আমার ঘরে বসেই রাস্তায় লোকজন, গাড়িঘোড়া, হরেক কিসিমের পণ্য নিয়ে হেঁকে যাওয়া ফেরিওয়ালাদের বেশ দেখতে পাই। মানুষের দেখা না পেয়ে যেসব প্রবৃদ্ধ মানুষ রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছেন বলে আক্ষেপ করেন আমি এখনো পর্যন্ত সেই দলে নাম লেখাইনি। অনেক মানুষের ব্যস্ত চলাচলের দৃশ্যের মধ্যে আমাকে কেন জানিনা সবথেকে তৃপ্তি দেয় ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলের পথে পা বাড়ানো ছাত্র ছাত্রীদের ছবি। হয়তো একটা সময় এদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি বলে। সকালের দিকে যারা যায় তাদের বেশির ভাগই যায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। দশটার পর দেখা মেলে মাতৃভাষা মাধ্যমের স্কুলের শিক্ষার্থীদের। চোখ তো আর ওদের মধ্যে ভাগাভাগির রেখা টানেনা।
কাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছে আমাদের এখানে। চারিদিক জলে টইটম্বুর। আমাদের বাগানের দশাও তেমনটাই। এমন ভেজা দিনে কি আর ছেলেমেয়েগুলো স্কুলে যাবে? এমন ভাবতে ভাবতেই একটা ভেসে আসা খবরে চোখ আটকে গেল। মানব জাতির আদিতম আরণ্যক জনগোষ্ঠীর কয়েকজন মানবক এই প্রথম জন অরণ্যের সোয়াদ পেতে চলেছে,তারা এখন থেকে স্কুলে যাবে শুধু নয় অন্যদের সঙ্গে একসাথে বসে নতুন নতুন পাঠ গ্রহণ করবে। মনটা আনন্দে ভরে উঠলো।

আগেই বলেছি, যে ওঙ্গি সম্প্রদায়ের মানুষেরা আবহমানকাল ধরে আরণ্যক পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের গভীরভাবে খাপ খাইয়ে নিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জীবনে অভ্যস্ত। এরা আদিম সংগ্রাহকের জীবন যাপনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। মনে রাখতে হবে যে এদের সভ্যতা প্রাক্ কৃষি যুগের সভ্যতা। এমনি এক যাপন পরিসর থেকে উঠে আসা যে মোটেই সহজসাধ্য ছিলোনা তা বুঝতে একটুও কষ্ট করতে হয়না। এই মুহূর্তে এই জনগোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা সাকুল্যে ১৪০ জন মাত্র। এখানেও লড়াই, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। এই নয়জনের সকলেই মানবিক শাখায় নাম লিখিয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই আগামী দিনে এদের হাত ধরেই হয়তো ওঙ্গি সম্প্রদায়ের মানুষদের নব উত্তরণ ঘটবে, রচিত হবে নতুন ইতিহাস।
ওঙ্গি সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে বাকি দুনিয়ার সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টার শুরু সেই ১৮৫৫ সালে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির দুস্তর পার্থক্য তো ছিলই তার ওপর ছিল ভাষার ব্যবধান। গত শতকের সত্তরের দশকের একেবারে শুরুতে সরকারি প্রচেষ্টায় ওঙ্গিদের আধুনিক জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত করার কাজ শুরু হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের ডুগং ক্রিক এবং লিটল আন্দামানের সাউথ বে এলাকায় পাকা বাড়ি করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি দেওয়া হয় খাবার দাবার, পোশাক পরিচ্ছদ এবং আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ। এতোদিনের নিরলস পরিশ্রম বোধহয় ফলবতী হলো। প্রাথমিক সমস্যার বেড়া ভেঙে বেরিয়ে ওঙ্গি সম্প্রদায়ের মানুষেরা এখন নতুন জগতের স্বাদ নিতে চলেছে। তবে নিজেদের আবহমানকালের যাপন ধারাকে অস্বীকার করে নতুনের নামে উন্নয়নের জোয়ারে গা ভাসাতে মোটেই ইচ্ছুক নয় এই আদিম অরণ্যচারী মানুষেরা ।
নতুন শিক্ষার্থীরা কেমন? তারাও কি উচ্চ বেতনের সরকারি আমলা হতে চায়? আধিকারিকদের মতে এদের নিয়ে আশাবাদী হবার যথেষ্ট কারণ আছে, কেননা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মিতি নিয়ে সকলেরই স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। এদের একজন হলো এ্যালাগি। তাঁর ইচ্ছা ভবিষ্যতে সে একজন বনবিভাগের আধিকারিক হতে চায়, যাতে সে তাদের এলাকার অরণ্যভূমিকে রক্ষা করতে পারলেই তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অরণ্যকে বাঁচিয়ে রাখার ঐকান্তিক ইচ্ছে থেকেই এ্যালাগি বন বিভাগের আধিকারিক হতে চায়।
মুকেশের ইচ্ছে সে আদিবাসী মানুষদের মধ্যে কাজ করবে একজন আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক হিসেবে। তার ইচ্ছে কী করে আদিম অরণ্যচারী আবাসিকদের জীবন ও এই পরিবর্তনশীল জীবনের ব্যবধানকে কমানো যায় সেই বিষয়ে কাজ করার। নিজেদের আবহমানকালের যাপনকে খারিজ করে দিয়ে নয় বরং তথাকথিত আধুনিক জীবনকে খানিকটা পরিমার্জিত করেই মুকেশ এক নতুন টেকসই জীবনযাপন পদ্ধতিতে সকলকে অভ্যস্ত করে তুলতে চায়। ভারি অন্যরকম তাদের ইচ্ছেগুলো।
উৎসর্গ
যাদের নিরলস প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে, সেই সমস্ত গবেষক ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি এই নিবন্ধটি। অগ্রজপ্রতিম সুজন শ্রী সুমিত মুখোপাধ্যায়কে অসংখ্য কৃতজ্ঞতা জানাই আমাকে প্রাণিত করার জন্য।
আগস্ট ০২,২০২৫











আশাতীত ভালো খবর। সত্যিই নবরত্ন। মেয়েরা সংখ্যায় বেশি দেখে আরও আনন্দ পেলাম। ওদের স্বপ্ন সফল হোক। ওদের খবর ছড়িয়ে পড়ুক।
অনেক অনেক বিরুদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে ওদের এই আশ্চর্য উত্তরণ। এখানে পৌঁছতে গিয়ে ছেড়ে যেতে হচ্ছে অনেক কিছু যা ওঙ্গি সমাজের একান্ত সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়েছে এতোদিন। সেই পুরনো আপ্ত বাক্য মনে এলো — কিছু পেতে গেলে কিছু ছাড়তে হয়।
আশার খবর।লেখক হচ্ছেন আমাদের আশার ঝাঁপি। সচল থাকুন মন আর কলম।
আশার ঝাঁপি!!!! এমন অভিধা আগে কেউ দেবার দুঃসাহস দেখাননি। মানসিক ভাবে বেশ চাঙ্গা বোধ করছি। ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ওষুধের খরচ কমিয়ে দেবার জন্য।
It’s so very heartening to know this ! The education will surely broaden their horizon and they will ultimately be able to do good to their society with the newfound knowledge. I’m sure they’ll protect the nature for a better ecological system and better future. Thanks for such a good reading 📚
Thanks a lot for your optimistic comment. It’s a great news undoubtedly but l feel pity for the nine onge kids that they would perhaps bring some evils of the so called modern society. Let’s hope for the best as you have mentioned in your comments .