বাবা ও মা,
তোমাদের কষ্ট দেখে তোমাদের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। যেতে হলে যে দেহ লাগে সেটা নাটাগড় শ্মশানে দাহ হয়ে গেছে। সশরীরে যেতে পারবো না। আমার অস্তিত্ব যেটুকু আছে সেটা মানুষের স্মৃতিতে। আমি যে দেশের নাগরিক হিসেবে গর্বিত ছিলাম তার সীমানার বাইরে মানসলোকে। তাই আমার জবানিতে অন্যের আঙুল এই চিঠি লিখছে।
এই রাষ্ট্র আমার নাম মুছে দিয়েছে আমার মর্যাদা রক্ষা করতে। যে নামে তোমরা আমাকে ডাকতে, সেই ডাকার অধিকার তোমরা হারিয়েছো। তোমাদের মেয়ে এখন তিলোত্তমা অথবা অভয়া।
এটা তো তোমরা সবাই জানো, দেশের সবাই জানে যে আমার ওপর অত্যাচার একজন করেনি। আমার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে চালাতে কারা কারসাজি করেছিল তাদের সবাইকেই তোমরা জানো।
এখানে এসে আরো অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। ওদের সঙ্গেই এখানে আছি। আমার সঙ্গে আছে আরুসি তলোয়ার, জেসিকা লাল, সেই হেমন্ত বসু, কেরলের সিস্টার অভয়া। লালবাহাদুর সাস্ত্রীজীর সঙ্গে সেদিন দেখা হলো। বিজ্ঞানী হোমি ভাবাও একটু দূরেই থাকে। আমাদের সামনের পাড়ায় থাকে সেই ভিখারীর দল। যাদের স্টোন ম্যান খুন করেছিলো। অনেকের নাম বলে লিস্ট আর বাড়াবো না। কালকে শুনলাম সন্দীপ আর অভিজিৎ জামিন পেয়ে গেছে। তোমরা দুঃখ পাচ্ছো। বিশ্বাস করো এতে আমি দুক্ষ পায়নি। এই প্রশাসন লুম্পেন গাঁটছড়ার আসল মুখ তো একমাত্র আমিই দেখেছি। যখন আমার পার্থিব শেষ নিঃশ্বাস বেরিয়ে যাচ্ছে। আর ধর্ষণ, ওটা তো শরীর থাকলে একটু আধটু হয়। বিশ্বাস করো আমাকে আর কেউ ধর্ষণ করতে পারবে না। ধর্ষণ করতে গেলে যে দেহ লাগে সেটা আমার আর নেই। শুধু একটাই চিন্তা রয়ে গেলো। এই করাপ্ট সিস্টেম থাকলে আরো অনেক মেয়েকে আমার মতো কষ্ট পেতে হবে। শরীর না থাকলেও অন্তরে সেই কষ্টের কান্না বার বার ফিরে আসছে। আমার ধর্ষিত দেহের কোটি কোটি অনু পরমাণু এখন তোমাদের সবার শরীরে ঢুকে গেছে। তোমাদের তো দেহ এখনো আছে। একবার সবাই মিলে চেষ্টা করে দেখো না দুঃশাসন গুলোকে সিধে করতে পারো কিনা।
আরেকটা কথা তোমাদের বলা হয়নি। সেদিন দ্রৌপদীর সঙ্গে দেখা হলো। ঠিক ধরেছো। মহাভারতের দ্রৌপদী। তদন্ত আর বিচারের কথা শুনে খুব হাসলো। বললো, আমার রাজসভায় বস্ত্র হরণের বিচার কি হয়েছিল? হয়নি।
বিচার না মেলার পরে, ধর্মযুদ্ধ হয়েছিল। বিচার হয়নি কিন্তু সিস্টেম ধ্বংস হয়ে গেছিলো। সামনের বছর সবাই মিলে ঠিক করেছি নাগাসাকি যাবো। 9 আগস্ট নাগাসাকিতে মানবতা ধর্ষিত হয়েছিলো। সেই একই দিনে আমি আর জি করে ধর্ষিত আর খুন হয়েছি। নাগাসাকির মৃতেরা আমাদের খুব আপনজন।
তোমরা সবাই পথে থাকো। একবার চেষ্টা করে দেখো। যদি পারো ভালো। নাহলে আরেকটা কাজ কোরো। যে টাকা আন্দোলনের জন্য মানুষ দান করেছে, সেই টাকায় লাখ লাখ ফটো ফ্রেম কেনো। সেই ফ্রেম পৌঁছে দাও যাদের বাড়িতে মেয়ে মা বা বোন আছে,সেই সব বাড়িতে। দুঃশাসনের পাল থাকলে আরো আরো অনেক তিলোত্তমা হবে। তদন্ত কমিশন হয় বলবে আত্মহত্যা অথবা খুন কিন্তু সেই খুন কেউ করেনি। তখন সেই তিলোত্তমার ছবি এই ফটো ফ্রেমগুলোতে বাঁধিয়ে রাখা যাবে।
তোমরা সুস্থ থেকো। লড়াইতে থেকো।
ইতি
তোমাদের চিরতরে মুছে যাওয়া মেয়ে
তিলোত্তমা








