ভারতে সেক্যুলারবাদ এর উদ্ভব হয়েছিল উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্বের হাত ধরে। জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক ওইসব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বুঝেছিলেন যে ভারত নামক জাতি রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে সেক্যুলার হতেই হবে। যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই ১৯৩১ সালে কংগ্রেসের করাচি সম্মেলনের প্রস্তাবে যেখানে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয় যে স্বাধীন ভারতের প্রতিটি নাগরিক বিবেক অনুসারী ও নির্বাধে স্বধর্ম আচরণ ও পালনের স্বাধীনতা ভোগ করবেন, জাত, বিশ্বাস ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সব নাগরিক আইনের চোখে সমান গণ্য হবে, বিশ্বাস বা জাতের কারণে সরকারি নিযুক্তি, সাম্মানিক বা ক্ষমতাপূর্ণ কোনও পদ, ব্যবসা বা পেশার ক্ষেত্রে কোনো নাগরিকের অধিকার ক্ষুন্ন হবে না এবং রাষ্ট্র সমস্ত ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষ আচরণ করবে।
কংগ্রেস সহ অন্যান্য সেক্যুলারবাদী দলগুলি যেমন সোসালিষ্ট পার্টি, ও বামপন্থীরা স্বাধীনতার আগে থেকেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে জাত পাত ধর্মের ভিত্তিতে নানা ভাগে বিভক্ত ভারতবাসীকে একটি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ করতে গেলে সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা বর্জন করে সেক্যুলার না হয়ে উপায় নেই,ঠিক একই রকম ভাবে ভারতীয়দের ঐক্য বিনষ্ট করতে, নিজেদের উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম রাখতে গেলে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হবে সাম্প্রদায়িকতা যার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই ১৯৩২ সালের ম্যাকডোনাল্ড এর সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা প্রস্তাবে।
ভারতীয়দের ঐক্য অখন্ডতা বিনষ্ট করার জন্য, জাতীয়তাবাদীদেরকে দুর্বল করার জন্য সাম্প্রদায়িকতার এই বিষ বৃক্ষ এর চারা রোপন করার দায় যদি ব্রিটিশদের হয় তাহলে একথাও গোপন করার কোনো জায়গা নেই যে কিছু ভারতীয় রাজনৈতিক দল যেমন মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা – আর এস এস স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই ওই চারা গাছে জল দিতে শুরু করে যে কাজে যুক্ত হয় স্বাধীনতার পরে অকালী দলও।
জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্ব ও সাভারকারের হিন্দুত্ববাদ – দুটোই প্রবল ভাবে জাতপাতের সমতার ভিত্তিতে আধুনিক ভারত রাষ্ট্র তৈরির ঐ করাচি প্রস্তাবকে অস্বীকার করে। জিন্নার পাকিস্তানে এবং সাভারকারের ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের “দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক” হিসেবে বেঁচে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তাদের ভাবনা চিন্তার মধ্যেকার এই মিল আকস্মিক নয়, এটাও সমাপতন নয় যে ব্যক্তিজীবনে প্রায় নাস্তিক, উচ্চশিক্ষিত এই দুই নেতা নিজ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থে আধুনিক সেক্যুলারবাদকে পরিত্যাগ করে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের সম্প্রদায়িকতাবাদকেই ভাবাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন।
ব্রিটিশ এবং তাদের ভারতীয় দোসরদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই ওই ১৯৩২ সালে “মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মোসলমান” নামক গীতি কবিতাটির জন্ম। সেই দিন থেকেই জিন্না/ সভরকারদের প্রশ্ন, “কিসের কুসুম”। এটা আসলে প্রশ্ন নয়, যতো দিন গেছে, ভারতের মাটিতে সেক্যুলারবাদ তত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, সাম্প্রদায়িক শক্তি পরাস্ত হয়েছে, আর পরাজিতদের ক্রোধ ও ক্ষোভ এর বহিঃপ্রকাশ হয়েছে ঐ ভাবে। “কিসের কুসুম” আসলে পরাজিতদের আর্তনাদ।
