এই কথোপকথনের অকুস্থল আমার ডাক্তারবাবুর চেম্বার। এইটি অবশ্য বেশ কয়েকজন ডাক্তারবাবুর সান্ধ্য আস্তানা – পোশাকি নাম পলিক্লিনিক। এখানে এলেই আপনার শরীরের যাবতীয় সমস্যার চট জলদি সমাধানের উপায় মালুম হবে । কেননা এখানে আপনি মানবশরীরের প্রধান পঞ্চাঙ্গ সহ সকল উপাঙ্গের জন্য দক্ষ পরিসেবা পাবেন। আমরাও তেমনই মনোবাঞ্ছা নিয়ে শবরীর মতো জনৈক তেনার অপেক্ষায় আছি। বিলম্ব হচ্ছে দেখে পাশের দোকান থেকে বেশ কয়েক পেয়ালা চা গলধঃকরণ করেছি, তবুও তেনার দেখা নাই। তবে এ কথা মানতেই হবে যে, সময়টা বেশ কেটে যায় এসব পাবলিক ডোমেইন এ এলে। বিচিত্র সব সমস্যা নিয়ে লোকজনের বিরামহীন আসা যাওয়া চলতেই থাকে। সমাজকে খুব কাছ থেকে দেখার এ এক মোক্ষম ব্যবস্থা। এমনি এক মা এলেন, সঙ্গে তাঁর ফুটফুটে বাচ্চাটি। খানিক সময় বাদে আরও এক মহিলা এলেন। ইনি অবশ্য তখনও একা। যাইহোক দুজনে কথাবার্তা শুরু করলেন। উর্দু ও হিন্দি মেশানো সেই কথোপকথনের যথাসম্ভব বঙ্গীয় অনুবাদ সকলের সামনে পেশ করি।
- কখন এসেছো ? অনেকক্ষণ?
- হ্যাঁ প্রায় আধঘন্টার ওপর হয়ে গেল।
- ভালো আছো ? অনেকদিন দেখিনা। তোমার কী সমস্যা ? নিজের না বাচ্চার?
- আরে বাচ্চার।
- কেন কী হয়েছে? বুখার ?
- না না , সেসব কিছু নয়।এই দেখোনা দেড় বছর বয়স হতে চললো, এখনও মুখে ঠিকঠাক বুলি ফুটলো না। বড়ো চিন্তায় আছি।
- আরে চিন্তা করেছো কেন? ও ঠিক কথা বলবে। এতো চিন্তার কিছু নেই। বাচ্চা তো বেশ হোনহার দেখছি। মোবাইল ঘাটছে । দেখো ডাক্তারবাবু কী বলে?
কথালাপ যাঁকে কেন্দ্র করে সেই বাবু সোনা এতোক্ষণ মায়ের হাতের মুঠোয় ধরে রাখা মুঠোফোনটাকে নিয়ে সমানে তার বোতাম টিপে চলেছে খট্ খট্ করে । ছবির চরিত্র বদলের সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ মুখের অভিব্যক্তি বদলে যাচ্ছিল ক্ষণে ক্ষণে। শত হলেও টেকনো অ্যাডিক্টেড জেনারেশন তো !!
বাচ্চা কথা বলছে না এটা আর কারো না হোক শিশুর মায়ের কাছে একটা মানসিক যন্ত্রণার কারণ বৈকি! মা ডাক শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন সদ্য মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়া মহিলারা। চিকিৎসাশাস্ত্র মতে অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা , যেমন অটিজম, সেরিব্রাল পালসি , হাইপোথাইরয়েডিজম, ইত্যাদি না থাকলে একটি শিশু ১০ থেকে ১৩ মাস বয়সের মধ্যে কথা বলতে পারে। যদি না…..
আমার এবারের কাহিনি এই যদি নার মতো এক সমস্যা বা তথাকথিত বিহেভিয়ারাল সমস্যা নিয়েই।

২০২১ সালের আগস্ট মাস থেকে ২০২৩ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ল্যাটিন আমেরিকার ১৮৭৮জন ১২ মাস থেকে ৪৮ মাস বয়সী শিশুদের ওপর এই গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করা হয়। একজন শিশু একটা স্মার্ট ফোনের সাথে ঠিক কী প্রতিক্রিয়া করছে, কীভাবে করছে, এই আসক্তিকাল কতক্ষণ ধরে স্থায়ী হচ্ছে এমন সব একান্ত প্রাথমিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। পাশাপাশি,তাদের বিকাশের বিষয়টির ওপর নজরের প্রভাবকে বুঝে নেওয়াও ছিল গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য। গবেষণা সূত্রে জানা গেছে যে দু বছর বয়সের আগেই শিশুরা দিন পিছু গড়পড়তা ১ ঘন্টা বা তার থেকেও বেশি সময় মোবাইলে ব্যস্ত থাকছে। অথচ শিশু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা দু বছরের আগে শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। দু বছরের পরেও মা বাবার নিয়ন্ত্রণে পরিমিত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কথা বলেন শিশু বিশেষজ্ঞরা। অথচ বাস্তবে দেখা গিয়েছে যে অধিকাংশ শিশুই বিনোদনের জন্য বেছে নিতে বাধ্য হয় বা পরোক্ষভাবে প্রণোদিত হয়ে টেলিভিশন অথবা মোবাইল ফোনের পর্দায় চোখ রাখতে অভ্যস্ত হয় শিশুরা । গান শোনানো, ছবি দেখানো , শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের নামে পরিচিত মানুষজনেরাই একটু একটু করে শিশুদের অভ্যস্ত করে তুলছি আসক্ত করে তুলছি স্ক্রিনের প্রতি। আর শিশুদের মধ্যে এমন প্রবণতা গড়ে উঠছে কোনো বিশেষ পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক অবস্থান নিরপেক্ষ ভাবেই।

