পলাশকান্তি শ্লথ পায়ে বাজার থেকে ফিরছিল। রোদ চড়ে গিয়েছে, বদ্ধ বাতাসে ভ্যাপসা ভাব – তার কেমন দমবন্ধ লাগছিল।
কতক্ষণে বাড়িতে ঢুকে বাজারের ক্ষীণকায় ব্যাগটি নামিয়ে স্নানঘরে কলের তলায় মাথা পেতে দেবে ভাবতে ভাবতেই থপথপ করে হাঁটছিল সে।
রাত দুটো আড়াইটেয় শুতে যাওয়ার ফলে তার সকালটা একটু দেরি করেই শুরু হয় – মানে এতকাল হতো।
ন’টার সময় প্রায় ঠান্ডা মেরে যাওয়া এক কাপ বিস্বাদ চা আর দুটো থিন অ্যারারুট বিস্কুট দিয়ে শুরু হওয়া চড়চড়ে রোদ্দুরের সকাল নিয়ে এতদিন কোনো অভিযোগই ছিল না পলাশকান্তির।
কারণ পরের ঘন্টা কয়েক সময় ছিল তার এক্কেবারে নিজস্ব – যতক্ষণ না সরলপুঁটির ঝাল আর রেশনের লালচে চালের ভাতের যুগলবন্দি গলা দিয়ে ঠেলে নামিয়ে, নিতান্ত বেমানান শার্ট-ট্রাউজার-টাই শোভিত হয়ে সে ওয়েলিংটনের মোড়ে অফিসের পিক আপ ভ্যানের উদ্দেশে লম্বা দৌড় মারত।
অবশ্য পলাশকান্তি একেবারে ন্যাতানো মুড়ির মতো একটা ছেলে, কোনো কিছুতেই চাগিয়ে ওঠা তার ধাতে নেই। পাড়ার বন্ধুরা যদি বলে – চ’ পল্টু, হিন্দে একটা বই দেখে আসি – পলাশ ম্রিয়মাণ গলায় জবাব দেবে – তোরা যা বরং, আমার তেমন ইচ্ছে করছে না রে।
অফিসের কলিগরা ইয়ারবন্ধুরই মতো – পড়ে পাওয়া একফালি ছুটির সন্ধেয় একটু বিদ্রোহী হতে চেয়ে তাকে ডাক দেয় কখনও, এক চোখ ছোটো করে, আঙুলের মুদ্রা দেখিয়ে বলে – চলো ব্রো, ঘুরে আসি আজ। নাইট ইজ় স্টিল ইয়াং! পলাশকান্তি নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে হাত উল্টোয়, চাড়হীন গলায় বলে – তোমরা যাও ভাই, আমার জন্য খাবার নিয়ে মা বসে থাকবে তো।
কেউ বসে থাকে না। অন্তত পলাশ তাই জানে। বাবা দশটা বাজতে না বাজতে বিছানায়, মা অনেক রাত অবধি সিরিয়ালে মজে থাকে ঠিকই – তবে বারোটার পরে আর পারে না, শুয়ে পড়ে। সে যখন ফেরে, বাসন্তীর তখন মাঝরাত। দরজায় মুহুর্মুহু বেল শুনে চোখ মুছতে মুছতে সদর খুলে দিয়েই টলমল পায়ে ভাঁড়ারঘরে ফিরে নিজের বিছানায় গড়িয়ে পড়ে সে।
তবু অফিসের গাড়ি তাকে ড্রপ করে দেবার পরে সংকীর্ণ গলিপথ বেয়ে ঐ মান্ধাতা আমলের বাড়িটার দিকে যতই এগোতে থাকে পলাশ, এক অদ্ভুত মায়াভরা ভালবাসা চারিয়ে যেতে থাকে তার প্রতি রোমকূপে। মস্ত ভারি কাঠের দরজার পাল্লাজোড়া বন্ধ করে, আধো অন্ধকারে ভাঙাচোরা উঠোন পেরোয় তার ক্লান্ত ছায়া – ক্ষয়ে যাওয়া সিঁড়ির ধাপ গুনতে গুনতে দোতলায় ওঠে। পরম মমতায় জং ধরা বারান্দার রেলিঙে হাত বোলাতে বোলাতে যায় – সে কি বুঝতে পারে, তেতলার কার্নিশ থেকে একজোড়া উৎকণ্ঠা মাখা চোখ নজর করছে তাকে? চুনবালি খসা সুরকির দেওয়াল আর ঘুলঘুলির পায়রারা শুনতে পায় সরোজবাসিনীর দীর্ঘশ্বাস – আহা মরে যাই, খেটে খেটে সোনার বন্ন কালি হয়ে গেল মানিকের, অনামুখো আপিসের ক্যাঁতায় আগুন – মর, মর!
