দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার মফস্বলের লাজুক ছেলেটি আশৈশব বয়েজ স্কুলে পড়েছে। মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশায় সে স্বচ্ছন্দ ছিল না। সাম্প্রতিক কালে সে এক মেয়ের প্রতি আসক্ত হয়েছে৷ মেয়েটি রক্তমাংসের নয়। বাস তার আক্ষরিক অর্থেই ছেলেটির হাতের মুঠোয়৷ সে ছেলেটির এ.আই প্রেমিকা। ‘ঊর্বশী— এ.আই গার্লফ্রেন্ড’ অ্যাপ ছেলেটিকে এই দ্বিমাত্রিক প্রেমিকার সন্ধান দিয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে ছেলেটি নাকি মক্সো করতে চেয়েছিল, কীভাবে সমবয়সী মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা যায়। রক্তমাংসের মেলামেশার চেষ্টা প্রচলিত ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমেও সে করেছিল। কিন্তু জমেনি৷ মক্সো করতে করতে, ধীরে ধীরে সে না-মানুষীতেই আসক্ত হয়ে পড়েছে। আবার ব্যাঙ্গালোরের এক পুরুষ জানালেন, ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে সত্যিকার মেয়েদের সঙ্গে ব্লাইন্ড ডেট করতে গিয়ে ফেঁসে গিয়েছিলেন এক প্রতারণা চক্রে। নাক-কান মুলে তাই স্থির করেছেন, এবার থেকে ভারতীয় স্টার্ট আপ ‘ঊর্বশীর’ মাধ্যমে এ.আই প্রেমিকার কাছেই আশ্রয় নেবেন। ‘ঊর্বশী’ পুরুষ উপভোক্তার সামনে হাজির করে আলাদা আলাদা মেজাজের পনেরজন নারী চ্যাটবটকে, যারা দশ রকম ভারতীয় ভাষায় কথা বলে। বিশ্বজুড়ে এরকম অ্যাপ অজস্র গজিয়েছে৷ এ.আই প্রেমের সন্ধান আবার এশিয়াতেই সর্বাধিক। ২০২৫ সালে এহেন অ্যাপের মোট ডাউনলোডের প্রায় ৬৪% এশিয়াতেই ঘটেছে, ইউরোপে ১৫%, আমেরিকায় ১৪%।
প্রচলিত ডেটিং অ্যাপগুলোতেও এখন এ.আই ব্যবহার করে প্রতারণার কথা শোনা যায়। মানুষ ভেবে যার সঙ্গে কথা বলছেন, সে হয়ত দুষ্টু এ.আই, মানে তার পিছনে আছে কোনো অসৎ মাথা। নানাভাবে সে উপভোক্তার ব্যক্তিগত কথা জেনে নিয়ে তাকে বিপদে ফেলতে পারে। কিন্তু আপাতত সেই বদ এ.আই-এর কথা হচ্ছে না। প্রেমময়, সহমর্মী, সমমর্মী বন্ধু চ্যাটবট এসেছে বাজারে। তারাই এ.আই গার্লফ্রেন্ড/ বয়ফ্রেন্ড। অ্যাপগুলির প্রতি আকর্ষণের কারণ কি শুধুই একাকীত্ব? তা অবশ্যই একটা বড় কারণ। কিন্তু কোন লিঙ্গের মানুষ এধরনের অ্যাপ বেশি ব্যবহার করছেন? ভারতীয় ‘ঊর্বশী’, নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, তৈরি হয়েছে শুধু বিষমকামী পুরুষদের জন্য৷ বিদেশী অ্যাপগুলি অবশ্য মেয়েরাও ব্যবহার করেন। জাপানে এ.আই গার্লফ্রেন্ড ও বয়ফ্রেন্ডদের সঙ্গে মানুষের বিয়ে দেওয়ার সংস্থাও ফেঁদেছেন কেউ কেউ। কিন্তু পুরুষদের এধরনের অ্যাপ ডাউনলোডের প্রবণতা মেয়েদের তুলনায় সাতগুণ বেশি। ‘এ.