আমরা রোগ বলতে সরল ভাবে বুঝি আমাদের দেহে কিছু উপসর্গ বা সিম্পটম ফুটে উঠল এবং তার একটা নির্দিষ্ট কারণ আছে। যেমন ধরা যাক টি বি বা যক্ষ্মা রোগের ক্ষেত্রে। এই রোগের জীবানু দেহে ঢুকে খুকখুকে কাশি, জ্বর, ওজন কমা ইত্যাদি কয়েকটি নির্দিষ্ট উপসর্গ তৈরি করলে টিবি হয়েছে বলা হবে। মানসিক রোগের ক্ষেত্রে ঠিক বিষয়টি এত সরল নয়। কতগুলো উপসর্গ একসাথে থাকলে একটা রোগ হয়েছে বলা যায় কিন্তু তার একদম টিবি রোগের মত নির্দিষ্ট কারন খুঁজে পাওয়া যায় না। সম্ভাব্য কারন বলা যায়। এই কারনে মানসিক রোগকে ঠিক DISEASE না বলে DISORDER বা বিকার বলা যায়। যেমন ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার ( DEPRESSIVE DISORDER) বা অ্যাংক্সাইটি ডিজঅর্ডার (ANXIETY DISORDER)। যাইহোক এত তাত্ত্বিক কচাকচির মধ্যে না গিয়ে বাংলায় সব কিছুকে রোগই বলব। আর কি কি উপসর্গ দিয়ে তা চেনা যায় দেখে নিই।
একজন মানুষের মানসিক রোগ হলে তার চিন্তা, আবেগ এবং আচরণের ভারসাম্য হারিয়ে যায় তাই তার মধ্যে নানা উপসর্গ দেখা যায়। অসংখ্য মানসিক রোগ আছে আর তাদের উপসর্গ গুলোও আলাদা। আমরা যখন আলাদা আলাদা রোগ নিয়ে বলব সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব। আপাতত স্বাভাবিক থেকে মানুষটি অস্বাভাবিক হচ্ছে কিভাবে সেই উপসর্গ গুলো একসাথে এখানে বলব।
পোশাক আশাকঃ অবিন্যস্ত অপরিষ্কার পোশাক বা বেশি পরিপাটি পোশাক। সে যেটা আগে পরত না সেরকম কিছু পরছে কিনা। বা যেখানে যেটা পরার নয় সেরকম পরছে কিনা। যেমন একটি মেয়ে একটু হাল্কা রঙের জামাকাপড় পরত হঠাৎ সে চড়া রঙের পোশাক পরছে, গাঢ় লিপস্টিক, ঝোলা দুল ইত্যাদি। কেউ হয়ত বিয়েবাড়ি গেছে ছেঁড়া নোংরা জামাকাপড় পরে আবার কেউ হয়ত শোকের বাড়ি গেছে অতিরিক্ত সাজগোজ করে।
মানসিক রোগীর চিন্তা ভাবনায় পরিবর্তন আসে। আর যেহেতু কথা হচ্ছে চিন্তা প্রকাশের মাধ্যম তাই কথার নানা পরিবর্তন হয়। কেউ অতিরিক্ত কথা বলে। কেউ চুপচাপ হয়ে যায়। কথা বার্তা অসংলগ্ন হয়ে যায়। এক প্রসংগ থেকে আর এক প্রসংগে চলে যায় যে দুটোর কোনো যোগ নেই। কেউ একটা কথা শুরু করে সেখানে আর ফিরতেই পারে না কেউ অনেক অন্য প্রসংগ ছুঁয়ে তারপর ফেরে। কেউ মাঝ পথে কথা শেষ করে চুপ হয়ে যায়। কেউ কোনো কথার উত্তরই দেয়না।
কারোর মন খুব খারাপ থাকে। কিছু ভালো লাগেনা। কেউ কেউ অতিরিক্ত উদবিগ্ন থাকে। কারোর শরীরে নানা রোগে হয়েছে মনে হয় কিন্তু শত পরীক্ষা নিরীক্ষা করেও কোন রোগ পাওয়া যায়না। কারোর কারোর মন অতি উৎফুল্ল থাকে। অতি এনার্জি।