পলাশের এ হেন রুটিনে পরিবর্তনের কারণ একটাই। বাসন্তী।
সপ্তাহ দুয়েক হলো বাসন্তী কেটে পড়েছে। বলা ভাল, এক্কেবারে ‘নেই’ হয়ে গিয়েছে। তার জিনিসপত্তর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল ভাঁড়ারের এদিক সেদিক। এমন কি তার চোখের মণি ছোট্ট মুঠোফোনটাও ফেলে গিয়েছিল সে। সেটা অবিশ্যি বাজেয়াপ্ত করেছে মুচিপাড়া থানার পুলিশ। দেশ ঘরে ফিরে যে যায়নি, সে খবরটাও পুলিশেরই দেওয়া। তার ট্যাঁপারি মার্কা একটা ভাই আর দুর্দান্ত মাতাল বর এসে খানিক হম্বিতম্বি করে গেছে গগন মুখুজ্যের ভিটেয়। তবে ঐ গর্জনই সার। বাসন্তীর টিকির খোঁজটুকুও মেলেনি কোথাও। বেবাক উবে গিয়েছে যেন মানুষটা।
প্রথমদিকে, পলাশকান্তির বাপ হেবো পুলিশকে শুনিয়ে খানিক চেল্লামেল্লি করেছিল বটে – “মঞ্জু, দ্যাকো দ্যাকো, ঝি বেটি কিচু নিয়ে সটকেচে কিনা! বলতে নেই, দামী জিনিসপত্তর তো কম নেই বাড়িতে” –
মঞ্জুরানী শশব্যস্ত হয়ে আঁচলে বাঁধা চাবির গোছা দিয়ে আলমারিটা খুলতে গিয়েই মধুর বচন শুনতে পেয়েছিল –
“ইঁইঁঃ, কতই দেখাবি পদি, অম্বলেতে আদা! পোঁদে নেই ইন্দি, ভজো রে গোবিন্দি! এক পয়সার মুরোদ নেই, পাগড়িঅলার কাচে গুপ্তধনের দেমাক দ্যাকাচ্চেন। বলি, হেবোর না হয় লাজলজ্জা নেই, তোরও কি মানসম্মান নেই লা?”
