অপরূপ নিসর্গের জন্য খ্যাত ভূস্বর্গ কাশ্মীর উপত্যকায় সন্ত্রাসবাদী হানা, ক্ষয়ক্ষতি এবং হত্যালীলা নতুন কিছু নয়। অতীতেও ছিল, বিগত ৩৬ বছর এর বাড়বাড়ন্ত। কিন্তু ২০১৯ থেকে কেন্দ্রের অধীনে চার স্তর নিরাপত্তার চাদরে মোড়া, ২০২৪ এ নির্বাচনের মাধ্যমে বিধানসভা ও সরকার গঠনের পর এবং কেন্দ্র সরকারের প্রচারের ফলে বাকি ভারতের ধারণা হয়েছিল কাশ্মীর স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তাই গত বছরের মত এবছরও পর্যটকদের ঢল নেমেছিল কাশ্মীর উপত্যকা এবং লাদাখ মালভূমিতে। শ্রীনগর, সোনমার্গ, গুলমার্গ ইত্যাদি অঞ্চল ঘুরে হাজারে হাজারে তারা আসছিলেন দক্ষিণ কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার নয়নাভিরাম লিডার নদী – উপত্যকা সংলগ্ন পাহালগাঁওতে। সেখান থেকে তাদের অনেকে যাচ্ছিলেন মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে তুষারশুভ্র শৃঙ্গরাজি এবং ঘন সবুজ পাইন বনের পটভূমিকায় সবুজ ঘাসের গালিচায় ঢাকা প্রসিদ্ধ কাশ্মীরি বুগিয়াল বৈসারণ উপত্যকাকে দেখতে। তারা ঘুণাক্ষরে ভাবতে পারেননি রাজ্যের উত্তর ও পশ্চিম নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে যথাক্রমে ১০০ ও ১৫০ কিমি অভ্যন্তরে এরকম নিরিবিলি প্রান্তরে সন্ত্রাসবাদী ঘাতকবৃন্দ অপেক্ষারত। গত ২২ এপ্রিল ‘রেজিস্ট্যান্স ফোর্স (TRF)’ নামে লস্কর-ই-তইবা (LeT) র ছায়া কাশ্মীরি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা অমুসলমান বেছে বেছে অন্য রাজ্য থেকে আসা ২৪ জন হিন্দু ও একজন খ্রিস্টান নিরপরাধ পর্যটক এবং বাধা দেওয়ায় একজন কাশ্মীরি মুসলমান সহিসকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিল।
এই ভয়ঙ্কর ও বিকারময় ঘটনায় সারা দেশ শোকে যেমন মুহ্যমান এবং তেমনই ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে এবং অপরাধীদের তৎক্ষণাৎ ধরতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ কেন্দ্র সরকার নিজেদের ভুল ও দায় স্বীকার না করে এবং কোন তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই পাকিস্তানের ঘাড়ে সমস্ত দোষ চাপিয়ে এবং সর্বস্তরে উগ্রজাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করল। আর সরকার কর্তৃক উত্তাপ ছড়ানোর ফলে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে দুই পরস্পর বৈরী প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্টি হল প্রবল উত্তেজনা, সংঘর্ষময় পরিস্থিতি এবং পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা। বিষয়টির গভীরে প্রবেশের আগে আমরা বানিহাল টানেল ধরে কাশ্মীরের জটিল ও অনন্য ভূ – রাজনৈতিক প্রেক্ষিতটা সংক্ষেপে একবার ঝালিয়ে নেই।
কাশ্মীরিয়াত ও ইনসানিয়াত এর জন্মঃ বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে বর্তমান কাশ্মীরের উল্লেখ আছে। অতীতে কারকাটা, ঊতপলা, লহরা প্রমুখ হিন্দু রাজবংশ বর্তমান কাশ্মীরে রাজত্ব করত। যার মধ্যে রাজা ললিতাদিত্য, অবন্তীবর্মণ কিংবা রানি দিদ্দা, কোটা রানি প্রমুখ খ্যাতিমান। এই সময় থেকেই গান্ধার ও কাশ্মীরে উদারপন্থী শৈব ভক্তি আন্দোলনের এবং কাশ্মীরিয়াতের সূত্রপাত। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে চার্বাকপন্থীদের মত তাঁরা বস্তু ও যুক্তিবাদী ছিলেন, বেদ মানতেন না, জাতিভেদ মানতেন না, তাঁদের কাছে সব মানুষ সমান ছিলেন। তাঁরা বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের কথা বলতেন। তাঁদের ৬৪ টি অগমিক প্রথা ছিল। এরপর হল বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার যা মৌর্য এবং কুশান দের সময় খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছিল। সম্রাট কনিস্কর সময় কাশ্মীরে তৃতীয় বৌদ্ধ সম্মেলন হয়। কলহন, অস্ব ঘোষ থেকে দ্রিধিবালা, সিতিকান্ত দর্শন, শিল্প, সাহিত্যেও কাশ্মীরকে শীর্ষে পৌঁছে দেন। রেশম পথে যাতায়াত ও বাণিজ্য ছিল তিব্বত, চিন, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে।
সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য, কম্বজ, সিন্ধ এবং ভারতভূমিতে ইসলামের বিজয়ের পর্বে কাশ্মীরেও ইসলামের প্রবেশ। ১৩৩৯ এ শাহ মীর প্রথম কাশ্মীরের সুলতান হন। সেই সময় থেকে ধর্মান্তরের শুরু। অন্য জায়গাগুলির মত তিনভাবেঃ (১) বলপূর্বক, (২) উচ্চবর্ণের সামন্তপ্রভু, মহাজন ও পুরোহিত দের শোষণ ও অত্যাচারে জর্জরিত দরিদ্র কৃষক, কারিগর ও শ্রমজীবীদের সমতাভিত্তিক ও সরল নতুন ধর্মে প্রবেশ এবং (৩) সুফি তারিকা ও খানকা গুলির প্রভাব। সেইসময় থেকে উচ্চবর্ণের রাজা ও সামন্তপ্রভুদের শাসন ও শোষণে সর্বস্বান্ত হতদরিদ্র কাশ্মীরি ভূমিদাসরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ১৫৮৬ – ১৭৫১ অবধি ছিল মুঘল শাসন। কাশ্মীর জাহাঙ্গীরের ছিল খুব পছন্দের। মুঘল শাসকরা কৃষির জন্য জলসেচের ব্যাবস্থা এবং বেশ কিছু উদ্যান নির্মাণ করেন। চাক বিদ্রোহীরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে ব্যর্থ হন। এরপর আফগান দুরানি রা ১৮১৯ অবধি শাসন করেন। মুঘল যুগে স্থিতাবস্থা বজায় থাকলেও আফগানদের সময়কার অরাজকতা এবং হিন্দুদের উপর অত্যাচার অনেক হিন্দুকে কাশ্মীরছাড়া করে।
এতসবের মধ্যেও প্রসিদ্ধ কাশ্মীরি শৈব ধারা স্বগর্বে বিরাজ করছিল। যার একজন প্রধান যোগিন ও সন্ত কবি ছিলেন লাল্লেশ্বরী অথবা লাল দেব। তাঁর রচিত প্রায় ৩০০ জনপ্রিয় কাব্য বা ‘বখ’ বা ‘বাতসুন’ এর সন্ধান পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি মুসলমান ভক্তি সাধকরা ঋষি আন্দোলন গড়ে তোলেন। মধ্য যুগের উদারতাবাদী ভক্তি ও সুফি আন্দোলনের প্রভাবে মানবতাবাদী সৌভ্রাতৃত্বের কাশ্মীরিয়াত ও ইনসানিয়াত দৃঢ়বদ্ধ হয়। এর মহান প্রচারকরা ছিলেন হাব্বা খাতুন, রূপা ভবানী, আরনিমল, মামুদ গামি, রসুল মির, পরমানন্দ প্রমুখ।
খালসা থেকে ব্রিটিশঃ শক্তিশালী শিখ নৃপতি মহারাজা রঞ্জিত সিংহ লাহোর, মুলতান, পেশোয়ারের পর ১৮১৯ এ কাশ্মীর দখল করে নেন। শিখ সাম্রাজ্যে প্রজাদের উপর নিপীড়ন বাড়ে। শিখ ও বর্ণহিন্দু জায়গিররা কৃষকদের রক্তচুষে আরও সম্পদশালী হয়ে ওঠেন। মুসলমানদের উপর দমন পীড়ন চলে। গোহত্যায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। রঞ্জিত সিংহের মৃত্যুর পর ব্রিটিশরা ১৮৪৬ এ শিখদের পরাজিত করে সাত বছরের বালক রাজা দলীপ সিংহের সঙ্গে অপমানজনক লাহোর চুক্তি করে এবং জম্বুর সুযোগসন্ধানী ডোগরি রাজা গুলাব সিংহের সঙ্গে অমৃতসরের চুক্তি করে বিভিন্ন সুবিধা ও সমর্থনের বিনিময়ে তাকে কাশ্মীরের সিংহাসনে বসায়। ব্রিটিশ সহযোগী গুলাব সিংহ ১৮৫৭ এর মহাবিদ্রোহে ব্রিটিশের পাশে দাঁড়ায়। তাঁর চতুর্থ প্রজন্মের উত্তরাধিকারী হরি সিংহ ১৯২১ এ কাশ্মীরের রাজা হন।
ওয়াল্টার লরেন্স, টিন্ডেল বিস্কাও, প্রেমনাথ বাজাজ, গয়াশলাল কল, রবার্ট ডাল, অ্যালস্টেয়ার ল্যাম্ব, ইশাক খান, রিতা মানচন্দা প্রমুখ কাশ্মীর বিষয়ক মিশনারি, ভূপর্যটক, লেখক, বিশেষজ্ঞ প্রমুখের প্রতিবেদনগুলি থেকে জানা যায় রাজতন্ত্রের অনুগত বর্ণহিন্দু অনুপস্থিত ভূস্বামী এবং তাদের দালালদের অত্যাচারে বেগার খাটা হতদরিদ্র মুসলমান ভূমিহীন কৃষি মজুররা নীরবে খেটে যেত (Dumb Driven Cattle)। অমলিন পোশাকে ঘিঞ্জি নোংরা মহল্লাগুলিতে বাস করত। তারা নিরক্ষর ছিল। তাদের দেখার কেউ ছিলনা। কিছু কাশ্মীরি যুবক বাইরে থেকে শিক্ষিত হয়ে এসে ১৯৩০ নাগাদ ‘রিডিং রুম এসোসিয়েশন’ এবং ‘ইয়ং মেন মুসলিম এসোসিয়েশন’ গড়ে তোলেন। তাঁদের নেতা ছিলেন জম্বু, লাহোর ও আলিগড় থেকে উচ্চশিক্ষা করে আসা স্কুল শিক্ষক শেখ আবদুল্লা। ১৯৩১ এ তাঁরা কৃষকদের দাবি নিয়ে রাজাকে অভিযোগপত্র জমা দিতে গেলে পুলিশ সমাবেশে গুলি চালিয়ে ২১ জনকে হত্যা করে। অত্যাচারী ডোগরি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই প্রথম সাধারণ মানুষ গর্জে ওঠেন। শ্রীনগরের মাইসুমা বাজারের মহিলারা প্রতিবাদ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন যাদের আবার একই ভুমিকায় দেখা যায় ১৯৮৯ এর ইন্তিফিদায়। এই পরিস্থিতিতে ১৯৩২ এ শেখ আবদুল্লা, ইয়ুসুফ শাহ ও গুলাম আব্বাসের নেতৃত্বে ‘অল জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর মুসলিম কনফারেন্স (AJ&KMC)’ গড়ে উঠে ভূমি সংস্কারের দাবিতে শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলে।
তার সময়ে কৃষক বিদ্রোহ এবং ‘ডোগরি রাজা হটো’ আন্দোলন চলায় রাজা হরি সিংহ বাঙ্গালি মন্ত্রী এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি লাল গোপাল মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে প্রজারঞ্জক সংবিধান প্রবর্তন এবং চতুর্থ পত্নী তারা দেবী সাহেবার প্রভাবে কিছু শাসন সংস্কার করতে বাধ্য হন। হরি সিংহ লন্ডনের গোল টেবিল বৈঠকে উপস্থিত থেকে ভারতীয় রাজ্যগুলির কনফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব দেন।
