টেনিদা আজকে অনেক দেরিতে আড্ডায় এলো। মুখটা ঠিক কালমেঘ খাওয়া বদনের মতো লাগছে।
প্যালা হাবুল ক্যাবলা কেউ ঠিক করতে পারছে না কিভাবে এই গুমোট আবহাওয়া কাটবে। হাবুল প্রথমে চেষ্টা করলো। বললো,” টেনিদা ভারত তো যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা কইরা ফ্যালাইলো”
অন্য সময় হলে আড্ডায় ঝড় বয়ে যেতো। আজকে পরিস্থিতি আলাদা। ঠিক বাইশ সেকেন্ড পরে টেনিদার থেকে উত্তর এলো,” ঘোষণা করলো নাকি ঘোষণা করতে বাধ্য হলো?”
আবার পরিস্থিতি চুপচাপ। আমরা সকলেই প্রমাদ গুনলাম।পরিস্থিতি ঘোরতর। এই পথে কোনো সুরাহা মিলবে বলে মনে হচ্ছে না।
আমরা পুরোনো পথ ধরলাম। আজকে তিনমাস হয়ে গেলো কোনো নিমন্ত্রণ আমরা পাইনি। তার ওপর এই যুদ্ধ। সামনেই আবার পরীক্ষা। তবে তাই নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তা নেই। আমাদের লিডারের জীবনে খাবার পরীক্ষা ছাড়া আর কোনো পরীক্ষা বিশেষ চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে না।
শেষে মরিয়া হয়ে ক্যাবলা বললো,” টেনিদা কি হলো বলো তো? আজ তিনমাস কোনো নিমন্ত্রণ পাইনি। লোকে কি বিয়ে সাদি পৈতে কোনো কিছু না করেই সন্যাস নিচ্ছে নাকি?”
এইবার টেনিদার জলদ গম্ভীর স্বর বেরুলো। বললো “সন্যাস নিলেও তো কাজ হতো। বাঙালী তার ইতিহাস আর সংস্কৃতি ভুলতে বসেছে।”
আমরা পড়লাম আরো বিপদে। নেমন্তন্নর সঙ্গে সংস্কৃতি ভোলার কি সম্মন্ধ। পরিস্থিতি বিবেচনা করে মুখ বন্ধ রাখলাম। একে যুদ্ধে সিসফায়ার। তার ওপর ভালো মন্দ খাবার কেমন খেতে সেটাই ভুলতে বসেছি। এই সময় মুখ খোলা আর গোখরো সাপের লেজ দিয়ে কান চুলকানো একই রকমের বিপজ্জনক।
শেষে মরিয়া হয়ে বলেই ফেললাম,” নেমন্তন্ন যখন মিলছে না, তখন চলো সেন্ট্রাল এভিনিউ এর হনুমান মন্দিরে গিয়ে দুপুরে খিচুড়ি খেয়ে আসি।”
ওষুধে কাজ হলো। টেনিদা বাঘা কুকুরের মতো দাঁত খিঁচিয়ে বললো,” খিচুড়ি? নিরামিষ ? কভি নেহি।
টেনিদার মুখে হিন্দি শুনে প্রাণে বল এলো।
আমি ফুট কাটার জন্য বললাম,” সামান্য মাছের লোভে তুমি নিরামিষকে অবজ্ঞা করছো?”
টেনিদা এবার পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে তেড়েফুঁড়ে বসলো। বললো,” সামান্য মাছ? মাছের তুই কি জানিস? এই অপরাধে জানিস তোর কান আমি এখুনি কানপুর, না না, করাচি নানা একেবারে কান্দাহারে পাঠিয়ে দেবো।”
আমি ভাবলাম সত্যি তো, সিঙ্গিমাছ ছাড়া আর কোনো মাছের বিষয়ে আমার কোনো জ্ঞান নেই। মাছ নিয়ে কথা বলতে যাবার সাহস দেখানোটা আমার ঠিক হয়নি।
হাবুল আগুনে ঘি ঢাললো। বললো,” মাছ নিয়া ক্যান জানুম না। বাড়িতে দাদা কত রকমের মাছ নিয়া আসে।”
টেনিদা রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললো”যা এখুনি আলুর চপ আর ফুলুরি নিয়ে আয়। আজকে ক্যাবলার পালা।”
ক্যাবলা বললো,” সে নিয়ে আসছি কিন্তু মাছের কথায় এমন চটলে কেনো?”
