কাট ওয়ান
অমাবস্যার রাত।
লালবাজার থেকে অনতিদূরের রাইটার্স বিল্ডিং। একদা সরকারি ক্ষমতার কেন্দ্রস্থল এখন কোলাহল মুক্ত। টানা,লম্বা করিডোর গুলিতে মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি বহুদিন। সংস্কার চলছে ইতিহাসের।
বারান্দার ইঁটের রেলিঙের উপর পুরু হয়েছে ধুলোর আস্তরণ।
দোতলার করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক পক্ককেশ বৃদ্ধ। পড়নে সাদা ধবধবে ধুতি পাঞ্জাবি। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন রজনী’র দিকে।
আচমকাই একটা সাদা বিদ্যুতের মতো আলোর ঝলকানি দেখা গেল রাতের আকাশে।
আচমকা উল্কাপাত শুরু হলো নাকি?
ঠিক সেই সময় একতলার লবিতে হই হই কর্মব্যস্ততা। হাজার ওয়াটের আলো, সাংবাদিকদের বুম, ঘন ঘন ফ্ল্যাশ বালবের আওয়াজে বিরক্ত আরেক বয়স্ক মানুষ, থামলেন একবার। কাকতালীয় ভাবে এনার পড়নেও সেই সাদা ধুতি পাঞ্জাবি,পায়ে কালো জুতো । প্রেসের প্রশ্নে র জবাবে বললেন, ” শুধু শিক্ষিত আর সংস্কৃতি সচেতন হলেই প্রশাসক হওয়া যায় না। দিনের পর দিন রাজপথ আটকে, টাটা’র তৈরি কারখানা অন্য প্রদেশে পাচার করার ধান্দা কে বুঝতে পেরেও, বলপ্রয়োগে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হীনতার কারণেই আজ এই অবস্থা।”
এই বলে রোজকার মতো গটগট করে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের দাঁড় করিয়ে রেখে গাড়িতে উঠে পড়লেন।
একবারও পিছন ফিরে তাকালেন না।
কাট টু
রাজ্যের কোন এক মেডিক্যাল কলেজ। ফার্স্ট এম বি বি এস পরীক্ষা চলছে। আজ অ্যানাটমি প্রাকটিক্যাল। লম্বা ডিসেকশন হল। শ্বেত পাথরের টেবিলের উপর পরপর শুয়ে রয়েছে ডেড বডিগুলো।
ফরমালিনের ঝাঁঝালো গন্ধে এখন অবশ্য অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সদ্য মেডিকেল কলেজে পড়তে আসা ছেলে মেয়েরা। ডিসেকশন শেষ,
এখন ওরাল পরীক্ষা শুরু।
এক পুরুষ পরীক্ষক বসে রয়েছেন ঘরের ভিতরে। টেবিলের উপর বড় বড় পাত্রে সাজিয়ে রাখা রয়েছে মানুষের সার সার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অর্থাৎ ‘ভিসেরা’। তার উপরেই মৌখিক পরীক্ষা হবে এখন।
হলের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা ছাত্র-ছাত্রীরা।
সবার গায়ে সাদা অ্যাপ্রন। হাতে অ্যানাটমি বই।
শেষ মুহূর্তের ঝালিয়ে নেওয়া আর কি!
একটি ছাত্র বেরিয়ে এলো ভাইভা দিয়ে। মুখভঙ্গি দেখে অবশ্য বোঝা গেল না,পরীক্ষা কেমন হয়েছে।
তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই ডাক পরলো ‘ রোল নম্বর টোয়েন্টি ফোর, তিলোত্তমা মুখার্জি’।
দুরুদুরু বুকে পরীক্ষার হলে ঢুকে পড়ল ছাত্রীটি।
‘আরে,ভয় পাচ্ছিস কেন, চেয়ারে বস। আমি কি বাঘ না ভাল্লুক?’ পরিস্থিতিকে সহজ করার চেষ্টা করলেন পরীক্ষক।
বসে পড়লো মেয়েটি।
‘তা কি ভিসেরা পড়েছিস? নিজেই তুলবি, না আমি বলবো? নে, মেল জেনিটাল সিস্টেমটাই তোল তো।’
বিভিন্ন পাত্রের মধ্যে থেকে খুঁজে, মেয়েটি তুলে ধরলো কম্পোজিট ভিসেরা টি।
‘হোল্ড ইট ইন অ্যানাটমিক্যাল পজিশন।’ পরীক্ষকের স্বর এবার জোড়ালো।
তিলোত্তমা চেষ্টা করছে পুরুষাঙ্গটিকে ঠিক মতো ধরবার। ফর্মালিনে পিছলে যাচ্ছে বারবার।
‘পেনিসের অ্যানাটমিক্যাল পজিশন কেউ শেখায়নি তোকে? ইট শ্যুড অলওয়েজ বি ইন ইরেক্টেড পজিশন।’
তিলোত্তমা লজ্জা পেল। সে জানতো এই উত্তরটা, কিন্তু পরীক্ষার টেনশনে অরগানটা ঠিকমতো ধরতে পারছিলো না।
কিন্তু এর পরের প্রশ্নে সে একেবারে ঘাবড়ে গেল। ‘বয়ফ্রেন্ড না থাকলে, পেনিসের ইরেকশন বুঝবি কি করে! বাড়িতে কে কে আছে তোর? তুই তো ব্রাহ্মণ, তাই না?’
