প্রথমত, নতুন সরকার এলে, সাধারণত, পূর্বতন সরকারের মনোনীত সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া হয় (বা তাঁরা নিজেরাই সরে যান) – এটা শুধুমাত্র মেডিকেল কাউন্সিল নয়, সর্বত্রই করা হয়। অতএব শুধু নির্মল মাজিকেই তার কার্যকলাপের জন্য সরিয়ে দেওয়া হলো, এমন নয়।
আর দ্বিতীয়ত, নির্মল মাজি সেভাবে কখনোই থ্রেট কালচার-এর পাণ্ডা ছিল না (যা কিনা বাংলার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নর্থ বেঙ্গল লবি-র, অনেকাংশেই মৌলিক, অবদান)। নির্মল মাজি পাড়ার পেঁচো মস্তান টাইপের – চুরি, তোলাবাজি, দাদাগিরি এইসব কাজের বেশী কিছুর এলেম ওর ছিল না, নেইও (সেদিক থেকে দেখলে বিরূপাক্ষ বিশ্বাস ওর উপযুক্ত উত্তরাধিকারী)। [এই পোস্টে আপনি-বাচক ক্রিয়া, ইচ্ছাকৃতভাবেই, ব্যবহার করছি না।]
থ্রেট কালচার – যা আসলে অর্গানাইজড ক্রাইম সিন্ডিকেট – তার আসল মাথা অভীক দে। (আমাদের সাবজেক্ট-তুতো ভাই সৌরভ পাল-ও বেশ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র – এ-ও কাউন্সিলের সরকার-মনোনীত সদস্য ছিল, একেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে – তবে বিপজ্জনক হিসেবে সৌরভ অভীকের তুলনায় কিছুই না।)
খেলায় বাদ পড়ে যাবার ভয়ে নির্মল মাজি ওই গ্রুপে মিশেছিল বটে, কিন্তু শুধু ল্যাবেঞ্চুস হাতে সন্তুষ্ট থাকার বেশী কিছু পেত না। (শান্তনু সেনের আত্মসম্মানবোধ এর তুলনায় সামান্য একটু বেশী থাকার কারণে সে এই গ্রুপে তেমনভাবে ভিড়ে উঠতে পারেনি।)
এর সঙ্গে যোগ করতে হবে সেইসব মহান চিকিৎসক তথা ফ্যাকাল্টিদের, যারা অভীক-সৌরভ-মুস্তাফিজুরদের নিরন্তর তেল মারত, স্থানীয়স্তরের খবরাখবর দিত – সামনে এলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াত – মাঝেমধ্যে ওই গোষ্ঠীর ক্রিয়াকলাপ কী করে আরও নিখুঁত করা যেতো পারে সে বিষয়ে পরামর্শও দিত – এবং যারা এখন প্রকাশ্যত আকুলভাবে বিজেপি-পন্থী হয়ে গেছে (বিজেপি তাদের নিয়েছে/নিচ্ছে/নেবে কিনা, সেটা অবশ্য আমার জানা নেই)। উদাহরণ হিসেবে মেদিনীপুরে জনৈক ইএনটির প্রফেসরের কথা বলা যেতে পারে – যে ইএনটি পরীক্ষার সময় মুস্তাফিজুরকে পাশের চেয়ারে বসিয়ে রাখত, এবং কে কত নম্বর পাবে তা মুস্তাফিজুরই নির্ধারণ করত – সেই প্রফেসর এখন খুবই বিজেপি-মুখো হয়েছে। তবে এরকম অনেকেই আছে, আমাদের সাবজেক্টে বা আমার সরাসরি সহকর্মীদের মধ্যেও তেমন লোকজন আছে, কিন্তু সকাল-সকাল তাদের নেমিং-শেমিং করে বিতর্ক বাড়াব না।
শশী পাঁজার প্রগ্রেসিভ হেলথ অ্যাসোসিয়েশন তৈরী হওয়ার দিনদশেকের মধ্যে রাজ্যের অধিকাংশ মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল-এমএসভিপি ইত্যাদিরা সংগঠনের সদস্য তো বটেই, এমনকি পদাধিকারী হয়ে গেলেন (যদিও এঁদের কারোরই, অন্তত প্রকাশ্যত, কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-নেত্রী হওয়ার কথা নয়) – প্রিন্সিপাল করবী বড়াল রামপুরহাটের মেডিকেল কলেজের চত্ত্বরে তৃণমূলের পতাকা হাতে মিছিল করেছিলেন – অভীক-মুস্তাফিজুরদের কর্মকাণ্ড দেখে তিনি যে নিত্যদিন অনুপ্রাণিত হন সে কথা জানিয়েওছিলেন – উনি বেশী উচ্চাকাঙ্ক্ষী তাই বাড়াবাড়ি করেছিলেন, কিন্তু আরও অনেকেই প্রায় এরকমই করতেন – এই বাস্তবটাও তো ভোলার নয়।
স্বাস্থ্যভবনের বিভিন্ন হর্তাকর্তা থেকে চুনোপুঁটি অব্দি, তাদের কথা বললে তো নিউজপেপার আর্টিকল-এর সাইজ হয়ে যাবে – তাই সেদিকে নাহয় আর গেলামই না।
মোদ্দা কথা হলো, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজ্যের পশুপালন ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে কচি কালো বাঙালি পাঁঠা (ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট) চাষের কথা বলেছিলেন। তিনি দেখলে খুশী হতেন যে সরকারে তাঁর উত্তরসূরীদের শাসনকালে সেই প্রজাতির বিপুল উন্নয়ন ঘটেছিল – রাজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি স্তরে তাদের প্রভাব ও প্রসার ঘটেছিল, সম্মিলিত ব্যা-ব্যা ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস আলোড়িত হতে পেরেছিল। উন্নয়ন এতোটাই যে তারা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক অব্দি হয়ে যেতে পেরেছিল। এখন তারাই, অধিকতর উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষায়, আকুলভাবে হাম্বা-হাম্বা ডাক পাড়তে চাইছে।
এই দুষ্টচক্রকে না ভাঙলে, এবং চাঁইদের সঙ্গে সঙ্গে যারা ধামাধরা হয়ে সিস্টেমটাকে টিকিয়ে রেখেছিল তাদের একঘরে করতে না পারলে, দু-চারটে মুখ বদলাবে বড়জোর, চুরি-জোচ্চুরি একটু-আধটু কমলেও কমতে পারে, কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতির বদল ঘটবে না।











