এমন কিছু বেশি বছর আগের কথা নয়, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা- লোকসভা-পঞ্চায়েত/পুরসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তাঁদের হার অথবা জিতের কারণ দর্শানোর জন্য সাংবাদিক সম্মেলনের ছবি দেখতাম টিভির পর্দায়। ভারতীয় জনতা পার্টির তরফ থেকে প্রায় সবসময়ই দেখা যেত রাহুল সিনহা মশাইকে। তিনি কি কারণ দর্শাতেন, সেটা আজ আর ভাল মনে নেই। সম্ভবত শাসকদলের রিগিং তত্ত্ব, মানুষের কাছে সঠিক ভাবে পৌঁছতে না পারার তত্ত্ব এই গতানুগতিক কারণগুলিই বলতেন — কিন্তু আমার বেজায় হাসি পেত।
এই হাসির স্পর্ধা এসেছিল একটা সুগভীর বিশ্বাস থেকে, যে আমাদের রাজ্যটি আলাদা — এই রাজ্যে অন্তত ধর্মের তাস খেলে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছনো যাবে না।
তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। বিজেপির এই ল্যাণ্ডস্লাইড ভিকট্রিতে অনেকে হতাশ হয়েছেন, অনেকে দুঃখিত, বহু মানুষ বিস্মিত। কেউ কেউ ভোটপরবর্তী সন্ত্রাসের খবর দেখেশুনে বলছেন — এই তো সবে শুরু!
না, আমি এসব কিছুই বলছি না। কারণ আমি জানি (এবং যাঁরা হা-হুতাশ করছেন, সম্ভবত তাঁরাও জানেন) এই হিংসা সাময়িক। আজ না হয় কাল অস্থিরতা কমে যাবে — কালের নিয়মেই তা কমতে বাধ্য। যে কোনও নতুন সরকার স্থিতু হতে একটু সময় নেয় — পশ্চিমবঙ্গের নবগঠিত বিজেপি সরকারও তার ব্যতিক্রম হবে না। তারপর প্রশাসন রাজ্য পরিচালনার রাশ শক্ত হাতেই ধরবে। আমার সেই বিষয়ে কোনও বক্তব্য নেই। (একজন রাজ্যসরকারি কর্মচারী হিসেবে থাকা উচিৎও নয়, কারণ আমিও এই বৃহৎ প্রশাসনযন্ত্রের অন্যতম ক্ষুদ্র একটি অংশ, তা সে যত অকিঞ্চিৎকরই হোক না কেন)।
আমার বক্তব্য একটু ভিন্ন। পনের কুড়ি বছর আগে যে সংবাদে আমি হাসার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিলাম, তা আজ চরম বাস্তব হয়ে আমার সবজান্তা গালে একটি থাপ্পড় মেরে গেল।
দেশে বহুত্ববাদের যে সুদীর্ঘ পরম্পরা আমরা, ভারতীয় নাগরিকেরা এতদিন বহন করে নিয়ে চলেছিলাম, তা বোধহয় এবার অস্ত যাওয়ার সময় হয়েছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতীয় কংগ্রেসের এইরকম দেশব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা, রাজ্য নির্বিশেষে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল ঠিকই, কিন্তু তার নানা কারণ ছিল। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলি স্বাধীনতার অবশ্যম্ভাবী পরেই ডানা মেলতে পারেনি তেমন।কংগ্রেস অনেকটা নিরঙ্কুশ ছিল ঠিকই কিন্তু একনিষ্ঠ ধর্মমুখী কোনও মতাদর্শ তাদের ইস্তাহারে কখনও প্রকাশ পায়নি। জাতপাতের অঙ্ক, ভোটমুখী বিভাজনের রাজনীতি অনেক পরে আসে — কিন্তু তা সর্বগ্রাসী ছিল না এখনকার মতো। তার নানা কারণ রয়েছে — বৈশ্বিক আর্থসামাজিক আমূল পটপরিবর্তন তার অন্যতম — তাই ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিকে উন্নাসিক ধর্মনিরপেক্ষ এলিটিজ়ম দিয়ে আর ‘সংকীর্ণ’ বলে দূরে সরিয়ে রাখার অবকাশ নেই।
তবু, মনে বিশ্বাস ছিল যে পশ্চিমবঙ্গবাসী কোথাও যেন একটু আলাদা, একটু তফাতে রয়েছে এই রাজনীতির থেকে।
না, ভুল। স্রোতের বিপরীতে হাঁটা যায় না, সেটা বিপজ্জনক। খুব বুদ্ধিমানের কাজও হয়ত নয়। স্রোতটা কেন তৈরি হলো, সেই নিয়ে তাবড় সমাজতত্ত্ববিদরা গবেষণা করুন — আমি নির্বোধ ব্যক্তি, সে ক্ষমতা আমার নেই। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের ‘এক ভারত’ এখন চূড়ান্ত সত্য — বিবিধের মাঝে মহান মিলনের ভারতবর্ষ ক্রমেই বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে, যাবে।
সমাজমাধ্যমে দু’চারটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ পোস্ট করে বেশিরভাগ নাগরিকের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির এই সামূহিক পরিবর্তনকে অস্বীকার করা যাবে না আর। এটাই বর্তমান সময়ের দাবি।
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সন্ত্রাস, পশ্চিমবঙ্গের সদ্যপ্রাক্তন ও সুদূরপ্রাক্তন শাসক দলগুলির অন্যায্যভাবে ক্ষমতাদখলের অনৈতিক প্রয়াস নাকি সামগ্রিকভাবে সমাজে দুর্নীতির বৈধকরণ — কোনটা এই প্রায় বিরোধীবিহীন জাতীয়তাবাদের জনক, তা নিঃসংশয়ে বলা কঠিন। হয়ত আমার জ্ঞান বা বোধের বাইরের অন্য কোনও তত্ত্ব দায়ী —
আমি জানি না।
কিন্তু আমার আজন্ম পরিচিত রাজ্যটি যে তার সামাজিক বীক্ষার চশমাটি সম্পূর্ণরূপে পালটে নিয়েছে — এই নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই।
সেই সঙ্গে ২০২৬এর বিধানসভা নির্বাচন মনের গভীরে এই বিশ্বাসও প্রোথিত করে দিয়ে গিয়েছে — নাথিং ইজ পার্মানেন্ট। গণতন্ত্রের পরিভাষা বদলে যেতে পারে, বদলে যেতে পারে স্বাধীনতার অর্থ। হ্যাঁ, বদলাতে পারে সংবিধান, সাধারণ মানুষের জীবনে রাষ্ট্রের ভূমিকা, ধর্মীয় মেরুকরণের বাইনারি — সবই। কারণ, নাথিং ইজ় পার্মানেন্ট একসেপ্ট চেঞ্জ।










