ক্ষমতায় এসেই রাজ্যের নতুন সরকার জানিয়েছে, তারা শিল্পের প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণের নীতি বদলাবেন। এর থেকে সংশয় ও সম্ভাবনা দুটোই তৈরি হচ্ছে। মাত্র কয়েক দিনের সরকারের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি।
ইতিমধ্যে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে তাকে তিনটে ভাগে ভাগ করা যায়। -একটা, মানুষের পরিষেবা মূলক, অন্যটা, সরকার পরিচালনা, আর একটা হচ্ছে-অর্থনীতিমূলক। আগের সরকারের পরিষেবাগুলি বজায় রেখেই নতুন সরকার ঠিক করেছে দুর্নীতির জন্য যে মানুষের কাছে যে পরিষেবাগুলো পৌঁছচ্ছিল না, সেগুলো আরও বেশি করে দেওয়া যাবে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে পারলে। তাই দুর্নীতি নিয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স।সরকারের কথায় আশা বেড়েছে, এরপর কার্যত মানুষ দেখবে কী হয়। তবে এক্ষেত্রে কেউই চায় না প্রসাধন আইন হাতে নিক, চলুক বুলডোজার, বদলে চায় আইনের শাসন।
এরপর একটা বড় প্রশ্ন: এই সরকার কোন শ্রেণীকে অগ্রাধিকার দেবে আর কোন শ্রেণির স্বার্থ দেখবে? নতুন সরকার জানিয়েছে, পূর্বতন সরকারের যে সামাজিক কর্মসূচি যেগুলো ছিল, সেগুলো চলবে। তবে শুধুমাত্র পিছিয়ে পড়া দুর্বল শ্রেণীর মানুষের জন্য। আগের সরকার যেমন সব আয়ের মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, সাধারণ মানুষকে নানা প্রকল্পের সুবিধা দিত, এরা তাতে লাগাম পরিয়েছে। ১০৫ টি প্রকল্প মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চালু করেছিলেন। সেই প্রকল্পগুলো চালু রাখার সিদ্ধান্ত মানে নতুন সরকার সামাজিক দায়িত্ব স্বীকার করে চলছেন।
নতুন সরকার এই কয়েকদিনেই বড় ইঙ্গিত দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন,শিল্প করার জন্য নতুন করে শিল্পনীতি ও জমি নীতি নেবেন।
পশ্চিমবঙ্গে জমি অধিগ্রহণ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু। ইতিহাসে দেখা গেছে জমির কারণে বাংলায় বারবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। মুঘল আমল থেকে কোম্পানি শাসনে বাংলায় রাজনীতি চলেছে জমির উপর প্রভুত্ব ফলিয়ে। ভুস্বামীদের শোষণে -:অত্যাচারে বাংলার কৃষক শ্রেণি বারবার বিদ্রোহ করতে বাধ্য হয়েছে। জমির রাজনীতি নিয়ে শাসকের অবস্থানের বিরুদ্ধে ও মানবতার টানে বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ কৃষক সমর্থনে এগিয়ে এসেছে। ক্ষমতার বদল ঘটেছে কৃষক – শ্রমিক শ্রেণির লড়াইয়ে মধ্যবিত্তের সমর্থনে। জমি আন্দোলন থেকেই বিরোধী রাজনীতি শক্তি বাড়িয়েছে। শেষে শিকড়ে টান পড়ে শাসক ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। পট পরিবর্তন ঘটেছে।স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে বঙ্গ ভঙ্গ, দেশভাগ , স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি এই জমি থেকে উদ্ভূত সমীকরণে প্রবাহিত হয়েছে। বারবার। তেভাগা, নকশালবাড়ি আন্দোলন থেকে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম, জমিকে নিয়ে আন্দোলন বা রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব বাংলার ভাগ্য লিখে গেছে। সর্বশেষে এই জমি আন্দোলন থেকে উঠে আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৩৪ বছরের বাম সরকারের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু সেই জমি জটে আটকে থেকেই রাজ্যে শিল্প গড়তে পারে নি। কারণ যে জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলন করে তারা ক্ষমতায় এসেছিল, শিল্প গড়তে হলে শিল্পপতিদের দাবি মেনে তার বিরোধিতা করতে হতো।মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হয়ে যেত। সেটা মমতা করতে চান নি। তাই রাজ্যকে বিকল্প উন্নয়নের পথে তিনি এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তাতে রাজ্যের ক্রমবর্ধমান বেকারির সমস্যা সামাল দিতে পারেন নি। যুব সমাজের ক্ষোভ এই রাজ্যে শিল্প হয় না। এবারের ভোটে যুব সমাজের হতাশা প্রতিফলিত হয়েছে ভোট বাক্সে।
বিজেপির সুবিধা হচ্ছে তারা জমি আন্দোলন করে উঠে আসেনি। যুবসমাজের চাকরির প্রত্যাশা মেটাতে তারা এখন ক্ষমতায় এসে কী করে সেটাই দেখার। নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করতে গিয়ে বিজেপি সংকল্প পত্রে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি রাখে নি। তাদের একটাই বক্তব্য রাজ্যে ১ কোটি চাকরির সংস্থান করবে আগামী পাঁচ বছরে। স্বভাবতই ঢেলে সাজাতে হবে শিল্প পরিকল্পনা। মমতা সরকারের জমি অধিগ্রহণ নীতি বদলাতে হবে নইলে শিল্প আসবেনা। এতে আবার অশনি সংকেত তৈরি হচ্ছে। বাংলার অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। তাই কতগুলো প্রশ্ন উঠছে: কৃষকদের জমি থেকে উৎখাত করতে রাষ্ট্র কি শেষ পর্যন্ত বল প্রয়োগ করবে? জমির ঊর্ধ সীমার সিলিং তুলে দেবে বলছে সরকার। জমি হাঙরদের গ্রাসে পড়ে যাবে ক্ষুদ্র মাঝারি চাষী। তাদের বাঁচাতে সরকার কি করে সেটাই সবচেয়ে জরুরি। আগামীদিনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে জমি অধিগ্রহণ করতে কৃষককেই উচ্ছেদ করতে সরকার বল প্রয়োগ করবে ,নাকি কৃষিজ অসন্তোষ মেটাতে যথাযথ পুনর্বাসন প্যাকেজ চালু হবে নাকি আলাপ আলোচনার মধ্যে থেকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিয়েই জমি অধিগ্রহণ হবে?