ভূস্বর্গের প্রতি শ্যেন দৃষ্টিঃ প্রায় ২,২৪,৭৩৯ বর্গ কিলোমিটার চারিদিকে স্থলবেষ্টিত স্বাধীন পাহাড়ি রাজ্য কাশ্মীর ভূ রাজনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উত্তর – পশ্চিম থেকে দক্ষিণ – পূর্ব আড়াআড়ি চলে যাওয়া পশ্চিম হিমালয় এবং তাকে চিরে বিবিধ উপনদী সমেত পশ্চিম প্রবাহিনী সিন্ধ, ঝিলাম আর চেনাব নদী ও তাদের উপত্যকা, গিরিবর্ত্ম, সবুজ বনানী; পশ্চিমে তুষারাবৃত পীরপাঞ্জাল থেকে দক্ষিণে অন্তরহিমালয় ও ধউলাধর পর্বত বেষ্টিত এই বিচ্ছিন্ন, জনবিরল, শান্তিপূর্ণ রাজ্যের উত্তর পশ্চিমে ছিল আফগানিস্তান ও তাজিকিস্তান সহ কারাকোরাম ও পামির পর্বত শ্রেণী। পশ্চিমে পাস্তুন সহ উপজাতি প্রধান ব্রিটিশ ভারতের ‘উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ’ এবং দক্ষিণে পাঞ্জাব। উত্তর ও পুবে অল্পকিছু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী তিব্বতী ও শিয়া মুসলমান জনজাতি বাস করা লাদাখ মালভূমি যার উত্তরে সালতর সহ একের পর এক তুষারাবৃত শৈলশিরা চিরে পূর্ববাহিনী নুব্রা, শায়ক ও জাস্কর নদী। তার উত্তর পূর্বে কুয়েনলুন পর্বত ও চিন। পুবে তিব্বত। সেই কারণে ব্রিটিশ, চিন, আফগানিস্তান সবার দৃষ্টি ছিল এই সীমান্তবর্তী রাজ্যের প্রতি। অন্যদিকে ব্রিটিশের সমর্থন পেয়ে উপমহাদেশে বেড়ে ওঠা বিবাদমান দুই নেতা নেহরু ও জিন্নার অভিলাষ ছিল কাশ্মীর উপত্যকাকে তাদের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করা।
কাশ্মীরি পণ্ডিত নেহরুর প্রপিতামহ রাজ কাউল কাশ্মীর থেকে দিল্লিতে আসেন। ব্রিটিশের সঙ্গে দেশ ভাগাভাগির বৈঠকে উভয়েই কাশ্মীরকে দাবি করেন। সেই থেকে কাশ্মীর উচ্চাকাঙ্খী ভারতীয় ও পাক শাসকদের যথাক্রমে ‘অটুট অঙ্গ’ (Integral Part) এবং ‘শাহ রগ’ (Jugular Vein)। ১৯৪১ এ ব্রিটিশ সরকার যে সেন্সাস করিয়েছিল তাতে জম্বু ও কাশ্মীরের ৩৯.৪৫ লক্ষ অধিবাসী। যার মধ্যে মুসলমান ধর্মাবলম্বী ৭৫.৯৭%, হিন্দু ২০.৪৮%, বৌদ্ধ ২.১৬%, শিখ ১.৩৯% ছিলেন। কাশ্মীরি মুসলমানদের মধ্যে বেশি ছিলেন সুন্নি ধারার। কাশ্মীরি হিন্দুদের মধ্যে ব্রাহ্মণ কাশ্মীরি পণ্ডিত, রাজপুত, ক্ষত্রী এবং ঠক্কর। কাশ্মীর উপত্যকার তুলনায় জম্বুর জনঘনত্ব বেশি ছিল। সেখানকার পাহাড়ি অঞ্চলে মুসলমান পশুপালক গুজ্জর, বাকেরওয়াল ও ধর্মান্তরিত রাজপুতরা এবং সমতলে শিক্ষা ও অর্থনীতিতে তুলনামূলক এগিয়ে থাকা হিন্দু আর শিখরা প্রধানত বাস করত।
ঘটনাবহুল চল্লিশের দশকঃ সেই সময় পৃথিবী জুড়েই দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ঘনঘটা। ভারতে তার প্রভাব সহ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা। স্বাধীনতা সংগ্রাম জোরালো হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে ভারত ছাড়ো আন্দোলন। এছাড়াও তেভাগা, তেলেঙ্গানা, পুন্নাপ্রা ভায়লার প্রভৃতি জায়গায় কৃষক সংগ্রাম; সাতারার প্রতি সরকার; আজাদ হিন্দ বাহিনীর বর্মার জঙ্গল পাহাড় ভেদ করে মণিপুর – নাগাল্যান্ডে আগমন; নৌ বিদ্রোহ। আবার এগুলিকে প্রতিহত করতে ব্রিটিশ পরিকল্পনায়, মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার সক্রিয় সহায়তায় এবং কংগ্রেস নেতৃত্বের নীরব প্রশ্রয়ে একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রক্তবন্যা। এর সঙ্গে ব্রিটিশ ও ইস্পাহানি সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ। বহু প্রাণহানী। এইসব ঘটনার প্রভাব সুদূর উত্তরের পাহাড় ঘেরা ঠাণ্ডা আবাহাওয়ার গরীব কৃষিজীবী ও পশুপালক অধ্যুষিত এই রাজ্যের জনজীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারল না। তবে এই আন্দোলনগুলির প্রভাবে ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স (NC)’ শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বে রাজতন্ত্র বিরোধী ‘কুইট কাশ্মীর’ রাজনৈতিক এবং ভূমি সংস্কার নিয়ে জোরালো কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলল। ইতিমধ্যে ১৯৩৯ এ AJ&KMC NC হয়েছে এবং গুলাম আব্বাস গোষ্ঠী বেরিয়ে গিয়ে মুসলিম কনফারেন্স (MC) তৈরি করে মুসলিম লীগে যুক্ত হয়। পরে তাদের একাংশ ‘জম্বু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট (JKLF) গঠন করে ‘আজাদ কাশ্মীরের’ দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। অন্যদিকে NC, কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (CPI) এবং কংগ্রেস সোশালিস্ট পার্টির (CSP) কর্মসূচিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৪৪ এ ‘নিউ কাশ্মীর ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশ করে।