“স্বাস্থ্য মানে কেবল অসুখের অনুপস্থিতি নয়, স্বাস্থ্য মানে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকা। ভালো থাকতে গেলে প্রয়োজন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা,ইত্যাদি। আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন না হলে মানুষের স্বাস্থ্যের অবস্থাও বদলাতে পারে না। তাই শ্রমিক আন্দোলনের পাশে থাকা, কৃষক আন্দোলনের পাশে থাকা, উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনের পাশে থাকা, গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলনের সঙ্গে থাকা… কখনো সে আন্দোলন ভোপালে, কখনো ছত্তিশগড়ের দল্লি রাজহরা বা ভিলাইয়ে, কখনো পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম বা লালগড়ে…”
শঙ্কর গুহ নিয়োগীর নেতৃত্বে দল্লী রাজহরায় ১৯৭৭ সালে গড়ে ওঠে শ্রমিক আন্দোলন। এই আন্দোলন কারখানা ইউনিয়নের বাইরে ব্যক্তিজীবন, বিনোদন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য নিয়ে সামগ্রিক ভাবে উন্নত জীবনযাপনের এক দিশা তৈরি করে। আন্দোলনকারী শ্রমিক কৃষক সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যকে আলাদা গুরুত্ব দেবার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক ছত্তিশগড়ের দল্লী রাজহরার শহীদ হাসপাতাল।
শহীদ হাসপাতালের অনুপ্রেরণায় ১৯৯৩ এর নভেম্বর এ কানোরিয়া আন্দোলনের শুরুর দিকে ফুলেশ্বরের রথতলায় স্বাস্থ্য শিবির শুরু হয়। কানোরিয়া আন্দোলনের প্রতি এলাকার মানুষের ভালোবাসা, মমতা, ও সমর্থনের প্রতিদানে কানোরিয়া শ্রমিকরা ২রা অক্টোবর ১৯৯৪ বিজয়দিবসে তাঁদের জন্য একটি হাসপাতাল উপহার দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। স্বাস্থ্য শিবিরের ধারাবাহিকতাতেই গড়ে ওঠে চেঙ্গাইলের ‘শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র।
এর অন্যতম কাণ্ডারি ডঃ পুণ্যব্রত গুণ বিসংবাদ পত্রিকায় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মূল তিনটি কাজ ব্যাখ্যা করেন – সুলভে মানুষের কাছে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া (সেই সময় মাত্র দু টাকায় চিকিৎসাপরিষেবা পাওয়া যেত, কর্মহীন শ্রমিক দের জন্য বিনামূল্যে ), দ্বিতীয় কাজ হল রোগ প্রতিরোধের আর্থ সামাজিক কারণগুলি সম্পর্কে রোগীকে অবহিত করে চিকিৎসার সাধারণ প্রযুক্তি গুলি হাতে তুলে দেওয়া ও রোগী কে স্বাস্থ্য সচেতন করে তোলা এবং তৃতীয় কাজটি হল মানুষের ন্যায্য অধিকার আন্দোলনের পাশে থাকা (বিসংবাদ, অগাস্ট- সেপ্টেম্বর ১৯৯৬)।
এই ভাবে ৯০এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই প্রান্তিক মানুষদের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেবার কাজ শুরু হয়ে যায় পশ্চিমবঙ্গে।
১৯৭৮ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এই ঘোষণাপত্রে ভারতবর্ষ স্বাক্ষর করেছিল। ২০০০ সালের আগে বা পরে অনেকগুলি দেশের সরকার সমস্ত নাগরিকের স্বাস্থ্যরক্ষার দায়িত্ব নিলেও আমাদের দেশের সরকার ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার এর পথে হাঁটে নি। ২০১০এ যোজনা কমিশন সবার জন্য স্বাস্থ্যের লক্ষ্যে উচ্চস্তরীয় একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে। শ্রীনাথ রেড্ডির নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞের একটি কমিটি ২০১১ সালে হিসেব করে দেখিয়েছিলেন জে কী ভাবে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে সরকারি পরিকাঠামোতেই বিনামূল্যে সমস্ত নাগরিকের স্বাস্থ্যরক্ষা সম্ভব। ২০১১ তে তাঁদের সুপারিশের মূল কথাটা ছিল ২০১৭র মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে সরকারের খরচ বাড়িয়ে জি ডি পি র ১.