৯ই আগস্ট, ২০২৪। আরজি কর মেডিকেল কলেজে কর্মরতা অবস্থায় নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুনের শিকার হন সোদপুরের এক তরুণী চিকিৎসক।
ক্রমশ আমরা জানতে পারি, এটি নিছকই খুন ও ধর্ষণের ঘটনা নয়। এর পেছনে আছে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি। থ্রেট কালচার, জাল ওষুধ, জাল স্যালাইন এবং জাল ডাক্তার সংক্রান্ত ঘটনা। সেই অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ফলেই ঐরকম পৈশাচিকভাবে খুন হতে হয় অভয়াকে।
এই ভয়ংকর, নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সারা বাংলার মানুষ রুখে দাঁড়ালেন। ১৪ই আগস্ট লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে এলেন। তাঁরা রাত দখল করলেন, প্রতিবাদে মুখর হলেন।বর্তমান শাসক দলের প্রতি সরাসরি অনাস্থা প্রকাশ করলেন। বিশ্বের অন্তত ২৫টি দেশের ১৩০টি শহরে প্রতিবাদী মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে সামিল হলেন।
প্রান্তিক যৌনতার মানুষ, শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী মানুষ, শ্রমজীবি মানুষ, রিক্সাচালক ভাইরা, সুইগি-জোম্যাটোর গিগ ওয়ার্কার মানুষজন, সংখ্যালঘু জাতির মানুষ – সকলে নেমে এসেছিলেন এই প্রতিবাদমুখর রাজপথে।
সেই শুরু, তারপর থেকে আমাদের রাজ্য সাক্ষী থেকেছে একের পর এক ঐতিহাসিক মিছিল, অবস্থান এবং বিক্ষোভ কর্মসূচির।
বারংবার রাত দখল, স্বাস্থ্য ভবনের সামনে জুনিয়র ডাক্তারদের অবস্থান, পুলিশ কমিশনারকে শিরদাঁড়া উপহার দিয়ে আসা, কখনো দ্রোহের প্রজাতন্ত্র পালন, কখনো মহালয়ার ভোর দখল, কখনো দ্রোহের বর্ষবরণ, আবার কখনো ফুটবল ফ্যানদের প্রতিবাদের ভয়ে ডার্বি ম্যাচ বাতিল…
কলেজ স্কোয়ার থেকে ধর্মতলা, যাদবপুর থেকে গড়িয়াহাট, আবার কখনো গড়িয়াহাট থেকে রাসবিহারী – বিশাল মিছিলে মিছিলে সেইসময় স্তব্ধ হয়ে গেছিল মহানগর।
অভয়া আন্দোলন শুধুমাত্র কলকাতা শহরেই আবদ্ধ থাকেনি।
ছড়িয়ে পড়েছিল বর্ধমান, পুরুলিয়া, নদীয়া, হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, রায়গঞ্জ, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি সর্বত্র।
এমনকি দেশের বাইরেও অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, জাপান, স্পেন, নেদারল্যান্ড, জার্মানি, কানাডা – সর্বত্র দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছিল প্রতিবাদের আগুন। গোটা বিশ্ব স্তব্ধ বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছিল প্রতিবাদের প্রতিস্পর্ধা।
ক্রমশ আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে।
৪ঠা সেপ্টেম্বর আবারও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রাত দখল করা হয়।
৯ই সেপ্টেম্বর – ৯ মিনিটের জন্য প্রতিবাদে স্তব্ধ ছিল রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
১৭ই সেপ্টেম্বর প্রেস ক্লাবে জয়েন্ট প্লাটফর্ম অফ ডক্টরস এবং বিভিন্ন নাগরিক / গণসংগঠনগুলোর মিলিত উদ্যোগে একটি প্রেস কনফারেন্স আয়োজিত হয়। সিদ্ধান্ত হয় একটি মঞ্চ গঠনের। প্রকৃত প্রস্তাবে ওই দিনই অভয়া মঞ্চের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়।
