সত্যি, সহজভাবে কোনো জিনিস ঘটা আমাদের কপালে নেই। আসলে আমরা তো সদা সর্বদা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মানসিকতায় রয়েছি, প্রায় সীমান্তে আর্মির মতোই সব সময় টানটান উত্তেজনা। একটা একটু কমে তো সঙ্গে সঙ্গে আর একটা এসে হাজির। এই বুঝি টাকাকড়ি সব চলে গেল’, এই বুঝি এলাকার পাততাড়ি গোটাতে হবে, এই বুঝি ঘাড়ের উপর থেকে মাথাটাই উড়ে গেল’!! আর ঠিক এই মুহূর্তে ভোটে নাম থাকবে না কাটা যাবে?! মানে মুণ্ডুর বদলে ভোটার লিস্টে নামটাই কাটা পড়ে বসবে। এ রকম সম্ভাবনা ব্যাপক, হলোই বা আমার চতুর্দশ পুরুষ পূর্ব সীমানা কখনো লঙ্ঘন করেনি, এমনকি যখন সীমানার গল্পই ছিল না, তখনও!!
শুনলাম নাকি বছর তেইশ আগে নির্বাচনী তালিকায় এই রকম নিবিড় পর্যালোচনা হয়েছিল, মানে সরাসরি বাড়ি বাড়ি গিয়ে। তারপর থেকে যা পর্যালোচনা হয়েছে তা নির্বাচনী দপ্তর থেকেই। কিন্তু, তেইশ বছর আগে এই রকম ধুম ধারাক্কা, শুধু পিলে চমকানো নয় প্রায় প্রাণঘাতী কাণ্ডের কোনো ক্ষুদ্র ভগ্নাংশও হয়েছিল বলে তো মনে পড়ছে না। এমনকি SIR নামটাও তখন শুনেছিলাম কিনা সন্দেহ! আর প্রায় কেন এতো পুরোপুরি প্রাণঘাতী ব্যাপার,”কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে, কত লোকের মাথা পড়ল কাটা”!! শেষ পর্যন্ত কত মানুষের যে হৃদয় স্তব্ধ হয়ে যাবে শুধু ‘টেনশনে’, তা একেবারেই অজানা। এও জানি না, এক্ষেত্রে ডাক্তাররা ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ কী দেবে, মানে cause of death? ‘Tension due to SIR’? অবশ্যই সেটা হবে এক নতুন সংযোজন!!
তবে, একটা ঘটনা ঠিক যে গত কয়েক বছরে বোধহয় এই প্রথম বাঙলার মানুষ ‘প্রেমঘটিত’ ছাড়া অন্য কোনো কারণে আত্মহত্যা করছে। এর আগে তো সমস্ত কৃষক আত্মহত্যা পারিবারিক ও প্রেমঘটিত বলেই পরিশেষে জানা যেতো। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (NCRB) ২০২৩ সালে সারা দেশে ১০৭৮৬ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন, এবং স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে পশ্চিম বঙ্গের সংখ্যা একেবারে শূন্য!
যাক, এই যে প্রায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, এ তো শুধু যুদ্ধ নয় এক মহামহা যুদ্ধ, যেখানে এক পক্ষ বলছে সমস্ত ‘ঘুসপেটিয়া’দের দুর করে ‘পবিত্র বাঙলা’ গড়ে তুলবে ( ‘সোনার বাংলা’ আর বলা যাবে বলে তো মনে হয় না),আর আরেক পক্ষ বলছে, একটা নাম কাটলে এমন যুদ্ধ হবে যে সেই সাদ্দাম হোসেনের ‘Mother of all wars”ও অতিশয় ম্লান বলে প্রতিভাত হবে!!
আর মাঝখান থেকে ভোট মাথায় থাকুক, নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতেই জনগণ একেবারে জেরবার!! এ তো সোজা ভয় নয়, সব ভয়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর stateless people হবার ভয়, হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে। আর, এই ভয়টাই হলো রাজ্যের শাসক দলের সবচেয়ে বড় সুযোগ, প্রায় অযাচিতই বলা যেতে পারে।
নিশ্চিত ভাবে বলা বাহুল্য যে এখন পুরো ব্যাপারটাই চলে গেছে রাজ্যের শাসক দলের কব্জায়। আসলে, পশ্চিম বাংলায় কেন্দ্রীয় শাসক দল যাই করে তা সবই মাননীয়ার উপকারে চলে আসে, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যে কারণেই হোক। SIR তো এখন করবে মাননীয়ার অনুগামীরা ; বরং লাভের লাভ যে এরপর আর বলা যাবে না ‘বহিরাগতদের’ ভোটে জিতেছে। ভোটার বৈধ-অবৈধ যাইহোক লিস্টে তো কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ছাপ পড়ে যাবে! SIR তো মাননীয়ার জন্য বিশাল উপহার, বাইরে কড়া প্রতিবাদ-বিক্ষোভ যাই চলুক!! একটা ‘পোস্ট’ বাজারে চলছে,’SIRকে পছন্দ হয়নি ম্যাডামের’ ! ঠিক কি? কে জানে?!
