আসলে রাজ্য সরকারের ডিফেন্সে আর.জি.কর কাণ্ডের কেসে বহু লইয়ারের মাঝে যে মানেকাও ছিলেন, তা আমি জানতাম না৷ জানলাম৷ মানেকাকে শ্রদ্ধা করতাম সেই দিন থেকে, যেদিন সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন করেছিল, কারা এই সমকামী, সংখ্যায় কতজন, কেন তাদের নিয়ে রাষ্ট্র মাথা ঘামাবে, আর মানেকা সদর্পে বলেছিলেন, ‘আমি তাদের একজন। আমি সমকামী।’ তিনি সমকামী বিবাহ স্বীকৃতি মামলায় বাদীপক্ষের উকিল ছিলেন। শ্রদ্ধায় চিড় ধরল আজ সকালে অন্য পরিচয় জানার পর। মানেকা গুরুস্বামী এবং রাজীব কুমারের মধ্যে মিল একটাই৷ দুজনেই আর.জি.কর হেতু ভরাডুবি সামলাতে রাজ্য সরকারকে সাহায্য করেছেন। তারই পুরস্কার পাচ্ছেন।
মানেকা পণ্ডিত, মানেকা সুতার্কিক, ঠিক যেমন সাংসদ আমরা চাই৷ কিন্তু আমরা তো শুধুই সুপণ্ডিত, সুতার্কিক চাই না৷ আমরা সৎ সাংসদ চাই, যে সৎ মানুষের প্রাণ অপর মানুষের জন্য কাঁদে। দুই বাবা-মা, যাঁদের সন্তান কীভাবে মারা গেল তাঁরা এখনও জানেন না, হয়ত মৃত্যুর আগেও জানবেন না, তাঁদের কান্না যদি কাউকে না ছোঁয়, তাহলে তিনি যতই বড় পণ্ডিত হোন, তার্কিক হোন, এমনকি প্রান্তিক লিঙ্গেরও যদি হন, তাহলে তিনি যথেষ্ট সংবেদনশীল নন৷
আমার বিশ্বাস একদিন সমকামী বিবাহ স্বীকৃতি পাবে। মানেকা গুরুস্বামী কি সেই জয় ছিনিয়ে আনবেন? ক্ষমতার সঙ্গে আপোষ করা শুরু করলে কি সেই স্পর্ধা আর থাকে?
ব্যক্তি কুয়্যার মানুষ আপোস করতে পারে, কুয়্যার রাজনীতি ও ক্যুয়ার দর্শন কিন্তু ক্ষমতার ধমকানি-চমকানির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। কিংবা আমাদের সংগঠনের ক্যুয়ার সদস্যদের কথাই ধরুন। তাঁরা চান অভয়া বিচার পাক। তাঁরা চান সমকামী বিবাহ স্বীকৃতি পাক। তাঁরা দুটোর একটাকে বেছে নেন না৷ দুটোই চান৷
তাই মানেকার চেয়ে ভাল মানুষ হিসেবে আমি বেছে নেব আমাদের দলের সমকামী মেয়েদের৷ গতকাল তাঁদের একজনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বলছিলেন বুড়ো বয়সে আমাদের বাড়ির কাছাকাছি থাকবেন তাঁরা দুজন। বুড়ো বয়সে পরস্পরের সাহায্য দরকার হবে৷ বলা বাহুল্য, ওঁরা নিঃসন্তান থাকবেন। এঁদের একজন মেডিক্যাল ইনশিওরেন্সে অপরজনকে নমিনি করতে চাইলে এজেন্ট হাঁ করে তাকিয়ে থাকে৷ ব্যাংক সঠিক বলতেই পারে না, একজনের লকারের নমিনি অন্যজনকে করা যাবে না কেন, কিন্তু নমিনি হতে দেয় না৷ আমার বন্ধু বলে, ‘আমার কিছু হলে তাহলে লকারটা খুলবে কে?’
হ্যাঁ, বন্ধু। আমরা একসঙ্গে বুড়ো হব। তোমরা দুজন সমকামী দম্পতি, আমরা বিষমকামী দম্পতি, তফাত তো কিছু দেখি না আবেগে, ভালোবাসায়৷ সমকাম শুধু তো নয়, আমি বলি সমপ্রেম৷
বিয়ে নিয়ে তর্ক থাকতে পারে। যাঁরা বহু সঙ্গী-তে খুশি, তাঁরাও ভাল থাকুন। কিন্তু আমাদের আর ওদের মতো কেউ কেউ একজনকেই নতুন নতুন ভাবে রোজ ভালবাসে। সেই একগামী ভালবাসার নজির বিষমকামীর ক্ষেত্রে মর্যাদা পায়, মাথায় তুলে রাখা হয়। সমকামীরা সে সুযোগ পাবেন না কেন? বিয়েতে তাঁদের সবার যে বিরাট আস্থা আছে, তা নয়৷ আজ যদি ব্যাংকে, ইনশিওরেন্সে একে অন্যের নমিনি হওয়া এঁদের সহজ হত, সঙ্গীর সম্পদে স্বাভাবিক উত্তরাধিকার সহজ হত, তাহলে বিয়ের জন্য সওয়াল করার প্রয়োজন পড়ত না৷
রাষ্ট্র যদি সেই বিয়ের অধিকার না-ও দেয়, তাহলেও আমরা বিয়ের আয়োজন করব৷ ব্যাংকে আর ইনশিওরেন্সে বারবার গিয়ে খোঁচা মারব। আমাদের বন্ধুরা বারবার বলবে, ‘এইও, নিয়ম বদলাও। আমরাও আছি।’
মানেকা ক্ষমতাচক্রে ঢুকে গেলেও আমরা আছি৷ আমরা, যারা একসঙ্গে বুড়ো হব। আমরা পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ব ঠিক।










