বাবা ও মা,
আজকে বড়দিন। ভেবেছিলাম কিছু লিখবো না। অন্যের হাত দিয়ে এখন লিখতে হয়। আমার নিজের হাত তো ছাই হয়ে গেছে। থাকতে না পেরে অন্যের হাত দিয়েই লিখছি।শরীর মন তো আর নেই। এখন আমি শুধুই আত্মা।তাই সুখ দুঃখের বোধ আর নেই। শুধু আনন্দের বোধটুকু আছে। তোমরা এখনো দেহমনে বিরাজ করছো। তাই দুঃখ পাও। যাকগে সেকথা।
আজকে চলো কিছু পুরোনো কথা মনে করিয়ে দিই। মা তোমার মনে পড়ে সেই ছোট্ট বেলায় বাবা বড়দিনে আমাকে কেক আর কমলালেবু এনে দিয়েছিলো। আমি লেবু ছাড়াতে পারছিলাম না। তোমরা খুব হাসছিলে আর আমি রেগে যাচ্ছিলাম। সত্যি বলছি তোমাদের কাছে ফিরে গিয়ে আবার সেই রকম লেবু ছাড়াতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে তখনই হয় যখন জানতে পারি এটা আর কোনোদিন পারবো না। পারবো কিকরে? আমার হাত তো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কাউন্সিলর কাকু আর এমএলএ জেঠু তো আমাকে তাড়াহুড়ো করে পুড়িয়ে দিয়েছে।
মা জানোতো বাবাকে আমি কোনোদিন কাঁদতে দেখিনি। একদিনই দেখেছি। সেটাও এই বড়দিনেই। আমি যখন ইন্টার্নশিপ করছি। মা তোমার মনে পড়ে, আমার স্টাইপেন্ডের টাকায় আমি একটা বড়ো কেক আর অনেকগুলো কমলালেবু কিনে বাড়িতে আনলাম। তুমি কেক কেটে সবাইকে দিলে। তখন বাবাকে দেখেছিলাম আনন্দে কেঁদে ফেলতে। আমি জীবিত থাকা অবস্থায় বাবার আনন্দের কান্না দেখেছিলাম। আমি মারা যাবার পরে এখন তো বাবাকে দেখি প্রতিজ্ঞায় কাঁদে। আমার বিচারের প্রতিজ্ঞায়।
মা জানো তো আমার আজকে দুঃখ হচ্ছে না। এই বড়দিনে আমার ভাই বোন দাদা দিদিদের দেখছি ডোরিনা ক্রসিং এ মঞ্চ বেঁধে প্রতিবাদ করতে। অনেকেই আমাকে ভুলে গেছে। আনন্দ করছে, উল্লাস করছে। সত্যি বলছি এই উল্লাস আমাকে ব্যথিত করছে না। শুধু একটি কথাই ওদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে।আমি তো শেষ নয়। যে সিস্টেম রয়েছে তাতে তো আরও তিলোত্তমা হবে। তোমাদের তো আর মেয়ে নেই। যাকে প্রাতিষ্ঠানিক বলির জন্য আবার তোমরা দিয়ে দেবে। এবার পরের বলিদানের জন্য তো অন্যদের ঘরের মেয়েকেই দিতে হবে। তখন সেই ঘরে কি বড়দিনের আনন্দ পৌঁছাবে?
ওরা কয়েকদিন আনন্দ বন্ধ রেখে সিস্টেমটা যদি পাল্টে নিতো তাহলে তো আর তিলোত্তমা হতো না।কারুর ঘরের আলোই তো আর তাহলে নিভে যেতো না।
মা আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে অনেক যন্ত্রনা পেয়েছো। গঙ্গায় আমার অস্থি ভাসানোর যন্ত্রনা তোমার পাওয়া হয়ে গেছে। আমি তোমাকে এই বড়দিনে একটা দায়িত্ব দিচ্ছি। তিরিশ সেকেন্ডের দায়িত্ব। যাদের বাড়িতে মেয়ে আছে বোন আছে বা যেকোনো কেউ প্রিয়জন আছে, তাদের আমার অবস্থায় তিরিশ সেকেন্ড তাদের প্রিয়জনকে ভাবতে বলো। এ হলো আমার জীবনের সেই শেষ তিরিশ সেকেন্ড। যখন চূড়ান্ত অত্যাচারে আমি মৃতপ্রায়। আমার স্বাস বন্ধ করে দিয়েছে। আমি চোখে অন্ধকার দেখা শুরু করলাম। আমি শেষ স্বাস নেবার চেষ্টা করলাম।পারলাম না। তারপর তো আমি আর নেই। আমি একটি মৃতদেহ। তিলোত্তমার মৃতদেহ।একটি দেহ পড়ে আছে, অন্ধকারে, একাকী। তুমি সবাইকে বলো তার প্রিয়জনকে আমার জায়গায় রেখে একটিবারের জন্য এই শেষ তিরিশ সেকেন্ড ভাবতে। তারপর মন যা চায় তারা সেটা
করুক। তুমি সবার জীবন থেকে এই তিরিশ সেকেন্ড ভিক্ষা চেয়ে নাও। আমি অপেক্ষা করছি। তোমরা একদিন না একদিন আমার কাছে চলে আসবে। তখন তোমাদের সঙ্গে আবার বড়দিন পালন করবো। তোমরা সপ্তাহের শেষে আমার কলেজ থেকে ফেরার অপেক্ষা করতে। আমি এখন তোমাদের অপেক্ষায় আছি।
আকাশের ঠিকানায় আমাকে চিঠি লিখো। আমি পেয়ে যাবো।
মেরি ক্রিসমাস
ইতি
তোমাদের তিলোত্তমা