ভুয়ো ভোটারের সমস্যা তো আজকের নয়, অনেক অ্যাসেম্বলি সেগমেন্টে প্রায় প্রথম থেকেই, আর এখন তো তা সর্বব্যাপী ও অনেক বেশি কেন্দ্রীয় ভাবে পরিকল্পিত। তাকে একটা সঠিক ও ত্রুটিমুক্ত রূপ দেওয়া কি এতই সহজ যে দু তিন মাসের মধ্যে সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে!!
তবে, এ সব নিয়ে আমার কিছু বলার নেই, আমার প্রশ্নটা একেবারে অন্য জায়গায়। ভোটের থেকে এখন মূল বিতর্ক তৈরি হচ্ছে ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে। এমন একটা ধারণা চলছে যে পশ্চিম বঙ্গে এতকাল ধরে শাসক তৈরির চাবিকাঠিটাই ছিল অনুপ্রবেশকারীদের হাতে, তাদের তাড়াতে পারলেই কেল্লা ফতে! সেটা কি সত্যিই ঘটনা? রাজ্যের শাসক দলের মূল স্তম্ভ কি শুধুমাত্রই অনুপ্রবেশকারী, আর কিছু নয়?
তাছাড়া, এই ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়েও আমার কিছু বলার আছে।
১) মানুষ নিজের জায়গা ভিটে মাটি ছেড়ে অন্যত্র যায় কেন, একেবারে সৃষ্টির প্রথম থেকে? নিশ্চয়ই বেড়াতে নয়! বরং, বাধ্য হয়ে এবং কিছুটা আর একটু ভালো ভাবে থাকার অভীপ্সায়।
কোনো একটি বিশেষ দেশে যুদ্ধ, অন্তর্কলহ, ঘোরতর আর্থিক-সামাজিক-রাজনৈতিক বিপর্যয় সব সময়ে প্রতিবেশী দেশের পক্ষে খুব বিপজ্জনক, কারণ মানুষ বাধ্য হয়ে পালিয়ে আসার চেষ্টা করে হাজার প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও। এটা তো সারা পৃথিবীর ঘটনা,আর এক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন কারণে সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থান এতটাই দুর্বল ছিল যে শুধু হিন্দুরাই নয়, অনেক মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বাধ্য হয়ে এদেশে আসে দালালের হাত ধরে কাজের খোঁজে। বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক ‘অনুপ্রবেশ’ যেমন religious harassmentএ ঘটেছে, তেমনি দারিদ্র্য ও কর্মহীনতাতেও কিছুমাত্র কম হয়নি। যদিও এটা অবশ্যই ঠিক যে এপারে অন্ততঃ গত দেড় দশক ধরে তাদের নানা ভাবে ব্যবহার করেছে রাজ্যের শাসক দল।
কিন্তু বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে আর্থিক ও অন্যান্য পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়, এবং সামাজিক সূচকে অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের চেয়ে ভালো জায়গায় চলে আসে(সেটা পাকিস্তান ছাড়া অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য)।
তাই, অনুপ্রবেশের সত্যিকারের পরিসংখ্যান যদি কোথাও থাকে, তাহলে কিন্তু গত কয়েক বছরে সেটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কথা। যদিও, ইদানিং কালে তা আবার পুরোনো অবস্থায় ফেরার পথে।
২) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে ভারতীয়দের আইনি-বেআইনি অনুপ্রবেশের হার যথেষ্টই বেশি এবং প্রায়শই তাদের ফেরতও দেওয়া হচ্ছে অত্যন্ত অমানবিক ভাবে। শুধু এখন নয় এর আগেও হয়েছে, তবে চুপচাপ ভাবে, এত ঢাকঢোল পিটিয়ে নয়। অনেককেই বিভিন্ন বৈষম্যের শিকার হতে হয় নানা সময়ে। সেখানে আমাদের বক্তব্য কী? আমরা কি সেখানে ‘অনুপ্রবেশকারী’দের চরম হেনস্থার পক্ষে না বিপক্ষে? মনে রাখতে হবে, নীতি পরিবর্তনে অনেক আইনি অনুপ্রবেশও রাতারাতি বেআইনিতে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে।
৩) সব দেশেই বেআইনি অনুপ্রবেশ ঘটে দালালের মাধ্যমে (অনেক সময়েই আইনি অনুপ্রবেশও)। জনগণ যখন দালালদের খুঁজে পায়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও তার বিভিন্ন সংস্থার পক্ষে কি সত্যিই খুব কঠিন কাজ তাদের চিহ্নিত করে নিষ্ক্রিয় করা? মাত্র কয়েক দিনে বন্ধ হয়ে যাবে সমস্ত এই ধরণের অনুপ্রবেশ। কিন্তু না আমাদের দেশে না আমেরিকা বা অন্য দেশের কোনো সরকারকে দেখবেন না এই বিষয়ে সক্রিয় হতে? কিন্তু কেন? কখনো দেখেছেন দালালদের বিরুদ্ধে কোনো ‘বিশেষ অভিযান’?
বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, এখন নাকি দলে দলে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাচ্ছে SIR এর ভয়ে অনুপ্রবেশকারীরা। তিনি তাদের পালাতে উৎসাহিতও করেছেন। সীমান্ত কি খোলা রয়েছে অন্ততঃ exit point এ? নাকি, সেই আবার দালাল ধরতে হবে?
আর যারা সত্যিই ভীত সন্ত্রস্ত হয়তো পালিয়ে যাওয়ার কথাই সিরিয়াসলি ভাবছে তারা সবাই যে একটি সম্প্রদায়েরই মানুষ, এ বিষয়ে কি সত্যিই নিশ্চিত?!
৪) আসলে, প্রত্যেক দেশেই অন্ততঃ একটা পর্যায় পর্যন্ত অনেক কাজেই বহিরাগতদের প্রয়োজন হয়, অনেক ক্ষেত্রেই প্রায় অপরিহার্য ভাবে। সেটা সেই দেশের সরকার ভালো ভাবেই জানে।
তবে, এখনকার কথা কিছু স্বতন্ত্র। সারা পৃথিবীতেই দক্ষিণপন্থীরা হাতিয়ার করার চেষ্টা করছে anti immigrant ইস্যুগুলোকে। সব উন্নয়ন সব চাকরি নাকি আটকে যাচ্ছে বহিরাগত কিছু সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর জন্য। এদের তাড়ালেই সব সমস্যার সমাধান, আর কোনো পলিসি -টলিসির দরকার পড়বে না!!
আমাদের রাজ্যের নির্ভরতা নিশ্চয়ই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনীয় নয়। কিন্তু, একেবারে নেই এ কথাটা বোধহয় বলা যায় না। সত্যিই যদি সবাই পালিয়ে যায় অন্ততঃ হুঙ্কার শুনে, অনেক বাঙালি মধ্যবিত্তের পক্ষে কিন্তু যথেষ্ট সমস্যার সৃষ্টি করবে।
আমার মূল বক্তব্য কিন্তু অনুপ্রবেশের পক্ষেও নয় বা তাদেরকে ভোটাধিকার দেওয়ার জন্যও নয়। সব দেশেই কিছু আইন আছে, নিশ্চয়ই তাকে মান্যতা দিতে হবে। এই নিয়ে কোনো সংশয় বা আপত্তির প্রশ্নই ওঠেনা। কিন্তু, যে ভাবে প্রতি মুহূর্তে সমস্ত দায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে অনুপ্রবেশকারীদের উপর, এবং যে ভাষায় তাদের আক্রমণ করা হচ্ছে, সেটাতেই আমার আপত্তি। যে ভাষাগুলি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা আমাদের অনেকেরই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে অন্য কোনো দেশে শুধু নয়, ভারতেরই অন্য কোনো স্থানেও। মাঝে মাঝে গুলিয়ে যায় বিরোধিতা কি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে না সমগ্র বাঙালি জাতির জন্যও !!
আইনি অধিকার না থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু মনুষত্বকে অপমান করার অধিকার কেউ দেয়নি। বস্তুত, সেই কাজটাই করা হচ্ছে নিরবিচ্ছিন্নভাবে এবং অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে। আপত্তিটা সেইখানেই…….
তো কী করা যাবে?! মানুষ অভ্যস্তই হয়ে গেছে সারাক্ষণ ট্রোল করতে, অন্যকে টিটকিরি ও অপমান করতে। যে যতো বেশি বা ভালো করতে পারে, তার রেটিং সবচেয়ে বেশি!!
তাই, চলুক টিটকিরি-গিটকিরি, কটাক্ষ ও বিদ্রুপের নিয়ন্ত্রণহীন অবিরাম ফোয়ারা, আর তার মধ্যে যা করার তা করে যাক মাননীয়া ও তার দল অতি স্বচ্ছন্দ গতিতে……….
ভোটের আগে এতো বড় সুযোগ তো ভাবাই যায় না, কী যেন বলে ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’………