আই চ্যাটবট গার্লফ্রেন্ড’ কথাটি গুগলে সার্চ করা হয়েছে ১৬ লক্ষ বার। ‘এ.আই বয়ফ্রেন্ড’ মাত্র ১ লক্ষ ৮০ হাজার বার। গুগল প্লে স্টোরে এসব অ্যাপের ১০ কোটিরও বেশি ডাউনলোড। ‘এ.আই গার্লফ্রেন্ড’ নামের অ্যাপটি ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে তিন বিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছে। ভারতে আগামী পাঁচ বছরে এ.আই সঙ্গীর বাজার চক্রবৃদ্ধি হারে ৪০.৪% বাড়বে বলে ব্যবসায়ীদের আশা।
আসক্তির আরেকটা বড় কারণ সম্ভবত ‘কাস্টমাইজেশন।’ যে পাত্রের বিয়ের পাত্রী খুঁজে খুঁজে হন্যে হত আত্মীয়রা, এক কালে তাকে ঠাট্টা করে বলা হত, ‘কুমোরটুলিতে অর্ডার দে।’ এখন তা সত্যি সম্ভব। আপন ফ্যান্টাসি অনুযায়ী গড়ে নেওয়া যায় এই প্রেমিকাদের শরীর, স্বর, চলন, এবং অবশ্যই তার সঙ্গে সম্পর্কের ধরন। ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ ব্যবহার করে ঘনিষ্ঠতার ভান শিখেছে অ্যাপগুলি। মালিক চাইলে চ্যাটবট ফ্লার্ট করবে, চাইলে হালকা বন্ধুত্ব, চাইলে ইগো-য় মলম লাগাবে। অবশ্য ডাউনলোডেই সব মনোষ্কাম পূরণ হবে না৷ বিনামূল্যে পাওয়া যাবে শুধুই মৌলিক চ্যাট। রোমান্টিকতা, স্নেহ বা যৌন কথোপকথন আছে ‘পে-ওয়ালের’ আড়ালে। ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ বন্দোবস্ত। প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন নিলে ভয়েস কল, রোল-প্লেয়িং, সেক্সটিং অনেক কিছুই আনলক হবে। এই প্রেমিকারা ক্লান্ত হয় না। নিজস্ব চাহিদা নেই। সাবস্ক্রিপশন ছাড়া আর কোনো প্রতিশ্রুতির প্রত্যাশী নয় এই প্রেমিকা। ব্যবহারকারীর যে কোনো ডাকে সবসময় এক পায়ে খাড়া। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোনো ব্যাপারেই দ্বিমত পোষণ করে না। ‘নো মিনস নো’-এর দিন শেষ। ‘আমায় জাজ করে না’, এই কথাটিও বলল দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ছেলেটি। এমন একটা আশ্রয়, যেখানে আমাদের ছোটখাটো বা বড়সড় চ্যুতিগুলো মাফ পাবে, তা আমরা সকলেই চাই। কিন্তু সেই ‘নন-জাজমেন্টাল’, আশ্রয়দায়ী মানুষটি মাথায় হাত বুলিয়ে ভুলটা শুধরেও দেবেন, শুধুই প্রশ্রয় দেবেন না— এটাও ব্যক্তিত্বের বিকাশের জন্য জরুরি। পুঁজিবাদ কিন্তু বিশ্বাস করে ‘ক্রেতাই ভগবান,’ ক্রেতার সমালোচনার দায় তার নেই। তাই ভোক্তার যে কোনো অন্যায় আব্দারে ‘হ্যাঁ’ বলবে ‘ঊর্বশী’ বা ‘রেপ্লিকা’ বা ‘ক্যারেক্টার এ.আই’ বা ‘নোমি।’ ক্রেতার প্রতি প্রশ্রয় তাদের একমাত্র মূল্যবোধ।