একটু হক চকিয়ে গেল মেয়েটি। এ সমস্ত প্রশ্ন সে আশা করেনি। একটু সন্ত্রস্ত হয়ে গেল সেবুঝতে পারল, বুক ধরফর করছে।
‘আরে তোর তো ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। আমার কাছে ভেসলিন আছে। একটু ঠোঁটে লাগিয়ে নে। ঠিক হয়ে যাবে। মেয়েদের শরীরে দু রকম ঠোঁট আছে। জানিস তো? একটা হরাইজেন্টাল, আরেকটা ভার্টিকাল।’ বলে পরীক্ষক নিজের রসিকতায় নিজেই হাসতে লাগলেন। ‘যা যা, তোর পরীক্ষা হয়ে গেছে। পরের রোল নম্বরকে পাঠিয়ে দে।’
কোনমতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে মেয়েটি। ডাক্তারি জীবনে প্রথম পরীক্ষা দিতে এসে এইরকম অস্বস্তিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে তার ধারণা ছিল না। কি একটা অদ্ভুত অপমানবোধ যেন তার বুকে চেপে বসলো।
অনেক কষ্ট করে তার গরিব মা-বাবা তাকে ডাক্তারি পড়তে পাঠিয়েছেন। অনেক পরিশ্রম করে সে ডাক্তারি এন্ট্রান্স পাস করে তবে সুযোগ পেয়েছে এই মেডিক্যাল কলেজে।
তার দু চোখভরা স্বপ্ন। হাসপাতালে স্বনামধন্য চিকিৎসকদের সে অবাক হয়ে রোজ দেখে আর ভাবে একদিন সেও হয়তো পারবে তাদের মত হতে। একদিন নিশ্চয়ই তার উপার্জনের ভরসায় ঘুচবে তার পরিবারের দারিদ্র্য। বাবাকে আর কষ্ট করতে দেবে না সে। তার দু চোখে জল ভরে এলো।
কাট থ্রি
আবার অমাবস্যার রাত। আবার রাইটার্সের অলিন্দ। এক চশমা পরা, ভাবালু যুবক দাঁড়িয়ে । পরনে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি। বুক পকেটে কলম।হাতে বন্ধ করা ডায়েরি। নির্নিমেষ তাকিয়ে রয়েছেন কলকাতার রাজপথের দিকে।
পাশে দাঁড়িয়ে সমবয়সী একটি কোট পড়া যুবক।
পাঞ্জাবি পরিহিত যুবকটি বিড়বিড় করছিল নিজের মনে। ‘এই স্বাধীনতার জন্যই কি, ফাঁসির দড়িতে চুম্বন করেছিলাম? কিছুই তো বদলায় নি! শুধু মানুষের চামড়ার রঙ পাল্টেছে। লজ্জা ছাড়া আমাদের কিছুই পাওয়ার নেই।’
‘যাই বলো দীনেশদা, আমি জিভের তলায় পটাশিয়াম সাইনাইডের অ্যাম্পুলটা ভাঙার আগে, অন্তত কর্নেল সিম্পসনের মৃত্যুটা নিশ্চিত করতে পেরেছিলাম। তাই আমার কোন হতাশা নেই। আমার কাজটা আমি করে গিয়েছি। আর সুযোগ পেলে আবার করবো।’
আচমকাই সিঁড়ির উপর থেকে বন্দুকের আওয়াজ।
সিঁড়ির হাতল ধরে স্যুট পড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরতাজা তরুণ, মুখে ঝকঝকে হাসি। হাতে কোল্ট রিভলবার।
‘চমকে দেওয়ার জন্য গুস্তাকি মাফ। তুমি চিন্তা করোনা বাদল। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের তুমি চেনো না। ওদের উপর নিশ্চিন্তে ভরসা রাখতে পারো। ভুলে যেও না মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজে যখন আমি ছাত্র ছিলাম, ঠিক এইরকম একটি সিঁড়ির ওপর থেকে দাঁড়িয়ে, ভিড়ের মাঝে অত্যাচারী ইন্সপেক্টর জেনারেল লোম্যানকে গুলি করে হত্যা করেছিলাম। ইংরেজ পুলিশ বিনয় বসুকে ছুঁতে পর্যন্ত পারেনি।’
মুখে জয়ের হাসি ফুটলো অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের।
রাত প্রায় শেষ। সূর্যোদয় হবে একটু পরেই । অদূরে লালবাজারেও মেডিক্যাল ছাত্রদের রাতজাগার পালা শেষ হতে চলেছে।
রাইটার্সের অলিন্দ অভিযানের তিন মূর্তির দীর্ঘ অবয়বও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল দিনের আলোর পরশে।
চলমান কলকাতা শহরে কেউ তা লক্ষ্য করলে না।











