আমাদের দেশে ভ্যাকসিন roll-out আজ প্রায় সাত দিন হতে চলল। খুবই আশাব্যঞ্জক চিত্র ভেসে উঠছে দেশের চারিপাশে। এখনো পর্যন্ত প্রায় বারো লাখ স্বাস্থ্যকর্মীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়ে গিয়েছে। মারাত্মক কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর নেই।
ভ্যাকসিন দেওয়ার গতিতে আমরা হারিয়ে দিয়েছি আমেরিকাসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশ গুলিকে। এমনকি ইজরায়েলও আমাদের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। প্রথম কয়েক দিনের দ্বিধা, সন্দেহ এবং উৎকণ্ঠা কে হারিয়ে এগিয়ে আসছেন স্বাস্থ্যকর্মীরাও। এই দৃশ্য খুবই আশাপ্রদ।
সারা দেশজুড়ে পাল্লা দিয়ে কমছে কোভিড।শুধু এখনো পর্যন্ত কেরালা এবং মহারাষ্ট্র একটুখানি অস্বস্তিতে রয়েছে। তবে ভ্যাকসিন সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে তাদের সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমতে থাকবে।
দেশ জুড়ে এই ভ্যাকসিন roll-out এর অসুবিধা গুলিও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। টেকনিক্যাল সমস্যাগুলি কাটিয়ে ভ্যাকসিনেটররা অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। সিনিয়র ডাক্তাররা এগিয়ে আসছেন ভ্যাকসিন নিতে, যাতে সাধারণ মানুষের ভ্যাকসিন নিয়ে অযথা সন্দেহ কেটে যায়।সরকারের দৈনন্দিন প্রচার সব মানুষকেই ধীরে ধীরে ভ্যাকসিন কেন্দ্রের দিকে নিয়ে আসবে,এমনটাই আশা করা যায়।
এরই মধ্যে দু একটা ভালো খবর আসতে শুরু করেছে। পৃথিবী বিখ্যাত মেডিকেল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’ জানিয়েছে আমাদের দেশীয় টেকনোলজিতে প্রস্তুত ভারত বায়োটেক, ‘আই সি এম আর’ এর তৈরী কোভ্যাকসিন অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাদের ফেজ ওয়ান ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করেছে ।তারা আরও বলেছে যে
সারা পৃথিবীতে এটাই একমাত্র ভ্যাকসিন যেখানে সম্পূর্ণ ভাইরাসটিকে, ইনঅ্যাক্টিভ করে ব্যবহার করা হয়েছে।ভ্যাকসিনটির শরীরে যেমন অ্যান্টিবডি তৈরি করার ক্ষমতা (ইমিউনোজেনেসিটি) চমকপ্রদ, তেমনই তার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া প্রায় নেই বললেই চলে।
ল্যানসেটের মত জার্নালে এই মন্তব্য দেশবাসীর ভরসা নিশ্চিতভাবে অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে।
আরো সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসবেন ভ্যাকসিন নিতে।
ইনজেকশনের সাথে সাথে এবার আসতে চলেছে ন্যাসাল ভ্যাকসিন। আর ইনজেকশন নয় নাকের ড্রপ এর মত দু ফোটাতেই শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যাবে। প্রস্তুত হয়ে গেছে সেই ভ্যাকসিন। নির্মাতা আবার সেই ভারত বায়োটেক। চাওয়া হয়েছে সরকারের কাছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ছাড়পত্র। এর ইমিউনোজেনেসিটিও বেশ ভালো আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দিক দিয়েও এটি নিরাপদ। এমনটাই মনে করছেন তাদের বিজ্ঞানীরা।তাই, এই ভ্যাকসিন ক্লিনিকাল ট্রায়াল পাশ করলে যুগান্তকারী হয়ে যাবে সেই আবিষ্কার। লক্ষ লক্ষ পরিবেশ দূষণকারী সিরিঞ্জ এবং নিডিলের ব্যবহার কমে যাবে আচমকাই। সেই রকম কোন ট্রেনিং ছাড়াই ভ্যাকসিন দেওয়া যাবে যত্রতত্র।অনেকটা পোলিও র মতো।
বাজারে এসে পড়লে কোভিড মহামারীতে এই ভ্যাকসিন সম্পূর্ণভাবে খেলা ঘুরিয়ে দিতে পারে।স্তব্ধ করে দিতে পারে রোগের বিস্তারকে।
আবিষ্কারের পরিভাষায় যাকে বলে ‘গেম চেঞ্জার’।
অধীর আগ্রহে আমাদের নজর থাকবে এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের দিকে।
নিজের কথায় ফিরি।সম্প্রতি ঘুরে এলাম উত্তর বঙ্গ আর ডুয়ার্স।পরে সবিস্তারে লিখবো সে কাহিনী।
কিন্তু সেখানে মানুষের করোনা নিয়ে বিশেষ হেলদোল নজরে এলোনা।পুজোর পরে কেস প্রায় নেই বললেই চলে।এমনই অবস্থা কোভিড সেন্টার গুলি নাকি প্রায় উঠে যাওয়ার অবস্থা।
এখনো শহর বিশেষত কলকাতা থেকে জনসমাগম শুরু হয়নি সেখানে।শুরু হলে চাপ বাড়তে পারে, সাবধান করে দিয়ে এলাম অনেক কে।কেউ খুব একটা পাত্তা দিল বলে মনে হল না।
মাস্ক পড়া বা সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং এর বালাই নেই।
কিছু একটা এক্স ফ্যাক্টর এখানে আটকে দিয়েছে মহামারিকে।এখন ভ্যাক্সিনেশন টা ঠিকঠাক হলেই হলো। জয় হার্ড ইমিউনিটি।
এই মহামারীর ডামাডোলের মধ্যে আজ আমাদের সবার প্রিয় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্মদিন।স্বাধীনতার ইতিহাসের কথা আমরা সবাই অল্পবিস্তর পড়েছি। তাই নেতাজী কে নিয়ে বেশি আলোচনা করার ধৃষ্টতা আমার নেই।
আমার শুধু মনে হয় ১৯৪১ সালের ১৬ ই জানুয়ারীর মাঝরাতের কথা। ওয়ান্ডারার গাড়ি তে চেপে বেরিয়ে পড়ছেন সুভাষ চন্দ্র তার এলগিন রোডের বাড়ি থেকে। সঙ্গী ড্রাইভার শিশির বসু। দেশী-বিদেশী ওত পেতে থাকা গুপ্তচরের দলকে ফাঁকি দিয়ে তাঁর ধানবাদ পৌঁছানো। তার পরের রাতে নিকটবর্তী গোমো স্টেশন থেকে এক পাঠান যুবকের পেশোয়ার গামী কালকা মেলে ওঠা।
আমরা সবাই জানি এখন।
কিন্তু কি ভাবছিলেন তখন সুভাষ? ১৯৩৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয়বারের জন্য নির্বাচিত সভাপতি!
