আজ প্রায় ছ’বছর বাদে আমার কর্মক্ষেত্র মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ব্লাডব্যাঙ্কে ফের আয়োজন করা হয়েছিল বিশ্বকর্মা ঠাকুরের পুজোর। কোভিডের পরে এই প্রথম।
ব্লাড ব্যাঙ্কে নানা যন্ত্রের সমাহার — যন্ত্রদেবতার কৃপাদৃষ্টি থেকে যেন বঞ্চিত না হয় হাসপাতালের এই অত্যাবশ্যক বিভাগটি, সেই আশাতেই আরাধনার আড়ম্বর।
পুজোশেষে কাগজের প্লেটে প্রসাদী ফল ও নাড়ুর পাশে নারকেলের ছাপা দেখে প্রথমেই মনে পড়ল মা ভীষণ ভালবাসত চন্দ্রপুলি। মামাও। অনেকবার বাক্যটা আওড়ালাম মনে মনে। মা ভীষণ চন্দ্রপুলি ভালবাসত….
মা ভীষণ ভালবাসত চন্দ্রপুলি….
মা চন্দ্রপুলি ভীষণ ভালবাসত…
কিন্তু নিজেকেই আশ্চর্য করে একফোঁটাও জল এলো না আমার চোখে।
তাহলে কি শুকিয়ে গিয়েছে অশ্রুনালি? নাকি নিরাবেগ যান্ত্রিকতা গ্রাস করেছে আমাকে? ক্রমাগত সামাজিক অবক্ষয়ের নিরুপায় সাক্ষী হতে হতে মরে গিয়েছে সংবেদ? আমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসতে ভুলেছি আগেই, এখন কান্নাও চোখের সঙ্গে আড়ি করে পাড়ি দিয়েছে অন্যত্র — দিনগত পাপক্ষয়ে দীর্ণ আমার যন্ত্রহৃদয় তার সংবাদ রাখেনি?
হাসপাতাল থেকে ফিরছি। মোড়ে মোড়ে রঙিন মণ্ডপে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ঈষৎ বক্র বিশ্বকর্মা। তাঁর দার্ঢ্য কম, সাজসজ্জা বেশি — যেন ভাদুরে কার্তিক! সামনে বক্স বাজছে মৃদুস্বরে — কোথাও হিন্দি, কোথাও চটুল বাংলা গান। বক্স ঘিরে উদ্দাম তারুণ্য — তবে নাচ, গান সবই নিচু তারে বাঁধা। রিকশা, ভ্যান, টোটোওয়ালারাও অন্যান্য বছরের মতো বাঁধনহারা নন তেমন — কেন কে জানে? চোরা আতঙ্কের স্রোত কি বইছে উৎসবের উজ্জ্বল আয়োজনের তলায়? অস্তিত্বরক্ষার আতঙ্ক, অর্থনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ার আতঙ্ক, রুজি/ঠিকানা হারিয়ে ফেলার নিশ্চিত আতঙ্ক? হলে অন্তত আশ্চর্য হবো না।
বেহালা চৌরাস্তা পেরিয়ে বকুলতলা ছাড়াতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল আলোর ছটায়। বাঁ হাতে কারখানা। ওষুধ কোম্পানির। ইস্ট ইণ্ডিয়া ফার্মাসিউটিক্যালস। তারপরেই প্যাটন ট্যাঙ্কের ফ্যাকটরি। তারা আজ সেজেছে অপূর্ব সব দেখনদারি বাতিতে, এলইডির মালায়, ঝকঝকে হ্যালোজেনে।
আমার মনে পড়ে গেল ক’দিন আগে উত্তর ২৪ পরগণায় রক্তদান শিবির করতে গিয়ে দেখেছি, বি টি রোডের দু’ধারে আমার মরে যাওয়া শৈশবস্মৃতির কঙ্কাল পড়ে রয়েছে অনাদরে — আগরপাড়া জুট মিল, টিটাগড় পেপার মিল, ন্যাশনাল টোব্যাকো, বেঙ্গল এনামেল, গৌরীশঙ্কর জুট মিল, ডানবার কটন মিল — লিস্ট লম্বা, অত পড়ার ধৈর্য আপনাদের নেই। চোখ বন্ধ করলেই মনে পড়ে যায় মামার প্রাণের ফ্যাকটরি হিন্দুস্তান মোটর্স — জঙ্গলে, আগাছায় ঢেকে সাপখোপের আস্তানা হয়ে পড়ে রয়েছে। ঠিক যেভাবে পড়ে রয়েছে নৈহাটির হাজিনগরের ইণ্ডিয়া পেপার পাল্প – আকাশ ছোঁয়া নির্ধূম, নিঝুম বয়লারের মাথা ফাটিয়ে বেরিয়ে এসেছে বট অশ্বত্থের মোটা মোটা ডাল।
আমার মনে পড়ে গেল, বাবা কোনওদিন বিশ্বকর্মা পুজোর দিন বাড়িতে ভাত খেতে আসেনি। পার্সোন্যাল ম্যানেজারের আদরের জ্যান্ত বিশ্বকর্মার দল তাদের ‘লেবার সাব’কে সঙ্গে নিয়েই পংক্তিভোজনে বসতো — আর বাড়িতে আমাদের জন্য আসত বড় বড় চ্যাপটা নিমকি আর দানাদার, গজা, কালোজাম ভর্তি মিষ্টির প্যাকেট। দিনভ’র প্যাণ্ডেলে বাজত শ্রীদেবীর তোফা, হিম্মতওয়ালা, কলাকার আর ঋষি কাপুরের সরগম ছবির গান — শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হলেও বিরক্ত লাগেনি কখনও, কেন কে জানে?
