এবারের পঁচিশে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথের ১৬৫ তম জন্মদিবস। যে মানুষ নিজেই পঁচিশে বৈশাখের আবাহনে শুনিয়েছিলেন ‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়’ তাঁর কাছে ফিরতেই হয়, বারবার। তাঁর সৃষ্টির ভিতরে যে গভীর কথাটি রয়ে গেছে তা হল দু:খ-দহন-জ্বালা অতিক্রান্ত মানুষ আর তার প্রতি গভীর ভালোবাসা।নিজের সমস্ত ক্ষুদ্র-তুচ্ছ ‘আমি’ র আবরণ ভেঙে সবার মাঝে, সবার সাথে মেলবার মধ্যেই যে জীবনের আনন্দ সে কথাটি কতো ভাবেই না বলেন তিনি। শুধু মানুষ নন, এই জগতের আনন্দযজ্ঞে সবার নিমন্ত্রণে যাঁর সায় তিনি গাছপালা-মাটি-জল-বাতাস-তুচ্ছাতিতুচ্ছ প্রাণের সঙ্গে তার যোগের কথা বলেন। বিশ্বসাথে যাঁর যোগ, তিনিই বিশ্বকবি। বিষ্ণু দে’র মত এটুকু মনে করে নিতেই হবে যে শুধু পঁচিশে বৈশাখ বা বাইশে শ্রাবণের কবি তিনি নন।’দারুণ দুর্দিনে’যেমন তাঁকে স্মরণ করার কথা লিখেছিলেন বুদ্ধদেব বসু তেমনই আরেক কবি বিষ্ণু দে ‘প্রাণের গঙ্গা ‘ খুলে রেখেই তাঁকে গ্রহণের কথা বলেছিলেন। তার জন্য রবীন্দ্রনাথকে ছড়িয়ে দিতে হবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কবির ১৫০ বছরের এক অনুষ্ঠানে অশোক মিত্র বলেছিলেন বাঙালির ড্রয়িং রুমের শোভন -সুন্দর পরিচয়ে রবীন্দ্রনাথ শুধু বেঁচে নেই, তিনি আছেন বাঙালির জনচৈতন্যে। রবীন্দ্রনাথকে, বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে জনপরিসরে পৌঁছে দেবার কাজে গণনাট্যের ভূমিকাই ছিল প্রধান। তা পুনরাবিষ্কার আর পুনরুদ্ধারের দায় কি আমরা নেব না?এই সময় তিনি আমাদের আত্মপরিচয়ের অবলম্বন হয়ে উঠুন। তার লেখাপত্তর আমাদের দিশা দেখাক।
‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ এদেশের শক্তির উৎস হিসেবে মিলনের মহামন্ত্রকে মনে করেছিলেন। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য,নানা পথকে একের মধ্যে নিয়ে আসার মধ্যেই ‘দেশ’-এর সার্থকতা। ইউরোপের ‘পোলিটিক্যাল ঐক্যে’র মধ্যে একটা মস্ত ফাঁকি আছে বলে তাঁর মনে হয়েছিল। এই বিচিত্র, বিপুল অথচ এক সুরে বাঁধার কথাটিই মনে পড়ে যাবে তাঁর দেশের খোঁজে।
‘আত্মশক্তি’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন ‘পোলিটিক্যাল সাধনার চরম উদ্দেশ্য একমাত্র দেশের হৃদয়কে এক করা। কিন্তু দেশের ভাষা ছাড়িয়া,দেশের প্রথা ছাড়িয়া, কেবলমাত্র বিদেশীয় হৃদয় আকর্ষণের জন্য বহুবিধ আয়োজন কেই মহোপকারী পোলিটিক্যাল শিক্ষা বলিয়া গণ্য করা আমাদেরই হতভাগ্য দেশে প্রচলিত হইয়াছে’। হয়তো সেকারণেই স্বদেশী যুগে গান লিখে ভাবের ইন্ধন যোগানোর পথ খুঁজেছিলেন তিনি। এজরা পাউন্ড হয়তো ঠিকই বলেছেন যে গান দিয়ে,গান গেয়ে একটা জাতিকে গড়ে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ।
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যার শুরু হয়েছিল দেশপ্রেমের গানে। খেয়াল করে দেখার বহু পরে গীতাঞ্জলি পর্বে যে ‘চরণধূলার তলে’ মাথা নত করার কথা বলেন সে সম্ভবনার বীজটি রয়ে গিয়েছিল স্বদেশপ্রেমের গানেই। সেসময় বাঙালি কবিদের লেখায় যখন নিজের দেশকে ‘সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি ‘ বলাই দস্তুর তখন রবীন্দ্রনাথ ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’তে থিতু হচ্ছেন। প্রেমে,নিবেদনে নিজেকে উজাড় করে দেবার মধ্যেই স্বদেশপ্রেমের খোঁজ করেছেন তিনি। না দরকার হয়েছে কোনো প্রতিপক্ষ, না হয়েছে তার সাথে লড়াই। শুধু আমি যে দেশটিকে গভীরভাবে ভালোবাসি,সে কথাটা জানানোর মধ্যেই স্বস্তি। ‘আত্মশক্তি’ র কথাটা যে কত গভীর তা এসবের মধ্যেই বোঝা যায়।
রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের আশ্রয়। প্রতিবাদের ভাষা। দু:খদিনের রক্তকমল। এর ভিতরে আমাদের জনপরিসরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অজস্র রাস্তা খোলা আছে। শুরুর দিকে সত্ত্বাধিকারের সমস্যা আর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মতন্ত্রে রবীন্দ্রনাথের গানের পরিসরটি ছিল সীমিত। রবীন্দ্র জন্মের একশো বছর পর এই গান যে সবার কাছে পৌঁছাতে পেরেছিল তার অন্যতম কৃতিত্ব ভারতীয় গননাট্য সংঘের। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভিতর যে একটি বিপুল সম্ভাবনা ব্যক্তিক ও সামাজিক স্তরে খুলে যেতে পেরেছে তার জন্য দেবব্রত বিশ্বাস,সুচিত্রা মিত্রদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
‘আত্মপরিচয়’ প্রবন্ধে একটা চমৎকার কথা বলছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলছেন: ” সকল মানুষেরই ‘আমার ধর্ম ‘ বলে একটা জিনিস আছে। কিন্তু সেইটাকেই সে স্পষ্ট করে জানে না। সে জানে আমি খ্রিস্টান, আমি মুসলমান, আমি বৈষ্ণব, আমি শাক্ত ইত্যাদি। কিন্তু…বাইরে থেকে যেটা দেখা যায় সেটা আমার সাম্প্রদায়িক ধর্ম। সেই সাধারণ পরিচয়েই লোকসমাজে আমার ধর্মগত পরিচয়। সেটা যেন আমার মাথার উপরকার পাগড়ি।” সত্যকারের ধর্ম ‘মাথার ভিতরকার মগজ,যেটা অদৃশ্য, যে পরিচয়টি আমার অন্তর্যামীর কাছে ব্যক্ত’। সাম্প্রদায়িক হিংসা,হানাহানির বাইরে মানব ধর্মই খুঁজেছিলেন তিনি।
জাত-ধর্ম নিয়ে এদেশের বাড়াবাড়ির চেহারাটা রবীন্দ্রনাথ অনেকখানি বুঝেছিলেন ক্ষিতিমোহন সেনের সান্নিধ্যে। বিশেষ করে এদেশের ভক্তির আন্দোলন ও যুক্ত-সাধনার আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তাঁর চিন্তাভাবনাকে অনেকখানি পথ দেখিয়েছে। একটা গল্প এপ্রসঙ্গে বলি। ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার পর শুরুর দিকে তাঁর দায়িত্ব অনেকখানি সামলেছিলেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়।সেখানে ছাত্ররা যখন অব্রাহ্মণ শিক্ষককে প্রণাম করতে অস্বীকার করলেন তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁদের বাধ্য করেননি,একরকম মেনে নিয়েছিলেন। এর পেছনে ব্রহ্মবান্ধবের ভূমিকা ছিল।পরে সম্ভবত নিজের অবস্থানের সমালোচনা করে খানিক প্রায়শ্চিত্ত করলেন ‘অচলায়তন’ লিখে। এমনকী জেলে ব্রহ্মবান্ধবের মৃত্যুর পরেও রবীন্দ্রনাথের কোনো অবিচুয়ারি পেলাম না আমরা। নিজেকে ভাঙা-গড়ার মধ্যে এইভাবে গড়ে তোলার নাম রবীন্দ্রনাথ।
‘রক্তকরবী’ র সেই কিশোর প্রতিদিন মারের মুখের উপর দিয়ে এনে দিত ফুলের গুচ্ছ। এই ছিল তার প্রতিবাদ, ভালোবাসা। একটা কথা না বলে পারছিনা। ‘ সংগীত চিন্তা’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ‘সংগীতের উতপত্তি ও উপযোগিতা ‘ পরিচ্ছেদে বলছেন সংগীত শুনে আমাদের অব্যবহিত সুখ হয় কিন্তু সেটি চরম নয়। আমোদের বাইরে সংগীতের যে অন্য মূল্য তা ভাব-অনুভাব দুয়ে মিলে এক দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায়। রবীন্দ্রনাথের গান সেই প্রেম, প্রতিবাদের অমলিন ভাষ্য।












কি সহজ সুন্দর ভাবে কবিগুরুকে মেলে ধরলে সকলের কাছে… তাঁর ভাবনা তাঁর চিন্তাধারা.. সমস্ত কিছুই… ভীষণ ভীষণ ভাল লাগল গার্গী.. পরের লেখার অপেক্ষায় থাকলাম🙏