গান্ধী এবং তার তাঁবেদার কংগ্রেস নেতাদের যোগসাজশে যিনি পদত্যাগপত্র দিতে বাধ্য হন! রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাসিত একটা মানুষ শুধুমাত্র নিজের উপর ভরসা কে সম্বল করে বেরিয়ে পড়েছেন দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করতে!
এমন একটা সময়, যখন সারা পৃথিবী জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে। ইউরোপে যুযুধান অক্ষশক্তি এবং মিত্রশক্তির লাগানো আগুন ছড়িয়ে পড়ছে একটার পর একটা দেশে।
সুভাষ সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন এটাই সেই সুযোগ। ইংরেজরা আমাদের দেশ দখল করেছিল বিভিন্ন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। তাই তাদের তাড়াতে হলে চাই সশস্ত্র আন্দোলন। সাধারণ মানুষের বিদ্রোহের সাথে সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণ যেখানে অবশ্য প্রয়োজন।
আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই অত্যাচারী ব্রিটিশ যে স্বাধীনতা দিয়ে যাবে না, তা নিয়ে নিঃসন্দেহ ছিলেন সুভাষ। বুঝতে পেরেছিলেন যুদ্ধ করেই অর্জিত করতে হবে স্বাধীনতাকে।
তাই যেখানেই ব্রিটিশবিরোধী শক্তি পেয়েছেন চেষ্টা করেছেন তাকে দেশের কাজে লাগাতে। আদ্যন্ত সোসালিষ্ট সুভাষ মস্কোর সাহায্য না পেয়ে বাধ্য হয়েছিলেন ফ্যাসিস্ট বার্লিন এবং জাপানের সাথে হাত মেলাতে।
আজাদ হিন্দ ফৌজ তীব্র লড়াইয়ের পর দখলও করে নিয়েছিল আন্দামান আর নিকোবর। উত্তর পূর্ব ভারতের সীমানা পেরিয়ে ইম্ফলের কাছে উড়িয়ে দিয়েছিল স্বাধীনতার পতাকা,অল্প কয়েকদিনের জন্য হলেও।
আর ঠিক সেই জন্যেই বিশ্বযুদ্ধ শেষে আজাদ হিন্দ ফৌজের যুদ্ধবন্দীদের বিচার চলাকালীন দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
“কিল্লা সে আয়ি আওয়াজ,
শেহগল,ধীঁলো,শাহনওয়াজ!!”
অনুপস্থিত নেতাজীর পদচারণার শব্দ যেন লালকেল্লার অলিন্দে অলিন্দে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। অত্যাচারী ব্রিটিশরা পিছু হটতে শুরু করে।সেই প্রথম বার।
ঠিক এটাই তো চেয়েছিলেন সুভাষ।
ফলস্বরূপ একের পর এক মিউটিনি সংঘটিত হয়। তাতে যোগদান করে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির ভারতীয় সৈন্যরা। প্রথমে নেভি তারপর এয়ার ফোর্স এবং সবশেষে আর্মি। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পরে বিদ্রোহের আগুন।
বিশ্বযুদ্ধে ক্লান্ত ইংরেজ প্রশাসন বুঝতে পারে,মিলিটারির সাহায্য ছাড়া আর তারা দেশ শাসন করতে পারবে না। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লেমেন্ট এটলি বাধ্য হন ভারতবর্ষকে স্বাধীন ঘোষণা করতে।
আর ঠিক সেই কারণেই ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাসে অমর হয়ে গেলেন সুভাষ। যার ১৯৪৫ সালের ১৮ই অগাস্টের সেই তাইহোকু এয়ারপোর্টের বিমান দুর্ঘটনার কথা এখনো অবধি কেউ বিশ্বাস করে উঠতে পারে নি।
যার সেই রাতে বাড়ি ছাড়ার পর আর কোনদিন ফিরে আসা হলো না। কিন্তু রয়ে গেলেন আপামর জনসাধারণের হৃদয়ে। স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক হয়ে।
জয়তু নেতাজী।
জয় হিন্দ।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ।