সময়ের প্রলেপে বাসন্তী অন্তর্ধান রহস্যও থিতিয়ে গেল একসময়। কোথাও সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে, পুলিশও আনাগোনা বন্ধ করে দিল। শুধু এককালে পাঁচ গন্ডা দাস দাসী পোষা গগন মুখুজ্যের ভাঙা প্রাসাদে শুকো বা বারোমেসে, কোনও কাজের লোকই আর পাওয়া গেল না।
অগত্যা অনাগ্রহী পলাশকান্তি প্রত্যহ বাজারে ছুটতে লাগল, মঞ্জুরানী সকাল সন্ধে একপাঁজা বাসন মাজতে বসল আর হেবোকত্তা কোলবালিশের আয়েস ফেলে নিত্যি গিঁট দিয়ে ফতুয়া কাচা অভ্যেস করে ফেলল।
ভাদ্র মাসের শেষ, বর্ষা যাই যাই করছে। পুজো প্রায় এসেই গেল। তবু মাঝে মাঝে আকাশের নীল তকতকে মেঝেতে কাদামাখা দস্যি দামাল শিশুর মতো হুটোপাটি করতে আসে মেঘের দল – খানিক কালিঝুলি মাখিয়ে আবার পালিয়ে যায় কোথায়।
এমনই এক দিনে, একজন অসুস্থ সহকর্মীর বদলি হিসেবে সকালের শিফটের ডিউটি পড়েছিল পলাশের। ফেরার সময় মল্লিকবাজারের আগেই ড্রপ ভ্যান গেল বিগড়ে। একে বাদলা বিকেল, তার উপর এতটা রাস্তা আপন ভরসায় ফিরতে হবে, খিদে পেয়েছে, ঘুমও – মেজাজটাই টকে গেল তার। অন্যান্য কলিগরা সব টুপটাপ খসে পড়ছিল ভ্যান থেকে, তারপর মুখচোরা পলাশের তোয়াক্কা না করেই মিশে গেল জনারণ্যে।
পলাশকান্তি তিত্কুটে মুখে রাস্তা পেরোল। অকালসন্ধ্যা নেমে আসায় আগেভাগেই জ্বলে উঠেছে রাস্তার বাতি।
সামনে ঝলমলে পার্ক স্ট্রিট, ডাইনে গাড়ির টায়ার আর যন্ত্রাংশের বাজার। বাজার ছাড়িয়ে নোনাপুকুর ট্রামডিপোর উল্টোদিকের বাঁ-হাতি রাস্তায় ঢুকে পড়লে শর্টকাটে রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড একটুখানি হাঁটাপথ। ওখান থেকে ওয়েলিংটনের অনেক বাস পাওয়া যাবে। তবু কেন যেন আজ চেনা পথে হাঁটতে মন চাইল না তার। ব্যস্ত রাজপথ,
অর্থহীন শোরগোল ছেড়ে ওর মনটা হঠাৎই পালাতে চাইল অন্য কোথাও – নির্জন, নিরিবিলিতে।
কি ভেবে, পার্ক স্ট্রিটের মোড় থেকে বাঁয়ে ঘুরে জীর্ণ লোহার আধখোলা গেট পেরিয়ে পলাশ সোজা ঢুকে পড়ল সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরখানায়। একা।
সিমেন্ট বাঁধানো পথ। নিস্তব্ধ। আশে পাশে তেকোণা গম্বুজের সারি। সামনে পাথরের বেদী। তাতে নামফলক। মৃতের। পরিজনদেরও। তারাও এখন মৃত। কোথায় যেন পড়েছিল, এক দেড়শ’ বছর এখানে সমাধিস্থ করা হয় নি কাউকে। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কবরখানার অনেকটা ভিতর দিকে চলে এসেছিল পলাশ। গাছপালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল সার্কুলার রোডের দিকের পাঁচিল – কালচে, শ্যাওলাঢাকা। গাড়িঘোড়ার শব্দ এখানে স্তিমিত। যদিও বৃষ্টি নেই এখন, তবু একটু বাদেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসবে, সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। একটা ঘড়ি যেন মনের মধ্যে টিকটিক করে উঠে জানান দিল তাকে – আর নয়, এবার ফিরতে হবে।
ফেরার জন্য পিছন ঘুরতেই স্থাণু হয়ে গেল পলাশকান্তি। ঐ দিকের ন্যাড়ামতো কবরটার পাশে ও কে দাঁড়িয়ে? সাদাটে শাড়ি পরনে – যেন হাওয়ায় ভেসে রয়েছে এক অমানুষী অবয়ব! একদলা মেঘ বুঝি নেমে এসেছে প্রায়ান্ধকার সমাধির পাশটিতে। সব আলো ধীরে ধীরে নিভে গেল পলাশের চোখের সামনে থেকে। মুছে গেল সব শব্দ। চেতনা তার হাত ছেড়ে দেবার মুহূর্তে একটা অস্ফুট চিৎকার বোধহয় করেছিল সে – ছায়ামানবী মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছিল তার দিকে। তারপর, তার আর কিছু মনে নেই।
“বাব্বা, এত ভিতু আপনি? তাহলে সিমেট্রিতে ঢুকেছিলেন কেন?”
