নৈতিক অবস্থান বলতে আমি বুঝি, নিজস্ব কিছু মূল্যবোধ থাকা, নিজস্ব কিছু বিচারশক্তি থাকা এবং সেই মূল্যবোধ ও বিচারশক্তির নিরিখে নিজের ও ক্ষেত্রবিশেষে অপরের কাজকে ঠিক মনে করা বা না করা।
এবারে ঠিক-ভুলেরও প্রকারভেদ থাকে। একটা উদাহরণ দিই। মিথ্যে কথা না বলা-ই সমীচিন, অনুচিতও বটে – কিন্তু বাস্তব জীবনে সবসময় অকপট সত্যভাষণ সম্ভব হয় না। নিজের ক্ষেত্রেও নয়, আর অপরে আমার সঙ্গে সবসময় সত্যি বলবে এমন তো নয়ই। তার ভিত্তিতে অপরকে বিচার করে বসাটা ঠিক নয় – অন্তত আমার নৈতিক অবস্থান অনুসারে, এমন প্রত্যাশা সঠিক বলে মনে হয় না। কিন্তু ক্রমাগত মিথ্যে কথা যে বলে, বা মিথ্যে কথার উপরেই যে নিজের জগত তৈরি করে, তার অবস্থান আমার অনুচিত মনে হয়।
অপরের নৈতিক অবস্থান কী হওয়া উচিত, বা আদর্শ নৈতিক অবস্থান ঠিক কী – এতখানি বলে দেওয়ার এলেম আমার নেই। এক্ষেত্রে আমি শুধু নিজেরটুকুই বলতে পারি। গার্হস্থ্য অশান্তি এড়াতে বাড়িতে যেটুকু প্রয়োজন (যেমন, এই বইটা কবে কিনলে বা রাত্তিরে শুতে যাবার আগে পা ধুয়ে এসেছ কিনা এসব প্রশ্নের উত্তর) তার বাইরে আমি – ঘরে এবং বাইরে – মিথ্যে কথা যথাসম্ভব কম বলার চেষ্টা করি। অনেকসময়ই সত্যি বলি না – বলতে পারি না বা সবদিক রেখে সত্যিটা বলতে পারা যায় না – সেসব সময় চেষ্টা করি খানিকটা ভাসাভাসা কথা বলে এড়িয়ে যেতে, নিতান্ত বাধ্য না হলে মিথ্যে বলি না। হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন – আগের কথাটুকু সত্যি।
অপরকে জাজ করার চেষ্টা সেভাবে করি না। কিন্তু বিরক্তিকর লোকজনের সান্নিধ্য যথাসম্ভব এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করি। বলতে পারেন, এ-ও একরকম জাজ করা – কিন্তু যেহেতু আমার সহনশক্তি খানিক কম, বিরক্তিকর লোকজনকে বেশিক্ষণ নিতে পারি না – ভেতরের বিরক্তি বেরিয়ে এসে তিক্ততা তৈরি করে ফেলার আগেই এড়িয়ে যাওয়া ভালো। একইভাবে ক্ষমতাবান, বিশেষত যিনি নিজস্ব ক্ষমতাবানত্ব বিষয়ে সচেতন, তেমন মানুষজন থেকেও দূরে থাকি। কিন্তু এই দুই গোত্রের মানুষের ক্ষেত্রেই আমি স্রেফ দূরত্বে থাকি – এটাকে নৈতিক অবস্থান বলা মুশকিল – আর ‘বর্জন করা’ বলতে যা বোঝায়, তার থেকে এই ‘দূরত্ব বজায় রাখা’ ব্যাপারটা আলাদা।
নৈতিক অবস্থানের কারণে বর্জন করা-র ব্যাপারে আমার কিছু ক্রাইটেরিয়া আছে।
১. যারা চুরি-জোচ্চুরির সঙ্গে যুক্ত/দুর্নীতিগ্রস্ত।
২. যারা ভণ্ড। অর্থাৎ প্রয়োজনে মিথ্যে বলার পরিধি অতিক্রম করে যাদের অস্তিত্ব নির্মাণে মিথ্যাভাষণ ও মিথ্যাচারটাই একপ্রকার প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. যারা ক্ষমতার (এই ক্ষমতা বহুমাত্রিক) সুযোগ নিয়ে মহিলাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি/অভব্যতা করেছে।
৪. যারা বিদ্বেষপূর্ণ। মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার আগে যারা তার লিঙ্গ/জাতি/ধর্মকে প্রাথমিক বিচার্য বিষয় হিসেবে দেখে এবং তার ভিত্তিতে কিছু মানুষকে নিচু চোখে দেখে বা ঘৃণা করে। (প্রসঙ্গত, অনেকেই এই ঘৃণা মুখে প্রকাশ করে না – আবার কেউ কেউ মুখে বলতে সঙ্কোচবোধ করে না – অকপটতা মহৎ গুণ হলেও, এই গোত্রের অকপটতাকে গুণ বলে বিশ্বাস করতে পারা মুশকিল।)
মোটামুটি এই চার গোত্রের মানুষকে আমি বর্জন করি (কেননা আমি নিজেকে ততখানি ‘উত্তম’ মনে করি না, যে নিশ্চিন্তে ‘অধম’-এর সঙ্গে চলতে পারে)। অবশ্য সাধারণত যাদের মধ্যে থাকে, তাদের মধ্যে এর মধ্যে একাধিক দোষেরই সমাহার ঘটে থাকে। নীরবে বর্জন করা-ই যথেষ্ট নয় – এসব অনাচারের সরব প্রতিবাদও জরুরি। ভয়ানক সোচ্চার হতে না পারলেও, আমি ওই নৈতিক অবস্থান থেকেই সাধ্যমতো প্রতিবাদও করি।
তো মুশকিল হয় তখনই, যখন দেখি বহুদিনের পরিচিত/ঘনিষ্ঠ/সুহৃদ/শ্রদ্ধাভাজন কেউ উপরোক্ত তিন দোষে দোষী। সেসব ক্ষেত্রে?