২০শে সেপ্টেম্বর JPD ও বিভিন্ন প্রতিবাদী সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত হয় গড়িয়া, হাইল্যান্ড পার্ক থেকে শ্যামবাজার, ৪২ কিলোমিটারের ঐতিহাসিক রিলে মশাল মিছিল।
১লা অক্টোবর – কলেজ স্কোয়ার থেকে রবীন্দ্র সদন পর্যন্ত “এক লক্ষ, লক্ষ্য এক” – আবারও এক ঐতিহাসিক মিছিল। স্লোগানে স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করে প্রতিবাদী গানে ও কবিতায় “রাস্তা দখল” করে নেন অগণিত মানুষ।
২রা অক্টোবর—কলেজ স্কোয়ার থেকে ধর্মতলা মিছিল হয় জুনিয়ার ডক্টরস ফ্রন্টের আহ্বানে।
৫ থেকে ২১শে অক্টোবর – ধর্মতলায় জুনিয়র ডাক্তারদের অনশন। সর্বতভাবে পাশে ছিলেন JPD সহ বিভিন্ন নাগরিক / গণ সংগঠনের প্রতিবাদী মানুষজন এবং বরিষ্ঠ চিকিৎসকরা।
এরই মাঝে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন।
১৫ই অক্টোবর – শাসকের দম্ভ ভরা উৎসবের কার্নিভালকে ম্লান করে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ মুখর দ্রোহের কার্নিভাল।
২৮শে অক্টোবর তারিখটা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ঐদিন জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টর্স সহ পশ্চিমবঙ্গ নাগরিক সমাজের ৮০টিরও বেশি প্রতিবাদী সংগঠন মিলে একাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সভাঘরে মিলিত হয়ে গঠন করেন অভয়া মঞ্চ।
“আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বন্টন” – দৃপ্ত এই উচ্চারণের মধ্য দিয়েই আত্মপ্রকাশ করে অভয়া মঞ্চ। সোচ্চারে বলে ওঠে –
“এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না
এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না
এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না”
অভয়া মঞ্চ বারংবার শাসককে মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রতিটা মাসের ৯ তারিখ “অভয়া দিবস”। প্রতিটা ৯ তারিখ, অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে মানুষ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছেন।
৪ঠা নভেম্বর – অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা অবধি ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায় “দ্রোহের আলো জ্বালো” উদযাপন।
৯ই নভেম্বর – কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা অবধি মিছিল করে এসে অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে জনতার চার্জশিট পেশ।
১৭ই নভেম্বর – বিচারহীন ১০০ দিনের প্রতিবাদে পানিহাটি-সোদপুর থেকে শ্যামবাজার অবধি সাইকেল মিছিল।
অভয়া মঞ্চ বিশ্বাস করে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা ভেঙ্গে ফেলে নতুন নির্মাণের জন্য শিক্ষা শিবির অত্যন্ত জরুরি। ডিসেম্বর ২০২৪-এ দুইটি শিক্ষা শিবির আয়োজন করেছে অভয়া মঞ্চ।
১ ডিসেম্বর নারী ও প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের অধিকার লিঙ্গসাম্য রাজনীতি নিয়ে আয়োজিত সফল শিক্ষা শিবিরের পর ২০ ডিসেম্বর মহাবোধি সোসাইটি হলে অনুষ্ঠিত হয় স্বাস্থ্যের অধিকার নিয়ে অভয়া মঞ্চ আয়োজিত দ্বিতীয় শিক্ষা শিবির। দুটি শিক্ষা শিবিরেই শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি এবং অংশ গ্রহণ চোখে পড়ার মত।