টেনিদা বললো “আগে আন পরে কথা”।
বড় ঠোঙায় চপ ফুলুরি এলো। তিনি একাই তার সিংহভাগ সাবাড় করলেন। তারপর ওনার শ্রীবদনে মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ বেরুনোর মতো একটু হাসির ঝিলিক দেখা গেলো। আমাদের এতো চেষ্টা শেষে সাফল্য পেলো।
টেনিদা দাবি করলো,”মাছের তোরা কিছুই জানিস না”।
আমরা একবাক্যে স্বীকার করলাম, হক কথা, মাছের আমরা কিছুই জানিনা।অন্ততপক্ষে টেনিদা যা জানে তার ধারে কাছে জানিনা।
টেনিদা বললো,” জানিস মাছের জন্য দুটি জাতি মারামারি করতে পারে? লাখ লাখ লোক উদ্বাস্তু হতে পারে? হাজারে হাজারে খুন হতে পারে? পৃথিবীর ইতিহাস পাল্টে যেতে পারে? পৃথিবীর মানচিত্র ওলটপালট হয়ে যেতে পারে?
আমাদের অবস্থা এখন, ধরণী দ্বিধা হও। আমাদের কারুর মুখে তখন কোনো কথা নেই।
লিডার তখন শুরু করলো। “সিপাহী বিদ্রোহের তখন কয়েক দশক পার হয়েছে।”
এবারে বিপদ হলো ক্যাবলাকে নিয়ে। ও ফস করে বলে বসলো,” তুমি সিপাই বিদ্রোহের সময় ছিলা নাকি? হেই কথাডা তো জানতাম না।”
একেবারে ধনুকের ছিলা থেকে তীর বেরুনোর মতো টেনিদার গর্জন বেরুলো। “আমি থাকি আর নাই থাকি, সিপাহী ছিলো, বিদ্রোহ হয়েছিলো। সেটাই যথেষ্ট।”
আমরা বললাম, “ছাড়ান দাও।পোলাপান, কয়ে ফেলেছে।”
টেনিদা বললো,” পোলাপান, একেবারে জলপান করে ফেলবো।”
রাগ কমলে আবার শুরু করলো। “ব্রিটিশ পুরোপুরি তখন জাঁকিয়ে বসেছে। রেল চলাচল শুরু হয়েছে। একটু একটু করে আধুনিক ভারত তার রূপ পাচ্ছে।সেই সময় ব্রিটিশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কিছু ভারতীয় ব্যবসা শুরু করেছে। সেখানে এগিয়ে আছে গুজরাটের পার্সিরা।”
“পার্সি কারা জানিস তো?”
