সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সেনাবাহিনী যখন পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত আক্রমণে নেমেছে শাসকদলের চেলাচামুন্ডা এবং ভারতবর্ষের গদি মিডিয়া ফেক নিউজের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধোন্মাদনায় মাতিয়ে তুলল গোটা দেশ। সঙ্গে চলল ধর্ম ঘৃণার বিষাক্ত উদগীরণ। সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা নয় শুধু সেনাবাহিনীর ওপর তৈরি হল পুরোদস্তুর যুদ্ধ করে একটা দেশকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবার মতো দেশজোড়া আকাঙ্খার এক ভয়ঙ্কর এবং অসম্ভব চাপ।
সেনাবাহিনী সঠিকভাবেই শুধুমাত্র পাকিস্তানে জঙ্গীঘাঁটিগুলোর ওপর আক্রমণ করে ঘোষণা করে দিল তাঁরা আদৌ যুদ্ধ শুরু করেনি তাঁরা আক্রান্ত না হলে আর এগোবে না। তারপর আক্রমণ, প্রতিআক্রমণ, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি নিয়ে কেটে গেল রুদ্ধশ্বাস চারটি দিন। তখন মিডিয়ার উন্মাদনা দেখে কে! ভুয়ো সংবাদ পরিবেশনায় যেন প্রতিযোগিতা শুরু হল। পাকিস্থানের কত নগর, বন্দর, বিমানপোত যে ধুলিস্যাৎ হল তার ইয়াত্তা নেই! সে দেশের সেনাপ্রধান গ্রেফতার থেকে শুরু করে, দেশটা টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া পর্যন্ত যা যা সম্ভব সব হল। সারা পৃথিবীর কাছে হাস্যাস্পদ হল ভারতীয় মিডিয়া আর সম্মানহানি হল আমাদের সেনাবাহিনীর।
যাঁরা নিজেদের প্রাণ বাজি রেখে লড়ছিলেন সীমান্তে তাঁদের শুধুমাত্র বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছিল না তাঁরা লড়ছিলেন দেশের ভেতরের এই ভয়াবহ যুদ্ধোন্মাদনা এবং ধর্মঘৃণার সঙ্গেও। তাঁরা প্রথমেই সোফিয়া ও ভমিকা, একজন মুসলমান ও একজন শিখ নারীকে মুখপাত্র করে ধর্মনিরপেক্ষতার বার্তা দিলেন এবং যুদ্ধ নয় নিয়ন্ত্রিত জঙ্গীঘাঁটি আক্রমণের লক্ষ্য ঘোষণা করলেন এবং দেশব্যাপী যুদ্ধজিগিরকে পাত্তা না দিয়ে চারদিনের মাথায় সংঘর্ষবিরতি ঘোষণা করলেন।
যাঁরা টিভির পর্দায় ভুয়ো খবর দেখে থ্রিলার শো দেখার তৃপ্তি নিচ্ছিলেন তাঁরা এহেন বিনোদন আচমকা ছেদ পড়ল দেখে ক্ষেপে গিয়ে ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি এবং সঙ্গে সোফিয়া ও ভোমিকাকে প্রবল গালিগালাজ করতে শুরু করে দিলেন। বিক্রমের অপরাধ এই সংঘর্ষ বিরতির কথা তিনিই ঘোষণা করেছিলেন। আর নারী দুটির অপরাধ প্রথমত তাঁরা প্রথমদিনই সেনার পক্ষ থেকে সাম্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছিলেন আর দ্বিতীয়ত সংঘর্ষ বিরতির ঘোষণার সময় বিক্রমের পাশেই ছিলেন তাঁরা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ট্রোলিং বা ঘৃণাভাষণ এমন পর্যায়ে গেল যে বিদেশ সচিবকে তাঁর এক্স হ্যান্ডেলের কমেন্ট বক্স বন্ধ করে দিতে হল, তাঁর মেয়েকেও ছাড়ল না এই উন্মাদরা। তার ফোন নম্বর দিয়ে দেওয়া হল জনসমক্ষে, ধর্ষনের হুমকি অবধি দেওয়া হল তাকে। সোফিয়া ও ভোমিকাও শিকার হলেন এই ঘৃণা ভাষণের। সোফিয়াকে বিজেপির এক নেতা ‘ওদের বেহেন’ অর্থাৎ পাকিস্তানীদের কিংবা সন্ত্রাসবাদীদের বোন বলে সম্বোধন করলেন। আর পহেলগাঁওয়ের ঘটনায় নিহত এক সেনা অফিসারের স্ত্রী হিমাংসী নারওয়াল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছিলেন বলে তাঁকেও যে ভাষায় আক্রমণ করা হল তা সভ্য সমাজে প্রকাশ করার নয়। আশ্চর্য বিষয় হল শাসকদলের কেউ এই উন্মাদদের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলছেন না। বরং আরও উৎসাহিত করছেন যুদ্ধ আর ধর্মঘৃণার পক্ষে।
