্বের নয়নের মণি, বহু দুর্নীতির অভিযোগ থাকা, দাবাং মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ক্রন্দন থেকে জুবিনের মৃত্যু নিয়ে নানাবিধ অজুহাত খাড়া করেও জনতার ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারছেন না। তার সিআইডি তদন্তের ‘সিট’ গঠনকে বিরোধী জাতীয় কংগ্রেস, আসু প্রমুখদের নিয়ে গঠিত ‘অসম জাতীয় পরিষদ (AJP)’, বিশিষ্ট কৃষক নেতা ও সমাজ কর্মী অখিল গগৈ এর নেতৃত্বাধীন ‘রাইজর দল’ সময় নষ্ট করার অভিসন্ধি আখ্যা দিয়ে সিবিআই তদন্ত এবং ফার্স্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচারের দাবি জানিয়েছে।
ভারতবর্ষ গুরুবাদ ও ব্যক্তি পূজার দেশ। এখানে সমাজ জীবনে ধর্মীয় গুরু, সিনেমার নায়ক – নায়িকা, খেলোয়াড় এবং জাতীয় আঞ্চলিক জাত্যাভিমানী রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রে জনতার প্রবল আগ্রহ (Craze), উত্তেজনা (Over – excitement), মাতামাতি (Excessive Enthusiasm), আবেশ (Vibe), এমনকি উন্মাদনার (Hysteria) সাক্ষী আমরা। আশারাম বাপু, গুরমিত রাম রহিম সিং ইনসান, রামদেব থেকে সাম্প্রতিক চৈতন্যানন্দের নানা কীর্তিকলাপে তাদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসে কিঞ্চিৎ ভাটা পড়লেও ভারতে ক্রীড়া বিষয়টি কেবলমাত্র আই পি এল জুয়ায় পর্যবসিত হলেও এবং রাজনৈতিক নেতাদের বিবিধ অনৈতিক কাজ ও লুটপাটে মানুষ অনেকটাই বীতশ্রদ্ধ হলেও সিনেমার রুপোলি জগৎ তাঁদের এখনও হাতছানি দেয়।
বাংলায় সুচিত্রা সেন এবং উত্তম কুমারের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি। হিন্দি সিনেমার জগতে তো বিষয়টি সাংঘাতিক – অমিতাভ বচ্চন, মাধুরী দীক্ষিত, শাহরুখ খান … বহু নাম চলে আসবে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ বলিউড কেও ছাপিয়ে যাবে। এম জি আর, এন টি আর, জয়ারাম জয়ললিতা থেকে শুরু করে আজকের রজনীকান্ত, প্রভাস, আল্লু অর্জুন, মোহনলাল, রামচরণ, জোসেফ বিজয় থালাপথি … অনেকের নামই চলে আসবে।
কিন্তু অসমের মত অবহেলিত প্রত্যন্ত উত্তর পূর্বের একটি রাজ্যে কিংবদন্তী শিল্পী ডঃ ভূপেন হাজারিকার (ভূপেনদা নামে সমাদৃত) পর জুবিন গর্গ আরেক জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন নতুন যুগের সঙ্গে তাল রেখে। যেখানে ভারত রাষ্ট্রের বিরোধী সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির ক্যাডাররা জুবিনদার গান গাইছেন, আবার ভারত রাষ্ট্র রক্ষক ‘আসাম রাইফেলস’-এর নারী-পুরুষ জওয়ানরা তাদের ব্যান্ডের অনুষ্ঠানে অবশ্যই জুবিনদার ‘মায়াবিনী’ গাইছেন।
জুবিন এর পারলৌকিক কর্ম ও অন্ত্যেষ্টিতে গুয়াহাটি তে ৫০ লক্ষ মানুষ উপস্থিত থেকেছেন। এখন অবধি তিনজন জুবিন ফ্যান জুবিন শোকে আত্মাহুতি দিয়েছেন। জুবিনের সিঙ্গাপুর যাত্রার সঙ্গীদের বাড়িঘর ভাঙচুর হয়েছে। তাঁর দলের বাদ্যযন্ত্রী শেখরজ্যোতি গোস্বামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একদা হিমন্ত বিশ্বশর্মার প্রাণসখা এখন টার্গেটেড এসকেপ রুট ‘উত্তর – পূর্ব ভারত উৎসব’ এর আয়োজক শ্যামকানু মহন্ত ও জুবিন-এর ম্যানেজার সিদ্ধার্থ শর্মা আত্মগোপন করে আছেন। জুবিন অনুরাগী অসমের আইনজীবীদের সংগঠন এদের পক্ষে আদালতে কোন আইনজীবী দাঁড়াবেন না ঘোষণা করেছেন। কোকরাঝার, বাকসা, চিরাং উদলগুড়ি ও তামূলপুর জেলাগুলিকে নিয়ে গঠিত ‘বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল (BTC)’ এর সাম্প্রতিক নির্বাচনে হাগ্রাম মহিলারীর নেতৃত্বাধীন ‘বোড়োল্যান্ড পিপলস্ ফ্রন্ট (BPF)’ এর কাছে বিজেপি পরাস্ত হওয়ায় হিমন্ত বিশ্বশর্মা জুবিন এর মৃত্যু কে দায়ী করেছেন।
জুবিন কেন অসম ও উত্তর – পূর্বে এরকম আরাধ্য ব্যক্তিত্ব (Cult Figure) হয়ে উঠলেন?
