{প্রয়োজনে তৃতীয় বন্ধনীভুক্ত লেখাগুলো বাদ দিয়ে যেতে পারেন। ওগুলো অকেজো বুড়োর জ্ঞান ফলানো}
তিলোত্তমা এবং
তিলোত্তমা বলে একটা মেয়ে মরে গিয়ে হঠাৎ আমাদের বুঝিয়ে দিল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বাস্থ্যটি ভালো নেই।
এ যাবৎ কালে রোগী মৃত্যুর যাবতীয় দায়দায়িত্ব ছিলো ডাক্তারের।
এখন তবু লোকজনের মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা যথেষ্ট নয়, ভেজাল ওষুধ, যন্ত্রপাতির অভাব, অক্সিজেনের অভাবও এর জন্য দায়ী। অন্যান্য ব্যবস্থাগুলোও রোগীর জীবনের জন্য দরকার।
হয়তো বা দায়িত্ব এড়ানোর জন্য সব সরকার চিরকাল রোগীমৃত্যুর দায় ডাক্তারদের ঘাড়ে তুলে দিয়েছে -যেন ডাক্তাররা মৃত্যুর ঠিকাদার। সমস্ত মৃত্যুর ঠিকা নিয়ে বেছে বেছে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই দুষ্টু বাচ্চার মতো একটা একটা করে মানুষ মারছে।
স্বাস্থ্যের দায়িত্ব কার?
এবং এটাও এখন মনে হচ্ছে যে এই সব কিছুর জন্য কেবলমাত্র ঐ কয়েকটা কর্মরত ডাক্তার বা নার্সরাই দায়ী নয়।
এবার আমরা ভারতে হাসপাতাল গুলোর মোট শয্যাসংখ্যা নিয়ে একটু ভেবে দেখি।
যথেষ্ট বেড আছে কি?
[ভারতবর্ষে মোট জনসংখ্যা একশো চল্লিশ কোটিরও বেশী। এরমধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন আট দশমিক চার কোটি মানুষ (৮.৪কোটি), অর্থাৎ পাঁচ দশমিক শূন্য চার শতাংশ(৫.০৪%) মানুষ আয়কর ফাইল দাখিল করেন। বছরে পাঁচ লক্ষাধিক টাকা উপার্জন করে’ বাস্তবিক ভাবে আয়কর (ইনকাম ট্যাক্স) দিতে হয় তিন দশমিক পাঁচ কোটি (৩.৫) মানুষকে অর্থাৎ দুই দশমিক এক আট(২.১৮%) শতাংশ মানুষ বাস্তবে ইনকাম ট্যাক্স দিচ্ছেন।]
ভারতবর্ষের সব প্রাইভেট হাসপাতাল মিলে মোট শয্যাসংখ্যা কিন্তু একশো চল্লিশ কোটি নয় এমনকি আয়কর দেওয়া মানুষের সংখ্যার সমান তিনকোটিও নয় কেবলমাত্র এগারো লক্ষ। সুতরাং আপনার আমার জন্য পড়ে থাকছে সেই সরকারি হাসপাতালগুলোই। অথচ স্বাস্থ্য খাতে খরচ কমিয়ে সরকার জোর দিচ্ছে স্বাস্থ্য বীমার ওপর। হ্যাঁ আমেরিকাতে এটাই চলে। কিন্তু ওই দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আর আমাদের ক্রয় ক্ষমতায় আকাশপাতাল তফাৎ। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মোট শয্যার তেষট্টি ভাগ রয়েছে প্রাইভেটে। প্রতি হাজারে এক দশমিক (১.৩) তিনটে বেড। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে প্রতি হাজারে ৩.৪টি বেড থাকা উচিত। আসুন দেখি তাহলে ঘাটতি কতোটা? সরকারি তথ্য অনুযায়ী ভারতবর্ষে বর্তমান মোট শয্যাসংখ্যা আঠেরো লক্ষ কুড়ি হাজার।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেশ অনুযায়ী সাধারণ শয্যা(জেনারেল বেড)থাকা উচিত কমপক্ষে সাতচল্লিশ লক্ষ ষাঠ হাজার। এছাড়াও ধাত্রী বিভাগের শয্যা হওয়া উচিত কমপক্ষে মোট জনসংখ্যার তিন শতাংশ [প্রায় চার লক্ষ শয্যা], অন্যান্য বিভাগের কথা বললে হয়তো মূর্ছা যাবেন। ওগুলো বাদ থাক। অর্থাৎ বেড না পেলে বা ওষুধ, যন্ত্রপাতি না পেয়ে রোগী মারা গেলে সেটা ঐ ডাক্তারদের দোষ নয়।উভয় সরকার সমানভাবে দায়ী।
এবার একটু কন্ঠ ছাড়ুন জোরে। আমাদের সঙ্গে সবাইকার জন্য স্বাস্থ্যের দাবীতে পথে নামুন। [তিলোত্তমা এই কথা বলতে গিয়েই দৃষ্টান্তমূলক নৃশংসতায় খুন হয়েছে।]
দেশে থেকেও যাদের দেশ নেই তাদের কথাঃ-
