সেই ছোট্টবেলায় বাবার কিনে আনা পিতপিতে গোলাপি কাগজে মোড়া দোতলা কাঠের রথে খুদে খুদে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার মৃণ্ময়মূর্তি আর তার সামনে এককুচি কাঁসার রেকাবিতে মায়ের হাতের তৈরি কুচো নিমকি আর নকুলদানার প্রসাদ রেখে বুড়োদাদুর বাড়ির ফাটা রোয়াকে অভিমানী ঠোঁটফোলানো আষাঢ়ু আকাশের নিচে সেই রথ গড়গড় করে টানা — আমার রথযাত্রার শৈশবস্মৃতি বলতে এতটুকুই।
অসমান রোয়াকের ফাটলে প্রায়ই আটকে যেত কমদামি রথের চাকা, কখনো কখনো ভেঙেও গিয়েছে — মুশকিল আসান বাড়ির জগন্নাথটি অপটু হাতে মেরামত করে দিত আর আমি কাজল ধ্যাবড়ানো চোখের জল মুছে ফের হাতে তুলে নিতাম সে রথের রশি।
ঘরের জগন্নাথের সঙ্গে সঙ্গে সেই রথ, রশি, মাটির দেবমূর্তি আর আমার অনাঘ্রাত ফুলের মতো ছেলেবেলা স্বপ্ন হয়েই মিলিয়ে গিয়েছে দিগন্তে।
পরিণত বয়সে এসে রথযাত্রা আর শ্রীক্ষেত্র আমার কাছে সমার্থক হলো মায়ের পুরীপ্রীতির কল্যাণে। মা চলে যাবার আগের বছরেও আমরা বেড়াতে গিয়েছিলাম পুরী। যদিও স্নানযাত্রার ঠিক পরে পরেই যাওয়াতে আমাদের আর জগন্নাথ দর্শন হয়নি সেবার। মায়ের ইচ্ছে ছিল পরের বছর ফের আসবে — আমি রেগে গিয়ে বলেছিলাম, “খুব শখ, না, বুড়োবয়সে? আমি বলে দিলাম, এটাই লাস্ট টাইম। আর আসছি না পুরী”।
বাকসিদ্ধির খ্যাতি ছিল না আমার, তবে সেই ২০২২এর জুন মাসে ডাউন পুরী এক্সপ্রেসের কামরায় হয়ত দারুব্রহ্ম স্বয়ং ভর করেছিলেন জিহ্বায়।
আর যাওয়া হয়নি পুরী — হবেও না কোনোদিন, সত্যি সত্যিই।
মা বেঁচে থাকতে বাড়ির আড়াইতলার চিলতে ঠাকুরঘরে কাঠের সিংহাসনে জড়ো করেছিল মেলা দেবদেবীর ছবি। দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী আর গৃহদেবী জগদ্ধাত্রীর পাশাপাশি কাশীর বিশ্বনাথ, দ্বারকার সোমনাথ তো ছিলেনই, স্বল্পপরিচিতা তমলুকের বর্গভীমা আর রাজবলহাটের রাজবল্লভী মাও ছিলেন। আর ছিলেন জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার ত্রিমূর্তি — অনেকগুলো। পুরী গেলেই রাজ্যের টুকিটাকি জিনিসের সঙ্গে মা একাধিক জগন্নাথমূর্তি কিনবেই। কটকি চাদর আর শাড়ি, পিপলির দেওয়ালঝোলা আর বেতের ফলের টুকরির পাশাপাশি গাঁটরিতে বন্দি হতেন জগন্নাথ — প্রতিবার। কিছু দিয়ে দিয়েছি কাছের মানুষদের, শোবার ঘরের দেওয়ালে আর ড্রেসিং টেবিলে বিরাজ করছে কিছু ছবি — বাকিটা সিংহাসনে। মা থাকাকালীন যে ঠাকুরঘরে আমার পা পড়ত কালেভদ্রে, গত অক্টোবর থেকেই সেখানে নিয়মিত সন্ধ্যে দেওয়া এখন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে।
ধূপ আর প্রদীপ জ্বালাই। নকুলদানা, কিসমিস বা মাখা সন্দেশের নৈবেদ্যর সঙ্গে মিশে যায় নোনা অশ্রু। শাঁখে ফুঁ দিই — মনের মধ্যে তোলপাড় করে ওঠে সাগরের ঢেউ, সে ঢেউ নিরন্তর আছড়ে পড়ে হৃদয়ের বালিয়াড়িতে। চোখ বন্ধ করলেই শুনি সমুদ্রের গর্জন — চোখের পাতায় মাখামাখি হয়ে যায় নোনতা হাওয়া, একলা বাতিঘরের আলো আর ঢেউয়ের মাথার ফসফরাসের মালা।
আমি দেখি একলা জীবনের রথের রশি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে মা যেন চড়ে বসেছে সেই সিংহাসনে, ঠাকুরকে সঙ্গী করে। আমি আকুল হয়ে ছুটছি, রথ চলে যাচ্ছে আমার নাগালের বাইরে। আর নয়নসুখ জগন্নাথ পিছন ফিরে মুচকি মুচকি হাসছেন।
ঝাপসা হয়ে আসছে রথ, পাঁপড়-জিলিপির পসরা সাজানো দোকান, বালিতে মেপে মেপে পা ফেলে চলা রঙিন ঝালরমোড়া উট, শঙ্খ আর ঝুটো মুক্তোর ফেরিওয়ালা, দিকচক্রবাল ছোঁয়া অজানা জাহাজ — অস্পষ্ট হয়ে আসছে সব।
শুধু ভাঙা হাটে একলা দাঁড়িয়ে রাধারাণী, হাতে বনফুলের মালা, আকুল নয়নে খুঁজে চলেছে কাকে যেন!
‘দুনিয়া কা মেলা
মেলে মে লড়কি
লড়কি অকেলি শন্নো — নাম উসকা’ —
আমার ঠাকুরের সিংহাসন। হ্যাঁ, এখন আমারই।










