বাড়ি করতে গেলে পাড়ার তোলাবাজ (ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় নেতা/ কাউন্সিলর/ পঞ্চায়েত সদস্য – মানে… ওই একই হলো, তোলাবাজরাই ইদানীং উপরিউক্ত পদগুলো আলো করে থাকেন) এসব-ক্ষেত্রে-আমরা-কিছু-পেয়ে-থাকি জাতীয় মুখ করে পাঁচ-দশ লাখ টাকা দাবি করবেন, এতে কেউই আর অবাক হন না।
না দিলে, মানে এঁদের খুশি না রেখে, বাড়ি করে বসবাস করা সম্ভব হয় না, এ অভিজ্ঞতাও নতুন নয়।
না দিলে হুমকি থেকে মারধর সবই জোটে। এ-ও অজানা নয়।
কিন্তু ধরুন পাড়ার খুচরো নেতা কাউন্সিলর পঞ্চায়েত-প্রধান, এই আমলের উন্নয়নের প্রবল জোয়ারের চোটে সকলেরই ঘরে লক্ষ্মী উপচে পড়ছে। নিদেনপক্ষে দশ-বিশ কোটি খুচরো টাকা এঁদের ঘরে ঘরে। তারপরও কেউ একজন যদি পাঁচলাখ না দিতে চান, তাহলে এঁদের তো আর্থিক কিছু ক্ষতি নেই – ওইটুকু টাকা তো এঁদের কাছে বাঁহাতের কড়ে আঙুলে জমে থাকা ময়লার চাইতেও তুচ্ছ – তাহলে ওই টাকাটুকু না দিলে এঁরা মারধরের ঝামেলায় যান কেন?
কারণটা সিম্পল। “খারাপ উদাহরণ” তৈরি হতে না দেওয়া।
এবং “স্মরণযোগ্য উদাহরণ” তৈরি করা। অর্থাৎ “কথা না শোনার” পরিণাম কী হতে পারে, সেই উদাহরণ তৈরি করা।
নইলে ধরুন, আজ যদি একজন তোলা দিতে অস্বীকার করেন, তাহলে পরের দিন হয়তো দুজন তেমন করবেন, তার পরের দিন…
এবং এরকম একজন একজন করেই একদিন মানুষ আর তোলা দেবেন না।
এই সম্ভাবনাটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নষ্ট করতে হয়। নইলে তোলা-সাম্রাজ্যই হাপিস হয়ে যায়।
এবারে ধরুন আপনি।
আপনি কার্যোদ্ধারের প্রয়োজনে তোলা দিয়েছেন। মানে, মনে মনে বিরক্ত হলেও দিতে বাধ্য হয়েছেন। বাড়িতে একান্তে ফিসফিস করে সে নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেন। কিন্তু সেটা করেন গোপনে, সন্তর্পণে।
পাশের বাড়ির নতুন আবাসিক তোলা দিলেন না। দেখে আপনি শুরুতে চমৎকৃত হলেন। একটু ঈর্ষান্বিতও, সম্ভবত।
আর তারপর যখন গুণ্ডাবাহিনী এসে পড়শির উপর চড়াও হলো, তখন আপনি ঠিক খুশি না হলেও মোটের উপর বেশ আশ্বস্ত হলেন। ফিসফিস করে পরিজনকে বললেন, দেখেছ তো, আগেই জানতাম, আর জানতাম বলেই আমি ঝামেলায় জড়াইনি। আমার কাজ চাকরি করা – ছেলেমেয়ে বড় হচ্ছে, তাদের মানুষ করা – এমন করে মানুষ করতে হবে যাতে ওদের এই ওয়েস্টবেঙ্গলে পড়ে থাকতে না হয় – এই ঝুট-ঝামেলা কি আমাদের পক্ষে সম্ভব? আগেরদিনই বাজারে যখন দেখা হলো, পড়শিবাবুকে বললাম, আর বলবেন না, যা অবস্থা, আমিও তো চাইনি দিতে, কিন্তু জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ…