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও মুনাফা বজায় রেখে বিশাল ভারতীয় উপনিবেশকে ছেড়ে যাওয়া মনস্থ করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা। একইসঙ্গে ভারতীয়দের ঐক্য চিরতরে ধ্বংস করতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও দাঙ্গা ঘটিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র বাংলা ও পাঞ্জাবকে ভাগ এবং দেশটিকে তিন টুকরো করে সহযোগী কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতাদের ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রিটিশ উপনিবেশ সরকার কর্তৃক সহযোগী – জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভা; রাজা, জমিদার, সামন্তপ্রভু এবং বিড়লা, ঠাকুরদাস, ইস্পাহানি, হাজি দাউদজী প্রমুখ বড় ব্যাবসায়ীদের সহায়তায় দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে টুকরো করে ১৫ ও ১৬ আগস্ট ১৯৪৭ এ জন্ম দেওয়া হয় জন্মবৈরী দুটি দেশ – ভারত ও পাকিস্তান। এতদিন অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কাজে লাগালেও জিন্নার ভাগ্যে জোটে তার ভাষায় পোকায় খাওয়া পাকিস্তান। বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে থাকা কাশ্মীর বাদে ৫৬৫ টি করদ রাজ্যের (সমগ্র ভারত ভূখণ্ডের ৪৫%) মধ্যে হায়দ্রাবাদ ও জুনাগড় বাদে বাকিরা ভারতে অন্তর্ভুক্ত হতে চায়। সেনা পাঠিয়ে এবং কূটনৈতিক দৌত্যে হায়দ্রাবাদ ও জুনাগড়কেও ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রধানমন্ত্রী হওয়া এডুইনা-বান্ধব জওহরলাল নেহরু খুশি হয়ে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরও মাউন্টব্যাটনকে ১৯৫০ অবধি তিন বছর ভারতের গভর্নর জেনারেল করে রাখেন। অন্যদিকে লিয়াকত আলি খানকে প্রধানমন্ত্রী করে জিন্না পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হন। একমাত্র কাশ্মীর রাজ্য কোন দিকে যোগ না দিয়ে স্বাধীন থেকে যেতে চায়।
কাশ্মীরে জঙ্গি হানা, কাশ্মীরের ভারত ভুক্তি এবং ভারত – পাক যুদ্ধঃ এরপর ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীরকে অন্তর্ভুক্তির জন্য চাপ দিতে থাকে। রাজা হরি সিংহ এই প্রবল চাপের কাছে নতজানু না হয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আবস্থান নেন। তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে ‘স্ট্যান্ড স্টিল’ চুক্তি করেন, ভারত চুক্তিবদ্ধ হতে অস্বীকার করে। পাকিস্তানের ‘কায়েদ-ই-আজম’ ও ‘বাবা-ই-কোয়াম’ জিন্না যিনি দুরারোগ্য যক্ষ্মায় ভুগছিলেন, পাকিস্তান গঠনের এক বছরের মধ্যেই মারা যাবেন, কাশ্মীর নিয়ে অধৈর্য হয়ে উঠেছিলেন। দেশভাগের পরপরই পাকিস্তানি সেনা কয়েক হাজার পাস্তুন ও অনান্য উপজাতির জঙ্গিদের অস্ত্র দিয়ে কাশ্মীর দখল করতে পাঠিয়ে দেয়। প্রসঙ্গত সেই সময় ভারত ও পাকিস্তানের সেনা প্রধান ছিলেন দুই ব্রিটিশ জেনারেল। জঙ্গিরা খুন, ধর্ষণ, লুঠপাট, অগ্নি সংযোগ করতে করতে বারামুল্লা অবধি পৌঁছে যায়। চূড়ান্ত বিপদ বুঝে হরি সিংহ মাউন্টব্যাটনের সাহায্য চান, শ্রীনগর থেকে জম্বু চলে যান এবং ২৬ অক্টোবর, ১৯৪৭ ভারতভুক্তিতে সই করেন। ভারত সরকার তার তরুণ পুত্র কর্ণ সিংহ কে কাশ্মীরের আশ্রিত রাজার মর্যাদা দিয়ে জম্বুতে রেখে হরি সিংহ কে বম্বেতে নির্বাসিত করে।
