“আমি তো নার্স। একেকজনের জীবনে নিভে আসা দীপ জ্বালানো আমার কাজ।” ১৯৫৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দীপ জ্বেলে যাই’ সিনেমায় সিস্টার রাধা মিত্রের একটি অসামান্য ডায়লগ। সিনেমাটা সুপার ডুপার হিট হয়েছিল। সুচিত্রা সেন এবং বসন্ত চৌধুরীর অভিনয় মন ছুঁয়ে গিয়েছিল মানুষের।
এ তো সেলুলয়েডের কাহিনী। ১৮৫৪ সালে ক্রিমিয়ার ভয়ানক যুদ্ধে আহত হয়েছিল অসংখ্য সৈনিক। একজন সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলা এগিয়ে গিয়েছিলেন তাদের শুশ্রূষায়। এমনকি সন্ধ্যা নেমে এলেও মোমবাতি হাতে নিয়ে অসুস্থদের সেবায় শিবিরে শিবিরে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ -আধুনিক নার্সিংয়ের জন্মদাত্রী ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। নার্সিং যে একটা পেশার থেকেও বড়ো কিছু সেটা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল তাঁর জীবনে করে যাওয়া অসংখ্য কাজ দিয়ে প্রমাণ করেছেন।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলেন নার্সরা। এখন অনেক পুরুষও নার্সিং পেশায় আসছেন। কিন্তু নয়ের দশকের গোড়ার দিকে আমি অন্তত মেল নার্স দেখিনি। তখন সদ্য ডাক্তারি পাস করেছি। সবজান্তা টাইপের হাবভাব। কি একটা কারণে আমার হাউসসার্জন দাদারা আমাকে একটা রাতের জন্য হাসপাতাল থেকে আসা কলবুকগুলো দেখতে বলেছিল। হয়তো অ্যাডমিশন ডে ছিল না বলে সিনেমা দেখতে বা বাইরে খেতে গিয়েছিল। সপ্তাহ দুয়েকের অভিজ্ঞ চিকিৎসক ইন্টার্ন ভাই কলার তুলে জানিয়েছিল যে ‘ম্যায় হুঁ না’। ডাক্তারি করা কোন ব্যাপার নাকি? ওই তো ডেভিডসন আর লাববেলিতে সব লেখা আছে। তোমরা নিশ্চিন্তে ঘুরে এসো।
দাদারা গেল আর ওয়ার্ড থেকে কলবুক এলো। একটা বার্ন পেশেন্ট খারাপ আছে। স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে বার্ন ওয়ার্ডে হাজির হলাম। রোগীটা চোখ বুজে শুয়ে আছে। পালসে হাত দিয়ে কিছু পেলাম না। মারা গেছে কিনা বুঝতে বুকে স্টেথো রাখলাম। কি কান্ড! বুকের ভেতর ঝিরঝির করে শব্দ। সিস্টোলিক ডায়াস্টোলিক লাবডুব শব্দের বিভিন্ন রকমফেরের কোনো চিহ্ন নেই। মারা গেছেই বা বলি কি করে? তাহলে এই শব্দগুলো কিসের?
আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এক বয়স্কা সিস্টার। আমি কোনো প্রশ্ন তাঁকে করিনি। তিনি নিজে থেকেই বেশ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন “অন্যরকম শব্দ পাচ্ছেন তো?” আমি অসহায়ের মতো ঘাড় নাড়ি।
“ওগুলো বডি ফ্লুইডগুলো নিচে নেমে আসার শব্দ। ডেথ সার্টিফিকেটটা লিখে যান। আমি চারঘন্টা বাদে দেখে নিয়ে বডি ছেড়ে দেবো।”
তারপরে যতদিন আরজিকর হাসপাতালে ছিলাম ঝর্ণাদির ইভনিং ডিউটি থাকলে তাঁর কাছে চা খেতে যেতাম। ঝর্ণাদির ছিল ভয়ংকর চায়ের নেশা। একটা বড়ো ফ্লাস্কে করে চা নিয়ে আসতেন দিদি। ঝর্ণাদি আমাকে প্রথম বুঝতে শিখিয়েছিলেন যে ডাক্তারি ব্যাপারটার সবকিছু বইয়ে লেখা থাকেনা।
যেহেতু হাসপাতালের প্রতিটি পদক্ষেপেই সিস্টারদের প্রয়োজন হয় সেহেতু বেশ কিছু এই পেশার মানুষকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি। বেশ কিছু সুন্দর স্মৃতি জড়িয়ে আছে সিস্টার দিদিদের সঙ্গে। তারমধ্যে বেশ মজার ঘটনাও আছে।