তো সে যা-ই হোক, মারধরের প্রতিবাদ তো দূর, আপনার প্রতিবেশীর পাশে থাকার চেষ্টাটুকুও আপনি করলেন না। এমনকি তিনি যখন থানায় যাবার সময় আপনাকে ডাকতে এলেন, আপনি ভেতরের ঘরে লুকিয়ে থেকে ছেলেকে দিয়ে বলে পাঠালেন যে আপনি বাড়িতে নেই। আপনাকে দেখে, আপনার আচরণ দেখে ছেলে একটু অবাক হলো বটে, তবে এ-ও সত্যি যে ‘বড় হয়ে ওঠা’-র পক্ষে একটা মোক্ষম শিক্ষা সে ওইদিনই পেয়ে গেল।
যেহেতু এক হাতে তালি বাজে না, সেহেতু এটুকু বলাই যায় যে, এই তোলা-সাম্রাজ্য সচল রাখার পেছনে আপনার – আপনাদের – অবদান কিছু কম নয়।
তো কাজের কথায় আসি। দেবাশিস হালদার, অনিকেত মাহাতো এবং আসফাকুল্লা নাইয়া – জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের তিন গুরুত্বপূর্ণ মুখ। সিনিয়র রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁরা ঠিক কোথায় কাজ করতে আগ্রহী, সে নিয়ে জুনিয়র ডাক্তারদের কাউন্সেলিং হয়েছিল। সেই কাউন্সেলিং-এ কর্মস্থল বাছার পর তাঁদের এই মর্মে বন্ড জমা দিতে হয় যে এরপর তাঁরা কিছুতেই অন্য কোথাও পোস্টিং চাইতে পারবেন না। সমস্ত জুনিয়র ডাক্তার – সিনিয়র রেসিডেন্ট-রা – এরকমভাবে কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে নিজ নিজ কর্মস্থল বেছে নিয়েছিলেন। সকলেরই পোস্টিং হয়েছে সেই সেই জায়গায়।
শুধু এই তিনজন বাদে।
এঁদের পোস্টিং দেওয়া হয়েছে তাঁদের বাছা হাসপাতাল থেকে ভিন্ন হাসপাতালে। তিনজনেরই পোস্টিং হয়েছে অপেক্ষাকৃত দুর্গম (যাতায়াতের সুবিধে-অসুবিধের হিসেবে) জায়গায়।
ঠিকই। প্রতিবাদী হয়ে ওঠার মতো “খারাপ উদাহরণ” যত কম তৈরি হতে দেওয়া যায়, ততোই ভালো। এবং প্রতিবাদ করার ও “কথা না শোনার” পরিণাম সবার জন্য চোখে আঙুল দিয়ে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সরকার একেবারেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – সঠিক বলতে বর্তমান সরকারের ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে মানানসই ও সাযুজ্যপূর্ণ।
আপনিও, দেখুন, ছাপোষা মানুষ আফটার অল, চাকরিবাকরি করেন, ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয়, প্রতিবাদ বা পলিটিক্স আপনার কাজ নয়, আর তাছাড়া ছেলেগুলোরও বোঝা উচিত যে আগুন হাত দিলে হাত তো পুড়বেই… আর তাছাড়া ব্লা ব্লা ব্লা…
তো আপনার যুক্তিগুলো খুবই স্পষ্ট। আপনাদের মতো লোকজনের কাছে গ্রহণযোগ্যও সম্ভবত।
তারপরও বিনীত অনুরোধ এই, যে, আপাতত এই মুহূর্তে… হ্যাঁ, ঠিক এই মুহূর্তেই, আপনি শুধু এইটুকু সিদ্ধান্ত নিন –
ভয়ের সাম্রাজ্য ও ভয়-দেখানোর রাজত্ব জারি রাখার তালিটি অবাধে বাজতে পারার জন্য আপনার হাতটি সরকারের দোসর হতে ধার দেবেন?
নাকি ওই হাত এখন রাগে-ঘেন্নায়-বিরক্তিতে প্রতিবাদে মুষ্টিবদ্ধ হবে?