এরপরে ভারত বিমানে করে কাশ্মীরে সেনা পাঠায়। ততদিনে অত্যাচার ও ধ্বংস করতে করতে জঙ্গিরা শ্রীনগর বিমানবন্দর অবধি পৌঁছে গেছে। তাদের সেখান থেকে কিছুটা পিছু হটিয়ে দেওয়া হয়। ভারতের সেনাদের সঙ্গে শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবকরাও পাকিস্তানি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ১৯৪৭ – ‘৪৮ এর প্রথম ভারত-পাক যুদ্ধে পাক মিলিশিয়া ও সেনারা ভারতীয় সেনা বাহিনীর কাছে পরাজিত হলেও কাশ্মীরের যে অঞ্চলগুলি দখল করে রাখে সেগুলি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পাকিস্তানের উত্তর ও উত্তর – পূর্বে (১) গিলগিট – বাল্টিস্তান এবং পূর্বে (২) আজাদ কাশ্মীর নামে দুটি প্রদেশের সৃষ্টি হয়। এই অঞ্চলকে ভারত ‘পাক অকুপাইড কাশ্মীর’ (POK), বাকি বিশ্ব ‘পাক অ্যাডমিনিস্টারড কাশ্মীর’ (PAK) নামে অভিহিত করে। এদের সীমান্তই হয়ে যায় ভারত – পাক সীমান্ত (LOC থেকে LAC)। এভাবে কাশ্মীরের ৮৫,৮৪৬ বর্গ কিমি চলে যায় পাকিস্তানের দখলে এবং ভারতের দখলে থাকে ১,০১,৩৩৮ বর্গ কিমি (IAK)। এরপর কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তান ১৯৪৮ – ‘৪৯ পর্যায়ে রাষ্ট্রপুঞ্জে খুব সক্রিয় হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জ একসময় কাশ্মীরে গণভোটের (Plebiscite) প্রস্তাব দেয়। ভারত সেটি এবং কাশ্মীর নিয়ে কোন তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা খারিজ করে। অন্যদিকে পাকিস্তান আমানুল্লা খান প্রমুখের নেতৃত্বে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ‘আজাদ কাশ্মীর’ (সমগ্র কাশ্মীরের স্বাধীনতা) আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমন করে পাক অধিকৃত কাশ্মীর থেকে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর উপত্যকায় ভারত বিরোধী জঙ্গি আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদ এবং ছায়া যুদ্ধে (Proxy War) মদত দিতে থাকে। ভারতীয় কাশ্মীরে একদিকে সাধারণের দারিদ্র এবং ভুস্বামী, ব্যাবসায়ী, ঠিকাদার দের শোষণ, প্রশাসনের দুর্নীতি ও সামরিক বাহিনীর দমন, অন্যদিকে সীমানার দুদিকেই একই কাশ্মীরি জাতি ও একই ইসলাম ধর্ম হওয়ায় পাকিস্তানের এই কাজটা সহজ হয়ে যায়।
ভারতের কাশ্মীরঃ নেহরু – প্যাটেল দের সঙ্গে দীর্ঘ দর কষাকষির পর মেহের চাঁদ মহাজনকে সরিয়ে শেখ আবদুল্লাকে কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী করা হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৩ অবধি কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি স্বায়ত্বশাসন (Self-determination) এবং আমূল ভূমি সংস্কারের উপর জোর দেন। ১৯৫২ তে কাশ্মীরের জন্য ৩৭০ এবং ৩৫ এ ধারা জারি হয় যাতে কাশ্মীর বিশেষ মর্যাদা; নিজস্ব – সংবিধান, আইন, পতাকা, স্বায়ত্বশাসন এবং আভ্যন্তরীণ শাসন ক্ষমতা অর্জন করে। কাশ্মীরে কোন অকাশ্মীরি স্থায়ীভাবে থাকার অধিকার হারায়। জনসঙ্ঘ নেতা সাংসদ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই ধারার বিরোধিতা করে কাশ্মীর অভিযান করে ১৯৫৩ তে রহস্যজনকভাবে মারা যান। একটি পর্যায়ে আবদুল্লাহ NC কে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে মিশিয়ে দেন। কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে এই মাখামাখি অচিরেই বন্ধ হয়। কারণ তার আগেই তিনি ১৯৫০ এ ‘বিগ ল্যান্ডেড এস্টেটস এবলিশন অ্যাক্ট’ চালু করে কংগ্রেস আশ্রিত ভুস্বামীদের রুষ্ট করেছেন। দেশ বিরোধিতার অভিযোগে কাশ্মীরের এই জনপ্রিয় নেতা ১৯৫৩ – ১৯৬৪ কারাবন্দি এবং ১৯৬৫ – ১৯৬৮ গৃহে অন্তরিন থাকেন। পরে নির্বাচিত হয়ে ১৯৭৫ – ৮২ অবধি জম্বু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী থাকেন।
তার মৃত্যুর পর পুত্র ফারুক আবদুল্লা তিনবার এবং পৌত্র ওমর আবদুল্লাহ দুবার NC র তরফে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ – ৬৫ অবধি NC এর বকশি গুলাম মহম্মদ তিনবার ও খাজা সামসুদ্দিন একবার এবং কংগ্রেসের গুলাম মহম্মদ সাদিক একবার প্রধানমন্ত্রী থাকেন। ১৯৬৫ থেকে পদটি মুখ্যমন্ত্রী হলে নয়বার NC, চারবার কংগ্রেস, তিনবার PDP এবং একবার ANC সরকার গঠন করে। ১০ বার গভর্নরের শাসন লাগু করতে হয়। ২০১৯ থেকে জম্বু কাশ্মীর কে কেন্দ্রশাসিত রাজ্য এবং লাদাখকে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল করা হয় এবং ৩৭০ ধারার বিশেষ মর্যাদা তুলে দেওয়া হয়। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে বিগত ৭৮ বছরে কাশ্মীর নিয়ে প্রচুর পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং তথাকথিত উন্নয়নের কাজ হয়েছে, কিন্তু তাতে ক্ষমতাসীন ও তাদের সহযোগী কিছু মানুষ উপকৃত হলেও ব্যাপক সাধারণ কাশ্মীরিরা বিচ্ছিন্ন থেকেছেন। এতদিন কাশ্মীর নিয়ে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, সঙ্গে ছিল কাশ্মীরিদের একাংশ। এখন ভারতীয় সেনাদের কাশ্মীরিদের একাংশের এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। কাশ্মীর ধারাবাহিকভাবে অশান্ত থাকছে এবং দেশি – বিদেশি সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গি কার্যকলাপের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। কার্যত সামরিক বাহিনী দিয়েই কাশ্মীরকে ধরে রাখা হয়েছে।