এর দশ বছর বাদে ১৯৪২ সালে এটাও সমাপতন নয় যে ধর্মপ্রাণ গান্ধীজির গলায় শোনা গেল নাস্তিক বামপন্থীদের স্বর, “রাষ্ট্র ও রাজনীতি থেকে ধর্ম কে বিযুক্ত করতে হবে” , সেক্যুলার বাদের আধুনিক তম সংজ্ঞা। যে সংজ্ঞার মূর্ত পরিচয় আমরা দেখেছি পরবর্তীকালে নেতাজির আইএনএ তে। আবার আর্তনাদ, “কিসের কুসুম”।
ভারত ভাগে সাম্প্রদায়িকতার যে সাময়িক জয় হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, আজকের দিনে ভারত নামক শক্তিশালী আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের পাশাপাশি পড়শী দুই দেশ এর দিকে তাকালে বোঝা যায় যে জাতি গঠনের প্রশ্নে সাম্প্রদায়িক তত্ত্ব ডাহা ফেল মেরেছে, দুটি ফেইল্ড স্টেট এর জন্ম দিয়েছে। জিন্না বেঁচে থাকতে একই ভাবে আর্তনাদ করতেন, “কিসের কুসুম”।
আর ভারতের মাটিতে ১৯৫০ সাল থেকে আজ অবধি সেক্যুলারবাদ এর হাতে সাম্প্রদায়িকতার পরাজয় তো চোখের সামনে। সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া এই কদিন আগেও বিন্ধাচল পর্বত পেরোতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে, কেরালা, তামিলনাড়ু, কর্নাটকে। আবার সেই পরাজিতের আর্তনাদ, “কিসের কুসুম”। গোবলয় টগবগ করে দৌড়ে বেরিয়ে বিহার টপকে বাংলায় এসে ঘোড়া শুয়ে পড়েছে, আবার আর্তনাদ। এত পয়সা খরচ করে তৈরি করা রাম মন্দির ডিভিডেন্ড দিল না, অযোধ্যায় পরাজয়। আবার আবার আর্তনাদ, কিসের কুসুম।
সবচেয়ে বড় পরাজয় এই খানেই যে মনে যাই থাক, মুখে অন্তত সেক্যুলারবাদ এর জয়গান গাইতে বাধ্য হয়েছেন হিন্দুত্ববাদের পোস্টার বয় যার সেই বানী গত সপ্তাহে ভাইরাল হয়ে গেছে সেকু মাকুদের দৌলতে। তাই বারবার লাগাতার আর্তনাদ, “কিসের কুসুম”।
কোটি টাকার গোয়েবলসীয় প্রচার যন্ত্রের তৈরি দাড়ি পেকে যাওয়া পোস্টার “বয়” নয়, সত্যিকার পোস্টার বয়, মাধ্যমিকে প্রথম হওয়া বাচ্চা একটা ছেলের গলাতেও সেক্যুলারবাদ এর জয়গান! কিসের কুসুম? কুসুম কি ভাবে বেঁচে থাকে সাধারণ ভারতীয়দের চিন্তা চেতনায় মননে, সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের কুৎসিত মতাদর্শিক বৌদ্ধিক শারীরিক আক্রমণের পরেও সেটা চোখ মেলে দেখার একটা সুযোগ করে দিল দেশের ভবিষ্যত কর্ণধার এই মেধাবী ছাত্রটি। কোনো টিভি স্টুডিওর বদ্ধ ঘরের চিল-চিৎকারের সাধ্য নেই সেই গানের শব্দ বন্ধ করার যে গান অতদিন আগে তৈরি করে গিয়েছিলেন যুদ্ধ ফেরত রণক্লান্ত বিদ্রোহী এক বাঙালি কবি, একতালা চালে ভৈরবীর সুরে যে গান আজও বাজে আমাদের মনে, প্রতিটি দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী ভারতীয়দের মনে, যার সাথে মিশে যায় আযান আর শঙ্খ ধ্বনি, সেটা আমাদের প্রাণের গান, মনের গান।












দারুণ লেখা।এই এখনই পড়লাম।
রাখলাম ওয়ালে।
অফিসিয়ালি এবং আনঅফিসিয়ালিও খানিক সেক্যুলার তো থাকতেই হবে থাকতেও হয়।ব্যাক্তিগত অপদস্ততা যাইই আসুক। বৃহত্তর স্বার্থে
বিভাজন বিভেদ আর ঘৃণা দিয়ে তো আর ভারতের মতো ঐতিহ্যের সার্বভৌমত্বের সম্প্রীতির দেশ চালানো
যায় না সম্ভবও নয়।
খুব ভাল লিখেছো।এমন সময় এমন লেখাই সঙ্গত মনে করিয়ে দেওয়ার ইতিহাস তথ্য।
আর সেইসঙ্গে কবির গান।
পুরোনোকে মারিয়ে দলে তো ধর্ম নিরপেক্ষতা আর সেক্যুলার সাজা যায় না।গানটির এইভাবে অসন্মান তার ইতিহাসটাও রাখলে সেইভাবে নতুন প্রজন্মের সাফল্যের হাত ধরে।
বিদ্রোহী কবি দরদী কবির এতোবড়ো এক দেশপ্রেমাত্ববোধের মানবপ্রেমের গান যে জোড়ার গান জুড়ে রাখার গান তাকে হুংকারের নীচে পাঠিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তো বলতেই হবে কতগুলো ফাটা বাঁশের ভাঙন ধরানো নব্যজাতীয়তাবাদ মিডিয়াপ্রমোটির।