৩ ডিসেম্বর অভীক দে এবং বিরুপাক্ষ বিশ্বাস কে স্বাস্থ্য দফতরে ফিরিয়ে আনার প্রতিবাদে West Bengal Medical Concil অভিযান এবং সারা রাত অবস্থান।
৪ঠা ডিসেম্বর – শিয়ালদা কোর্টের সামনে ন্যায় বিচারের দাবিতে প্রতিবাদী জমায়েত।
৬ ডিসেম্বর West Bengal Medical Concil থেকে স্বাস্থ্যভবন পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিল।
১৪ই ডিসেম্বর – রানী রাসমণি এভিনিউতে সমাবেশ এবং পথসভা করা হয়। মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুতুল পোড়ানো কে কেন্দ্র করে পুলিশ এবং প্রতিবাদী জনতার মধ্যে বিরোধ এবং প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
১৮ ডিসেম্বর ওয়াই চ্যানেলে পথ সভা হয় এবং কুশপুত্তলিকা জ্বালানো হয়।
২০ থেকে ৩১শে ডিসেম্বর – ধৰ্মতলায় অবস্থান মঞ্চ। জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস ও অভয়া মঞ্চের ডাকে প্রতিবাদী মানুষদের লাগাতার অবস্থান।
৯ই জানুয়ারি – কলেজ স্ট্রিট থেকে মিছিল করে শ্যামবাজার অভিযান।
১৭ জানুয়ারি বিধান নগর কমিশনারেট অভিযান ।
১৮ জানুয়ারি শনিবার আর ২০ জানুয়ারি সোমবার শিয়ালদহ কোর্ট চত্বর উত্তাল হয়ে ওঠে। আর জি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের মামলার রায়দান ছিল ১৮ জানুয়ারি। ঘটনার ১৬২ দিন এবং বিচার শুরুর ৬৮ দিন পর শিয়ালদহ অতিরিক্ত দায়রা বিচারকের আদালতে রায় ঘোষিত হয়- সঞ্জয় রাই ই একমাত্র দোষী। ২০ জানুয়ারি সাজা ঘোষণা করলেন বিচারক অনির্বাণ দাস – যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫০০০০ টাকার জরিমানা।
১৮ এবং ২০ দু দিন ই সব নিয়মের নিগড়কে অগ্রাহ্য করে দূর দূরান্তের বহু সাধারন মানুষ এসে যোগ দেন । প্রতিবাদী গান, কবিতা, স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে শিয়ালদহ এলাকা। ১৮ তারিখ রায় ঘোষণার দিন জুনিয়র চিকিৎসক আন্দোলনের নেতারা অভয়া মঞ্চের কর্মসূচিতে যোগ দেন। জুনিয়র চিকিৎসকরা WBJDF এর পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ লিফলেট বিতরণ করে যেখানে তদন্ত প্রক্রিয়ার ২০ টি গভীর অসঙ্গতি কে তুলে ধরা হয়। এই দু দিনের শেষ কর্মসূচি ছিল শিয়ালদহ থেকে মৌলালি পর্যন্ত মিছিল এবং মানব বন্ধন। ২০ তারিখ মৌলালি তে কুশ পুত্তলিকা দাহ করা হয়।
WBJDF এর আস্ফাকুল্লা নাইয়া র উপর পুলিশি জুলুমবাজির প্রতিবাদে ১৬ জানুয়ারি কলেজ স্কয়ার থেকে আর জি কর অবধি মিছিল।
২৯ জানুয়ারি প্রতিবাদী চার চিকিৎসকদের আইনি চিঠির বিরুদ্ধে West Bengal Medical Concil অভিযান
৯ই ফেব্রুয়ারি – কলেজ স্কোয়ার থেকে আরজি কর মেডিকেল কলেজ অবধি মৌন মহা মিছিল।
৯ই মার্চ – হাজরা থেকে রাণুছায়া মঞ্চ এবং ধর্মতলা থেকে রাণুছায়া মঞ্চ অবধি মিছিল। দুই মিছিল রবীন্দ্রসদনে এসে মিলেমিশে সৃষ্টি করে জনস্রোত। অতঃপর রাণুছায়া মঞ্চে এসে পথসভা।