সেদিন চিকিৎসক মশাই কী বিধান দিয়েছিলেন ঐ মাকে তা জানার সুযোগ হয়নি। আপনাদের মধ্যে কেউ তা জানলে অনুগ্রহ করে আমাকে জানাবেন।
ফেব্রুয়ারি ১৩,২০২৫
মধ্যমগ্রাম।














একদম পরিচিত এক সমস্যার কথা বলেছেন লেখক। ছোট বেলায় অনেকসময়ই সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক শিশুও বেশ কিছুদিন পরে কথা বলতে শুরু করে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হয়ে উঠে আসছে শিশুদের স্ক্রিন
আসক্তি বেড়ে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতের থেকে বাস্তব জগতের সঙ্গে পরিচিতি বাড়াতে হবে। না হলে সমস্যা বাড়বে। মায়েরা সচেতন হোন।
মায়েদের সবথেকে আগে সতর্ক হতে হবে। যে কথোপকথনের সূত্র থেকে এই বিষয়ে আলোচনা সেখানে কিন্তু মায়ের অসচেতনতাই প্রকাশ পেয়েছে। আধুনিক মায়েরা নিজেরাই বাচ্চাটিকে শান্ত রাখার জন্য হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছেন। এতো ছোট থেকে শিশুদের মোবাইল দেখার সুযোগ করে দিলে অনেক অনেক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
বাস্তব সমস্যা।শুধু শিশু নয় বড়দের পরীক্ষার খাতায় ভাষার ধরন পাল্টাচ্ছে।ছোটদের আচরনে প্রভাব পড়ছে।
আসক্ত হয়ে পড়লে সমস্যা নানা দিকে।আর নিরাসক্ত থাকা মানেই সামাজিক মর্যাদার অবনমন। যাবেন কোথায়?
হয়ত আমরা নিজেদের স্বার্থেই শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছি। আমি এর একটা ব্যতিক্রমী ধারা লক্ষ্য করেছি। দেড় বছর বয়সে যখন শিশুটি অনেক টা active হয়ে উঠছে, তাকে মোবাইল এর বদলে গুগল নেস্ট বলে একটি যন্ত্র দেওয়া হয়েছিল। কিছুটা ট্যাবলেট এর মতই কিন্তু তাকে কথা বলে আদেশ দিতে হবে। কিছুদিনেই শিশুটি বোঝে যে স্পষ্ট ভাবে কিছু না বলতে পারলে যন্ত্র চুপ করে থাকবে। সে তার সব অনুসন্ধিৎসা প্রয়োগ করতে থাকে গুগল এর প্রতি। আজ তার পাঁচ বছর বয়স। সে এখনো মোবাইল দেখে না। আলেক্সা তাকে বিভিন্ন জীব জগৎ সম্পর্কে শেখায়। সেই শিশু আমাদের বোঝায় recycle করতে হবে কেনো। আর সঠিক উচ্চারণ। তার শব্দভাণ্ডার যথেষ্ট প্রাচুর্যে পূর্ণ। আর সে কি দেখছে শুনছে শিখতে চাইছে, সেটা বড়দের নজর তো রাখতেই হবে।
সে কিন্তু বড়দের মোবাইল এর দিকে ঘুরে ও দেখে না।
আজকাল মা বাবার হাতে সময় কম , সাথে এত রকম টেকনোলজি। সব মিলিয়ে মিশিয়ে চলা টাও দরকার।
পার্থসারথি বাবুকে ধন্যবাদ জানাই তাঁর মতামতের জন্য। গুগল নেস্ট নামের উপকরণটির অস্তিত্ব ও উপযোগিতা সম্পর্কে এতো কথা আমার জানা ছিল না।এই তথ্য জানানোর জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই।
এ কথা মানতেই হবে যে , টেকনোলোজির উদ্ভাবক মানুষ।
তার নিজের প্রয়োজনের তাগিদ সূত্রেই এদের উদ্ভাবন। সুতরাং এগুলোর কিছু সুবিধা যে আছে তা অস্বীকার করবো কী করে? আমার বক্তব্য সেখানে নয়। গবেষণা সূত্রে যা জানা গেছে তাতে বলা হয়েছে যে, কোনো রকম পর্দায় নিয়মিত নজর দিতে দিতে এই প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে নতুন নতুন সমস্যা দেখা দিচ্ছে যা সত্যিই চিন্তা বা উদ্বেগের। খুব সম্প্রতি সুইডেন পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে সমস্ত রকম ভার্চুয়াল উপকরণ মোবাইল, ট্যাবলেট, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, টেলিভিশন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সাবেকি বইপত্তরের ব্যবস্থা কায়েম করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের শিশুদের শিশু হয়েই বড়ো হতে দিতে হবে। এখন থেকেই নোমোফোবিক না হলেই মঙ্গল। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে পার্থসারথি।