৪% থেকে ২.৫% করতে হবে। ২০২২ র মধ্যে ৩% করতে হবে। এটা করলে সরকারি খরচে সবার জন্য স্বাস্থ্যের লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হবে। পরবর্তী তিন বছর UPA সরকার ছিল , সেসময় সরকারের খরচ সামান্য বাড়িয়ে ১.৫৮% করা হয়। আর ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর সরকার এসে প্রথমেই ২০% স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় কমিয়ে দেয়। এখন সরকার গড়ে জিডিপির ১% স্বাস্থ্যখাতে খরচ করে। যার বেশিরভাগটাই খরচ করে বীমাগুলোর প্রিমিয়াম দেওয়ায়। যার অর্থ সরকার বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে জনগণের করের টাকাটা তুলে দিচ্ছে।
সরকারকে নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য করতে পারে সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে অসংখ্য বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য, ছাত্র-যুব এবং গণ সংগঠন ২০১৩ থেকে কাজ করে চলেছে। ২০১৩ তে পিপল ফর হেলথ কেয়ার’ গঠিত হয়। ২০১৫তে গঠিত হয় “অল ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ ফর অল ক্যাম্পেইন কমিটি’, যার আহবায়ক ছিলেন ডঃ পুণ্যব্রত গুণ। এই কমিটি বিভিন্ন জেলায় জাঠা ও কনভেনশন করে গণমত গঠন করা শুরু করে। ২০১৬ র ২৪ জানুয়ারি কলকাতার ইউনিভার্সিটি ইন্সিটিউট হলে একটি গণ কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হাইলেভেল এক্সপার্ট গ্রুপের চেয়ার পার্সন শ্রীনাথ রেড্ডি , বিনায়ক সেন , অরুণ সিং ছিলেন। ২০১৭ র ৭ই এপ্রিল কলকাতায় জাতীয় প্রতিনিধি সভা আয়োজিত হয়। ২০১৭ র ২৬শে অগাস্ট দিল্লির এইমস এ সবার জন্য স্বাস্থ্য নিয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
ইউনিভার্সিটি ইন্সিটিউট হলের গণ কনভেনশনের বক্তৃতা গুলির বাংলা অনুবাদ সঙ্কলন প্রকাশিত হয় পুণ্যব্রত গুণের সম্পাদনায় ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য : একটি স্বপ্ন যা সত্যি করা যায়’। শ্রীনাথ রেড্ডি নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ টি ব্যাখ্যা করেন। অরুন সিং সর্বজনীন স্বাস্থ্যের দাবির সঙ্গে আর্থিক বৈষম্য অবসানের দাবি জানান। ডঃ পুণ্যব্রত গুণ সর্বজনীন স্বাস্থ্যের দাবি তে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের প্রয়াসের কথা উল্লেখ করেন। সত্য শিবরামণ লাতিন আমেরিকার স্বাস্থ্য আন্দোলন এবং রাহুল মুখার্জি ব্রিটেনের সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। ডঃ বিনায়ক সেন স্বাস্থ্যের অধিকার ও শিশু অনাহার নিয়ে বলেন। অলোকেশ মণ্ডল এবং বঙ্কিম দত্ত স্বাস্থ্যের অধিকার নিয়ে আলোচনা করেন। দীপক চক্রবর্তী সবার জন্য স্বাস্থ্যের অধিকারে একটি গান রচনা করেন।
আমাদের দেশে স্বাস্থ্য নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নয়। ১৯৪৭ এর পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সদর্থক ভুমিকা পালনের একটা উদ্যোগ ছিল। নব্বই এর দশকের শুরু থেকে বিপরীত যাত্রা শুরু হয়। স্বাস্থ্য বেসরকারি পুঁজির মৃগয়া ক্ষেত্রে পরিণত হয়। অধিকারের পরিবর্তে আইন স্বীকৃত পণ্য হয়ে ওঠে স্বাস্থ্য। ২০১৭ র ১৬ মার্চ পশ্চিমবঙ্গে New Clinical Establishment Act প্রবর্তিত হয় যার আওতায় সরকারি হাসপাতাল কে আনা হয় না, যেখানে রাজ্যের সিংহভাগ মানুষ চিকিৎসা করাতে যান এবং পরিকাঠামোর অভাবে অনেক সময়েই