৭ মে, ২০২৬
গত তিনদিনে পশ্চিম বাঙলার খেটে খাওয়া দিন-আনি-দিন-খাই জনগণ মানে টোটোওয়ালা-অটোওয়ালা-আনাজ বিক্রেতা-খুচরো বিক্রেতা-হকার-ফেরিওয়ালা,জীবিকার কারণে যাদের রাস্তা ব্যবহার করতে হয়, গ্রামে গঞ্জে দৈনিক হারে কার্যরত মানুষজন– এদের কোনো তোলা দিতে হয়নি। প্রত্যেকের দিনপ্রতি দশ-বিশ টাকা করেও হিসাব করলে এই তিনদিনে মানুষের কতো টাকা বেঁচেছে? অঙ্কটা (sum total) বোধহয় খুব অকিঞ্চিৎকর হবে না।
এখন বেশির ভাগ মানুষই কাজ করে অসংগঠিত ক্ষেত্রে, যার সিংহ ভাগ এমনকি সিভিক কর্মীদেরও নিয়মিত তোলা দিতে হতো দৈনিক হারে। প্রতিটা বাস-লরি ইত্যাদি ব্যবসায়িক পরিবহন কারুরই ছাড় ছিল না এই parallel taxation system থেকে। গত তিনদিন কিন্তু সেই ‘tax collection’ বন্ধ!!
কতোদিন মানুষের এই অভাবনীয় সৌভাগ্য স্থায়ী হবে জানা নেই। কিন্তু এই দায়িত্ব মানুষের এবং যারা মানুষের পাশে থাকার কথা বলেন তাদেরও যাতে পুরোনো ‘তোলাবাজির প্রক্রিয়া’ আবার শুরু না হয়। প্রয়োজন সেই সংগঠিত জনমত যাতে মানুষই সরাসরি অস্বীকার করতে পারে যে কোনো ফর্মেই আর ‘তোলা’ তোলা যাবে না। পুরাতন বা নতুন কিংবা নবরূপে পুরাতন, কেউই যেন সেই গল্প আবার শুরু করতে না পারে। এটা যেন কোনোক্রমেই জাস্ট ‘টাইম আউট’ বা ‘থোড়াসা ব্রেক’ না হয়ে যায়।
বিজেপি দল নিয়ে আমার কোনো প্রেম-ভালোবাসার প্রশ্ন নেই। কিন্তু তাও আমি আশা করবো, রাজ্যে ক্ষমতায় এসে তারা যেন মানুষের জীবন জীবিকার সঙ্গে জড়িত বেসিক প্রশ্নগুলো সমাধানের চেষ্টা করে। চাইবো, বিগত জমানার সমস্ত দুর্নীতির পরিষ্কার তদন্ত হোক, প্রত্যেকটা রাজনৈতিক চোর-ডাকাতের যথাযথ শাস্তি হোক, শুধু ‘অভয়ার মৃত্যু’ নয়, প্রত্যেকটি অত্যাচার-অনাচারের বিচার হোক। কারণ, নবনির্বাচিত একটি সরকারের কাছে সেটাই আবশ্যিক ভাবে মানুষের চাওয়ার কথা।
আর শুধুমাত্র অসংগঠিত কাজের ক্ষেত্রেই নয়, সমস্ত ধরণের পেশাগত ক্ষেত্রেও রয়েছে অসংখ্য অত্যন্ত জরুরি সব বিষয়। যে দলই আসুক, তা আমার পছন্দের হোক বা না হোক, তাদের কাছে তো এই দাবিগুলো নিশ্চিত ভাবেই রাখতে হবে। এবং, আজকের পরিস্থিতিতে সেটাই হওয়া উচিত utmost priority।
যেমন, স্বাস্থ্যের বিষয়ে পরিষ্কার চাইবো, স্বাস্থ্যভবনে ও অন্যত্র যে সমস্ত উচ্চ পদস্থ আধিকারিকরা সরাসরি কাজ করে গেছে চরম দুর্নীতির ধারক ও বাহক হিসাবে তাদের প্রত্যেককে অপসারণ করে তদন্ত শুরু করা হোক ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি ও নিয়মবহির্ভূত কাজের। চাইবো বেআইনিভাবে দখল করা চরম দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রতিহিংসাপরায়ণ ‘মেডিকেল কাউন্সিল’কে এক্ষুনি ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক, তথাকথিত ‘নর্থ বেঙ্গল লবি’র সব কটাকে আইনী ব্যবস্থার সম্মুখীন করতে, বিগত পনের বছর ধরে যারা চিকিৎসকদের সর্বভারতীয় সংগঠন IMA এর রাজ্য শাখাকে পার্টি অফিসে পরিণত করেছে কয়েকটা তস্কর আর বশংবদ দালালদের নিয়ে, তাদের সব কটাকে চিরতরে দূর করতে।
হ্যাঁ, পরিষ্কার বলছি এই দাবিগুলো একেবারে স্বাভাবিক, কারণ এই বিষয়ে প্রত্যেকটা অভিযোগ সার্বজনীনভাবে সত্য। তাই, আশা করবো বিজেপির প্রার্থী হিসাবে জিতে আসা চিকিৎসক বিধায়করাও আন্তরিকভাবেই অংশীদার হবেন এই কাজগুলোতে। ব্যক্তিগত ভাবে তাদের মধ্যে যাদের চিনি, তারাও যে এই বিষয়গুলিতে ভিন্নমত পোষণ করেন, সে রকম কখনোই মনে হয়নি। তবে, দেখার জিনিস ‘দল’ কী বলে?!
সত্যি করে বলতে গেলে এই মুহূর্তে নতুন সরকার lesser না greater evil, বঙ্গে ফ্যাসিবাদ কতো যোজন এগিয়ে গেলো, সেই তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে আমার মনে হয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলো বিভিন্ন জ্বলন্ত সমস্যাগুলো যেগুলোর সৃষ্টি/বিকাশ মূলতঃ বিগত দেড় দশকে, সেগুলোকে ক্রমান্বয়ে সামনে নিয়ে আসা, যাতে করে পরিষ্কার হয়ে যায় আগামী সরকার সত্যিই কী চায়? খেটে খাওয়া আপামর জনগণের ভালো না মন্দ? আসলে কী চায়, গণতন্ত্রের প্রসার না সংকোচন?
চূড়ান্ত কথা কিন্তু মুখ নয় কাজ বলবে……….











