বুক চিতিয়ে মাথা উঁচু করে বীরের মতো বাঁচবো, নাকি নতজানু হয়ে করুণা ভিক্ষার মতো দাসত্বের পথেই হাঁটবো? বিচার করার জন্য মাস্টারমশাই কেউ নেই। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে নিজের কাছেই নিজেকে। আজকের বিশ্ব-পরিস্থিতি এটাই দাবি করছে আমাদের সকলের কাছে।
প্রায় পাঁচশো বছর আগে, সাম্রাজ্যবাদ তার শুরুর দিন থেকেই ঘোষণা করছে, ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’ – বীরেরাই নাকি শুধু পৃথিবীকে ভোগ করবে! পেশি শক্তির জোরে হত্যা, অত্যাচার, লুঠ, আধিপত্য… এগুলোই তারা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিমুহূর্তে। পিতামাতা হারা শিশুর কান্না, স্বামীহারা রমনীর বিলাপ, সন্তানহারা বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস, কোনোদিনই – কোনোকিছুরই মূল্য নেই এদের কাছে। কিন্তু অনেকে যেনো কিছুই দেখেন না, কিছুই বোঝেন না! “বিশ্বের সবার মঙ্গল হোক”, অতএব পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদেরও ‘মঙ্গল হোক’ – এটাই যেনো তাঁদের ইচ্ছা! শাসক-লুঠেরার তুলনায় সাধারণ মানুষ পেশীশক্তির বিচারে সবসময়েই দুর্বল। তাঁরা বাগানে পরিচর্যা করে গোলাপ-রজনীগন্ধা ফুল ফোটাতে পারেন, কিন্তু ড্রোন-মিসাইল তৈরি করতে পারেন না। টিভিতে নানা দেশে আমেরিকা-ইজরায়েলের দানবীয় হত্যালীলা আর ধ্বংসলীলা দেখে তাঁরা ক্রোধে ফুঁসতে পারেন অথবা দুঃখে মুষড়ে পরতে পারেন। কিন্তু নিত্য পরিচর্যায় ফোটানো ফুল ছুঁড়তে পারেন না দানবশক্তির বিরুদ্ধে। এটাই তাঁদের অক্ষমতা। তবে গোলাপ-রজনীগন্ধা ফোটানোই সভ্যতা, আর সেই ফুলকে সশস্ত্র হানায় ধ্বংস করা হচ্ছে অ-সভ্যতা। পেশি শক্তির জোরে দানবরা ‘বিজয়ী’ হতে পারে, কিন্তু মানবতার বিচারে সভ্যতাই হয় ‘সুখী’। ধ্বংসে মেতে না-ওঠার সুখ; মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে থাকার গর্ব; পিশাচদের ঘৃণা করতে পারার আনন্দ। মনুষ্যত্বের পথিক হবার সুখ।
হত্যা, ধ্বংস, লুঠপাট, জবরদখল… এই সবই নাকি ‘সভ্যতা’-র পথে অনিবার্য! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খোলাখুলিভাবেই জানিয়ে দিচ্ছেন, “ওটা দিতে হবে” – ভেনেজুয়েলা, গ্রীনল্যান্ড, কিউবা, কানাডা… দস্যুসর্দারের যা ইচ্ছা তা-ই চাই! সাম্রাজ্যবাদ চিরকালই হৃদয়হীন, রক্তপিপাসু, অমানবিক, বর্বর শক্তি। পৃথিবীর নানা দেশে বিভিন্ন সময়ে আমরা তার ভয়াবহ নজির দেখেছি। অস্ত্রশস্ত্রের দাপট তার বহদিন ধরেই আছে। কিন্তু এতো বর্বরতাপূর্ণ সীমাহীন ঔদ্ধত্য আগে দেখা যায় নি। ভেনেজুয়েলার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস, সোনা, বক্সাইট, নিকেল, হীরা ইত্যাদি; গ্রীনল্যাণ্ডের বিরল মৃত্তিকা, লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম, সোনা, তামা, লোহা, দস্তা, গ্রাফাইট ইত্যাদি; কিউবার নিকেল, কোবাল্ট, তামা, ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোমিয়াম, সিলিকা, তেল; কানাডার তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, পটাশ, ইউরেনিয়াম, নিকেল, সোনা, তামা। এইসব প্রাকৃতিক সম্পদের লোভেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আজ মরিয়াভাবে আগ্রাসী। নানা দেশের বিরুদ্ধে এটা-ওটা-সেটা মিথ্যা অথবা অতিরঞ্জিত অভিযোগ তোলা শুধুই লুঠেরা শয়তানের বাহানা। ইরানে মজুত রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাণ্ডার আর চতুর্থ বৃহত্তম জ্বালানি তেলের মজুত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ইরানকে পুরোপুরি কব্জায় আনার জন্য যে মরিয়া চেষ্টা, তার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য এই বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের উপর দখলদারিত্ব।