চিনা আগ্রাসনঃ ১৯৪৯ সালের সফল বিপ্লবের পর কম্যুনিস্ট চিন ১৯৫০ -‘৫১ তে ১২.৩ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল আয়তনের ১৬ হাজার ফুট গড় উচ্চতার তিব্বত দখল করে নেয়। চিন কখনই ব্রিটিশকৃত চিন – ভারত কল্পিত সীমান্ত ‘ম্যাকমোহন লাইন’কে মান্যতা দেয়নি। চাচা নেহরুর ‘হিন্দি – চিনি ভাই ভাই’ প্রগলভতাকে নস্যাৎ করে ১৯৬২ এর যুদ্ধে চিন ভারতকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে এবং কাশ্মীরের লাদাখ সংলগ্ন ৩৭,৫৫৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের আকসাই চিন দখল করে নেয়। চিন, কাশগড় – খুঞ্জেরাব পাস AH4 মহাসড়ককে কারাকোরাম ট্র্যাক্ট এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরের গিলগিট – বাল্টিস্তানের মধ্যে দিয়ে আরও বাড়িয়ে (N35) পাকিস্তানের বালুচিস্তানের গ্বাদর আরব সাগরের গভীর বন্দর পর্যন্ত নিয়ে যায়। ৩১০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এই হাইওয়ে নির্মাণ ১৯৫৯ এ শুরু হয়ে ১৯৭৯ তে শেষ হয়। অন্যদিকে চিন আকসাই চিন ও গালওয়ানের মধ্যে দিয়ে জিন জিয়াং (সিন কিয়াং) – জি জ্যাং (তিব্বত) G219 মহাসড়ক নির্মাণ করে।
১৯৬৩ তে পাকিস্তান পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ৫,১৮০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের শাক্সগ্রাম অঞ্চলকে চিনের হাতে তুলে দেয়। ১৯৬৭, ‘৭১, ‘৭৫, ‘৮৭, ২০১৩ ও ২০১৭ তে চিনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত সংঘর্ষ হয়। নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে পাঁচবার এবং প্রধানমন্ত্রী হিসাবে চারবার মোট নবার চিনে গিয়েও, চিনের সর্বচ্চ নেতা শি জিনফিং কে ভারতে দুবার এনেও এবং ভারতীয় বাজারকে চিনা পণ্যের জন্য অবারিত করেও চিনা আগ্রাসনের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে পারেননা। ২০২০ তে চিন লাদাখের গালওয়ান ও প্যাঙ্গং হ্রদ অঞ্চলে পুনরায় সীমান্ত সংঘর্ষের পর বেশ কিছুটা ঢুকে পড়ে। এরফলে সরু সুতোর মত একখণ্ড জমি দিয়ে সংযুক্ত ভারতের কাশ্মীরের উত্তর প্রান্তিক বায়ুসেনা ঘাঁটি দৌলত বেগ ওল্ডির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। চিন নিজেদের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক সামরিক নির্মাণ করলেও ভারতীয় অংশে নির্মাণে বাধা দিতে থাকে।
পরবর্তী ভারত – পাক যুদ্ধগুলিঃ লাল বাহাদুর শাস্ত্রী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ১৯৬৫ তে জঙ্গিদের সামনে রেখে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কাশ্মীর আক্রমণ করলে দ্বিতীয় ভারত – পাক যুদ্ধ শুরু হয়। ভারতীয় সেনারা প্রবল পরাক্রমে পাক সেনাদের হটিয়ে দিয়ে লাহোর অবধি পৌঁছে যান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরের স্ট্রাটেজিক হাজি পীর দখল করে নেন। রাষ্ট্রপুঞ্জ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্ততায় যুদ্ধ বন্ধ হয়। তাসখন্দ চুক্তি অনুযায়ী ভারত সমস্ত দখলিকৃত জমি ফেরত দেয়।
ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ১৯৭১ এ পাকিস্তান একদিকে পশ্চিম ও উত্তর ভারতের আটটি বায়ুসেনা ঘাঁটি আক্রমণ করে এবং অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানে নারকীয় অত্যাচার ও হত্যাকাণ্ড চালায়। পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধ শুরু হলে পশ্চিম রণাঙ্গনে পাকিস্তান শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং ভারত ১৫,০১০ বর্গ কিলোমিটার জমি দখল করে। পূর্ব রণাঙ্গনে মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে পাক সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে। আত্মসমর্পণকারী প্রায় এক লক্ষ পাক সেনাকে ভারত ফেরত দেয়। সিমলা চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানকেও সব জমি ফেরত দেয়।
