আরজি কর-এ “অভয়া”র নৃশংস ধর্ষন, নৃশংসতর খুন এবং মরা হতভাগ্য মেয়েটিকে তড়িঘড়ি পুরিয়ে ফেলাকে (পরে যুক্ত হয়েছিল আরজি কর-এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতিপরায়ন একটি মেডিক্যাল সাম্রাজ্যের স্বরূপ উদ্ঘাটন) কেন্দ্র করে সমগ্র বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ৩ মাস ধরে যে বিপুল উত্তাল জনরোল তৈরি হয়েছিল, সেসময় যাদেরকে বারংবার ইলেকট্রনিক মাধ্যম ও সংবাদপত্রে দেখা গেছে, যাদের বিবৃতি সবার কাছে পৌঁছেছে তাদের ৩ জন হল দেবাশিস হালদার, অনিকেত মাহাতো এবং আসফাকুল্লা নাইয়া।
গত ক’দিন হল আবার এদের নাম সমস্ত ধরনের সংবাদমাধ্যমে ভেসে উঠেছে। কারণ? দুর্জনেরা বলে, যে আন্দোলন সরকার এবং ক্ষমতাশীল দলকে সাময়িকভাবে টলিয়ে দিয়েছিল, সে আন্দোলনের মূল্য গুণে দিতে হচ্ছে এই প্রধান তিন মুখকে।
এমনটাই তো স্বাভাবিক। কারণ draft constitution রচনার সময়ে আম্বেদকর আমাদের সতর্ক করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, আমরা একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করছি, কিন্তু ভারতবর্ষ এখনও গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয়। তাঁর প্রশ্ন ছিল – “How to cultivate democracy in a soil that is essentially undemocratic?”
আজ প্রায় ৮০ বছর পরেও কি আমরা প্রস্তুত হয়েছি? গণতন্ত্রের একটি সামাজিক-রাজনৈতিক স্তম্ভ হচ্ছে – বিরোধী স্বর, কণ্ঠ এবং পরিসরকে সম্মান দেওয়া, যতক্ষণ অব্দি গণতন্ত্রের মৌলিক শর্তগুলো রক্ষার জন্যই এই ভিন্ন পরিসর বা তৃতীয় পরিসর কাজ করছে। এই পরিসরটিকে কোন রাজনৈতিক দলের অনুগত বা দলদাস হবার প্রয়োজন নেই। দলের উর্ধে এই পরিসর থাকবে, এর ভিন্ন রাজনীতিও থাকবে – দলহীন রাজনীতি।
আরও দুয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমরা স্মরণ করে নিই –
(১) দেবাশিস, অনিকেত, আসফাকুল্লা এবং তাদের হাজার হাজার সহযোদ্ধাদের আন্দোলন আগাগোড়া আক্ষরিক অর্থে অহিংস ছিল। শত প্ররোচনাতেও অহিংসার গণ্ডির বাইরে যায়নি। এ ব্যাপারটা শাসকের পক্ষে খুবই অস্বস্তিকর – কোথায় সহিংস হবে, পুলিশ এবং ক্যাডার মিলে পেটাবে এবং লকআপে ঢুকিয়ে দেবে। হাত নিশপিশ করা সত্ত্বেও ওরা এগুলো কিছুই করেনি বরঞ্চ ঠায় রাস্তায় বসে থেকেছে। পুলিশ কমিশনারকে একটি শিরদাঁড়া উপহার দিয়েছে, দিয়েছে তাঁর পদত্যাগের দাবীপত্র।
(২) এদের আন্দোলোনের মাঝে প্রবল কষ্টের মধ্যেও রসবোধ ছিল। বিশ্বখ্যাত সঙ্গীত Imagine-এর গায়ক এবং লেখক জন লেনন ১৯৬০-এর দশকের উত্তাল সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন – “When it gets down to having to use violence, then you are playing the system’s game. The establishment will irritate you – pull your beard, flick your face – to make you fight. Because once they’ve got you violent, then they know how to handle you. The only thing they don’t know how to handle is non-violence and humor.”