পরিষেবা পান না। তাই বার বার আক্রান্ত হন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা,যা শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নিশ্ছিদ্র করে ঠেকানো যাবেনা। রোগীর পরিষেবা এবং সুরক্ষার সঙ্গেই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের সুরক্ষা সরাসরিভাবে যুক্ত। একটি অগণতান্ত্রিক রেগুলেটরি বডি তৈরি করা হয়, যা পরিষেবা নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ভুমিকা নিতে পারবে না। ‘অল ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ ফর অল ক্যাম্পেইন’ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন প্রচার কর্মসূচি গ্রহণ করে। পুণ্যব্রত গুণের সম্পাদনায় ‘স্বাস্থ্য অব্যবস্থা’ সঙ্কলনটি (২০১৭) এই কর্মসূচির একটি অংশ। রাজ্যে স্বাস্থ্যের সাম্প্রতিক অব্যবস্থা, New Clinical Establishment Act, জনস্বাস্থ্যের নানা দিক, জেনেরিক ওষুধ এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য নিয়ে কলম ধরেন পুণ্যব্রত গুণ, রেজাউল করিম, প্রবীর গঙ্গোপাধ্যায়, জয়ন্ত ভট্টাচার্য, স্থবির দাশগুপ্ত, অরিন্দম বসু প্রমুখ স্বাস্থ্য ও গণআন্দোলনের কর্মী, সংগঠক ও চিকিৎসকরা।
স্বাস্থ্যের জন্য লড়াই থেমে নেই।স্বাস্থ্যের জন্য প্রচার, শ্রমজীবী ক্লিনিক, স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষনা ও প্রকাশনা সর্বজনীন স্বাস্থ্যের দাবিকে শক্তিশালী করছে,গণ আন্দোলনের পথ তৈরি করেছে। । ২০২৫ এ প্রকাশিত হয়েছে স্বাস্থ্য আন্দোলন সংক্রান্ত দুইটি বই। সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় আর নটরাজ মালাকারের লেখা ‘স্বাস্থ্য : পরিষেবা না পণ্য’ স্বাস্থ্যের রাষ্ট্রীয় করণের স্বপক্ষে, পণ্যায়নের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা গ্রন্থ। এই গ্রন্থের উৎসর্গ “স্বাস্থ্য আন্দোলনের নির্ভীক যোদ্ধা ডাক্তার পুণ্যব্রত গুণকে“। শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ৩০ বছরের পথ চলার উদযাপনে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ থেকে প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থ- ‘সংঘর্ষ ও নির্মাণের আখ্যানঃ শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ৩০ বছর’ পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। শহীদ হাসপাতালের আদর্শে গড়ে ওঠা মডেল ক্লিনিক, জনস্বাস্থ্য আন্দোলন এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে তথ্য সমৃদ্ধ আলোচনা আছে এই বই এ। স্বাস্থ্য ও সাম্যের জন্য সংগ্রামে নতুন দিশা তৈরি হচ্ছে।
“প্রবল গতিসম্পন্ন বর্তমান শিল্প সমাজে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বলে কিছু হয় না, সমস্ত স্বাস্থ্যই সামুহিক স্বাস্থ্য।“ (নরম্যান বেথুন )
স্বাস্থ্যের আন্দোলন কোন বিচ্ছিন্ন আন্দোলন নয়, এই আন্দোলন মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন, রুটি রুজির লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত। ‘স্বাস্থ্য কে লিয়ে সংঘর্ষ করো’ – এই চিন্তা স্বাস্থ্যের ধারণাকে বদলে দেয়। স্বাস্থ্য মানে শুধু চিকিৎসা নয়, সামগ্রিক জীবন ধারণের মান- খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের উন্নতি ছাড়া স্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব নয়। অধিকাংশ স্বাস্থ্য সমস্যার মূলে আছে শোষণ ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা। এই ভাবেই সমাজ পরিবর্তনের লড়াই এর সঙ্গে মিশে যায় স্বাস্থ্যের আন্দোলন।