আমি জেলা হাসপাতালে জয়েন করার পর পেয়েছিলাম সোনালিদিকে। ওনার সেন্স অফ হিউমার ছিল অসাধারণ। ডাক্তার রায়চৌধুরী ছিলেন আমার অ্যানাস্থেটিস্ট। একদিন রায়চৌধুরীদা খুব ক্লান্ত ছিলেন মনে হয়। অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে বললেন যে চিনি-দুধ না দিয়ে অল্প চা-পাতা দিয়ে এককাপ চা পাওয়া যাবে কিনা। সোনালিদি একজনকে চেঁচিয়ে বললেন – “ওরে, তোরা কেউ ডাক্তার রায়চৌধুরীকে এককাপ গরম জল দে।”
একবার হাসপাতালে সাপ্লাই হওয়া অবশ করার ওষুধ জাইলোকেনটায় ভালো কাজ হচ্ছিল না। এদিকে খান পনেরোর মতো শর্ট কেস থাকে প্রতিদিন। সোনালিদি অপারেশন চলাকালীন নানা কথা বলে রোগীর মনটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখতেন। একেকদিন একেকরকম প্রশ্ন। সেদিন আমার ডিউটি। অবশের ইঞ্জেকশন দিয়ে অপারেশন করার সময় প্রত্যেককেই দিদি এক সেট প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছিলেন। রোগী বিয়ে করেছে কিনা। পরের প্রশ্ন ছেলেপুলে কখানা। তারা কি করছে? – ইত্যাদি ইত্যাদি। ঘন্টা দুয়েক ধরে অনেকগুলো অপারেশন করার পর এক মাস্টারমশাইয়ের পিঠের ছোট একটা টিউমার কাটছিলাম। তাড়াহুড়োয় দিদি দ্বিতীয় প্রশ্ন আগে জিজ্ঞেস করে ফেললেন। ভদ্রলোকের দু’খানা ছেলেমেয়ে। একজন ক্লাস ফোর আর একজন টুয়ে পড়ে। সোনালিদি গম্ভীর গলায় শেষ প্রশ্ন ছাড়লেন – “আপনি বিয়ে করেছেন?” ভদ্রলোক কিংকর্তব্যবিমূঢ়। অস্বস্তিতে গলা ফলা ঝেড়ে পরিস্কার করে বললেন যে তিনি বিবাহ নামক সামাজিক সংস্কারে বিশ্বাস করেন এবং মানুষকে বাইরে থেকে দেখে তার চরিত্রের বিচার করা মোটেই ঔচিত্যবোধের পরিচায়ক নয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার যে সোনালিদি নিজেও ব্যাপারটা খেয়াল করেননি। “এতো উত্তেজিত হবার কি আছে!” – সোনালিদির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া।
জেলা হাসপাতালে মাঝেমধ্যেই কিছু সেরোপজিটিভ রোগীর অপারেশন হয়। এইচআইভি সংক্রামিত রোগীর অপারেশন বেশ সাবধানে করতে হয়। সাধারণত অ্যাসিস্ট করেন সিনিয়র সিস্টাররা। অপারেশনে ব্যবহার করা জিনিসপত্র আরেকজন সিস্টার নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দেন। একটা নিডলের খোঁচা লাগলেই মারাত্মক রোগটি আপনার হতে পারে। কতখানি সাহস এবং কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে একজন মানুষ এই অপারেশনে নামতে পারে।
কোভিড মহামারির সময় এরকমই দায়বদ্ধতা দেখেছিলাম স্বাস্থ্যকর্মীদের। একজন ওটি নার্সের স্বামী আক্রান্ত হলেন কোভিডে। আমরা খোঁজখবর নিতাম। ওঁদের ছেলেমেয়েরা একেবারেই বাচ্চা। অবস্থা খারাপ হতে ভদ্রলোককে বড়ো জায়গায় রেফার করা হয়। সেখানে তিনি মারা যান।
তার ঠিক পরপরই দুর্গা পুজো। পুজোর সময় মানুষ কিছুটা বেপরোয়া হয়। পুজোর ডিউটি সেই নার্সকে ধরাতে তিনি আপত্তি করেননি। অনেককে চমকে দিয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল যে কোভিডের নিয়ম ভাঙা মানুষদের তিনিই ভালো বোঝাতে পারবেন। তিনি তো ঘরপোড়া গরু। তাঁর এইধরনের মানুষের পাশে থাকাটা জরুরি। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান হলেও সেদিন থেকে জানি কিছু কিছু মানুষ এখনও আছেন। মনুষ্যত্ব শব্দটাই নাহলে যে অর্থহীন হয়ে যেত।
হাসপাতালে মাঝেমধ্যেই গন্ডগোল হয়। মানুষের ক্ষোভ উগরে দেবার জন্য হাতের কাছে পায় কিন্তু কর্তব্যরত নার্সদের।
কিছু অবিমৃষ্যকারী লোক নতুন প্রফেশনে আসা অল্পবয়সী সিস্টারদের মনে ঢুকিয়ে দেয় “আমরা-ওরা”র বিষ।