পারমানবিক সহ আধুনিকতম সবরকম মারনাস্ত্র আর ধ্বংসাস্ত্র তাদের হাতে বহুকাল ধরেই মজুত রয়েছে। শোষণ ও লুঠপাটের রাস্তায় গড়ে ওঠা তাদের টাকার থলিও যথেষ্টই মোটা। এই সবকিছুর জোরে সে ‘ধরাকে সরা’ জ্ঞান করে। বিমানের একটি করে বোতাম টিপে কখনও জাপানের হিরোশিমায়, কখনও নাগাসাকিতে পারমানবিক বোমা ফেলে লক্ষলক্ষ অসহায় মানুষকে হত্যা আর শহর দুটিকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে। আজও বিশ্বজয়ের খোয়াব দেখছে সে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে তারা অভাবনীয় বর্বরতার সঙ্গে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে তুলে নিয়ে গেছে আমেরিকায়! ‘গণতান্ত্রিক’ গুণ্ডামির নতুন নজির সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প একথাও জানিয়েছে, খামেইনি-হত্যার পর মনোনীত ইরানের প্রেসিডেন্ট তার পছন্দসই হয় নি! ভাবখানা, বিভিন্ন দেশের নেতা যেনো আন্তর্জাতিক দস্যু-দলপতি ট্রাম্পের মর্জিমাফিক হতে হবে। কে-কবে এই সাম্রাজ্যবাদী খুনি-লুঠেরা-বর্বর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিশ্ব-মোড়ল পদে বসালো? ভারতবর্ষ কোন দেশ থেকে তেল আমদানি করবে, সেই সিদ্ধান্ত-ও নাকি এদের ‘অনুমতি’ ছাড়া নেওয়া যাবে না! এরা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে, আজ পর্যন্ত ইতিহাসে যতো শক্তিধর ও অত্যাচারি শোষক-শাসক এসেছে, তাদের কারও হম্বিতম্বিই চিরদিন টেঁকেনি। একসময়ে তাদের সকলেরই মাস্তানি শেষ হয়েছে। শেষমেষ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই জায়গা হয়েছে তাদের। অসভ্য-বর্বরদের নাম ইতিহাসে চিরকালের জন্য কালো অক্ষরেই লেখা থাকে। অর্ধশতাব্দীরও আগে, ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নারকীয় বর্বরতার ভয়ঙ্কর আলোকচিত্রগুলো আজও ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া যায় নি। মানবতা, সভ্যতা, গণতন্ত্র… সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের মুখে এইসব শব্দগুলো বেশ মজাদার শোনায়!
সাধারণ মানুষের হাতে রাইফেল, ট্যাঙ্ক, এন্টি-এয়ারক্রাফট গান, ড্রোন, মিসাইল, পারমানবিক অস্ত্র… কিছুই নেই। কোনোদিনই থাকে না। আমাদের হাতেও তা নেই। কিন্তু আমাদের হাতে আছে অসংখ্য গোলাপ অথবা রজনীগন্ধা ফুল; আর আছে মানবিক ও শুভ চেতনার মহত্তম ভাণ্ডার। মানবিক মূল্যবোধের সম্পদ। আমরা তাই নিয়েই যুদ্ধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো। ঘৃণা ও ধিক্কারের ক্লাস্টার মিসাইল ছুঁড়ে দেবো সভ্যতা ধ্বংসকারী দানবদের দিকে। আজ আমাদের অতি অবশ্যই পক্ষ বেছে নিতে হবে। হয় আক্রমণকারী ও অন্যায়-যুদ্ধের পান্ডা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের স্তাবকতা। অথবা আত্মরক্ষাকারী ও ন্যায়-যুদ্ধের সৈনিক প্যালেস্তাইন-ইরানকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা। অসভ্যতা অথবা সভ্যতা। মাঝামাঝি, তৃতীয় কোনও ‘পক্ষ’ হয় না। অসভ্যতার বিরুদ্ধে, আমাদের অঙ্গীকার হোক সভ্যতার পক্ষে।
বিশ্ব-পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে এগুচ্ছে, তা আমরা অনেকে যেনো কল্পনাও করতে পারছি না। আমরা যদি শুধুমাত্র যুদ্ধের ধাক্কায় রান্নার গ্যাসের সমস্যা অথবা টাকার দাম কমে যাওয়া নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তাহলে কেউই হয়তো শেষপর্যন্ত বাঁচতে পারবো না! সাড়ে তিন হাজার বছর আগে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের হাজার হাজার সৈনিক। কিন্তু ‘আধুনিক’ ও ‘উন্নত প্রযুক্তির’ যুদ্ধে বোমার আঘাতে ইস্কুলে মারা যায় পাঠরত ছাত্রছাত্রীরা; হাসপাতালে রোগী ও প্রসুতিরা; ক্ষেতে কর্মরত কৃষকরা; ধর্মস্থানে প্রার্থনারত ভক্তরা। এবারে ট্রাম্পের বোধহীন আগ্রাসী ভূমিকার ফলে যে ‘আধুনিক’ প্রযুক্তি-নির্ভর যুদ্ধ শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে, তার ফলে মরছে হাজার হাজার শিশু-নারীও; আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে অ্যাসিড বৃষ্টি! পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসী ভূমিকার ফলে ক্রমশই তীব্র হয়ে উঠছে এমনকি পারমানবিক যুদ্ধের সম্ভাবনাও। অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া দেশগুলির লক্ষকোটি মানুষই শুধু না, পুরো মানবসভ্যতাই আজ “ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা”! পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার লেজুড় ইজরায়েলের সীমাহীন লোভ ও বর্বরতার কারণেই মানবসভ্যতার এই বিপদ ঘনিয়ে এসেছে।
এই সঙ্কটের সময়ে দ্বিধার কোনও সুযোগ আর নেই। সভ্যতার পক্ষে আমাদের দাঁড়াতেই হবে। এই মুহূর্ত থেকেই। না হলে ইতিহাসের কাছে আমরা অপরাধী হয়েই থাকবো।
১৯ মার্চ ২০২৬, দৈনিক ‘সুখবর’ পত্রিকায় প্রকাশিত।











