যতই অন্তরের অন্তঃস্থল ছেনে রঙ্গব্যঙ্গের সুষমা তুলে আনতে চাই, হাতে উঠে আসে নিঃসীম আঁধার।
কাউকে বিচার করার অবস্থায় নেই, বিশেষ করে নিজে যখন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, যে অন্যের জুতোয় পা না গলালে তার পরিস্থিতি কিছুতেই সম্যকভাবে বুঝে ওঠা যায় না।
তবু ট্যাংরা, বেহালা, মধ্যমগ্রাম, কসবা, বীরভূমের লাভপুর —
মৃত্যুর মিছিল চলেছেই। প্রায় একই পদ্ধতিতে পরিবারের অন্যান্য প্রিয়জনের মৃ ত্যু নিশ্চিত করে অন্তিমে নিজেকেও শেষ করে দেওয়া — যাকে মনোবিদেরা আখ্যা দিচ্ছেন, ‘কপিক্যাট সুইসাইড’ বলে।
আত্মহত্যার বহুবিধ কারণ থাকলেও ইদানিংকার ঘটনাগুলিতে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বসে যাওয়াকেই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা চলে। এই ‘অর্থনৈতিক’ ভাবে ধ্বসে যাওয়া মানে শুধুই অনাহারের ভয় নয়, সমপেশার/সমবিত্তদের ‘পিয়ার প্রেশার’ অর্থাৎ আর্থসামাজিকভাবে সমান অবস্থার মানুষজনের সঙ্গে সাম্যের বা তাদের উপরে টেক্কা দেওয়ার জন্য সাধ্যের অতিরিক্ত সাধ/ঝুঁকির প্রবণতা, যা ঠেলে দিচ্ছে Inability ঋণের দিকে।
অথবা, অসুস্থ সন্তানের দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার ভার অর্থনৈতিকভাবে বইতে না পারার অপারগতাজনিত হতাশা — এই দ্বিবিধ কারণেও অসহায় মানুষ, নিরুপায় মানুষ, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ বেছে নিচ্ছেন আত্ম হন ন।
কিন্তু প্রশ্ন সেটা নয়। প্রশ্ন আত্ম হন নের আগে প্রিয়জনের হত্যা – স্ত্রীর, অসুস্থ সন্তানের হ ত্যা! এই নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা অকল্পনীয়।
যে মাতা-কন্যা জুটি অর্থলোভে সচ্ছল আত্মীয়াকে বঁটিতে কেটে ‘সাইজ’ করে ট্রলিব্যাগে ঢুকিয়ে গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটাতে যায়, তাদের নিষ্ঠুরতার সঙ্গে অসুস্থ পুত্রের গলা টিপে মারার নৃশংসতার ফারাক করবে কে?
কারো জীবনের পরিস্থিতি-উদ্ভূত সিদ্ধান্তের ন্যায্যতা বিচার করার ন্যায়াধীশ নই আমি — তবু পরপর এত এত অপমৃত্যুর অভিঘাতে কিঞ্চিৎ মনোবিকলন ঘটে যাচ্ছে আমার।
নির্বিকার সমাজ, দুনিয়াজোড়া লোভের হাতছানি, মানুষের আকাশছোঁয়া চাহিদা, অলজ্জ অসংযম, মূল্যবোধহীন দেখনদারি, সমস্ত বিষয়ে অসংবৃত আবেগের অশ্লীল প্রকাশ, অন্যের মনের খবর রাখার ব্যাপারে অসংবেদী ঔদাসীন্য, নিয়তির সঙ্গে অসম নিত্যযুদ্ধ — এগুলো কিছু বাহারি শব্দবন্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়।
ঈশ্বর, প্রকৃতি বা কোনও অদৃশ্য শক্তি — যে যাকেই মানি না কেন, মহামূল্য প্রাণের সঙ্গে রোগ/শোক/দুর্যোগ ইত্যাদি নানা উপহার অযাচিতই দিয়েছেন আমাদের। তার উপর স্বাভাবিকভাবেই মানুষের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই।
এর সঙ্গে মানবসৃষ্ট যুদ্ধ, হত্যা, ধর্ষণ, আত্মহনন যদি অতিমারী রূপ ধারণ করে, ভবিষ্যৎ অনেক আলোকবর্ষ দূরের কথা, এই বিবর্ণ, পচে গলে যাওয়া বর্তমানটা তো সহস্র উৎসব আর উদযাপনের আলোতেও উজ্জ্বল হবে না।
আমরা কি একটু ভাবব এই নিয়ে? সবকিছুর দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে, সমাজের ঘাড়ে, প্রশাসনের ঘাড়ে ফেলে দেওয়ার আগে, অন্যের দিকে নিয়মিতভাবে অভিযোগের আঙুল তোলার আগে নিজেদের মনের ভিতরে সার্বিক অসন্তোষের, সর্বদা অন্যের সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর তুলনার যে কলুষিত ধারাটি বয়ে চলেছে, সেটিতে বাঁধ দেওয়ার ব্যাপারে কিছু ভাবব?