(৩) এই আন্দোলন আক্ষরিক অর্থেই জনআন্দোলনের চেহারা নিয়েছিল – এক অভাবিতপূর্ব ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী থেকেছিল আমার বাংলা।
(৪) এদের ১০ দফা বা তার বেশি দাবীর মধ্যে একবারের জন্যও এদের মাইনে বাড়ানোর দাবী আসেনি। এসেছিল রোগিদের স্বার্থে হাসপাতালগুলোর সিস্টেমকে পরিবর্তন করা, বাৎসরিক ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং একটি ভয়মুক্ত, সন্ত্রাসহীন পরিবেশ কর্মক্ষেত্রে বজায় রাখা, ডাক্তারদের সুরক্ষা ব্যবস্থাকে কার্যকরী করা।
(৫) এরা লড়েছিল একটি আইনসিদ্ধ আইনহীনতার (legalized lawlessness) বিরুদ্ধে।
বাধ্যতামূলক বন্ড বনাম স্বাভাবিক পোস্টিং
এখানে এসে অনেক মানুষই বিভ্রান্ত যে, এদের তো যেখানে সেখানে সরকার প্রয়োজনমতো পাঠাতে পারে। না – পারেনা। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কাউন্সিলের নির্দেশিকা অনুযায়ী স্নাতকোত্তর পর্যায় সফলভাবে শেষ হলে একটি মেধা-ভিত্তিক কাউন্সেলিং হয়। এবং সেখানে মেধার ভিত্তিতে ৩ বছরের জন্য এদেরকে অন্যত্র কাজ করতে হয় – সেটা গ্রামীণ এলাকাও হতে পারে। এই ৩ বছরের মধ্যে ১ বছর নিজের কলেজে এবং ২ বছর অন্য জায়গায় বন্ড পোস্টিং হয়। এর সঙ্গে সরকারি চাকরিতে থাকা ডাক্তারদের বদলির কোনরকম বিন্দুমাত্র সাযুজ্য নেই।
যে কাঊন্সেলিং হয় সেখানে একটি লিস্ট বেরোয়। তার ১ কপি পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডাক্তারের কাছে থাকে। আমার কাছে দেবাশিস হালদারের কপিটি আছে। ভালো করে পড়ুন।
এখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, ওর হাওড়া ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালে পোস্টিং হয়েছে। কিন্তু “অদৃশ্য” হাতের খেলায় ওর চূড়ান্ত পোস্টিং হয়ে গেল দক্ষিণ দিনাজপুরের গাজোলে – যেখানে অ্যানাস্থেটিস্টের কোন পোস্টই নেই। একই ঘটনা অনিকেত এবং আসফাকুল্লার ক্ষেত্রেও ঘটেছে।
একে কী “প্রতিহিংসা” বলা যায়? বলা যায় – উপযুক্ত “শিক্ষা” দেওয়া? আপনারা কী বলছেন?
অতঃপর
এরা কী করবে? ডাক্তার সমাজ ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলের কাছে বিচার চাইবে। কিন্তু সে তো কাকস্য পরিবেদনা! শেষ রাস্তা কোর্টে বিচারের জন্য যাওয়া।
অনেকদিন আগে সামাজিক ন্যায় ও নৈতিকতাবাদী জন রলস (John Rawls) তাঁর A Theory of Justice গ্রন্থে (অমর্ত্য সেন যে বইয়ের বহুল ব্যবহার করেছেন) বলেছিলেন – “all people have equal claims to as much freedom as is consistent with everyone else having the same level of freedom.”
সামাজিক ন্যায়ের একেবারে গোড়ার কথা বলা যায়। কিন্তু সমগ্র সিস্টেমটিই যেখানে দুর্নীতি, দুরাচার, অবদমন, পীড়ন এবং অনুদান-নির্ভর সেখানে এই jaustice-এর কথা কে শুনবে? হয়তো বিচারব্যবস্থা শুনতেও পারে।
মনে পড়ছে জ্যাক লন্ডনের The Iron Heel বইটির কথা। বইটি একটি dystopia (an imagined society, place, or state where life is extremely unpleasant and oppressive, often characterized by deprivation, inequality, and a repressive social order)। ১৯০৮ সালে আমেরিকার বলদর্পী মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের হাতে সমস্ত ক্ষমতা-কেন্দ্রিক এক সমাজের সাথে শ্রমিকশ্রেণি তথা বিক্ষুব্ধ মানুষের লড়াইয়ের কথা বলেছেন। সবাইকে নির্বিচারে অত্যাচার, কারাবন্দী ও হত্যা করা হচ্ছে। এরই ভিন্নতর সংস্করণ আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এ বইয়ের একজায়গায় জ্যাক লন্ডন বলছেন – “It is far easier to see brave men die than to hear a coward beg for life.” বলছেন – “No man can be intellectually insulted. Insult, in its very nature, is emotional.”
দেবাশিসরা জেনে রাখো, আমরা ডাক্তার সমাজের বড়ো অংশ তোমাদের পাশে এবং সঙ্গে। আমরা যতদূর যাওয়া যায়, যাবো। তবে সব লড়াইয়ে জয়-পরাজয় আছে, একথাও মাথায় রাখতে হবে।
চরৈবেতি!












খুব ভাল লেখা
সবটাই তো ভালো লাগলো, কিন্তু শেষ লাইনের আগে কেন লেখা হল, সব লড়াইয়ের জয় পরাজয় আছে?
জয় যেখানে ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়ে গেছে , সেখানে পরাজয়ের প্রসঙ্গ কেন?
যা কেউ করতে পারে নি সেটা জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন করেছে এবং আপনারা সঙ্গে থেকে এবং এই তিন নেতৃত্বে সম্ভব হয়েছে।সেটা হল সততার প্রতিমূর্তির মুখোশটা টেনে খুলে মমতার আসল মুখটা দেখিয়ে দেওয়া, বাকিটা রাজ্যের জনগণের দায়িত্ব এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ যে তারা কতটা বদল ঘটাতে পারে। ডাক্তাররা পথে নেমে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন, তারা সফল। বাকি বাংলার মানুষ যদি সে পথে হাঁটতে না পারে তার দায় বাকি জনগণের।
যথার্থ।সহমত
এখন সমাজ মানেই দুর্নীতি, দুরাবস্থা এটাই যেন ভাসে চোখে। ছোট থেকেই জেনে এসেছি সাহিত্য স্টুডেন্ট হিসেবে লেখনীতে ধার থাকে। তোমার লেখনি তেমনই তীক্ষ্ণ
সময়োপযোগী লেখা। প্রতিবাদের কন্ঠস্বরকে জোরালো করে। 👍