এই দেশে গৃহহীন, পরিচয়হীন, বস্তুত পরিচয়পত্রহীন মানুষের সংখ্যাই প্রায় ন’ কোটি তিরিশ লক্ষ পঁচাত্তর হাজার আটশো আটচল্লিশ, ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় সাত দশমিক দুই শতাংশ (তথ্য ২০১১আদমশুমারি)।
[কেবলমাত্র উত্তর প্রদেশে তিন কোটি আটাত্তর লক্ষ মানুষের ঘরবাড়ি নেই, উত্তর প্রদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় কুড়ি কোটি চল্লিশ লক্ষ। মানে প্রায় ঊনিশ শতাংশ লোকের ঘর বাড়ি নেই আর মহারাষ্ট্রে মোট জনসংখ্যা এগারো কোটি চল্লিশ লক্ষ তার এগারো দশমিক নয় শতাংশের মানে এক কোটি ছত্রিশ লক্ষ মানুষের ঘরবাড়ি কিস্যু নেই, নাগরিক অধিকার-স্বাস্থ্য–শিক্ষা- আব্রু কিচ্ছু নেই।অবশ্য কাশ্মীরের মাত্র এক দশমিক শূন্য এক শতাংশ লোকে গৃহহীন; এটাই সব চাইতে কম। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সাত দশমিক পাঁচ ছয় শতাংশ মানে আটষট্টি লক্ষ লোকের ঘরবাড়ি নেই ।(তথ্য আদমশুমারি দুইহাজার এগারো)।]
বেসরকারি হাসপাতাল এদের কী ভাবে স্বাস্থ্য বীমার সুযোগ দেবে?
এসব গরীব গুর্বো পথের কুকুরের জীবন কাটানো মানুষের কথা বাদ থাক। আপনার কথায় আসি।
এই দেশ আপনার স্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ?
প্রথমে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি। দু হাজার চার। আমার ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাক। পিজিতে বেড নেই-ফিরিয়ে দিল; আর কোথাও ঘুরে ঘুরে খোঁজার সময় নেই। প্রাইভেট হাসপাতালে গেলাম, তিনটে স্টেন্ট, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।প্রায় চার লাখ টাকা বিল। আমার মেডিক্লেমের সীমার বাইরে।
সান দু হাজার সাতেরো মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ। ক্যাথল্যাব নেই। বর্ধমানের মেডিক্যাল কলেজে ক্যাথল্যাব, আইসিসিইউ আছে। ঘর আছে লোক নেই। অর্থাৎ সেখানে কিছু করার মতো ব্যবস্থাই নেই। রেস্ট রুমের অভাবে ছাত্রছাত্রীরা ওখানেই রাতে বিশ্রাম করে। এটুকু জানি ডায়ামন্ড হারবার বা রামপুরহাট বা মুর্শিদাবাদ বা পুরুলিয়া বা কোচবিহার বা যে কোনও পেরিফেরির মেডিক্যাল কলেজে আইসিসিইউ, ক্যাথল্যাব অবশ্যই নেই। বাস্তবে ঘরবাড়ি আর একগুচ্ছ উজ্জ্বল ঝকঝকে তরুণ তরুণী ছাড়া কিছুই নেই। আর সিউড়ি,কাঁথি, রানাঘাট, কৃষ্ণনগর, বিষ্ণুপুর এই সব জেলা বা সদর হাসপাতালেও এসবের কথা ভাবাই উচিত নয়। তাহলে আপনি সাধারণ মানুষ, আপনি কোথায় যাবেন? কাকে মারবেন? জুনিয়র ডাক্তার না ভিজিটিং? কে আপনাকে চিকিৎসা দেবে? সুতরাং দাবীটা আপনাকেই তুলতে হবে নাহলে অগতির গতি প্রাইভেট হাসপাতাল -যারা কেবলমাত্র ব্যবসার জন্য এই সব প্রতিষ্ঠান খুলেছে।তাও কটা বেসরকারি হাসপাতালে ঠিকঠাক আইসিইউ, ক্যাথল্যাব আছে?
সারা ভারতবর্ষে পাবলিক সেক্টরে(সরকারি হাসপাতালে) আইসিইউ মাত্র পঁয়ত্রিশ হাজার। মোট আইসিইউ চুরানব্বই হাজার (সরকারি, বেসরকারি মিলে)। পশ্চিমবঙ্গের আলাদা করে কোনও তথ্য নেই। কলকাতা লন্ডন হোক আপত্তি নেই কিন্তু ভুললে চলবে না ইংল্যান্ডে কিন্তু গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটাই সরকারি খরচে চলে।
তিলোত্তমার মৃত্যু মানুষের মনে যে চেতনা এনেছে সেই চেতনাকে জাগান। নিজের অধিকার বুঝে নিন। স্বাস্থ্যও একটা অধিকার।
সেটাই হবে আমাদের মৃত মা দুর্গার প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।











