২ ডিসেম্বর নারী ও প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের অধিকার নিয়ে আয়োজিত সফল শিক্ষা শিবিরের পর ২০ ডিসেম্বর মহাবোধি সোসাইটি হলে অনুষ্ঠিত হল স্বাস্থ্যের অধিকার নিয়ে অভয়া মঞ্চ আয়োজিত দ্বিতীয় শিক্ষা শিবির। এই শিক্ষা শিবিরে ৩৪ টি সংগঠনের মোট ৭৯ জন সদস্য অংশ গ্রহণ করেছিলেন।
সরকারি স্বাস্থ্য নীতি এবং জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে অসাধারণ আলোচনা করেন ডঃ পুণ্যব্রত গুণ, ডঃ সুজয় বালা, ডঃ রাহুল মুখোপাধ্যায় এবং ডঃ নির্মাল্য দাস । সার্বজনীন স্বাস্থ্যপরিষেবা ও গণস্বাস্থ্যনীতি (Universal Health care) বনাম স্বাস্থ্যবিমা, স্বাস্থ্যের পরিকাঠামোগত উন্নতি বনাম স্বাস্থ্যের বেসরকারিকরণ- এই ছিল শিক্ষা শিবিরের মূল আলোচ্য বিষয় ।
ডঃ পুণ্যব্রত গুণ সার্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারণা দিয়ে শিক্ষা শিবির শুরু করেন। ২০১০ এ বিশেষজ্ঞ দের নিয়ে একটি সরকারি কমিটি গঠন করা হয় যে কমিটির সুপারিশ ছিল গণ স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করা দেশের সার্বিক উন্নতির জন্য জরুরি। ১৯৮০ র দশকে পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসক আন্দোলনও হয়েছিল এই একই দাবিতে। সার্বজনীন স্বাস্থ্যপরিষেবা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই চিকিৎসকরা ‘স্বাস্থ্য ভিক্ষা নয়,অধিকার’ এই শ্লোগান তোলেন । ২০১০ এর বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ সরকার কার্যকর করার চেষ্টা করেনি, এর বদলে সরকারি অর্থে জনসাধারণের জন্য বেসরকারি স্বাস্থ্য বিমার প্রকল্প জনপ্রিয় হতে শুরু হয়। ২০১০ এর আগেই গণস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসাবে বিভিন্ন রাজ্যে স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল, যে বেসরকারি বিমার প্রিমিয়াম দিত সরকার। কর্ণাটকে যশস্বিনী হেলথ ইনসিওরেন্স , অন্ধ্রে রাজীব আরোগ্যশ্রী প্রকল্প, তামিলনাড়ু তে কলাইগ্নার স্বাস্থ্য বিমা, হিমাচল প্রদেশে ‘RSBY Plus’ , এছাড়া ২০০৮ এর রাষ্ট্রীয় বিমা যোজনা ইত্যাদি প্রকল্পের প্রদর্শিত পথে পশ্চিমবঙ্গে চালু হয়েছে স্বাস্থ্য সাথী । নিম্নবিত্ত মানুষ স্বাস্থ্য সাথী কার্ডের সাহায্যে বেসরকারি কর্পোরেট হাসপাতালে পরিষেবা পাচ্ছেন । এই বিমার প্রিমিয়াম দিচ্ছে সরকার। ২০১৮ র পরিবর্তিত নিয়ম অনুযায়ী সব রোগের ক্ষেত্রে বিমার পরিমাণ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫ লাখ। ডঃ গুণ বলেন যে অর্থ সরকার বেসরকারি বিমা সংস্থাকে দিচ্ছে, সেই অর্থ দিয়ে সরকারি পরিকাঠামোর উন্নতি করা সম্ভব ছিল। বেসরকারি বিমা সংস্থা স্বাস্থ্য কে পণ্য হিসাবে দেখে, আবশ্যিক পরিষেবা হিসেবে নয়। স্বাস্থ্য পরিষেবা যেখানে পন্য, সেখানে ক্রেতা আর বিক্রেতার মধ্যে ক্ষমতার বৈষম্য তৈরি হয় কারণ পণ্য সম্পর্কে বিক্রেতার জ্ঞান কেই চূড়ান্ত হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয় ক্রেতা ।
