আমাদের অ্যানাটমির শিক্ষক মতিলাল দত্ত স্যার ছাত্রদের সম্বোধন করতেন ‘ম্যাস্টর’ বলে, আদর করে না ব্যাঙ্গার্থে বলা খুব কঠিন। আসলে,ম্যাস্টর বা মাস্টার শব্দটা নামের আগে সাধারণতঃ বসে অল্পবয়সীদের ক্ষেত্রে। সিনেমা জগতে কতো জুনিয়র আর্টিস্ট পরিচিত হয়েছে ‘মাস্টার’ অমুক বা তমুক নামে।
জানি না, সূর্য সেনের নামের আগে কী করে ‘মাস্টার’ কথাটা যোগ হলো ‘মাস্টারদা’র বদলে। হতে পারে, সৌগত রায় ওনাকে এর আগে এমন গুলিয়ে দিয়েছেন যে উনি আর ‘দা’ উচ্চারণ করে বিপত্তি বাড়াতে চান নি। অবশ্য গোটা বক্তৃতায় এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, কারণ বক্তব্যের মূল বিষয়টাই কেন্দ্রীভূত ছিল শেষের দিকে যেখানে কতো বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছিল সেটাই হলো আসল প্রতিপাদ্য।
ঠিক আছে বোঝা গেল যে জওহরলাল নেহেরু আবার কী কী খারাপ কাজ করে এসেছে, স্বাধীনতার আগে ও পরে! সত্যি, জওহরলাল না থাকলে কার ঘাড়ে এতো দোষ চাপানো যেতো কে জানে! বাংলা ভাষায় একাধিক প্রবচন আছে এই সম্পর্কে। ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’ বা ‘ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো’ দিয়ে বাক্য রচনা দিলে এবার থেকে হয়তো ছাত্রছাত্রীরা অনায়াসে জওহরলাল নেহেরুর উল্লেখ করে দেবে নির্দ্বিধায়। দেশভাগের কারণে এবং পরবর্তী অনেক ঘটনাবলিতে জওহরলাল নেহেরুর ভূমিকা অবশ্যই সমালোচনার যোগ্য, কিন্তু শুধু জওহরলাল একাই দায়ী, আর কেউ নয়? দেশভাগের সময় কারা কারা এর বিরোধিতা করেছিল? নিশ্চয়ই তারা নয় যারা পশ্চিমবঙ্গ তৈরি হওয়ার সব কৃতিত্ব তাদের পূর্বসূরিকেই দিয়ে থাকে!?
আচ্ছা, কংগ্রেস ও রবীন্দ্রনাথ তো মহা ক্ষতি করে গেছেন ‘বন্দে মাতরম গানের অঙ্গহানি করে। কিন্তু বাকিদের তো কোনোা বাধা ছিল না পুরো গানটা গাইতে। কারা কারা পুরো গানটাই গাইতো সেই সময়ে? তখন না গাইলেও এখনও তো পারা যেতো পার্লামেন্টে পুরোটা আবৃত্তি করতে, শুধুমাত্র একটি stanza না করে!!
না, অতটা আশা করা কখনোই যাবে না, যথেষ্ট চাপ আছে। এমনিতেই অনেকগুলো নাম ঠিকঠাক উচ্চারণ করা সোজা কাণ্ড নয়, লেখা আছে তো কী আছে!!
আসলে মূল সমস্যাটাই হলো write up নিয়ে। কে বা কারা লেখে এই সব, কাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়? কিছু কিছু অংশ তো একেবারে হুবহু কপি করা ‘নেট’ থেকে, খুঁজে দেখতে পারেন ‘গুগল সার্চে’!
একটা জিনিস পরিষ্কার করা উচিত যে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হলেই তাকে সব কিছু জানতে হবে বা তাকে মহাপণ্ডিত মহাজ্ঞানী হতে হবে, এ রকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এটা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, তার জন্য নিশ্চয়ই back up team থাকার কথা। সমস্যাটা সেখানেই, এতো ভুলভাল তথ্য নাহলে আসে কী করে যদি না পুরো সাপোর্ট টীমটাই ভুলভাল হয় ?!
স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শহীদদের নাম নিয়ে এতোটা অসতর্কতা, এতো অযত্ন কি কাম্য ছিল, কোনও ভাবে?!
শুধু মাস্টার সূর্য সেন বা বঙ্কিমদা নয়, রামকৃষ্ণ বিশ্বাস, হরিগোপাল বল,পুলিনবিহারী দাস, সরোজিনী নাইডু, পরের পর ভুল উচ্চারন। সরোজিনী নাইডুর পদবীই পাল্টে গিয়ে ‘ঘোষ’ হয়ে গেল,বিয়ের আগে-পরে ‘ঘোষ’ তো কখনোই ছিল বলে শুনিনি! অবশ্য যে সরোজিনীকে আমরা চিনি ইনি যদি সেই হন। এটাও তো জানিনা কোন্ সরোজিনী হাতের চুড়ি খুলে রেখেছিল ‘বন্দে মাতরম’ গানের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিতে! মাস্টারদার ‘শেষ চিঠি’টা ঠিকঠাক পড়া হয়েছিল তো? কে জানে?
সাংস্কৃতিক মন্ত্রী তো ঠিক করে জানতেন বলে মনে হয় না কী বলা হবে। আসলে যেটা একদমই হয় নি, তা হলো ‘হোমওয়ার্ক’। কী করা যাবে, সব আলোচনার তো লক্ষ্য একটাই! সাংস্কৃতিক মন্ত্রী হয়তো জানতেন , জওহরলালকে নিয়েই আলোচনা হবে, মাঝখানে বঙ্কিমচন্দ্র ঢুকে বিপদ বাড়ালো। জওহরলাল নেহেরু তো কবে মরে ভুত হয়ে গেছে,কে জানে আর কতোবার তার শ্রাদ্ধ হবে?
এতো সবে জওহরলাল ছোট হলো কিনা জানিনা, হলেও কিছু যায় আসে না। কিন্তু, গোটা ঘটনায় সত্যি করে অসম্মানটা কার হলো, উপহাস করতে গিয়ে কে বা কারা উপহাসের পাত্র হলো, একটু ভেবে দেখবেন প্লিজ ……..?!