আমরা প্রমাদ গুনলাম।
বাঁকা হাসি হেসে টেনিদা বললো, “পার্সিরা আদতে ইরানের লোক। আহুর মাজদার উপাসক। ইরানে কাঠ মোল্লাদের কাছে তাড়া খেয়ে গুজরাটে এসে বসতি গাড়ে। ভারতের জল হওয়ার গুণে দিনে দিনে পুরো ভারতীয় হয়ে যায়।”
এরপরেই টেনিদার প্যাঁচ, “তবে যাকে নিয়ে আজকে বলবো সে পার্সি নয়।”
মনে মনে ভাবলাম, যাচ্চলে, তাহলে পার্সি নিয়ে এতো ডায়ালগ দেবার কি মানে। মুখে কিছু বললাম না। যতই হোক ঐ কিং সাইজ হাত দিয়ে কান টানলে, সেটা কানপুর যাবে কিনা জানিনা। তবে বিলক্ষণ যে ব্যথা লাগবে সেটা জানি। চুপচাপ শুনে যাওয়াই মঙ্গল।
টেনিদা বলে চললো, “যার কথা বলছি সে খাঁটি হিন্দু। বাঙ্গালীর মতো পেয়াঁজ রসুন খাওয়া হিন্দু নয়। এমনকি চাচার দোকানে ফাউল কারি খাওয়া হিন্দুও নয়। দুইবেলা ভগবানের নাম নেয়। নিরামিষ খায়। আমিষ ছুঁলে শীতকালে স্নানও করে।”
আমাদের উত্তেজনা বাড়তে থাকে। নিরামিষ খাবার জন্য আবার লণ্ডভণ্ড কীকরে হবে। ভয়ে উত্তেজনা চেপে রাখলাম।
টেনিদার কাহিনী এগুতে লাগলো। “তো আমার সেই ব্যক্তি শুরু করলো মাছের ব্যবসা। দূর দূর থেকে একেবারে ফ্রেস মাছ নিয়ে আসে। সেই মাছ বিক্রি করে। এ তোদের কোলে মার্কেটের পচা মাছ নয়। ”
ক্যাবলা বললো, “তাতে কি? নিরামিষাশী মাছ বিক্রি করছে তাতে গোলমাল কিসের?”
হাবুল তো বলেই ফেললো, “হ ময়রার মিষ্টি খাওন চলে না, গোয়ালার দুধ খাওনের কোনো ইচ্ছাই দেখি না।”
ক্যাবলা গম্ভীর ভাবে বললো, “সেতো অনেক হিন্দুও আছে যারা গোরু জবাই করে তার মাংস বিদেশে পর্যন্ত চালান দেয়। এমনকি তারা আবার রামচন্দ্র আর হনুমানজির একনিষ্ঠ সেবকও বটে।”
টেনিদা এগুলো শুনে তাচ্ছিল্য ভরে আমাদের দিকে একবার তাকিয়ে আবার বলতে শুরু করলো। “তোরা তো জানিস গুজরাট একেবারে মেডিস্টোফিলিস জায়গা। ওখানের লোকজন ভাবে এক, বলে এক আর করে আরেক।”
মেফিস্টোফিলিস শুনে ক্যাবলা বললো, “মেফিস্টোফিলিস মানে শয়তানও হয়।”
টেনিদা রেগে বললো, “থাম থাম, আর বিদ্যে জাহির করিস না। একেবারে তোর পুদিচ্চেরি মার্কা বুদ্ধি। তো সেই মাছ বিক্রির অপরাধে ঘোর নিরামিষ যারা তারা একেবারে ব্যাটাকে একঘোরে করে ছেড়ে দিলো। দোকানি জিনিস ব্যাচে না, গোয়ালা দুধ দেয়না, মন্দিরে ঢুকতে দেয়না। এমনকি পায়খানা যাবার বদনাটা পর্যন্ত কেড়ে নিয়ে গেলো। এরকম করে তো বাঁচা যায়না। উপায়ন্তর না পেয়ে পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে সে রওনা দিলো করাচির উদ্দেশ্যে। করাচি তখন এক বহুজাতিক শহর। ওখানের হিন্দুরা শাকাহারি নয়। মাছ মাংস খায়। হিংলাজ মাতা আর কালাটেস্বরীর পুজো করে। ওখানে গিয়ে এই শাকাহারীদের অত্যাচার থেকে পরিত্রাণ পেলো। নিজে ধর্ম পাল্টালো না, কিন্তু হিন্দু আচার আচরণ একেবারে ছেড়ে দিলো। দিনের শেষে বাড়ি ফেরে আর, ফেলে আসা ভিটের কথা মনে পড়ে।”
এই পর্যন্ত বলে টেনিদা একটু সময় উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকালো। মাথার ওপর দিয়ে একটা কাক উড়ে গেলো। যে উদাস দৃষ্টি দেখলাম তাতে কাকের উড়ে যাওয়া চোখে পড়লো কিনা জানিনা।
আবার শুরু করলো। “তো সেই মাছওলার ঘরে জন্মালো এক ফুটফুটে ছেলে।”
আমরা উত্তেজনা চাপতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করে বসলাম, “ছেলের নাম কি? ”
গম্ভীরভাবে উত্তর এলো,” নামে কি হবে?”