৯ই এপ্রিল – “আর কতদিন সময় চাই / জবাব দাও সিবিআই” – এই দাবিতে রাজপথ মুখরিত করে করুণাময়ী থেকে CGO কমপ্লেক্স অভিযান।
২২শে এপ্রিল – জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে অভয়া (ডরিনা) ক্রসিং অবধি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ডাক দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মিছিল।
৯ই মে – রবীন্দ্রনাথকে মনে রেখে বেলগাছিয়া মেট্রো স্টেশন থেকে শ্যামবাজার অবধি প্রতিবাদী পদযাত্রা এবং শ্যামবাজারে পথসভা। রবীন্দ্রসঙ্গীত, রবীন্দ্রকবিতার প্রতিরোধ ও প্রতিবাদে উদ্বেলিত হয় মিছিলের পরিক্রমাপথ এবং পথসভা।
৯ই জুন – অভয়া কাণ্ডের তথ্য প্রমাণ লোপাটের জন্য সমগ্র বিশ্বের সামনে কুখ্যাত হয়ে উঠেছে টালা থানার নাম। সেই ষড়যন্ত্র এবং কুকীর্তিকে আরো একবার স্মরণ করিয়ে দিতে সংগঠিত হয় টালা থানা অভিযান। অভিযান শেষে টালা থানা থেকে মিছিল করে গিয়ে আরজি কর হাসপাতালে গিয়ে অভয়া মূর্তিতে মাল্যদান এবং মূর্তির সামনে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন।
২৯শে জুন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অভয়া মঞ্চের তৃতীয় শিক্ষাশিবির অনুষ্ঠিত হয়।
এই দিনেই (২৯শে জুন ) সন্ধ্যায় “অভয়া থেকে তামান্না” – অভয়া মঞ্চের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৩০টি সংগঠনের ডাকে গড়িয়াহাট থেকে রাসবিহারী বিশাল একটি মশাল মিছিলে আবারও গর্জে উঠেছিল মহানগর।
৯ই জুলাই – শ্রমিক-কর্মচারীদের আহ্বানে সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘটের প্রতি সংহতি জানিয়ে, মৌলালি থেকে রাজাবাজার অবধি বিশাল এক মিছিল করে মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া অভয়া একজন শহীদের নাম। অতঃপর বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় রাজাবাজারে অনুষ্ঠিত হয় এক পথসভা, যা উপচে উঠেছিল বিভিন্ন ভাষা ও বিভিন্ন ধর্মের মানুষের ভিড়ে।
২৫শে জুলাই – অভয়া আন্দোলনের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভাবনা বিষয়ে মৌলালি যুব কেন্দ্রে ডাক দেওয়া হয় এক গণ কনভেনশনের। সভাস্থল উপচে পড়ে প্রতিবাদী জনতার ভিড়ে।
১লা আগস্ট – আরজি কর তদন্তে ঢিলেমি এবং সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট দিতে গড়িমসি করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ঝাঁটা হাতে CGO কমপ্লেক্স অভিযান করেন অভয়া মঞ্চের সদস্যরা। অভিযান শেষে প্রতীকী তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় দফতরের মেইন গেটে।
৭ই আগস্ট – অভয়া মঞ্চের ডাকে ৬০ টির মতো সাইকেল সুদূর সুন্দরবন থেকে অভয়ার বিচারের দাবি প্রচার করতে করতে কলকাতা এসে পৌঁছয়।
৮ই অগস্ট – সাইকেল আরোহীরা অভয়াদের বিচারের দাবী নিয়ে প্রচার চালান বেহালা থেকে কলেজ স্কোয়ার অবধি। ২০২৪ সালের ৮ই আগস্টের অভিশপ্ত রাতকে ভুলতে না দেওয়ার অঙ্গীকার করে WBJDF এর ডাকে এবং অভয়া মঞ্চের সমর্থনে কলেজ স্কোয়ার থেকে শ্যামবাজার অব্ধি মশাল মিছিল। সারারাত শ্যামবাজার মোড়ে অবস্থান।