ডঃ সুজয় বালা সার্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার আলোচনাকেই আরো এগিয়ে নিয়ে যান । তথ্যনিষ্ঠ আলোচনায় পরিসংখ্যানের সাহায্যে দেখান কি ভাবে ২০০৮ থেকে ২০১৮ র মধ্যে স্বাস্থ্যে বেসরকারি পুঁজির বিনিয়োগ বাড়তে থাকে, যা ক্রমেই একচেটিয়া বাজার দখলের লড়াই তৈরি করে। ক্রমেই ভেঙ্গে পড়ে সরকারি পরিকাঠামো। বেসরকারি কর্পোরেট হাসপাতাল মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা , এমন কি অপারেশনও করাচ্ছে নিয়মিত ভাবে, যার জন্য সরকারের অর্থ ছাড়াও সাধারণ মানুষের পকেট থেকেও বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ডঃ বালা দেখিয়েছেন বিমা থাকা আর না থাকার মধ্যে পার্থক্য ৩৩ শতাংশ। ওষুধ, পরীক্ষা নিরীক্ষা, বহির্বিভাগে চিকিৎসা কখনই বিমার আওতায় নয়। তাই প্রকৃত পক্ষে হাসপাতালে যাতায়াতের খরচ ধরে মোট খরচের ৬৭ শতাংশ রোগিকেই বহন করতে হয়। সরকারি পরিকাঠামোর অবনতির ফলে নিম্নবিত্ত মানুষ ও বেসরকারি জায়গায় যেতে বাধ্য হচ্ছে এবং এক বড় অংশের মানুষ স্বাস্থ্যের খরচ মেটাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।
ডঃ রাহুল মুখোপাধ্যায় ইউনাইটেড কিংডমের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন, যেখানে ধনতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেও স্বাস্থ্য পরিষেবা কে পণ্যের আওতার বাইরে রাখা হয়। মারগারেট থ্যাচারের সময় সার্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারণাকে সংকুচিত করে দেয়া হয় যার পরিণাম কখনোই ভাল হয়নি । তথ্যের সাহায্যে ডঃ মুখোপাধ্যায় দেখান ফ্রান্স , জার্মানি , সুইডেন, ডেনমার্ক নরওয়ে প্রভৃতি যে দেশ গুলিতে সার্বজনীন সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা আছে সেই দেশ গুলির মানুষের গড় আয়ু মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের গড় আয়ুর চেয়ে বেশি। তাই বলা যেতে পারে কোন দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সব সময় স্বাস্থ্যের উন্নতি কে সুনিশ্চিত করেনা, সার্বজনীন সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবাই সেটা করতে পারে ।
শিক্ষা শিবিরের শেষ বক্তা ডঃ নির্মাল্য দাসের উপস্থাপনা খুবই আকর্ষণীয় আর তথ্যসমৃদ্ধ ছিল। সার্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারণার পক্ষে জোরদার সওয়ালের পাশাপাশি তিনি স্বাস্থ্যের সামজিক নির্ধারক গুলি সম্পর্কেও আলোচনা করেন। যত ক্ষণ খাদ্য বস্ত্র শিক্ষার অধিকার সুরক্ষিত না হচ্ছে ততদিন স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি সম্ভব নয়। ডঃ দাস সার্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার পক্ষে ক্লিমেণ্ট অ্যাটলির বিখ্যাত উক্তি টি উল্লেখ করেন যেখানে অ্যাটলি বলেন সমগ্র দেশের অর্থনীতি তে যত মানুষ কাজ করছেন, যত সামাজিক পরিষেবা এবং সম্পদ উৎপাদন হচ্ছে, তা সামগ্রিক ভাবে হিসাব করলে সার্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা কখনোই কোন দেশের পক্ষে দুঃসাধ্য হতে পারেনা।
এই শিক্ষা শিবিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দীর্ঘ প্রশ্নোত্তর পর্ব যা স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারণা বুঝতে সাহায্য করেছে। এই পর্বে ডঃ হীরালাল কোনার মনে করিয়ে দেন স্বাস্থ্য কিন্তু এখনো আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের তালিকাভুক্ত নয়। এর জন্য কোন বড় আন্দোলন এখনো অবধি হয়নি, কিন্তু এই আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই আমরা সার্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার লক্ষ্যে এগোতে পারব ।