হাবুল বললো, “হক কথা। নাম নয় কামই আসল।”
ক্যাবলা বললো, “হরি মধু ইসমাইল যাহোক কিছু হলেই হলো।”
আমি বললাম,” আইনস্টাইন বা হিটলার হলেই বা আটকাচ্ছে কে।”
টেনিদার মুখে এক ঝিলিক রসুনের কোয়ার মতো হাসি খেলে গেলো।
শ্রীমুখ দিয়ে এরপর বক্তব্যের ফোয়ারা ছুটতে লাগলো। “এরপর সেই ছেলে বড় হতে লাগলো। স্কুলে দারুন রেজাল্ট। এরপর কলেজে গেলো। বাবার কাছে অবসর সময় গল্প শোনে। কেনো গুজরাট ছেড়ে করাচিতে আসতে হয়েছিলো। শাকাহারী হিন্দুরা কেমন অত্যাচার করেছিলো এইসব কাহিনী।
সামান্য ঘটনাও মানুষের মনে যে কি ছাপ ফেলে তা দেবা না জানন্তি। এই ঘটনাই হয়তো ওই ছেলের মধ্যে তীব্র বিদ্বেষ তৈরি করলো। এর মাঝে বিলেতে পড়তে গেলো। ফিরে এলো। ধর্ম পাল্টালো। মুসলমান হয়ে গেলো। দেশ ভাগ করে দিলো। হাজার হাজার উদ্বাস্তু হলো, খুন হলো। একটা দেশ ভেঙে দু টুকরো হলো।”
ক্যাবলা লাফিয়ে উঠলো। বললো,” দাঁড়াও দাঁড়াও, দেশ ভাগ করেছে জিন্না। আর তুমি কি গুলতাপ্পি ঝাড়ছো।”
এটা শুনে টেনিদা যে অবজ্ঞার হাসিটা হাসলো, তার সঙ্গে একমাত্র মুক্তাভর্তি ঝিনুকে আধলা ইট মারারই তুলনা চলতে পারে।
শ্রীমূখ দিয়ে বেরুলো, “আমি জিন্নার কথাই বলছি। মোহাম্মদ আলী জিন্না ওরফে কায়েদ- এ – আজম।”
এটা শুনে আমাদের সবার মুখ এমন হাঁ হয়েছে যে সেখানে উড়ন্ত পাখি ঢুকে পড়লেও আশ্চর্যের কিছু নেই।
স্বগতোক্তির মতো টেনিদা বললো, “একবার মাছ নিয়ে গণ্ডগোলের জন্য পাকিস্তান হয়েছে। এই আমিষ নিরামিষ করে এখনো কিছু লোক ঝামেলা পাকায়। হুঁ হুঁ বাওয়া। আমরা বাঙালি। মাছ আমাদের কালীর ভোগে লাগে। এই নিয়ে কেউ বাওয়াল করলে বাঙালী মেনে নেবে না। দেশের অখন্ডতা রক্ষার আগে যে জাতি আমিষ নিরামিষ নিয়ে গণ্ডগোল করে তাদের দেশ শত টুকরো হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
ক্যাবলা অবাক হয়ে বললো, “মানে মাছের ব্যবসায় বাগড়া না দিলে জিন্নার বাবা করাচি যেতো না। জিন্নার মনেও প্রতিহিংসা তৈরি হতো না। জিন্নাও মুসলিম হতো না। দেশভাগ হতো না। লাখ লাখ উদ্বাস্তু খুন হতো না। বিক্রমপুরের বাড়ি ছেড়ে হাবলের বাবাকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসতে হতো না। বলছো কি?”
টেনিদা হঠাৎ বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, “ডি লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস।”
আমাদেরও গলা দিয়ে বেরিয়ে গেলো, “ইয়াক ইয়াক।”