চারিদিক ঘেরা পশ্চাদপদ, দরিদ্র, শিল্প ও কর্মসংস্থানহীন, বাইরেকার বৃহৎ পুঁজির কাছে এখানকার অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ হারানো অসম রাজ্যের মানুষ প্রথম থেকেই দেখে আসছেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং পরবর্তী ভারতীয় শাসকদের শোষণ অত্যাচার, ঘটিয়ে চলা জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ, হিংসা, রাষ্ট্রীয় দমন পীড়ন, নিয়ত বন্যা ভাঙন ভূমিকম্প ও ধ্বস সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শক্তিশালী ভাষা স্বায়ত্বশাসন স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনগুলির অধপতন, নেতাদের দুর্নীতি ও স্বজন পোষণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ছাত্র যুব কৃষকদের শিক্ষা ও আয়ের জন্য অন্য রাজ্যে বা বিদেশে পরিব্রজন (Migration) ইত্যাদি। এর ফলে তাঁদের মনের মধ্যে যে দুঃখ যন্ত্রণা হতাশা সেগুলি জুবিন দার সুরেলা গান, জনমুখী কার্যক্রম, মুম্বাই এ প্রতিষ্ঠিত হয়েও অসমে ফিরে আসা, নীতিতে দৃঢ় থাকা, নিজস্ব স্টাইল, বর্ণময় জীবনযাপন এবং সবসময় মানুষের পাশে থাকা – তাঁদের যাবতীয় যাতনাকে কিছুটা প্রশমিত করেছে, মনের আরাম দিয়েছে।
জুবিন কিভাবে অসম ও উত্তর- পূর্ব ভারতের এত বড় জনপ্রিয় তারকা হয়ে উঠলেন?
মোহিনী মোহন এবং ইলি বড়ঠাকুরের সন্তান জুবিন-এর নামটা দেওয়া হয় বিখ্যাত অনাবাসী ভারতীয় সুরস্রষ্টা জুবিন মেহতার নামে। গর্গ তাঁদের গোত্র। জুবিনের পিতা পেশায় ম্যাজিস্ট্রেট হলেও কপিল ঠাকুর নামে কবিতা লিখতেন। মা ছিলেন গুণী শিল্পী। বাবার কর্মসূত্রে তাঁরা অসম ও বর্তমান মেঘালয়ের বিভিন্ন জেলায় বসবাস করেন। জুবিন বিভিন্ন স্কুলে পড়েন এবং বি. বড়ুয়া কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হন। তারপর গানের জন্য পড়াশুনা ছেড়ে দেন। বাল্যে ১১ বছর ধরে তিনি মা, পণ্ডিত রবিন বন্দ্যোপাধ্যায়, পণ্ডিত রমণী রাই এবং অন্যান্য গুরুদের কাছ থেকে লোক সঙ্গীত ও তবলার তালিম নেন। তিনি ১২ টি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। তিনি অসমীয়া, বাংলা, হিন্দি ছাড়াও ৪০ টি অন্য ভাষা ও লিপিতে ৪০০০০ গান গেয়েছিলেন।
এছাড়াও তিনি একাধারে ছিলেন কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়ক, যন্ত্রী, সঙ্গীত পরিচালক, অভিনেতা, চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, সমাজকর্মী এবং পরিবেশ সংরক্ষক। তিনি বন্যা ত্রাণে সাহায্য থেকে আরম্ভ করে কোভিডের সময় সংকটময় পরিস্থিতিতে নিজগৃহে কোভিড রোগীদের আশ্রয় দান করেছিলেন। তিনি শাসক দলের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে NRC ও CAA এর বিরোধিতা করেছেন।
তিনি বলেছিলেন তাঁর কোন জাত ধর্ম নেই, তিনি মুক্ত। দেহে ব্রাহ্মণ্যবাদের চিহ্ন উপবীত ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। তাঁর জাত ধর্ম বিরোধী মানবতাবাদী বক্তব্য ব্রাহ্মণ পুরোহিত সমাজ এবং মাজুলি সহ প্রভাবশালী ধর্মীয় সত্রগুলিকে ক্ষুব্ধ করে। কিন্তু তাতে তিনি কোন ভ্রূক্ষেপ করেননি। তিনি কোন রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি এবং কোন রাজনৈতিক নেতার কাছে মাথা নত বা গা ঘষাঘষি করেননি। কারো নির্দেশে নয় নিজের শর্তে আনন্দ করে বেঁচেছেন। ২০০২ তে ফ্যাশন ডিজাইনার গরিমা শইকিয়াকে বিবাহ করেন।
তিনি মানুষকে ভালবাসতেন। মানুষও তাঁকে খুব ভালবাসতো। ১৯৯২ তে যুব উৎসবে ওয়েস্টার্ন সোলো গানে প্রথম হয়ে তাঁর পেশাদার সাঙ্গীতিক জীবনে প্রবেশ। তারপর ৩৩ বছর ধরে সৃষ্টিশীল সৃজনে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে বিহু, ঝুমুর থেকে আধুনিক ফিল্মি গান, র্যাপ সবই উৎকর্ষ ও প্রবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এভাবেই তিনি কালক্রমে অসম এবং উত্তর পূর্ব বাসীর হৃদয় সম্রাট হয়ে উঠেছিলেন।