১৯৮৪ থেকে লাদাখের উত্তরে সালতরা রেঞ্জের সিয়াচেন হিমবাহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অতি উচ্চতায় ভারত – পাক যুদ্ধ শুরু হয় যা বহু ক্ষয়ক্ষতির পর ২০০৩ এ ভারত পাক সেনাদের হটিয়ে হিমবাহের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী প্রতিবেশী চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্কের উদ্যোগ নেন। অকস্মাৎ ১৯৯৯ তে পাকিস্তান শ্রীনগর ও লেহ এর মধ্যবর্তী কার্গিল, দ্রাস, বাতালিক প্রভৃতি অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ শৃঙ্গ ও আউট পোস্ট দখল করে নেয়। ভারতীয় সেনা অনেক কৃতিত্ব দেখিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের হটিয়ে দেয়।
কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হতে পারত যদি ভারত পাকিস্তানের মধ্যে মৈত্রী হত। কিন্তু পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করা মার্কিন, পাক সেনা বাহিনী ও মোল্লারা যেমন তা চাননি, ভারতীয় রাজনীতিকরাও চাননি। কারণ উভয়ের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান অস্ত্র পরস্পর বিরোধিতা, মার্কিনের উদ্দেশ্য দুপক্ষকে অস্ত্র বিক্রি। ফলে দুই গরীব দেশের জনগণ কে বঞ্চিত করে উভয়ের সামরিক বাজেট বেড়েই চলেছে। ব্যতিক্রমভাবে বাজপেয়ী ও ইমরান খান উদ্যোগ নিয়েছিলেন, মুসারফ ও মোদী তা ব্যর্থ করেন। উপরোক্ত যুদ্ধগুলি ছাড়াও ১৯৮০ সহ বহু সময় দুপক্ষের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর উপর ভারত ১৯৭৪ এ এবং পাকিস্তান ১৯৭৮ এ পরমাণু অস্ত্র অর্জন করে।
১৯৮৯ – ‘৯০ এর ইন্তিফিদা এবং পরবর্তী সন্ত্রাসঃ ১৯৮৯ – ‘৯০ এ বাম ও বিজেপি সমর্থিত কেন্দ্রের ভিপি সিংহ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন কাশ্মীরের মুফতি মহম্মদ সইদ এবং কাশ্মীরের প্রশাসক ছিলেন জগমোহন। এই সময় JKLF এর নেতৃত্বে ‘আজাদির’ দাবিতে এক সশস্ত্র গণ বিদ্রোহ সংগঠিত হয় যা সাধারণ কাশ্মীরিদের সমর্থন পায়। হাজার হাজার মহিলাও অংশ নেন। গেরিলা লড়াই চলতে থাকে। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় সামরিক বাহিনী তা প্রশমিত করলেও ১৯৯২ – ‘৯৩ থেকে তাদের জায়গা নেয় পাকিস্তানপন্থী ইসলামি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিজব-উল মুজাহিদীন। তারা সামরিক বাহিনী ছাড়াও বেছে বেছে হিন্দু, শিখ, অন্য রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিক এবং পুন্যারথীদের হত্যা করতে থাকে। সেই সময় কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দা তিন লক্ষ কাশ্মিরী পণ্ডিত কাশ্মীর ছাড়তে বাধ্য হন। ২৩০ জন কাশ্মিরী পণ্ডিতকে হত্যা করা হয়। এদের পাশাপাশি মৌলবাদী লস্কর-ই-তৈবা, জইশ-ই-মহম্মদ, হরকত-উল-মুজাহিদিন প্রভৃতি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি পাকিস্তানের আইএসআই ও সেনা বাহিনীর মদতে কাশ্মীর উপত্যকায় শক্তিবৃদ্ধি করে জঙ্গি হামলা এবং নির্বাচিত নরহত্যা শুরু করে। ওয়ানধামা, চাপনারি, প্রাণকোট, চাম্বা, কালুচক, নান্দীমার্গ প্রভৃতি জায়গায় একের পর এক নির্বাচিত গণহত্যা সংঘটিত হতে থাকে। পুরো দশক জুড়েই জঙ্গিদের তাণ্ডব চলতে থাকে যাতে অংশ নেয় পাক, আফগান প্রভৃতি পেশাদার জঙ্গিরাও। আর এদের দমন করতে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীও দমন পীড়ন চালায়। একটি সরকারি সূত্রে জানা যায় যে এই সময় ১৫,৯৩৭ জন জঙ্গি, ১৩,৫০০ নিরপরাধ মানুষ এবং ৪,৬০০ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মারা যান। নিখোঁজের সংখ্যা আট হাজার। কোন কোন মতে ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা দ্বিগুণ।