অথচ যুদ্ধ একটা খেলা নয় যে সেটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে হবে। কোনও একটা দেশের অন্যায়ের শিক্ষা দেওয়ার জন্য ইচ্ছে হলেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া যায় না। ইসলামিক মৌলবাদ সারা পৃথিবীর পক্ষেই বিপজ্জনক একথা ঠিক, পাকিস্তান তাকে মদত দিয়ে আসছে একথাও ঠিক, সেই সন্ত্রাসবাদীরা আমাদের দেশের বহু সাধারণ মানুষের প্রাণ নিয়েছে বারবার, সেটাও নির্ভুল। ফলে সেই সকল জঙ্গীঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তানকে একটা সবক শেখানোর চেষ্টাকেও সকল বিরোধীদলসহ সবাই সমর্থন করেছেন। কিন্তু তার মানে যে একটা পুরোদস্তুর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নয় সেটা এই যুদ্ধোন্মত্তদের বুঝতে হবে। একটা যুদ্ধে দুটো দেশের কত লক্ষ সাধারণ মানুষের প্রাণ যায়, কীভাবে আমাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের সকল দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে তা কি এই উন্মদরা জানে না? কোনো স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ কি যুদ্ধের পক্ষে ওকালতি করতে পারে? প্রাক্তন সেনাপ্রধান নারাভানে এঁদের উদ্দেশে বলেছেন ‘যুদ্ধ কোনও রোমাঞ্চকর বলিউডি ফিল্ম নয়, যুদ্ধ-ক্ষতর প্রভাব সুদূরপ্রসারী, প্রজন্মের পর প্রজন্ম তা বহন করে। এ হল একেবারে শেষ অস্ত্র, একমাত্র দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই যুদ্ধে যাওয়া যায়। সেনা সংঘর্ষ থামিয়ে সঠিক কাজই করেছে।’
কিন্তু এই যুদ্ধবাজদের থামায় কে? এখন তাঁরা যে কোনও যুদ্ধবিরোধী, শান্তির স্বপক্ষে কথা বলাকেই দেশদ্রোহিতা আর পাকিস্তানের দালালি বলে দেগে দিচ্ছেন। কারণ শাসক এই খেলাটাকেই জিইয়ে রাখতে চাইছে। তাহলে সামনের নির্বাচন বৈতরণী সহজেই পার হওয়া যাবে। তা যদি না হত তাহলে চারদিনের ভারত পাকিস্তানের সংঘর্ষকে যুদ্ধ অবধি টেনে না নিয়ে গিয়ে তড়িঘড়ি থামিয়ে দেওয়ার ঘোষণার জন্য বিদেশ সচিব বা সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিকে খিস্তি করার এই উন্মাদ আস্পর্ধা শাসকদলের নেতা মন্ত্রীরা মুহূর্তে বন্ধ করে দিতেন, নিদেন পক্ষে নিন্দেটুকু করতেন। কিন্তু উল্টে তাঁরা যুদ্ধের স্বপক্ষে গ্যালন গ্যালন ঘৃণার বিষ উগরেই চলেছেন, উগরেই চলেছেন। মানুষের অন্ন, বস্ত্র বাসস্থানের জন্য স্বাভাবিক ক্ষোভকে প্রশমিত করতে অনন্তকাল এই ঘৃণা উভয় দেশের শাসককে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে, না হলে ক্ষুধার সূচকে পৃথিবীর ১২৭টা দেশের মধ্যে ১০৫ আর ১০৯ তম দুটো দেশ কখনও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কথা কল্পনা করতে পারে? আমাদের সেনাবাহিনীকে স্যালুট তাঁরা হাজার চাপের ভেতরেও পুরো দস্তুর যুদ্ধকে এড়িয়ে গিয়েছেন। ফ্রান্টিয়ার-এ তাঁরা লড়েন, তাঁরা প্রাণ দেন, তাঁরা জানেন যুদ্ধের ভয়াল রূপ।
সেনার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা যাঁরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যুদ্ধ থেকে সরে আসার জন্য যাঁরা সেনাপ্রতিনিধিদের গালাগালি করছেন তাঁরাই তো আসলে দেশপ্রেমের নামে দেশদ্রোহিতার কাজ করছেন। তাঁদের বলি প্রতিদিন আমাদের দেশে তিন হাজারেরও বেশি শিশু স্রেফ না খেতে পেয়ে মরে যায়। চমকে উঠবেন না সংখ্যাটা আসলে আরো অনেক বেশি, হ্যাঁ এরা আমাদেরই দেশের শিশু আর তাদের প্রতিদিন হত্যা করা করা হয়! তাদের মেরে ফেলে কোন সন্ত্রাসবাদী সিস্টেম, শাসককে একবার সে প্রশ্ন করার কথা ভেবেছেন হে দেশপ্রেমিক? বহিঃশত্রু নয়, দেশের ভেতরকার সেই সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করার যে যুদ্ধ তাতে সামিল হওয়া কি আপনার অবশ্য কর্তব্য নয় হে দেশভক্ত?