কারোর মাথায় একই চিন্তা বারবার আসে, চেষ্টা করেও তাড়াতে পারেনা। এটা ক্রমশ যন্ত্রণাদায়ক হয়ে যায়। যেমন কারোর মনে হয় সব কিছু নোংরা তাই সে বারবার ধুয়েই যায়। চান করতে অনেক সময় নেয়। সব কাজ মনে হয় ঠিক হোলনা তাই বারবার করে নিখুঁত করার জন্যে। কারোর হয় ভগবান বা আল্লা সম্পর্কে খারাপ চিন্তা আসে। কারোর মনে হয় দড়ি দেখা মানে সুইসাইড করে ফেলবে। কেউ দরজা দিয়ে বারবার টেনে দেখে বা গ্যাস বন্ধ হোল কিনা বারবার দেখে। এগুলোকে অবসেশান বলে।
কিছু ক্ষেত্রে চিন্তাটা অযৌক্তিক কিন্তু যুক্তি দিয়েও তাকে বোঝান যায়না। যেমন কারোর মনে হয় আসপাশের লোক তাকে নিয়ে আলোচনা করছে, কেউ ভাবছে অন্য লোক তার ক্ষতি করবে। কেউ মনে করে তার স্বামী বা স্ত্রী অন্য কারোর সাথে সম্পর্ক রাখে। কারোর মনে হয় তার মোবাইল দিয়ে নজরদারি চলছে বা বাথরুমে সিসি ক্যামেরা বসান আছে। কেউ মনে করে তার চিন্তা অন্য লোকে বুঝে ফেলছে বা উল্টোটা সে অন্য লোকের চিন্তা বুঝতে পারে। কারোর নিজেকে বিরাট কিছু মনে হয়। কোটি টাকার মালিক বা ভারতের প্রধানমন্ত্রী বা বিরাট কোহলি। এগুলোকে ভ্রান্তি বা ডেলুউশান ( delusion) বলে।
কেউ হয়ত অদ্ভুত অনুভূতির শিকার হয়। কোনো উদ্দীপনা বা স্টিমুলাস (stimulus) ছাড়া পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের যে কোনো ইন্দ্রিয়ের এই অনুভূতিকে বলা হয় অলীক অনুভূতি বা হ্যালিউসিনেশান( hallucination)। হয়ত সে কানে এমন কিছু শুনছে যেটা আর কেউ শুনতে পায়না। একে বলা হয় অলীক শ্রবন। আর সেসব কথার উত্তর দিতে গিয়ে সে বিড়বিড় করে। একই ভাবে চোখে উল্টোপাল্টা দেখা বা গায়ে চামড়ার ভেতরে পোকা চরে বেড়ান এইসব অলীক অনুভূতির উদাহরণ।
কেউ কেউ রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়। কেউ কেউ বাড়ি ছেড়ে অনেক দূর চলে যায়। কারোর স্মৃতি শক্তি কমতে থাকে। সময়, তারিখ ঠিক বলতে পারে না। চেনা মানুষের নাম ভুলে যায়। খেয়েছে কিনা মনে করতে পারে না।
খুব কম কিছু ক্ষেত্রে কোন কোন মানসিক রোগী হিংস্র হয়ে অন্যকে আক্রমণ করতে পারে। প্রকৃত পক্ষে এরা যত না হিংসা করে তার থেকে বেশী হিংসার শিকার হয়।
কেউ কেউ নেশার কবলে পড়ে যায়। ঘুম ক্ষিধে যৌনেচ্ছা সাধারণত কমে যায় কিছু ক্ষেত্রে বাড়ে। কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে প্রস্রাব করার প্রবনতা বেড়ে যায়।
সাধারণ ভাবে উপসর্গের প্রভাবে মানুষটি কষ্টে থাকে। নিজের কাজ ঠিক মত করতে পারে না। এবং বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয় স্বজনের সংগে সম্পর্ক ঠিক রাখতে পারে না।
***