সেক্ষেত্রে আমার নৈতিক অবস্থান হলো – প্রাথমিকভাবে সত্যতা বিচার। অর্থাৎ আমার এতদিনকার শ্রদ্ধা-বিশ্বাসের পাত্রটি কি সত্যিই এরকম? যদি দেখা যায় অভিযোগ মিথ্যা, তাহলে যথাসম্ভব মানুষটির পাশে থাকি। কিন্তু যদি দেখা যায়, হ্যাঁ, অভিযোগ সত্যি – তাহলে?
এখানেই আমার দুর্বলতা – নীতিপ্রয়োগের দুর্বলতা। ব্যক্তিগত সম্পর্ক কোনও এক জায়গায় আমাকে দুর্বল করে দেয় – আমি কিছুতেই যেন সেই মানুষটার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারি না। এক্ষেত্রে আমি যেটা করি, তা হলো – চুপ থাকা। বর্জন যদি করতে হয়, সে বর্জন, অন্তত এসব ক্ষেত্রে, নীরব। হ্যাঁ, এটা অনুচিত আমি জানি – তবু পেরে উঠি না। এবং আমার সেই প্রিয় মানুষটি যদি উপরোক্ত দোষ কাটিয়ে উঠে নতুন করে শুরু করা চেষ্টা করে, আমি তার পাশে থাকার চেষ্টা করি।
অপরের নৈতিক অবস্থান স্থির করে দেবার ঔদ্ধত্য আমার নেই। তবু এটুকু বলার, উচিত-অনুচিত বিচার ব্যক্তিপরিচয়-নির্বিশেষ হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কোন কাজটি উচিত মনে করবেন আর কোনটি অনুচিত (এবং কোনটি একেবারেই অনুচিত), তার বিচার আপনারই। কিন্তু যে কাজ একজনের ক্ষেত্রে অনুচিত বলে মনে করেন – এবং সোচ্চারে যে কাজের নিন্দা করেন – সেই কাজ কোনও প্রিয়জন করে বসলেও তা অনুচিতই। প্রতিবাদ করুন – কিংবা নিতান্ত অপারগ বোধ করলে চুপ থাকুন (সেটাও কাজের কথা নয় – কিন্তু যেহেতু আমি নিজেও এই দুর্বলতা-দোষে দোষী, তাই অন্য পরামর্শ দিতে পারছি না)। আর যা-ই করুন, ধানাইপানাই করে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অন্য কাজের প্রতিষ্ঠা/খ্যাতি/কৃতিত্ব/গুণ ইত্যাদির প্রসঙ্গ তুলে, বা অন্যক্ষেত্রে মানুষ হিসেবে তিনি কত অমায়িক কত উদার কত ভদ্র কত হ্যানা কত ত্যানা ইত্যাদি বলে অনুচিত কাজটির পক্ষে সাফাই দেবেন না বা অপকর্মটিকে লঘু করবেন না। দোষেগুণে মানুষ, ঠিকই। সেদিক থেকে দেখলে ডাকসাইটে অপরাধীরও কিছু গুণ থাকে, আপনার প্রিয় মানুষটির যে অনেক গুণ থাকবে তেমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু কিছু দোষ এমন বড় দোষ যে তা অনেক গুণকে গৌণ করে দেয় – ঠিক যেমন কালির পোঁচ সব রংকেই ঢেকে দিতে সক্ষম। কাজেই, একেবারেই অনুচিত গোত্রভুক্ত যেসব কাজ সেগুলোর বিরুদ্ধে থাকুন।
নইলে, পাব্লিক মেমরি অতি হ্রস্ব – কাজেই হয়তো আপনার বর্তমান অবস্থান কেউই মনে রাখবে না – তবু পরবর্তীতে, ভিন্ন কোনও ঘটনায়, আপনার নৈতিক অবস্থানের ভিতটি আপনাআপনিই নড়বড়ে হয়ে যাবে। অন্যায়-অনুচিতের বিরুদ্ধে আপনার ‘প্রতিবাদ’ লঘু হয়ে যাবে, যেতে বাধ্য। অবশ্য, এক্ষেত্রে ডিসক্লেইমার দিয়ে রাখা কর্তব্য – এই সতর্কবার্তা প্রযোজ্য তখনই, যদি নৈতিক অবস্থান বলে প্রাথমিকভাবে আপনার যদি আদৌ কিছু থেকে থাকে।