৯ই আগস্ট – সকালে রাজ্যের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অভয়ার ন্যায় বিচারের দাবীতে রাখী বন্ধন কর্মসূচি। সাধারণ মানুষের থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়ার পরে ঐদিনই বিকেল ৪টেয় হাজরা মোড়ে জমায়েতের ডাক দেয় অভয়া মঞ্চ।
৯ই আগস্ট ছিল অভয়া হত্যার এক বছর। অভয়ার বিচারহীনতার এক বছর। ক্ষোভে ফুঁসছিলেন সাধারণ প্রতিবাদী মানুষ। অভয়া মঞ্চের ডাকে অসংখ্য মানুষ এই ঐতিহাসিক সমাবেশে যোগ দেন। স্তব্ধ করে দেন হাজরা মোড়।
১৪ই আগস্ট – কলকাতা মহানগর তো বটেই, পুরুলিয়া থেকে পাথরপ্রতিমা, জলপাইগুড়ি থেকে জঙ্গিপুর – রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অভয়া মঞ্চের ডাকে সংগঠিত হয় “রাতদখল” কর্মসূচি এবং রাত ১২টার পরে স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন। রাত দখল কর্মসূচিতে অসংখ্য সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ঢল নামে। উত্তর থেকে দক্ষিণ বঙ্গের গ্রাম, শহরের বহু পরিবার অংশ নেন। বহু জায়গায় মশাল মিছিল হয়। রাতের আকাশ আরো একবার মুখর হয়ে ওঠে অভয়ার ন্যায় বিচারের দাবিতে।
৯ই সেপ্টেম্বর – অভয়ার বিচারহীন ১৩ মাসের প্রতিবাদে রাণুছায়া মঞ্চে প্রতিবাদী সমাবেশ।
৯ই আগস্ট ও ১৪ই আগস্টের প্রতিবাদের তীব্রতা দেখে প্রশাসন আবারও ভয় পেতে শুরু করে। ফলে শুরু হয় বিভিন্ন মিথ্যা ও ভুয়ো মামলায় প্রতিবাদী চিকিৎসকদেরকে জড়িয়ে ফেলার অপচেষ্টা। কখনো বৌবাজার, কখনো ঠাকুরপুকুর, হরিদেবপুর, আবার কখনো বা হেয়ার স্ট্রিট থানায় ডেকে এনে সুদীর্ঘ জেরার মাধ্যমে চলে তাঁদেরকে ভয় দেখানোর হাস্যকর প্রয়াস। ফল হয় উল্টো। প্রতিরোধ হয়ে ওঠে দৃঢ়তর। দলদাস প্রশাসনের বেঁকে যাওয়া শিরদাঁড়ার চিকিৎসা করার অভূতপূর্ব এক প্রয়াস নেয় অভয়া মঞ্চ।
১৩ই সেপ্টেম্বর – যে হেয়ার স্ট্রিট থানায় প্রতিবাদী চিকিৎসকদের ডেকে এনে বারংবার হেনস্থা করা হচ্ছিল, সেই রাষ্ট্রীয় হেনস্থার বিরুদ্ধে হেয়ার স্ট্রিট থানা সংলগ্ন এলাকাতেই চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করা হয়।
২২শে সেপ্টেম্বর – অভয়া আন্দোলনের প্রতিবাদীদের পুলিশি হেনস্থার বিরুদ্ধে JPD এর আহ্বানে এবং অভয়া মঞ্চের সহযোগিতায় মৌলালি যুব কেন্দ্রে গণ কনভেনশন।
৯ই অক্টোবর – দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে অভয়ার বিচারহীন থাকার বিরুদ্ধে শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশনের সামনে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা অবধি ১২ ঘন্টার প্রতিবাদী অনশন অবস্থান এবং শেষে মোমবাতি মিছিল। অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষ সামিল হয়েছিলেন এই অনশনে।
১২ই অক্টোবর – গণ ধর্ষণের শিকার হওয়া দুর্গাপুর আইকিউ সিটি হসপিটালের প্রথম বর্ষের ছাত্রীর ন্যায়বিচার চেয়ে দুর্গাপুরে পৌঁছে যায় অভয়া মঞ্চ। ঘটনাস্থলে বিক্ষোভ প্রদর্শন, এসপি অফিসে ডেপুটেশন জমা দেওয়া, সিটি সেন্টার অঞ্চলে প্রতিবাদী সমাবেশের মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয় “অভয়া মঞ্চের একটাই সুর, জাস্টিস ফর দুর্গাপুর”।