আলো বলতে ছিল রঙবেরঙের টুনি লাইট আর ঠাকুরের মুখে ফেলা জাঁদরেল এক স্পটলাইট — কত ওয়াটের কে জানে! তাতেই ঝকমক করে উঠত চারদিক — শ্রমিকদের কালচে দাঁতের দিলখোলা হাসির মতো। সেই টুনি শেষ ভাদ্রের বাদুলে হাওয়ায় মাঝে মাঝেই দুলে উঠে নিভে যেত, স্পটলাইটও দপদপ করত প্রায়ই — তখন বুড়ো ইলেক্ট্রিশিয়ান শিবু ঘোষ ছোকরা এক সহকারীকে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে আসত তার কোয়ার্টার থেকে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরে টুনি ফের জ্বলত ঠিকই তবে দেখা যেত প্রতিটি মালাতেই কয়েকটি বাল্ব জবাব দিয়েছে কিংবা দুর্বলভাবে ‘চোখ মারা’র চেষ্টা করছে। ক্লান্ত শিবু ঘাম মুছতে মুছতে স্বগতোক্তি করত — ‘সামনের বার চাঁদনি থেকে নতুন মালা নিতেই হবে, সায়েবকে বলব — এগুলো দিয়ে আর চলে না!’
এনটিসির বিশাল মাঠ, যেখানে ঠাকুরের প্যাণ্ডেল হতো, সেখানে প্রথমে শপিং মার্ট হলো — পরে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং। ডানবার মিলের জমিও শুনছি বিক্রি হয়ে ফ্ল্যাট হবে। হিন্দমোটরের জায়গাও হয়ত বিকিয়ে যাবে একদিন — কোনও মল বা রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স হবে সেখানে, আমি জানি না।
চোখ খুললাম। আলোকিত প্যাটন কারখানার সামনে রাস্তার ধারে বসে পড়েছে ফেরিওয়ালারা — ঘুঘনি, ফুচকা, চুড়ি, মালা, দুল, ক্লিপ আর বাসনকোসনের পসরা নিয়ে। বিশ্বকর্মার দর্শকরাই ক্রেতা — ঠাকুর দেখে ফিরতি পথে চলছে কেনাকাটা।
আমার মনে হলো, কোনওদিন আমার বাড়িটাও হয়ত বাজার হয়ে যাবে। এই রাস্তাঘাট, চলমান বাস, ট্যাক্সি, অটো সব একদিন বাজারে পর্যবসিত হবে। ইশকুল বাজার হবে, কলেজ, হাসপাতাল, সরকারি আপিস, মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদ্বার, শ্মশান, কবরস্থান, শোবার ঘর, স্নানের ঘর সব একদিন এক বিশাল, অতিবৃহৎ সুপারমার্কেটে পরিণত হবে। সেখানে মানুষের অন্য কোনও পরিচয় থাকবে না, লিঙ্গভেদ থাকবে না, জাতিবৈষম্য থাকবে না — সকলের, সব্বার সেখানে একটাই আইডেন্টিটি — হয় সে ক্রেতা, নয় বিক্রেতা।
জানতেও পারিনি, কখন আমার বন্ধ দু’চোখ, অন্ধ দু’চোখ বেয়ে নেমেছে জলের ধারা, ভিজিয়ে দিয়েছে গাল, নামছে গলা বেয়ে। আঙুল দিয়ে সেই অশ্রুচিহ্ন মোছার ইচ্ছে হলো না আমার।
একটা নষ্ট শতাব্দীর চৌকাঠ মাড়িয়ে আরও অন্ধকার শতকের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছি বর্ণহীন ভবিষ্যতের দিকে — ভুবনগ্রামের খোলা হাটে বিশ্বকর্মা হরেক মাল ফেরি করতে করতে চলেছেন আমার সঙ্গে – এই কি আনন্দাশ্রু মুছে ফেলার সময়?