১৯৯৯ তে জঙ্গিরা ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স এর বিমান ছিনতাই করে কাবুলে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছু জেলবন্দী জঙ্গি নেতাকে ছাড়িয়ে নেয়। ২০০০ সালে চিত্তিসিংপুরার একটি শিখ গ্রামকে পুরুষ শূন্য করে দেওয়া হয়। ২০০১ এ ভারতের সংসদ আক্রান্ত হয়। বিভিন্ন সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প আক্রান্ত হতে থাকে। ২০১৪ তে পুলয়ামায় সিআরপিএফ কনভয়ে বড়সড় আক্রমণ ঘটে। আবার উরিতে ২০১৬ তে আর্মি ক্যাম্প এর উপর জোরালো আঘাত হানা হয়। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ও সামরিক দমন পীড়নে বহু মানুষ হতাহত হন, বহু মানুষ বন্দী থাকেন, মানব অধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ আসে। জঙ্গিপনা ও রাষ্ট্রের অভিঘাতে গণতান্ত্রিক ও প্রতিবাদী কণ্ঠগুলি স্তব্ধ হয়। সুজাত বুখারির মত সাংবাদিকদের হত্যা করা হয়।
ভূস্বর্গ যখন কাঁটার মুকুটঃ একের পর এক কাশ্মীরি দলগুলির সরকার, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প (প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন তহবিল থেকে ৬৩ টি প্রকল্পে ৮০,০০০ কোটি; বর্তমান আর্থিক বছরে ১৫,৭১৯.৪০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ; শিল্প উন্নয়নে পৃথক ২৮,০০০ কোটি; বারামুল্লাহ অবধি রেল সহ উন্নত যোগাযোগ প্রকল্প ইত্যাদি), ৩৭০ ধারা লাগু কিংবা তোলা, ১৯৭২ ও ১৯৭৬ এ প্রযুক্ত ‘জে & কে অ্যাগ্রারিয়ান রিফরম অ্যাক্ট ১ ও ২’, ধারাবাহিক সেনা অভিযান (ভারতীয় সেনার তিন বাহিনী এবং তাদের ParaSF, MARCOS, AFSOD, NSG, Garud প্রমুখ এলিট কমান্ডো; Rashtriyo Rifles; CAPF, BSF, CRPF, SSB, ITBP; JK Police ও তার Special Operation Force সমেত সাত লক্ষের বেশি নিরাপত্তা কর্মী), তাদের Search and Cordon, ২০১৬ ও ‘১৯ এর নাটকীয় সারজিকাল স্ট্রাইক ও বালাকোট অভিযান ইত্যাদি কোনভাবেই দিল্লির শাসকরা কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদকে আটকাতে পারছেননা। ১ কোটি ২৫ লক্ষ জনসংখ্যার, দুনিয়ার সবচাইতে বেশি সামরিক শক্তির অবস্থানপূর্ণ এবং উপর্যুপরি সন্ত্রাসবাদে জর্জরিত, কাশ্মীর তাই অন্ধকারে মুক্তির পথ হাতড়াচ্ছে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কাশ্মীরিয়াত ও ইনসানিয়াত এর পরিবর্তে প্রবল ভারত বিরোধিতা এবং ইসলামি মৌলবাদ সমাজ – রাজনীতিকে আচ্ছন্ন করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক ধারাগুলির মধ্যে ১৯৯৩ তে বিভিন্ন ইসলামি, প্রাক্তন জঙ্গি প্রমুখ ২৬ টি সংগঠনকে নিয়ে মিরয়াজ ওমর ফারুক ও আলি শাহ গিলানির নেতৃত্বাধীন পাকপন্থী ‘হুরিয়াত কনফারেন্স’ সমগ্র উপত্যকায় খুবই প্রভাবশালী। এছাড়াও সংসদীয় JKNC, JKPDP, CPIM, JKANC প্রমুখ সংগঠন কে নিয়ে ২০১৯ এ ঘোষিত হয়েছে ‘গুপকার ডিক্লারেশন’। বিজেপি, জাতীয় কংগ্রেস প্রভৃতি জাতীয় দল হিন্দু প্রধান জম্বু ছাড়া কাশ্মীর উপত্যকার জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোন কোন বিশেষজ্ঞ মনে করেন পাঞ্জাবের কৃষক আন্দোলন আসলে পাঞ্জাবের ধনী কৃষকদের সঙ্গে ভারতীয় বৃহৎ পারিবারিক পুঁজির দ্বন্দ্ব, সেরকমই কাশ্মীরের নতুন করে সন্ত্রাস বৃদ্ধি আসলে ৩৭০ ধারা অবসানে কাশ্মিরের ধনী ব্যবসায়ী, বাগিচা মালিক এবং পর্যটন ব্যাবসার মালিকদের সঙ্গে কাশ্মীরে থাবা বসানো ভারতীয় বৃহৎ পারিবারিক পুঁজির দ্বন্দ্ব। যাই হোক না কেন, জটিল কাশ্মীর সমস্যার আজ অবধি সমাধান মেলেনি। তাই স্বাধীনতার সময় থেকে ভূস্বর্গ কাশ্মীর ভারতীয় শাসকদের যেমন কাঁটার মুকুট, তেমনই পাকিস্তানি শাসকদের অধরা স্বপ্ন এবং সাধারণ কাশ্মীরিদের কাছে বধ্যভুমি হিসাবেই রয়ে গেছে।
০২.০৫.২০২৫
সূত্রঃ
১) Kashmir: Roots of Conflicts, Paths to Peace – Sumantra Bose;
২) Kashmir: The Partition Trilogy – Monreet Sodhi;
৩) Kashmir: Untold Story – Iqbal Chand Malhotra;
৪) Kashmir: Untold Story – Christopher Snedden;
৫) Kashmir: Untold Story – Humra Qureshi;
৬) Solving Kashmir – Mohan Bhandari;
৭) Kashmir at the Crossroads – Sumantra Bose;
৮) The Generation of Rage in Kashmir – David Devadas;
৯) Kashmir The Troubled Frontiers – Afsir Karim;
১০) Kashmir in Conflict – Victoria Schafield;
১১) Understanding Kashmir and Kashmiris – Christopher Snedden;
১২) Kashmir Dispute – Shabir Chowdhury;
১৩) দর্শনের দরবারে (দ্বিতীয় খণ্ড) – অরণি সেন;
১৪) ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড) – অরণি সেন।











প্রয়োজনীয় লেখা।