ছোটবেলায় ডাক্তার হবার কোন ইচ্ছাই আমার ছিল না। ভাবতাম বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করবো আর আমূলের বিজ্ঞাপনের মতো অমূল্য বিজ্ঞাপন বানাবো। রাস্তা ট্রেনের কামরা,খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন বিজ্ঞাপন আমাকে টানতো। তারপরে বাড়ি থেকে বোঝালো এটা শখ হিসেবে ভালো কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার,উকিল সিএ না হলে খাবার জুটবে না। আমার শখ চাপা পড়ে গেল অংক খাতার শেষ পাতায় যেখানে ছবি আঁকতাম তার বন্ধুদের জন্মদিনের কার্ডে যেখানে মজার মজার ক্যাপশন লিখতাম। অধরা থেকে গেল সেই স্বপ্ন আমার কলম থেকে বেরোবে ‘বঙ্গ জীবনের অঙ্গ’, সেই লাইনটা। সেই সূত্রে ই জানতে পারি পীযুষ পান্ডে নামটা টিভিতে তার সাথে আলাপ, মিলে সুর তুমহারা হামারা। আমাদের ছোটবেলা।এই বিজ্ঞাপনটা আমাদের বিজ্ঞাপন দেখার ধরনটাই বদলে দিয়েছিল। ভোরের সূর্য, সমুদ্রের ঢেউ আর ভীমসেন যোশীর দরাজ গলা দিয়ে গান শুরু তারপর কাশ্মীরে শিকারা, পাঞ্জাবের ট্রাক্টর। একসময় দেশের প্রথম, কলকাতার মেট্রোর রবীন্দ্রসদন মেট্রো স্টেশন থেকে নামছেন সুচিত্রা মিত্র, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আনন্দশংকর,অরুনলাল আর পিছনে বাজছে তোমার সুর আমার সুর সৃষ্টি করুক ঐক্য সুর। আমি মন্ত্রমুগ্ধ। দেড় মিনিটে পুরো ভারতবর্ষ।
পীযুষ পান্ডে গল্প বলতেন কোন যা চকচকে ড্রয়িং রুমের নয় আমাদের সাধারণ পরিবারের। রাম মুরারির গল্প। যে সারাদিন অফিসের ফাইলে চাপা পড়ে থাকে, দেরিতে বাড়ি ফেরার জন্য বউয়ের বকুনি খায় । সে পয়সা জমিয়ে একটা লুনা মোপড কিনেছে। মপেড তার পরিবারের সদস্য। লুনা মানে খরচা কম, মজবুত বেশী। আমার বাবা কাকারাও তো সেই ভেবে জিনিস কিনতেন ।
এরপর ক্যাডবেরি সেই বিজ্ঞাপন। একটা মেয়ে দর্শক আসনে বসে ক্যাডবেরি খাচ্ছে আর প্রার্থনা করছে বয়ফ্রেন্ডের সেঞ্চুরিটা যেন পূর্ণ হয়। তারপর বল বাউন্ডারি লাইন পার করলো, স্কোরবোর্ডে ১০০। সে মাঠে ঢুকে গিয়ে পুলিশটাকে ডজ করে কাটিয়ে নাচতে আরম্ভ করল। একটা মেয়ে ক্রিকেট মাঠে নাচ। এক স্বাধীনতার স্বাদ। এরকম নাচ আমরা আমরা চান করার সময় বন্ধ কলতলায় বা আয়নার সামনে একা ঘরে কতবার প্র্যাকটিস করেছি। আমাদের ছোটবেলার ক্যাডবেরি আর কুচ খাস হে হাম সাভি মে। আমরা সবাই স্পেশাল।
ফেভিকলের বিজ্ঞাপন আমাদের মুখের ভাষা হয়ে গেছিল। কোন দাদা দিদি বেশি দিন প্রেম করলে আমরা বলতে শুরু করতাম ফেভিকল কা মজবুদ জোড় হে। ফেবিকুইক এর ক্যাপশন তোরো নেহি জোড়ো আমাদের মনের কথা। সে সম্পর্কই হোক কী দেশ,ভাঙতে নয় গড়তে হবে।অমিতাভ বচ্চন কে নিয়ে করা তার বিখ্যাত পোলিওর বিজ্ঞাপন , দো বুঁদ কী জিন্দেগি। পীযুষ পান্ডে শিখিয়েছিলেন ভালো বিজ্ঞাপনের জন্য অর্ধনগ্ন নারীর শরীর বা বিদেশি লোকেশন দরকার নেই আমাদের ঘোমটা দেওয়া মা, মাসিরা বা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ঘামে অফিস যাওয়ার দিদিরাও বিজ্ঞাপনে চরিত্র হয়ে উঠতে পারেন। বিজ্ঞাপন কোন প্রোডাক্ট বিক্রি করা নয় বিজ্ঞাপন আমাদের সংস্কৃতিকে, আমাদের দেশকে,আমাদের রুচিকে তুলে ধরা।স্যালুট স্যার।











পীযূষ পাণ্ডের মতো মানুষেরা তাঁদের অনন্য সৃষ্টির আড়ালেই থাকেন,চলে যাবার পর তাঁদের কৃতীকে নিয়ে আমাদের স্মৃতি জ্ঞাপন। মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে — এই শব্দভাষ্যের অনুসরণে বলি, মন ভরে যায় বিজ্ঞাপনে। পীযূষ পাণ্ডে জানতেন আমজনতার মনখিড়কি খোলার রসায়ন। তাই তিনি স্মরণীয়।