১৬ই অক্টোবর – জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে জলপাইগুড়ির বন্যাদুর্গত এলাকায় অনুষ্ঠিত অভয়া ক্লিনিকে অভয়া মঞ্চ যোগ দেয়। এটি ছিল তাদের আয়োজিত অষ্টম বন্যাত্রাণ শিবির। এছাড়া সাধারণ ত্রাণও দেওয়া হয় বিভিন্ন এলাকায়।
২১শে অক্টোবর – অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে এবং গ্লোবাল সলিডারিটি কমিউনিটির উপস্থাপনায় “স্বাধীনতা অসহায়” শীর্ষক গ্লোবাল এন্থেমটি রিলিজ হয়, যা এই বর্তমান সময়ের আন্দোলনে আন্তর্জাতিক স্তরে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে।
২৪শে অক্টোবর – ধর্ষিতা মূক ও বধির মেয়েটির জন্য ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনতে অভয়া মঞ্চের প্রতিনিধি দল হাজির হয় দত্তপুকুরে। ওই প্রতিনিধি দল গাইঘাটায় আক্রান্ত চিকিৎসকের বাড়িতে গিয়েও দেখা করেন।
অভয়াকে আমরা ভুলবো না। কাউকে ভুলতেও দেব না। “ধর্ষিতা বোনের শাড়ি ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।” সেই পতাকা বহন করেই দিক থেকে দিগান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে অভয়া মঞ্চ। জলপাইগুড়ি, বর্ধমান, উত্তর দিনাজপুর, কুচবিহার, হাওড়া, বৃহত্তর বারাসাত, বৃহত্তর বিধাননগর, নদীয়া, বৃহত্তর দক্ষিণ – জেলায় জেলায় ডানা মেলেছে অভয়া মঞ্চ।
এই রাজ্যে প্রতিদিন অভয়ারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। প্রতিটা সকাল শুরু হচ্ছে সংবাদপত্রে, “নিত্যনতুন” ধর্ষণের ঘটনার শিরোনামে। অভয়া মঞ্চ লড়াইয়ের রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ায়নি। সুলঙগুড়ি, কোন্নগর, হরিদেবপুর, ক্যানিং, কসবা ল কলেজ, দুর্গাপুর, দত্তপুকুর, ব্যারাকপুর, গরফা, সোনারপুর, চাঁদপাড়া – যেখানেই নারী নির্যাতনের / ধর্ষণের খবর এসেছে, অভয়া মঞ্চের প্রতিবাদী সদস্যরা ছুটে গেছেন।
অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যেমন খিদিরপুর, বোলপুর, জলপাইগুড়ি, ১৬ বিঘা বস্তি, সোনারপুর প্রভৃতি জায়গায় আয়োজন করা হচ্ছে “অভয়া ক্লিনিক” নামক স্বাস্থ্য শিবিরের। কেন্দ্রীয় কর্মসূচি ছাড়া বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের ও অসংখ্য কর্মসূচি হয়েছে গত এক বছরে যেখানে মঞ্চের সদস্য এবং বহু সাধারণ প্রতিবাদী মানুষ অংশ নিয়েছেন।
যদিও “অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,” তবুও অন্ধকার রাত পেরিয়ে রোদ ঝলমলে দিন আসবেই। তখন ইতিহাস সাক্ষী থাকবে, সেই চির আঁধারের দিনগুলোতেও রাস্তায় ছিল অভয়া মঞ্চ। রাজপথ থেকে আলপথে, গলিপথ থেকে বনপথে প্রতিবাদে ছিলেন, প্রতিরোধে ছিলেন আমার, আপনার মতোই ছাপোষা কিছু সাধারণ মানুষ।
ঘন আঁধারের আল বেয়ে যাত্রা শুরু করেছে অভয়া মঞ্চ। আলোর পথযাত্রী হয়ে নিয়ে আসবে নতুন ভোর। আগামী দিন গুলি হোক সংগ্রামী মানুষের, বৈষম্য আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাশে থাকবে অভয়া মঞ্চ।
সঙ্কলনঃ অরিত্র দে।












অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকলন। অভয়া মঞ্চের ধারাবাহিক আন্দোলনের মূল্যবান দলিল। ✊✊✊✊