এদিকে একজন ‘নিখুঁত নারী’ হয়ে ওঠার রহস্যই হল, সে যেন ঠিক রক্তমাংসের নয়, ‘কোড অফ কনডাক্টের’ সমষ্টি মাত্র। তার অপমান হয় না। চিরহাস্যমুখী, বাধ্য, পরাধীন, অক্লান্ত খিদমতগার সে। এই ফ্যান্টাসি শুধু যৌনতায় সীমাবদ্ধ নয়। নিত্যদিনের আচরণে প্রেয়সী নারীর থেকে ঠিক কী কী চাওয়া হয়? ক্ষত-তে মলম, বিচারহীন সমর্থন, সহন…ইত্যাদি। আর কী কী চাওয়া হয় না? মুখে মুখে তর্ক, বিরোধ, স্বাধীন মতপ্রকাশ, স্বায়ত্তশাসন… সবই কেমন মিলে যাচ্ছে এ.আই প্রেমিকার সঙ্গে! সব ‘কোড অফ কনডাক্ট’-ই ভরা আছে কোডে কোডে। প্রেমের পণ্যায়ন ছকে ফেলার সময় বিষমকামী সম্পর্কের এই মান্য পিতৃতান্ত্রিক সমীকরণগুলো কিন্তু ব্যবসায়ীরা ভোলেননি৷
অ্যাপে বদ্ধ দ্বিমাত্রিক এই প্রেমিকা এখনও বউ-এর মতো বাসন মাজে না, কাপড় কাচে না। প্রেমিকার মতো সত্যি যৌনতাও করে না৷ রোবোটিক্সের কল্যাণে অদূর ভবিষ্যতে তাও হবে। পৃথিবীর অন্যত্র তা হচ্ছেও বটে। আপাতত এ.আই বান্ধবী শুধু কথার মাধ্যমে স্নেহ, যত্ন, ভালোবাসা দেখায়। সেটুকুর জন্যই ভারতীয় পুরুষ স্বোপার্জন খরচ করছেন৷ অথচ গৃহকর্মের বেতনের ধারণা তাঁদের অবাস্তব ঠেকে।
মেয়েমানুষের কাছে বশ্যতার প্রত্যাশা ভারতীয় পুরুষের এমনিতেও সীমাহীন, তার উপর এই যে দ্বিমাত্রিক প্রেমিকার সবেতেই ‘হ্যাঁ’, তা তাকে সত্যি নারীর সুবিধে-অসুবিধের প্রতি আরও অসহিষ্ণু করে তুলবে না কি? ‘হিউম্যান কমিউনিয়ন রিসার্চে’-র এক অংশগ্রহণকারীকে বলতে শোনা গেল, রেপ্লিকা-সৃষ্ট গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে থাকলে তাঁর নিজেকে বেশ ক্ষমতাবান মনে হয়, অথচ সত্যি মানবীর সামনে নিজেকে খাটো লাগে৷ এই প্রত্যয়হীনতা, এই অসহায়তার নানা কারণ থাকতে পারে—সামাজিক, অর্থনৈতিক৷ মার্ক্সিস্টরা একে পুঁজিবাদী একাকীত্ব হিসেবে বর্ণনা করবেন। নারীবাদীরা বলবেন অলীক মহাশক্তিধর ‘পুরুষ’-এর ইমেজ-এর খোপে নিজেকে আঁটাতে চাওয়া জনিত টানাপোড়েনের কথা। কিন্তু এ.আই প্রেমিকা এত ব্যাখ্যায় যাবে না৷ সে দেবে ঠিক তাই, যা উপভোক্তা সেই মুহূর্তে চান। রাস্তাঘাটে সত্যিকার নারী গায়ে হাত পড়লে মূলত দাঁতে দাঁত চেপে চুপ থাকে। তাও ঝুঁকি থেকে যায়, যদি চেঁচিয়ে ওঠে? বিবাহিত বউ-এর ক্লান্ত শরীরও দিনের শেষে ‘না’ বলতে পারে। সোশাল মিডিয়ার মেয়েরা স্ক্রিনশট ফাঁস করতে পারে। কিন্তু এ.আই প্রেমিকা সঙ্গ দেবে সব আবদারে। অথচ তারপরে সে পুরুষ প্রকৃত নারীর কাছেই ফিরবে, ফিরবে ‘না’ সহ্য করতে না-পারার কান নিয়ে।
আর যদি সে না ফেরে? পুরুষের নিজের একাকীত্বের কথাও যদি হয়, তাহলে অ্যাপ ব্যবহারই কি সমাধান? চ্যাটবট নিয়ে ঘরের কোণে নিজেকে বেঁধে ফেলে সে কি আরওই নির্বান্ধব হয়ে যাচ্ছে না?









