‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য় আমার এই চিঠিটি প্রকাশিত হয়েছে।
ছবি থেকে লেখাটা পড়া মুশকিল, তাই এখানে মূল লেখার পুরোটাই দিয়ে রাখছি। খবরের কাগজে প্রকাশের সময়, স্থানসঙ্কুলানের জন্যই, লেখায় অল্পবিস্তর কাটছাঁট হয়েছে, লেখার মূল বক্তব্যে বিন্দুমাত্র হাত না দিয়েই। পত্রিকার সম্পাদনা বিভাগের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা রইল।
.
.সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটতে/ঘটাতে পারার আগে অব্দি প্রান্তিক মানুষের উন্নয়ন বলতে কী বুঝি? মোটামুটিভাবে বলা যেতে পারে, উন্নয়ন বলতে জীবনযাত্রার উন্নয়ন। এবং তা দুই ভাবে ঘটে। প্রথমত, যিনি যে পেশাতে ছিলেন, সেই পেশার পরিসর বৃদ্ধি – আয়বৃদ্ধি, পেশাগত নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি। আর দ্বিতীয়টি, যিনি একটি পেশার মাধ্যমে উপার্জন করেন, বা সেই পেশাটিকে বেছে নিতে বাধ্য হন, তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের সামনে সেই বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে পেশা বেছে নেবার সুযোগ বৃদ্ধি। পরবর্তী প্রজন্ম যদি সামাজিক সম্মানের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে উচ্চতর পেশায় যেতে পারেন, তাকেও উন্নয়ন হিসেবে দেখা যেতে পারে। ধরুন, যিনি দিনমজুরের কাজ করেন, তাঁর সন্তান যদি লেখাপড়া শিখে প্রাথমিক শিক্ষক হন, তা উন্নয়ন বইকি! আমি নিশ্চিত, এক শ্রেণীর বামপন্থী এক্ষেত্রে আমাকে গালি পাড়বেন, কেননা “সব পেশাই সম্মানজনক, কোনও কাজই অসম্মানের নয়” ইত্যাদি প্রভৃতি – কিন্তু আপাতত সে তর্ক থেকে দূরে থাকছি, কেননা কথায় কথায় যাঁরা এসব যুক্তির অবতারণা করেন, তাঁরা নিজের সন্তানদের সেই সামাজিক সম্মানের পেশার (শিক্ষকতা/অধ্যাপনা/ডাক্তারি/ ইঞ্জিনিয়ারিং/সাংবাদিকতা/ওকালতি ইত্যাদি) দিকেই ঠেলেন, “অসম্মানের নয় এমন” পেশায় (ছোট ব্যবসা বা কায়িক শ্রমভিত্তিক পেশা) যোগ দেবার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করেন বলে দেখিনি।
তো ভোটের আগে এই কথা কেন? কথাটা এজন্যই, কেননা, তথাকথিত সম্মানজনক পেশায় যুক্ত মানুষজনের মুখে ভোটের আগে যা মতামত শুনতে পাই (হ্যাঁ, সংখ্যা বা শতাংশের হিসেবে এঁরা ক্ষুদ্র হলেও, মতামত প্রকাশ বা পারিপার্শ্বিক আলোচনায় মতামত প্রতিফলিত হতে পারার ক্ষেত্রে এঁরাই মূলস্রোত), তার সঙ্গে প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতার ঢের অমিল। এবং সেই অমিল, প্রতিবারই, প্রকাশ পায় ভোটের ফলে।
ভোটের দিন ও তার অব্যবহিত আগে/পরে রাজনৈতিক হিংসা ও ভয়দেখানো এই রাজ্যের ভোটের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গিয়েছে – এবং সেই ভয়ের সুযোগ শাসকদল পেয়ে থাকে – এ সত্য প্রায় সর্বজনীন। কিন্তু শুধুই কারচুপি করে বা ভয় দেখিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না – আমার ধারণা, ওসবের মাধ্যমে বড়জোর জয়ের ব্যবধান বাড়ানো যায় মাত্র। সুতরাং, এটুকু বলা যেতেই পারে যে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি এই রাজ্যের মানুষের একটা বড় অংশের সমর্থন রয়েছে। অথচ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ওরফে ভদ্রলোক বাঙালির সোচ্চার সমর্থন তৃণমূল পায় বলে মনে হয় না। তাহলে? হ্যাঁ, তাহলে এটাই সত্য যে রাজ্যের তথাকথিত প্রান্তিক মানুষ – প্রান্তিক, অথচ তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ – এঁদের বড়সড় অংশের সমর্থন তৃণমূল কংগ্রেস পেয়ে থাকে। এবং এমন দাবী করাটাও হয়তো অসমীচীন নয় যে তৃণমূল কংগ্রেস, আপাতত, এঁদেরই প্রতিনিধিত্ব করছেন।
কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ (অথচ প্রান্তিক) শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটাই তো শেষ কথা নয় – প্রশ্নটা হলো, এই প্রান্তিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করার মাধ্যমে সরকারে আসীন দলটি সংশ্লিষ্ট শ্রেণীর উন্নয়নের জন্য ঠিক কী করছে? বিভিন্ন ধরনের ভাতা চালু হয়েছে বটে, এবং রাজ্য ও কেন্দ্র উভয় সরকারেরই বিবিধপ্রকার জনকল্যাণমুখী প্রকল্প – তৃতীয় বিশ্বের দেশ, যেখানে অধিকাংশ মানুষই গরীব, সেখানে এধরনের উদ্যোগ যে গুরুত্বপূর্ণ সেবিষয়ে তর্কেরই অবকাশ নেই – কিন্তু এসব হলো যাকে বলে ‘ইন্টেরিম রিলিফ’, যা অল্পসময়ের জন্য স্বস্তি দিতে পারে, ভাতা-ই যদি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মুশকিল। এই কথাটা শাসক শ্রেণী জানেন না এমন নয় – এমনকি তাঁদের ভোটব্যাংক যাঁরা, তাঁরা বোঝেন না এমনও হয়তো নয় – তবু অনুদান কিংবা ভাতা-মডেলের প্রসার বেড়ে চলেছে কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে, অন্তত আমার মতে, রাজ্যের রাজনীতিতে সংখ্যার হিসেবে ভদ্রলোক-শ্রেণীর প্রান্তিক হয়ে যাবার তাৎপর্য বুঝতে পারাটা জরুরি। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার মধ্যে একটা ‘অ্যাস্পিরেশনাল ভ্যালু’ থাকে – আজ যাঁরা তথাকথিত ভদ্রলোক শ্রেণীভুক্ত, মাত্র এক কি দুই প্রজন্ম আগেও, তাঁদের সবাই, উচ্চ-মধ্যবিত্ত তো দূর, মধ্যবিত্তও ছিলেন না। নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের সন্তানরা সরকারি স্কুলে বিনেপয়সায় পড়ে কেউ শিক্ষক হয়েছেন, কেউ অধ্যাপক, কেউ বা ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার/উকিল/ব্যাঙ্ক-অফিসার কিংবা সাংবাদিক। বস্তির মেধাবী ছেলেটি ডাক্তার হলে, বা খেতমজুরের ছেলে স্কুলশিক্ষক হলে তা আশেপাশের আরও অনেক ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় মন দিতে অনুপ্রাণিত করে, করতে পারে – ইতিহাস সাক্ষী, করেওছে। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে, আর্থসামাজিক শ্রেণীও জলচলহীন বর্ণাশ্রম ব্যবস্থায় পরিণত হয়। যা এই রাজ্যে হয়েছে। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা ভগ্নপ্রায় – ইশকুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কলেজে ছাত্রছাত্রী জুটছে না – তা নিয়ে যাদের বিচলিত হওয়ার কথা ছিল, সেই গরীব মানুষের মধ্যে অকুণ্ঠ নির্বেদ, কেননা সবাই জানে যে পড়লেও চাকরি নেই, বরং ‘যুবসাথী’-র ভাতা আছে। স্বাস্থ্য কৃষি ইত্যাদি সবক্ষেত্রেই এধরনের উদাহরণ রয়েছে, কিন্তু কথা বাড়ানো নিষ্প্রয়োজন।
শ্রেণী-উন্নয়নের পথ বন্ধ করে পিছিয়ে-থাকা শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে নির্বাচনী সাফল্য রাজনৈতিক দলের পক্ষে আকর্ষণীয় মডেল হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এ এক বিপজ্জনক স্ট্র্যাটেজি। দুর্ভাগ্য আমাদের, রাজ্যের নির্বাচনী তরজায় একদিকে এই স্ট্র্যাটেজি, আর অপরদিকে ধর্মীয় বিভাজন ও প্রান্তিক মানুষকে নির্বাচনী হিসেবনিকেশের বাইরে রেখে দেওয়ার ভয়ংকর পরিকল্পনা – এর বাইরে অন্য কণ্ঠ যা কিছু রয়েছে, ভোট-রাজনীতির জটিল অঙ্কে তা এতই মৃদু যে সেসব কথা, ভদ্রলোক বা প্রান্তিক, কোনও শ্রেণীরই কর্ণগোচর হচ্ছে না।