ঝাঁঝালো গলার কথা ক’টি কানে যেতে ভয়ে ভয়ে চোখ মেলেছিল পলাশ। অবশ্য একটু আগে প্রভূত জলের ঝাপটায় শীত ধরিয়ে দেওয়া অনুভূতি এবং দেহাতি ঠেট হিন্দিতে ‘জুত্তি সুঙ্গানে কা তরকিব’ কানে যেতেই নিখুঁত টাইমিংএ লুপ্ত জ্ঞান ফিরে এসেছিল তার। চোখ মেলেই দেখল, গোরস্থানের পেত্নিকে পাশে নিয়ে তার নাকের ডগায় দুর্গন্ধ ভিজে মোজাসহ তারই চামড়ার জুতোজোড়া দোলাচ্ছে হতভাগা কেয়ারটেকার!
উঠে বসে, চোখ দুটো রগড়ে নিয়ে অপ্রাকৃত ছায়ামানবীকে ভালো করে লক্ষ্য করল পলাশকান্তি। নিগ্রোদের মতো কুঞ্চিত কেশদাম টেনে পনিটেল করে বাঁধা। দ্রাবিড় সুন্দরীদের তুল্য দেহসৌষ্ঠব, খসখসে কষ্টিপাথরের মতো গায়ের রং,পরনে সরুপাড় সাদা খোলের আটপৌরে তাঁত, মাজনের বিজ্ঞাপনকে লজ্জা দেওয়া ঝকঝকে দাঁতের হাসি – দেখেশুনে পলাশ যেন থ’ হয়ে গেল।
হাস্যমুখী এবার বলে উঠল – “আর কতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে থাকবেন? উঠুন। দেখুন, মেঘ ছিঁড়ে কেমন সুন্দর জ্যোৎস্না ফুটেছে!”
উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মাথাটা টলমল করে উঠেছিল পলাশের। মনে পড়েছিল, অনেকক্ষণ কিছু খাওয়া হয়নি। সকালের রুটি আলুর তরকারি কখন তলিয়ে গিয়েছে, ফাঁকা পাকস্থলি জানান দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে এতক্ষণে।
নিমেষে তার ডান হাতটা দৃঢ়ভাবে ধরে ফেলল মেয়েটি – “একি, পড়ে যাচ্ছেন কেন? এখনো অসুস্থ লাগছে?”
অস্পষ্টভাবে ঘাড় নাড়ল সে। তারপরই শুনল মেয়েটি বলছে – “ও, খাওয়া হয়নি বুঝি অনেকক্ষণ? চলুন চলুন, এখান থেকে বেরোলে একটু এগিয়ে একটা রোলের দোকান আছে, দারুণ এগরোল বানায় – খিদেতেষ্টার বোধ ভুলে অফিসে কাজ করেন কেমন করে? আচ্ছা লোক মশাই আপনি!”
এই প্রথম পূর্ণদৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকায় পলাশকান্তি। জীবনে প্রথমবার দুটো সহজ, হাসিমাখা চোখে সোজাসুজি চোখ রাখে। “আপনি কে?”
“ও, পরিচয় না দিলে এগরোল খাওয়া বুঝি বারণ?”
পাহাড়ি ঝর্নার মতো খিলখিল হাসির ফোয়ারায় ভিজে যায় পলাশ – “আমি আকাশমণি। আকাশমণি কিস্কু। এন্টালির মেরি কুপার্স ওল্ড এজ হোমের সুপারভাইজার। এবার এগরোল খাবেন তো?”
(ক্রমশ)












